পল্লবী সেনগুপ্ত
পশ্চিম আকাশের অস্তগামী লালচে সূর্যটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিল আঁখিশ্রুতি। দেখতে দেখতে জীবন আকাশ থেকে খসে গেল আর একটা গোটা দিন। আগামীকাল আবার একটা নতুন সকাল আসবে। তারপর আবার ফুরিয়ে যাবে। আর এই ভাবেই একটু একটু করে প্রতিদিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় প্রত্যেকটা মানুষ।
আজকাল মৃত্যুর চিন্তা ভাবনারা মাথার মধ্যে যেন বড় বেশি দাপাদাপি করে প্রখ্যাত সাহিত্যিক শ্রুতি রায়ের। আসলে বিগত এক বছরে মানে ঊর্মির বিয়ের পর থেকে নিঃসঙ্গতা যেন আরও বেশি প্রবল পরাক্রমে চেপে ধরেছে ওকে। অবশ্য এই আরও বেশি নিঃসঙ্গ জীবন তো ও নিজ দায়িত্বেই বেছে নিয়েছিল মেয়ের বিয়ের পর।
ঊর্মির বিয়ের সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই কথাটা অনীশ এর সামনে তুলেছিল ও।
-''আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আমাদের এই বাড়িটা ছেড়ে কসবার পুরনো বাড়িতে শিফট হয়ে যাব। আমি ওখানেই নিরিবিলিতে থেকে এবার থেকে নির্বিঘ্নে লেখা লিখি করতে চাই। আশা করি, তোমার আপত্তি হবে না''। কথাটা এক নিঃশ্বাসে বলেই সেদিন অনীশ এর উত্তরের অপেক্ষা করেছিল শ্রুতি।
কয়েক পলক চুপ ছিল সে। তারপর বলেছিল
-''বেশ তবে তাই হোক। তুমি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছ তখন আমি আর তার ওপরে কেনই বা কিছু বলতে যাব। তুমি তো জানোই আমি ব্যাক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তুমি ভাল থাক আমি শুধু এইটুকুই চাই''। নিজের বক্তব্য টুকু শেষ করেই উঠে গেছিল অনীশ রায়। বুকের বাম দিকটায় চিনচিন করে উঠেছিল শ্রুতির। একটা কান্নার দলা আটকে এসেছিল গলার কাছে। এত গুলো বছরেও তার মানে অনীশের জীবনে এতটুকু অপরিহার্যতা তৈরি করতে পারেনি ও! হ্যাঁ পারেনি নিশ্চয়ই। সেইজন্যই তো ঊর্মি নেই বলে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার ভাবনাটা এসেছিল ওর মাথায়। না, অনীশ ওকে একবারও আটকায়নি সেদিন। তাই শ্রুতিও আর মিথ্যা বন্ধনে বাঁধা পড়ে থাকতে চায়নি।
মাসী মেসো মারা যাবার পর এই ফ্ল্যাটটা ওর বরাদ্দেই জুটেছিল মিষ্টিদিদি বেঁচে না থাকার দরুন। তাই সেই বাড়িতেই আজকাল থাকতে শুরু করেছে ও। একেবারে একা। ইতিমধ্যে ফোনে ঊর্মির সাথে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। মেয়েটা এসেওছিল এখানে। কিন্তু ও বাড়িতে ফিরে যাওয়া নিয়ে কোন কথা হয়নি। ঊর্মিকে আজকাল ভাল পড়তে পারেনা শ্রুতি। কখনও মনে হয় মেয়েটা ভালই আছে জীবনের নতুন রঙ খুঁজে নিয়ে, আবার কখনও মনে হয় বুকের গভীরে অনেকটা কষ্ট চেপে রেখেছে যেন ও রঙিন সেলফেনের মিথ্যা আবরণের মাঝে।
না, অনীশ কখনও যোগাযোগ করেনি এর মধ্যে। এখানে আসা তো দূর, ফোনও কখনও করেনি নিজের থেকে। শ্রুতি নিজে থেকেই কয়েকবার ফোন করেছিল মানুষটার খোঁজ খবর নিতে। তখনও কেমন যেন ছাড়াছাড়া ভাব ছিল তার। মনে হচ্ছিল যেন কথা শেষ করতে পারলেই বাঁচে।
অপমান আর যন্ত্রণার অনুভবটাও আজকাল কেমন যেন ভোঁতা হয়ে গেছে শ্রুতির। এত বছর ঘর করার পরেও যে নিজের মনের মানুষটার হৃদয়ে একফালি জায়গাই তৈরি করতে পারে না নিজের জন্য, সে বোধ হয় সত্যি মান অপমানের লক্ষণরেখার বাইরেই হয়। প্রেমের গল্প উপন্যাস লিখে অনেক নাম, অর্থ সবই পেয়েছে এ জীবনে, কিন্তু গোটা জীবন বিলিয়ে দিয়েও একমুঠো প্রেমের স্পর্শ আর কেনা হল না সাহিত্যিক আঁখিশ্রুতি রায়ের। অজান্তেই বুক ঠেলে বেরিয়ে এল একটা হাহাকার গোঁজা দীর্ঘশ্বাস।
সূর্য দুবে গেছে। পৃথিবীর বুক জোড়া অন্ধকারের টুকরো টাকরা ছিটকে এসে আঁধারে ভরিয়ে দিয়েছে শ্রুতির ঘরটাকেও। কালো টুকু মুছতে সুইচ টিপে সাদা টিউব লাইট জ্বালাল ও। আলো জ্বলতেই ওর চোখটা কিভাবে যেন চলে গেল দেওয়ালে টাঙ্গান ক্যালেন্ডারটার দিকে। ধক করে উঠল অমনি বুকের ভেতরটা। আগামীকাল ৮ই ডিসেম্বর! উফফ! এই দিনটাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করে ও। এইরকমই একটা অভিশপ্ত ৮ ডিসেম্বরে এই বিচ্ছিরি পৃথিবীটায় এসে জুটেছিল ও। এটাই নাকি ওর জন্মদিন!
