পল্লবী সেনগুপ্ত
ঘড়ির দিকে নিজের অজান্তেই চোখটা চলে গেল ঊর্মির। ঘড়িতে পাক্কা বারোটা দশ। তার মানে আজকের দিনটা শেষ। পের হয়ে গেল ওর আর আকাশের প্রথম বিবাহবার্ষিকীর দিনটা। তবু কোন ফোন এল না আকাশের। অবশ্য ঊর্মিও করেনি। কি লাভ একটা শেষ হয়ে যাওয়া সম্পর্ক নিয়ে ফর্মালিটি করে।
মাঝে মাঝে ঊর্মির মনে হয় হয়তো আকাশকে বিয়ে করার ওর সিদ্ধান্তটাই সম্পূর্ণ ভুল ছিল। এই বিয়েটা না হলে অন্তত ওদের নিখাদ বন্ধুত্বটা তো থাকত। আসলে ছোটমায়ের সত্যতা , মেঘের হারিয়ে যাওয়া সব কটা ঘটনার একসাথে ঘটে যাওয়া কেমন যেন এলোমেলো করে দিয়েছিল ওকে। সেই সময় ওর নিজেরও হয়তো কিছু সময়ের জন্য মনে হয়েছিল যে সত্যি বোধ হয় মেঘ বলে কেউ নেই। সবটাই স্কিতজোফ্রেনিয়া। তাই সেদিন চেনা পরিচিত জীবনের গণ্ডি ছেড়ে অন্য একটা জীবন বেছে নেবার তাগিদ তাড়া করেছিল ওকে। সেই তাগিদ থেকেই আকাশকে জোর করেছিল বিয়ে করার জন্য। মনে হয়েছিল অন্য পরিবেশ, সংসার এগুলো হয়তো শান্ত করবে ওর মন। আর সব থেকে বেশি যে সম্পর্কটা ও খুঁজে পেতে চেয়েছিল তা হল মাতৃত্ব। নিজের আত্মজকে বুকে চেপে নিজের সব অতীত ভুলে যেতে পারবে ও সেটাই সেদিন মনে প্রাণে অনুভব করেছিল ও।
কিন্তু কিচ্ছু হল না। আকাশকে হয়তো কোনদিন নিজের মনের মানুষ এর জায়গাই দিতে পারে নি ও। আর আকাশও কোনদিন ওকে দিতে পারবে না একটা সন্তান। কারন সে এক অসম্পূর্ণ পুরুষ। এই না দিতে পারার লেনদেনটা নষ্ট করে দিল ওদের প্রাণ খোলা বন্ধুত্বটাও। ওদের দু জনের মাঝে এখন কয়েক যোজন দূরত্ব।
ঊর্মি বুঝতে পারে আকাশের মা বাবাও চান ঊর্মির কোলে তাদের নাতি / নাতনি কে দেখতে। কিন্তু সে আশা তাদের মিটবে না এ জীবনে। না আসল কারণ তারা জানেন না। হয়তো ঊর্মিকেই তারা দায়ী করে যাবেন সারাজীবন এই অপ্রাপ্তির জন্য এটাই তো হয়। সব দায়ের বোঝা তো মেয়েদেরই বয়ে বেড়াতে হয়। ঊর্মি নিজেও তো একদিন ঠিক এভাবেই অন্যায় ভাবে দোষী করে রেখেছিল ছোটমাকে। আজকাল শ্বশুর শাশুড়ির চোখে নিজের জন্য কেমন যেন শ্লেষ দেখতে পায় নিজের জন্য। কে জানে মনের ভুল কিনা। কি ভাবেন ওনারা? ঊর্মির জন্যই খুব খারাপ আছে ওদের ছেলে? আর ঊর্মির খারাপ থাকা, যন্ত্রণা? সেগুলো কি কোনদিন কেউ দেখতে পাবে? না পাবে না। সবাই জানবে ঊর্মি, অসম্পূর্ণ। কালক্রমে বন্ধ্যা হবার খেতাব জুটবে শুধু ওরই কপালে। এটাই তো হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।
মনটা আজ বড় বেশি উচাটন লাগছে। ঊর্মি নেমে পড়ল বিছানা থেকে। নিঃশব্দে খুলল ব্যাক্তিগত আলমারির পাল্লা। গোপন লকার থেকে বের করল বহু দিন আগে নিজের হাতে আঁকাই একটা আবছা হয়ে আসা ছবি। একটা মানুষের ছবি, যে মানুষটা আগে অহরহ আসা যাওয়া করত ওর স্বপ্নে। তারপর বাস্তবেও। কিন্ত আজ সে হারিয়ে গেছে। স্বপ্ন বাস্তব কোথাও আর নেই সে। সত্যি কি সে কোনদিন আসেইনি? সত্যি কি সবটাই কল্পনা ছিল? এটা যে হতেই পারে না।ছবিটা বুকে চেপে হাউহাউ কাঁদছে ঊর্মি।
—''কেন তুমি হারিয়ে গেলে মেঘ? একটিবার অন্তত এস আমার সামনে। আর কিচ্ছু চাই না আমি। কিচ্ছু না''।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।