পল্লবী সেনগুপ্ত
বুকের মধ্যে অসম্ভব একটা ধুকপুকানি টের পাচ্ছে আজ আকাশ। সে তো হবারই কথা। এতগুলো বছর পরে আজ যে আবার ঊর্মির মুখোমুখি হবার দিন। না, আকাশ সত্যি ভেবেইছিল একদিন যে আর কোনদিন ঊর্মির মুখোমুখি হবে না ও। কিন্তু
এর মধ্যে বেশ কয়েকবার কথা হল অনীশ আঙ্কেল আর শ্রুতি আনটির সাথে। মানুষ দুটো বিপর্যস্ত পুরোপুরি ভাবে। শ্রুতি আনটি তো একান্তে ওর হাত চেপে ধরে ছলছল চোখে অনুরোধ করেছেন বারবার
-''প্লিজ আকাশ। প্লিজ আমার মেয়েটাকে আবার তুমি ফিরিয়ে নিয়ে এস স্বাভাবিক জীবনে। আমি জানি তুমি পারবে। কারণ আমার মেয়েটা যে বড্ড ভরসা করত তোমায়''। একটা অসহায় মমতার বৃষ্টি ঝড়ে পড়ছিল আনটির দুই চোখ থেকে। ঊর্মি বারবার বলত শ্রুতি আনটি নাকি ভীষণ খারাপ একজন মানুষ। কিন্তু কই তেমন তো মনে হচ্ছে না। উনি ঊর্মির সৎ মা এমনটাও একবারের জন্যও মনে হয়নি আকাশের।
আস্তে আস্তে ঊর্মির ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল আকাশ, দীর্ঘ চার বছর পর। জানলায় মাথা রেখে ঘরমুখী পাখী আর গোধূলির আলো মাখা বিকালটাকে চোখের তারায় জড়িয়ে নিচ্ছে ও। আর কোনদিকে খেয়ালই নেই যেন।
-''ঊর্মি, ঊর্মি কেমন আছিস রে? চিনতে পারছিস আমায়''? নিজের আবেগকে যথাসম্ভব লুকিয়ে রেখে গলা ঝাড়ল আকাশ। এতক্ষণে কোনরকমে ঊর্মির ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়েছে ও।
ঊর্মি আস্তে আস্তে ঘাড় ফেরাল। আকাশ এবার একেবারে ওর চোখের সামনে। একি! ওকে দেখেই চমকে গেছে আকাশ। এটা কাকে দেখছে ও? গাল ভেঙ্গে গেছে মেয়েটার। চোখ দুটো কোটরাগত। রুগ্ন শীর্ণ চেহারা।
মিনিটখানেক ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মেয়েটা। যেন এক সমুদ্র স্মৃতি হাতড়ে খুঁজছে ও আকাশের নামটা। তারপর আস্তে আস্তে ঠোঁট নড়ে উঠল ওর
-''আকাশ, তুই এসেছিস? কোথায় ছিলি রে এতদিন?'' আস্তে আস্তে ওর দিকে এগিয়ে আসছে ঊর্মি। ওর হাত ছুঁল আলতো করে।
-''আমার তোকে অনেক কিছু বলার আছে আকাশ। শুনবি তো তুই''?
-''সব শুনব। সব সময় তোর সাথে আছি ঊর্মি''।
আকাশের হাত ধরে এবার টানছে ঊর্মি। ওকে নিয়ে গেল খাটে। বসাল নিজের পাশে।
-''বল। তোর মনে যা আছে সব খুলে বল আমায় ঊর্মি''। ঊর্মির মাথায় হাত রাখল আকাশ।
-''মেঘ! জানিস আকাশ মেঘ আর নেই। হারিয়ে গেছে। হয়তো আর কোনদিন ফিরবে না। আমার ভালবাসাকে ছুঁড়ে ফেলে চলে গেল ও। বলেও গেল না। না ওর থাকার কোন প্রমাণ আজ আর নেই। তাই সবাই ভাবছে মেঘ বলে আজ আর কেউ নেই। ও কাল্পনিক। কিন্তু বিশ্বাস কর, মেঘ সত্যি। দিনের আলোর মত সত্যি। বিশ্বাস কর তুই আমায়''। হুহু করে কাঁদছে ঊর্মি। বুকটা মুচড়ে উঠছে আকাশের।
-''আমি বিশ্বাস করি তোকে। আজীবন করব।'' কান্না চেপে বলল আকাশ।
-''জানিস সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল ঝিরঝির করে। আমি আমার হাল্কা গোলাপি ছাতাটাকে সঙ্গি করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম বই পাড়ায়। একটা বই খুঁজছিলাম। রাশিয়ান রূপকথার কমপ্লিট কালেকশান। অনেক দোকান দোকান জিজ্ঞাসা করছিলাম। কিন্তু কেউই দিতে পারছিল না আমায়। আমি হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। যখন হতোদ্যম হয়ে ফিরে আসার পরিকল্পনা করছি, ঠিক তখনই পলকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছিল আমার হৃদপিণ্ডটা। একটা সুর। সেই সুরটা মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিয়েছিল আমার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস। খুব কাছের কোন বুক স্টল থেকেই ভেসে আসছিল সুরটা। কেউ একজন গিটার বাজাচ্ছে। কিন্তু গিটারের সে সুর যে আমার বড় চেনা। এই সুর যে আমি বহুকাল ধরে শুনে আসছি আমার স্বপ্নের মধ্যে। এই সুরের আড়ালে থাকা মানুষটাই যে আমার ভালবাসার মানুষ।