যতদিন মাসি মেসো ছিল ততদিন তাও এক চিলতে আশীর্বাদ জুটত এইদিনটাতে ওর কপালে। কিন্তু তারা চলে যাবার পর থেকে সেই পার্ট চুকে গেছে চিরতরে। কেউ এসে আলাদা করে কোনদিন একটাও ভাল কথা বলে নি ওকে কখনও ৮ই ডিসেম্বর। তবে হ্যাঁ অনীশ রায় একজন কর্তব্যপরায়ন মানুষ। তাই আলাদা ভাবে উইশ না করলেও প্রতি বছর এই দিনে ফুলের তোরা অর্ডার করতে কখনও ভুলত না সে। ঠিক সময়মত এসে হাজির হত গোলাপের গুচ্ছ।
আস্তে আস্তে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল শ্রুতি। মাথাটা বড্ড ধরেছে। একটু চা খেতে হবে।
চায়ের জল কেটলিতে চাপাতেই হুট করে বেজে উঠল ডোরবেল।
-''কে? কে?'' রান্নাঘর থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এল শ্রুতি। কে এল এই অসময়ে? দরজার আইবলে চোখ রাখল। কিন্তু বাইরে এত অন্ধকার যে দেখা যাচ্ছে না কিছুই। বাধ্য হয়েই দরজাটা অল্প ফাঁক করল ও। আর অমনি মাথার ভেতর একটা অদ্ভুত দুলুনি টের পেল ও। এটা ও কি দেখছে? কে দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে? অনীশ রায়ই কি সত্যি? ও কিছু ভুল দেখছে না তো?
-''ভেতরে আসতে বলবে না''? শ্রুতির চোখে চোখ রেখে বলল মানুষটা
-'' হ্যাঁ নিশ্চয়ই। এস।'' এতটাই বিস্মিত হয়েছিল ও যে ভুলেই গেছিল ওকে ডাকতে ভেতরে।
চৌকাঠ পেরিয়ে শ্রুতির আঙ্গিনায় এসে দাঁড়াল সে। হাতে শক্ত করে ধরা লাল গোলাপের গোছা।
-''বোসো''। মৃদুস্বরে বলল শ্রুতি।
-''বসতে আমি আসিনি।
-''তাহলে''?
-''তোমায় নিয়ে যেতে এসেছি। আজই। এক্ষনি''।
মধ্য পঞ্চাশেও বুকের মধ্যে কেমন যেন কিশোরীবেলার মত জলতরঙ্গ বাজছে সাহিত্যিক আঁখিশ্রুতি রায়ের।এসব হঠাৎ হচ্ছে টা কি ওর সাথে!
-''আমি ও বাড়িতে সত্যি ফিরব না। আমার ওখানে প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমাদের বিয়েটা হয়েছিল শুধুমাত্র ঊর্মিকে কেন্দ্র করে। ঊর্মি এখন নিজের সংসারে থিতু। তাই''
-''শুধুই ঊর্মি? আর আমি? এই এতগুলো বছরে আমি কি তোমার কাছে এতটুকুও আপন হয়ে উঠতে পারিনি কখনও আঁখি''?
