পল্লবী সেনগুপ্ত
মন্দির থেকে বেরতেই আজ মনে একটা অন্যরকম প্রশান্তি টের পেল শ্রুতি। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছে ঊর্মি। আকাশ ছেলেটা সত্যি যেন ম্যাজিশিয়ান। ও আসার পর থেকেই ধীরে ধীরে আবার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা ফিরে এসেছে ঊর্মির।
আকাশ ওকে বুঝিয়েছে হয়তো মেঘ আছে, তবে সে সত্যি ওকে ভালবাসলে ঠিক ফিরে আসবে। মেঘ বলে কেউ নেই এই কথাটা একবারও বলে না আকাশ।
আকাশ ওকে সত্যি নিজের সবটুকু দিয়ে ভালবাসে। ভাল রাখতে চায়। তাই মা হিসেবে বেয়াড়া আবদারটা কাল কাউকে না জানিয়ে করেই ফেলেছে ওর কাছে শ্রুতি।
-''আমার ছেলেটার হাত কোনদিন ছেড়ো না বাবা। ওকে তোমার জীবনে তোমার পাশে রেখো আজীবন''।
-''আমি তো ঊর্মি ছাড়া আর কাউকে কোনদিন ''কথাটা শেষ করতে পারে নি ছেলেটা। গলাটা বুজে এসেছিল ওর।
মন্দির থেকে ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ল অনীশ ল্যাপটপে মুখ ডুবিয়ে কাজ করছে। মেয়ের অবস্থার উন্নতি দেখে এখন ও খানিক আশ্বস্ত।
-''তোমার সাথে জরুরী কথা ছিল।'' গলা ঝাড়ল শ্রুতি।
-''বল''।
''ঊর্মির অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, এবং সেটা যে শুধুই আকাশের জন্য সে তো আমরা সকলেই জানি। আকাশ ওর জন্য সবথেকে ভাল চয়েস। কারণ ও মেয়েটাকে ভালবাসে। তাই আমার মনে হয় আমাদের এবার ওদের ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবা উচিত। আকাশের বাড়ি গিয়ে একাবার ওর মা বাবার সাথেও কথা বলা উচিত''।
-''কিন্তু ঊর্মি তো এখনও মেঘ এর অবসেশন পুরো কাটাতেই পারে নি। এর মধ্যে বিয়ের ব্যাপার?''
-''মেঘ একটা কাল্পনিক চরিত্র। তাই সেই নিয়ে কতদিন আটকে থাকবে মেয়েটা? তাছাড়া এই অবসেশন একদিন না একদিন তো কাটতেই হবে। সেইজন্যই তো চিকিতসা চলছে। আর তাছাড়া আমার মনে হয় ঊর্মিও আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে মেঘ আর ওর জীবনে ফিরবে না।
আমাদের আকাশের কথাটাও তো ভাবতে হবে। ও শুধু নিঃস্বার্থ ভাবে বন্ধু হয়ে একতরফা ভালবাসা দেখিয়ে যাবে এটাও তো হয় না। আকাশের চোখে একটা ভেঙ্গে পড়ার কষ্ট আমি প্রতিদিন দেখতে পাই। যে নেই তার জন্য যে আছে তাকে প্রতিনিয়ত অবহেলা করা হলে সেটা একটা সীমার পর সত্যি হয়তো আর সহ্য করা যায় না''। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল শ্রুতির। ও যে নিজের ছায়া বড় বেশি দেখতে পায় ছেলেটার মধ্যে। একতরফা প্রেমের জ্বালা, শুধু বন্ধুত্বের অভিনয় করার যন্ত্রণা, যে নেই তার জন্য নিজের ভালবাসার মানুষটার চোখে অবিরাম প্রেমের চুপকথা সহ্য করার অনবরত আঘাত।
-''আকাশ কাল আমায় বলছিল আনটি মাঝে মাঝে আমার মনে হয় কেন আমি ঊর্মির মনের ক্যানভাসে জায়গা করতে পারলাম না! একটা কাল্পনিক চরিত্র যেটা পারল সেটাও হল না আমার দ্বারা!''
-''আকাশ বলেছে এই কথা? আকাশ বলেছে মেঘ কাল্পনিক?'' একটা তীব্র কণ্ঠস্বরে একসাথে চমকে তাকাল অনীশ আর শ্রুতি। কখন যেন ঊর্মি এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে মেয়েটার।
-''না ঊর্মি শোন'' কিছু বলতে গেল শ্রুতি। শুনল নাঊর্মি। দৌড়ে চলে গেল নিজের ঘরে। দড়াম করে বন্ধ করে দিল দরজা। অনবরত দরজা ধাকাচ্ছে অনীশ আর শ্রুতি।
কিছু কানে যাচ্ছে না ঊর্মির। বনবন করে গোটা পৃথিবীটাই যেন ঘুরছে ওর সামনে। আকাশ! শেষ পর্যন্ত আকাশও ঠকাল ওকে! আকাশও মনে করে মেঘ বলে কেউ নেই। তবু মেঘকে খুঁজে দেবার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে ওকে দিনের পর দিন। আসলে এগুলো সব প্রতারণা! ঊর্মির কাছাকাছি থাকার ছল! আসলে ও নিজেই শ্রুতি রায়ের সাথে হাত মিলিয়ে হাসিল করতে চাইছে উর্মিকে! এত নিচ ও? তার মানে তো কেউ নেই ঊর্মির এই পৃথিবীতে। শ্রুতি হাত করে ফেলল আকাশকেও! ওর বাবার মত আকাশও তাহলে এখন শ্রুতির লোক!
মেঘ হারিয়ে গেছে, আকাশ প্রতারক, আর ওর বাবা তো কোনদিন ওর ছিলই না। বুকের পাঁজরে অসম্ভব যন্ত্রণা করছে ঊর্মির। চোখ পড়ল এবার মায়ের ছবির দিকে।
-''মা কেন আমায় তোমার সাথে নিয়ে গেলে না তুমি''? কাঁদতে কাঁদতে বলল ঊর্মি। দু মুহূর্ত কিছু একটা ভাবল ও। তারপরেই ঝপ করে তুলে নিল ছুরিটা, যেটা দিয়ে ওকে ফল কেটে দেয় কাজের দিদি। নিমেষের মধ্যে ধারাল ছুরি চালিয়ে দিল নিজের কব্জির কাছে। ফিনকি দিয়ে ছুটছে রক্ত। আস্তে আস্তে চোখের সামনে আঁধার ঘনাচ্ছে ওর।
-''মা''! অস্ফুটে বেরল শব্দটা ওর নিস্তেজ ঠোঁট ছুঁয়ে। তারপরেই চোখের সামনে নেমে এল ঘন দুর্ভেদ্য অন্ধকার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।