আমি কেমন পাগলের মত হয়ে গেলাম। মোহগ্রস্তের মত হাঁটতে শুরু করলাম। তবে বেশিক্ষণ নয়। খানিক এগোবার পরেই দেখতে পেলাম। একটা ছোটমত স্টল বইয়ের। সেখানেই বসে রয়েছে একটা ছেলে। পিছন করে বসেই বাজিয়ে চলেছে একমনে একটা কমদামী হাওয়াই গিটার। কোনদিকেই যেন খেয়াল নেই তার।
একটু শুনবেন বলে একটা মৃদু হাঁক দিলাম আমি। তার মুখ দেখার জন্য তখন আমি মরিয়া হয়ে গেছি। আস্তে আস্তে সে মুখ ফেরাল আমার দিকে। আর আমার মনে হল আমি বুঝি জ্ঞান হারাব এবার। এ কাকে দেখছি আমি? এ তো সেই মুখ যে আমার স্বপ্নে লুকোচুরি খেলছে না জানি সেই কবে থেকে। বড় মিল রয়েছে এই দুটো মুখের মধ্যে।
প্রাথমিক ভাবে সব কথা হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর কোনমতে বললাম
রাশিয়ান রূপকথার সমগ্র হবে?
সে অল্প হাসল। হুবুহু সেই হাসি, যেমন আমি দেখতে পাই আমার স্বপ্নে। সে অল্প হেসে বলল
এখানে মূলত পড়াশুনার মানে স্কুলের বই পাওয়া যায়। আর তার পাশাপাশি কিছু অনামি লেখকদের বই। যাদের বই তথাকথিত বড় প্রকাশক দের কাছ থেকে বের হয়না বা যারা ঠিক সেই অর্থে নাম করা লেখক বা প্রকাশক নয় তাদের বই আছে এখানে। না রাশিয়ান রূপকথা নেই, কিন্তু অনেক সাধারণ মানুষের স্বপ্নের রূপকথা পাবেন।
খুব সাধারণ কিছু মানুষ থাকেন যারা আজও বিশ্বাস করেন জীবনে হয়তো সত্যি কিছুটা রূপকথা লুকিয়ে থাকে। সেইজন্যই এই যান্ত্রিক যুগেও তারা লেখক বা কবি হবার জন্য সংগ্রাম করেন, স্বপ্ন দেখেন। আসলে স্বপ্নটাই তো আসল। যতক্ষণ একটা স্বপ্ন আছে ততক্ষণ জীবনে রূপকথাও আছে। স্বপ্ন যেদিন ফুরিয়ে যায় সেদিন থেকেই জীবন আর জীবন থাকে না, পরিণত হয় মৃত্যুর অপেক্ষায়।
না, ছেলেটার এই কঠিন কঠিন কথাগুলোর স্পষ্ট মানে আমি সেদিন মোটেই বুঝতে পারিনি। শুধু মনে হয়েছিল স্বপ্নের মানুষ বাস্তবের মাটিতে নেমে এলে আর কাগজের রূপকথা পড়ার প্রয়োজন থাকে না।
সেদিন কেমন মোহগ্রস্তের মত যেন ফিরে এসেছিলাম। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম সারা রাত। তারপর দিনই ফিরে গেলাম আবার। কিনে নিলাম একটা অখ্যাত লেখকের লেখা রূপকথা উপন্যাস।
আস্তে আস্তে যাওয়া বাড়তে লাগল আমার। জানলাম তার নাম মেঘ। খুব কষ্ট করে এই বইয়ের ব্যবসাটা করছে ও। টাকা পয়সা, মূলধন এসব খুব একটা নেই ব্যবসা বাড়ানোর জন্য। আছে শুধু একটা স্বপ্ন আর নিষ্ঠা। আস্তে আস্তে ওখানে প্রতিদিন যেতে শুরু করলাম আমি। ওর কথা শুনতাম মন্ত্রমুগ্ধের মত। মনে হত সেও যেন চায় আমি রোজ যাই সেখানে। মেঘ বলেছিল ওর তিনকুলে কেউ নেই। খুব একা ও। আর আমি ভাবতাম ওর ভালবাসার অভাব কড়ায় গণ্ডায় আমি মিটিয়ে দেব একদিন।
তারপর এল সেই দিন। সেদিনও আমি গেছিলাম ওর দোকানে। গিটারে আমার সেই সুরটাই বাজাচ্ছিল সেদিন ও। হঠাৎ কোথা থেকে যেন আকাশ ভরে গেল এক খণ্ড কালো বাদল মেঘে। আচমকা ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। ওর ছোট দোকানের ভিতর হিংস্রভাবে আছড়ে পড়ছিল বৃষ্টির ছাঁট। তড়িঘড়ি তাই দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়েছিল ও। ছোট দোকান, ভিতরে টিমটিমে আলো, বন্ধ ঝাঁপ, আর শুধু আমি আর আমার মেঘ।