বুকের মধ্যে বাষ্প আরও ঘনীভূত হচ্ছে আঁখিশ্রুতির। আজ এত বছর পর আবার তার মুখে আঁখি ডাক।
-''আমার তো তোমার আপন হবার কথা ছিল না অনি দা। তোমার জীবনে আমি কোনদিন মনোরমার জায়গা নিতে পারব না তুমি নিজেই তো জানিয়েছিল বিয়ের রাতে। তাই সেই চেষ্টা কোনদিন ভুল করেও তো করিনি আমি''। গলা কাঁপছে এবার শ্রুতির।
-''জানি আমি এ কথা বলেছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি তা বলে তুমিও নিজের মনটাকে এমন পাষাণ পাথরে বেঁধে দেবে যে আমি করাঘাত করার সুযোগটুকুও পাব না আর। দিন যেতে যেতে একটা সময়ে তুমি আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলে আঁখি। মনে হয়েছিল তুমি তো আছই। কিন্তু তবুও তোমায় ছুঁতে ইচ্ছে করলেও সেই ইচ্ছেকে সংযমের কঠিন বাঁধে বেঁধে রেখেছিলাম আমি চিরকাল। মনে করেছিলাম তুমিও নিশ্চয়ই আমাক বিয়ে করেছ সমঝোতা করেই, হয়তো খানিকটা তোমার মাসি মেসোর কথায় আর কিছুটা ঊর্মিকে কাছে ধরে রাখার জন্য। তাই তোমার বন্ধুত্ব বা সাহচর্যের অভ্যাস গড়ে উঠলেও, তোমাকে ভালবাসার অভ্যাস যাতে না ধরে আমায় সেই ব্যাপারে সদা সচেতন থেকেছি সতর্কভাবেই। বহু রাত ভেবেছি কেন তুমি ভালবাসতে পারলে না এতদিন এক ছাদের নিচে থেকেও। কেন একবারও আমার সামনে নিজে থেকে এসে দাঁড়ালে না স্ত্রীয়ের অধিকার নিয়ে! তারপর ঊর্মির বিয়ের পর যখন তুমি ঐ বাড়ি ছেড়ে দিলে তখন দুমড়ে গেছিল আমার মনটা। খুব অপমানিত লেগেছিল নিজেকে তোমার কাছে এতটা অবাঞ্ছিত হতে দেখে। তোমার সাথে কথা বলতেও ইচ্ছে করেনি একটিবারের জন্যও।
হয়তো এই অভিমান নিয়েই কাটিয়ে দিতাম বাকী জীবনটাও যদি না ঊর্মির কাছে শুনতাম সবটা। ঊর্মির কাছে তোমার নিজের জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির জেরক্স কপি ছিল আঁখি। তুমি হয়তো সেটা জানতে না। কাল ঊর্মি মা সেই জেরক্স কপিটাই পড়তে দিয়েছিল আমায়। আর তাই
কেন আমায় এতদিন বলনি যে তোমার জীবনের কিশোরীবেলা থেকেই শুধু আমিই ছিলাম। কেন আমায় এত বছর ধরে এতটা নিঃসঙ্গ করে রাখলে আঁখি?'' আচমকাই আঁখির হাত চেপে ধরেছে অনীশ রায়।
-''কি হত বলে? আমি যে মনোরমা নই। তোমার মনে যে শুধুই তার অধিষ্ঠান''। চোখ দিয়ে জল পড়ছে টপ টপ আঁখি শ্রুতির।
-''তুমি আমার সন্তানের মা। তুমি আমার স্ত্রী। আমি আজ এর বাইরে আর কিচ্ছু জানতে চাই না। তাই তুমি আমার সাথে ফিরে যাবে। জীবনের এই গোধূলিপ্রান্তে আর আমায় একা করে দিও না তুমি''।
-''তা আর হয় না। অনেক দেরি হয়ে গেছে অনিদা''।
-''কেন হয় না? কিসের দেরি ?তুমি কি জান'' কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল অনীশ রায়, কিন্তু বলা হল না। তার আগেই আবার বেজে উঠল ডোরবেল।
-''কে'' বলেই দরজা খুলে দিল শ্রুতি। আবার চমক। দরজার বাইরেই ঊর্মি।
-''তুই? আয় মা আয়''।
ভিতরে এল ঊর্মি।
-''বোস মা। আমি চা করে আনি''।
-''না আমি চা খেতে আসিনি।আমি একটা কাজে এসেছি''। একটু কঠিন গলাতেই বলল ঊর্মি।
একটু চমকাল শ্রুতি।
-''কি কাজ বল''।
-''আমি আমার মা কে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি আমাদের বাড়িতে। আমার বাবার জীবনে। কাল তোমার জন্মদিন। তোমার এই জন্মদিনে তুমি না হয় আমাকেই উপহার দিলে। আমার বাবার মুখের হাসি আমায় উপহার দাও মা। আর আমায় ফিরিয়ে দাও না আমার বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত মাতৃস্নেহ''।
চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে আঁখির। ঊর্মি মা বলে ডাকছে ওকে! এগুলো স্বপ্ন নয় তো? এই দিনটার প্রত্যাশাতেই যে ও প্রহর গুনেছে বছরের পর বছর।
-''কি হল বল? ফিরিয়ে দেবে আমায়''? এবার ঊর্মি এসে জড়িয়ে ধরেছে তার জন্মদাত্রীকে।
-''তোর ডাক ফেরানোর ক্ষমতা আমার নেই রে মা।'' পরম স্নেহে মেয়েক বুকে জড়িয়ে নিল আঁখিশ্রুতি রায় আর অপর এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরল ভালবাসার মানুষটার হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।