পঞ্চম অধ্যায়

পল্লবী সেনগুপ্ত

কোকিলটার কুহু কলতান আর মিঠে বাতাসের আচমকা আছড়ে পড়া জানান দিচ্ছে আবার বসন্ত এসে হাজির হয়েছে দোরগোড়ায়। কিন্তু বসন্ত কি সত্যি সবার জন্য আসে? কিছু মানুষ তো এরকমও হয় যাদের জীবন থেকে বসন্ত চিরতরে বিদায় নেয়, তাই না?

আঁখিও ঠিক এমনই গোত্রের মানুষ। সুখ, খুশি, আনন্দ এসব কিছু আঁখিদের মত মেয়েদের জন্য হয় না। আঁখি জন্মেছিল দুর্ভাগ্যলগ্নে। জন্মের আগেই বাবা ছেড়ে চলে গেছিল ওদের। লম্পট, মাতাল ওই লোকটাকে কোনদিন দেখে নি ও। দেখতে চায় ও নি। কেনই বা চাইবে? যে কোনদিন ওর বা ওর মায়ের জন্য ভাবে নি, ওদের মানুষ বলেই গণ্য করে নি তেমন মানুষের কানাকড়ি মূল্যও থাকতে পারে না আঁখির কাছে।

আঁখি ছোটবেলা থেকেই মানুষ হচ্ছিল মা আর দিদিমার ছত্রছায়ায়, অভাব অনটনের সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে। তবে হাজার প্রতিকুলতার মাঝেও ওর ছিল অদম্য জেদ। বড় হওয়ার একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

প্রতিকূলতার অমাবস্যা ঘেরা কালো রাত গুলোতে যখন চোখের জল ফেলত ওর মা অসহায়ের মত তখন বুকের কাছটায় অসহ্য টনটন করত ওর । মা এর কোল ঘেঁষে বসে ও বলত তখন

—''মা, তুমি কেঁদো না। আমি একদিন তোমার সব কষ্ট দূর করে দেব দেখো''। সব বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করেও পড়াশুনায় নিজের নিষ্ঠা অবিচল রাখত আঁখি। কারণ ও জানত একমাত্র এই জিনিসটাই ওকে এগিয়ে দিতে পারবে উন্নতির পথে।

কিন্তু আঁখি যে জন্মেছিল দুর্ভাগ্য লগ্নে। আর ওই লগ্নের জাতিকারা হাজার চেষ্টা করলেও সুখের মুখ দেখতে পায় না। তাই হঠাৎ একদিন আচমকা সানস্ট্রোক হয়ে মরে গেল ওর দিদিমা। আর তার ঠিক বছরখানেকের মাথায় গাড়ি চাপা পড়ে এ গ্রহের যাত্রা শেষ করল ওর মা। আঁখির তখন চোদ্দ বছর। তিন কূলে কোথাও কেউ নেই। এমন অবস্থায় আঁখির মত কিশোরীরা মেয়েরা হয় শকুন আর নেকড়ে রূপী মানুষদের লালসার শিকার হয়ে যায়, নয়তো পরিচালি হয় বিপথে।

কিন্তু হাজার দুর্ভাগ্যের কবলে বারবার পড়লেও সে যাত্রায় কিভাবে যেন বেঁচে গেছিল ও। পাকে চক্রে কিভাবে যেন এসে পড়েছিল মণি মাসির হাতে। মণি মাসি ওর দুঃসম্পর্কের এক মাসী। কলেজের প্রফেসর। তার স্বামীও প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জনিয়ার। বেশ উচ্চবিত্ত ওরা। আর ভীষণ ভাল মানুষ ওরা। মণি মাসীর সংসারে জায়গা পেয়ে হাতে যেন স্বর্গ পেয়েছিল সেদিন আঁখি। বারবার ধন্যবাদ জানিয়েছিল ও ওই ওপরে থাকা ভগবান নামের লোকটাকে যাকে ও এতদিন বিশ্বাস করত না। তবে এই সংসারে যে সবচেয়ে বেশি ওর আপনার হয়ে উঠেছিল সে হচ্ছে মিষ্টি দি।

মিষ্টিদি মণি মাসির একমাত্র মেয়ে। একটু রুগ্ন, কিছুটা ক্ষ্যাপাটে কিন্তু বড় ভাল মনের মানুষ। আঁখির মত একটা অনাথ অভাগা মেয়েকেও কোনদিন অবহেলার চোখে দেখে নি সে। বরঞ্চ কখন যেন নিজের বোনের জায়গাই দিয়েছে। আঁখিও ভীষণ শ্রদ্ধা করে মাত্র পাঁচ বছরের বড় এই মেয়েটাকে। কিন্তু তার মনের মানুষকেই কখন যে আঁখি অজান্তে মন দিয়ে ফেলেছে সেতো ও টেরই পায় নি।

