পল্লবী সেনগুপ্ত
ঝ্যাং ঝ্যাং করে গিটার বাজাচ্ছে মল্লার। এই সুরটা খুব প্রিয় ওর মায়ের। তাই এই সুরটাই বেশি বাজায় ও। এখন সবে মাত্র পনেরো বছর বয়স ওর, তবুও বাজানোর হাত দারুন ভাল। সেইজন্যই তো বাবা ওকে কিনে দিয়েছেন গিটারটা।
পাশের ঘরে ছেলের গিটারের শব্দ শুনতে শুনতেই ক্যানভাস বন্দী কাগজটায় রঙ তুলির আঁচড় কাটছিল মল্লারের মা মানে মিসেস ঊর্মিলা যিনি প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী। আস্তে আস্তে সাদা কাগজে ফুটে উঠছে বড় অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য। এই দৃশ্যটাই কেন কে জানে আজকাল ঊর্মির স্বপ্নে ফিরে আসে বারবার।
একটা মায়াবী সবুজ প্রান্তর। তার অদূরেই রয়েছে কাঁচের মত স্বচ্ছ জলের টলটলে এক দীঘি। বৃষ্টি পড়ছে ঝিরিঝিরি আর ভেজা হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে দীঘির পাড়ে বসে থাকা ছেলেটাকে। ছেলেটা বেহালার ছড় টেনে সৃষ্টি করছে অদ্ভুত এক মায়াবী সুর। ছেলেটাকে চেনে ঊর্মি। এই তো ওর আত্মজ। ওর মল্লার। মল্লারের পাশেই বসে মন দিয়ে ওর বাজনা শুনছে আকাশ। আর একটু দুরেই দাঁড়িয়ে আছে আকাশী ওড়না উড়িয়ে মল্লারের মা। আর মেঘ ঘেরা আকাশটা থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের দেখছে এক জোড়া মায়াভরা চোখ, যে চোখের সাথে বড় মিল বহুযুগ আগে ঊর্মির স্বপ্নে ভেসে আসা এক মানুষের নেত্রদ্বয়ের।
—''ছবিটা কি সুন্দর মা'' ছেলে এসে আচমকা জড়িয়ে ধরেছে ওকে।
—''তোর পছন্দ হয়েছে?'' মল্লারের মাথায় হাত বুলাল ঊর্মি।
—''দারুণ মা। ছবিতে আমি রয়েছি, বাবা রয়েছে, তুমি রয়েছ। কি সুন্দর সবুজ ঢাকা ছবি। কিন্তু এই ছায়া ঘেরা চোখ দুটো কেন আঁকলে মা? কার চোখ এটা জেগে রয়েছে আকাশের বুকে''?
—''মেঘের চোখ। মেঘ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে আমাদের''। ছেলেকে রূপকথাময় উত্তরটা দিয়েই হি হি হাসছে ঊর্মি। হাসছে মল্লারও।
—''এত কি হাসাহাসি হচ্ছে শুনি মা ছেলের''? মা ছেলের দলে এসে ভিড়ল বাবাও।
—''সব কথা বলব নাকি তোমায়?'' বলেই ছদ্মকোপে গাল ফোলাচ্ছে ঊর্মি।
দরাজ গলায় হাসছে এবার আকাশও। না, আজ আর খুশির কোন অভাব নেই ঊর্মির জীবনে।
হ্যাঁ ভাল আছে তিস্তাও। অরূপ দাস এখন অনেক সুস্থ। ছোট্ট একটা মেয়ে হয়েছে ওদের।
আঁখি আর অনীশ তো চুটিয়ে উপভোগ করছে বেলা শেষের দাম্পত্য।
শায়না এখন নিজের রেস্তরাঁ বানিয়েছে তিস্তার সাহায্যে। বেশ নাম করেছে শায়নার রেস্তরাঁ 'বিলিভ ইন টেস্ট'।
আর আজিজ? না কেউ জানে না তার খবর। হয়তো আজও পালিয়ে পালিয়েই বেড়াচ্ছে সে। কিংবা হয়তো বাঁধা পড়েছে অবশেষে সেও অন্য কোন শহর বা দেশে। কিংবা হয়তো এই শহরেই ফিরে এসেছে আবার অন্য কোন নাম বা পরিচয় নিয়ে। আসলে জীবন সফরে চলতে চলতে কত মানুষই তো ছিটকে যায় মূলস্রোত থেকে। কজনই বা আর খোঁজ রাখে তাদের! কিছুজন ভেসে থাকে জীবনসমুদ্রের উপরিতলে, আবার কেউ হারিয়ে যায় অতল গভীরে। আসলে জীবনের সমীকরণ যে বড়বেশি জটিল। তবু বেঁচে থাকে ভালবাসা, এগিয়ে চলে সম্পর্ক, প্রাণ পায় অনুভূতিরা; আর সেইজন্যই জন্ম নেয় হাজার হাজার অদেখা গল্প আমাদেরই চারপাশে প্রতিদিনে, প্রতিক্ষণে।
সমাপ্ত
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।