হঠাৎ কেমন যেন বুকের মধ্যে দামামা বেজে উঠল আমার। হঠাৎ মেঘের হাত চেপে ধরলাম আমি। ফস করে বলে বসলাম লুকিয়ে রাখা কথাটা।
মেঘ, মেঘ তুমি কি বোঝো না কেন বারবার ছুটে আসি আমি। তুমি কি সত্যি বোঝো না? আমি তোমায় ভালবাসি মেঘ।
আমার কথাটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিল মেঘ। এদিকে আমার বুকে তো তখন সমুদ্রের উথাল পাথাল। ওর নীরবতায় কেঁপে উঠলাম আমি। কোন উত্তর না পেয়ে ফের বললাম কিছু তো বল।
না তাও সেদিন কিছু বলেনি ও। শুধু নিজের ঠোঁট দিয়ে আমার ঠোঁটে এঁকে দিয়েছিল ভালবাসার জলছবি''।
এতটা বলে একটু থামল ঊর্মি। আকাশ এর বুকে রক্ত ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা। কি বলছে এগুলো ঊর্মি! এতকিছু সব কি তবে ওর স্কিতজোফ্রেনিয়ার কল্পনা? এমন কি হয়?
-''তারপর আমি খুশিতে পাগল হয়ে গেছিলাম জানিস আকাশ। কিন্তু ও সব ছেলেদের মত ছিল না। ওর কোন মোবাইল নম্বর ছিল না। আমি বারবার বলা সত্ত্বেও ও ফোন নিত না।
তারপর একদিন হারিয়ে গেল ও। কোথায় হারিয়ে গেল কেউ জানে না। সবাই বলছে মেঘ বলে কেউ নেই। কারণ ওর থাকার কোন প্রমাণ নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বইয়ের দোকান নাকি এক মুসলিম বৃদ্ধের।
ওর মেসবাড়ি এর ঠিকানা একবার আমি ওর অয়ালট এর একটুকরো কাগজ থেকে পেয়েছিলাম। সেখানেও খবর নেওয়া হল। না, মেঘ নামে ওখানে নাকি কেউ কোনদিন থাকে নি। আমার কাছে মেঘের কোন ছবিও নেই জানিস। ও কোনদিন তুলতে দিত না কিছুতেই। শুধু আমার নিজের হাতে অঁকা দুটো স্কেচ আছে। একটা রঙ্গিন আর একটা সাদা কালো। দেখবি?''
হুট করে উঠে গেল ঊর্মি। নিয়ে এল দুটো ছবি ওর নিজের হাতে আঁকা।
আকাশের হাতে এখন ঊর্মির মেঘ। খুব যত্ন নিয়ে এঁকেছে ও দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এই তাহলে ঊর্মির কল্পনার চেহারা।
-''আকাশ, আমায় খুঁজে এনে দিবি মেঘকে? আমি জানি আকাশ একমাত্র তুই আমার কথাগুলো বিশ্বাস করবি। আমায় পাগল ভাববি না''। ঊর্মি নিজের মুঠোয় চেপে ধরেছে ওর জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধুর হাত।
-''আমি জীবনের শেষ দিন অবধি এই খোঁজ অব্যাহত রাখবো। কথা দিলাম তোকে। তুই তো বললি মেঘ স্বপ্নে বিশ্বাস করত। তাহলে তোকেও সেই স্বপ্নের প্রতি আস্থা রাখতে হবে ঊর্মি। তোকে মানতে হবে মেঘ তোকে সত্যি করে ভালবাসলে সে তোর কাছে ফিরে আসবেই। তবে তার জন্য তোকে নিজেকে সামলে রাখতে হবে। ঠিক করে খাওয়া দাওয়া করতে হবে, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে। তুই নিজেই ঠিক না থাকলে কিভাবে তুই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখবি''?
-''তুই আমার সাথে আছিস তো আকাশ? আমি জানি তুই ঠিক খুঁজে আনবি। আর আমিও তোকে কথা দিচ্ছি এবার থেকে আবার নিজের খেয়াল রাখব''।
-''এই তো গুড গার্ল'' ঊর্মির নাক নেড়ে দিল আকাশ। অনেকদিন বাদে আবার হাসছে খিলখিল করে ঊর্মি।
দৃশ্যটা আড়াল থেকে দেখছে লুকিয়ে শ্রুতি। না, এই হাসিটা কিছুতেই হারাতে দেবে না ওর জীবন থেকে আর শ্রুতি। কিছুতেই না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।