মেসোর বন্ধুর ছেলে সে। অনি দাদা। এ বাড়িতে বেশ ঘনঘন যাতায়াত ছিল। অনি দাদার সাথে মিষ্টিদিদির একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল সেটা জানতো আঁখি। ওরা অনেক গল্প করত, হাসি ঠাট্টা করত। আর সেই গল্পের মাঝেই কখনও সখনও মিষ্টিদি জোর করেই সামিল করে নিত আঁখিকে।

—''এই আঁখি সব সময় বুড়িদের মত মায়ের পায়ে পায়ে কেন ঘুরিস রে? আয় তো এখানে গল্প করি''। প্রতিবারই না বলত মিষ্টিদি। কিন্তু অনি দাদা সামনে এলেই কি এক অদ্ভুত ব্রীড়া যেন অবরুদ্ধ করত ওকে। তবে সেদিন আর না করতে পারে নি আঁখি, যেদিন প্রথম অনি দাদাও মিষ্টি দিদির সাথে সুর মিলিয়ে আহ্বান জানিয়েছিল ওকে।

—''হ্যাঁ আঁখি ও তো ঠিকই বলছে। তুমি এস তো। গল্প কর আমাদের সাথে। একদিন আমাদের সাথে গল্প করলে কিচ্ছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না''।

পলকেই অনি দাদার আন্তরিক ব্যবহারে সহজ হয়ে গেছিল ও। আস্তে আস্তে সেই ছেলেটার সাথেও বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল ওর। অনি দাদা ভীষণ ভাল। খুব সম্মান করে আঁখিকে। ও বাড়ির আশ্রিত বলে মনেই করে না। আর তার এই উদার মন আর আন্তরিক ব্যবহারই কখন যেন চুরি করে নিয়েছিল আঁখির মন।

তারপর একদিন এল সেই দিন। বড্ড মেঘ বৃষ্টির খেলা চলছিল সেদিন সারা বেলা জুড়ে। অনি দাদা ওদের বাড়ি এসে আটকে পড়েছিল। ফিরতে পারছিল না। আর ওদিকে মাসি আর মেসোও বাড়িতে ছিল না। দুপুরে সেদিন খাওয়া দাওয়ার পর আড্ডা মারছিল ওরা তিনজন। সেদিন হঠাৎ অনি বলল

—''এই আঁখি, চা খাওয়ায় না একটু''।

—''এক্ষুনি আনছি''। বলে উঠে গেছিল ও।

কিন্তু শেষ অবধি আর চা দেওয়া হয় নি ওর। চায়ের পেয়ালা পড়ে গেছিল হাত থেকে। চা করে নিয়ে ঘরে ঢোকার সময়ই ও দেখেছিল সেই দৃশ্য। অনি দাদার বুকের উপর শুয়ে আছে মিষ্টিদিদি। আর অনি দাদা ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলছে

—''আর তো মাত্র কটাদিন। তার পরেই তো আমাদের বিয়েটা হয়ে যাবে। তারপর শুধু তুমি আমি আর আমাদের ভালোবাসার স্বর্গ।

নিমেষে পৃথিবীটা যেন টুকরো টুকরো হয়ে গেছিল আঁখির চোখের সামনে। হাত ফস্কে পড়ে গেছিল চায়ের কাপ।

হ্যাঁ ওদের দুজনের বিয়ে একদম স্থির। দু বাড়ির সকলেই তাই চায়। আঁখিও চায়। ও সত্যি বরাবর চেয়েছে মিষ্টিদিকে সুখি দেখতে। কিন্তু তবুও যে খুশি হতে পারছে না আজ। কষ্টে যে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। নিজের প্রথম ভালবাসাকে অন্যের হতে দেখতে পারার মত মনের জোর কিভাবে জোটাবে ও!

—''আঁখি মা, এই খাবারটা দিয়ে আয় না একটু ওদের। বাগানে আছে ওরা''। মাসির ডাকে সম্বিৎ এলআঁখির। মাসি মেয়ে আর হবু জামাইয়ের জন্য গরম গরম খাবার বানিয়েছেন।

খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে ধীর পায়ে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল ও। আস্তে আস্তে এগোচ্ছে। এটা মাসীদের বাড়িরই লাগোয়া বাগান। সেই বাগানেই ঝিলের পারেই বসে আছে ওরা দুজন। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এবার ওদের আঁখি। ওই তো ওরা দুজন। মিষ্টি দিদির ঠোঁটে অনি দাদার ঠোঁট।

না আর সহ্য করতে পারছে না ও। এই দৃশ্যটা কিছুতেই চোখের সামনে দেখতে পারবে না। মাথা ঘুরছে আঁখির । ও বুঝতে পারছে ও বুঝি জ্ঞান হারাবে এবার। সত্যি হলও তাই। চেতনা হারিয়ে ঝুপ করে নরম ঘাসের ওপরই পড়ে গেল মেয়েটা । ছত্রখান হয়ে গেল ওর নিয়ে আসা খাবার। কিন্তু তখনও কিছু টের পেল না মিষ্টি আর অনি। তখনও ওরা একে অন্যর ওষ্ঠে খুঁজে চলেছে আগামী দিনগুলোর রঙিন স্বপ্ন।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%