পল্লবী সেনগুপ্ত
শোবার ঘরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেটে সুখটান দিচ্ছিল আকাশ। বুকের ভেতরটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। রাতের অন্ধকারে ঢাকা মায়াবী শহরটাকে দৃষ্টির চুম্বনে সিক্ত করতে বরাবরই বেশ ভাল লাগে ওর। নৈশ শহরের কোলে জেগে থাকা রাতবাতির চুইয়ে পরা আলো আরও যেন মোহময় করে তুলেছে কৃশাঙ্গী তিলোত্তমাকে।
অনেকদিন পর ফ্ল্যাটের ফালি বারন্দা থেকে মন খুলে প্রকৃতিকে আবার দেখছে আকাশ। খুঁজে নিতে ইচ্ছে করছে রাতের মায়া আবার যেন বহুযুগ পর। আসলে মনে শান্তি না থাকলে কোন কিছুই তো ভাল লাগে না। আর বিগত কয়েকটা বছরে ভাল লাগা, আনন্দ পাওয়া এই বিষয়গুলো তো চিরতরে বিদায় নিয়েছিল ওর থেকে।
আকাশ তো ভেবেই নিয়েছিল হয়তো আর কোনদিন আনন্দের অনুভূতিটা ফিরে আসবে না ওর কাছে। প্রথমে ঊর্মিকে ভালবেসে ওর কাছে প্রত্যাখিত হয়ে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, তারপর ফিরে এসেও মানসিক ভাবে অসুস্থ ঊর্মিকে দেখে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণায় দগ্ধ হওয়া, অতঃপর বিয়ে করেও কয়েক ক্রোশ মানসিক দূরত্ব নিয়ে সমান্তরাল রেখার মত চলতে থাকা।এভাবেই কেটে যাবে বিষাক্ত বোঝার মত জীবনটা এটা তো কতকটা ভেবেই নিয়েছিল আকাশ। কিন্তু তখন কি আর একবারও ভেবেছিল ঈশ্বর আসলে এতটাও নিঠুর নন। হয়তো সেইজন্যই তিনি নয়নকে পাঠিয়েছিলেন ওদের জীবনে, যার সাথে একটা আশ্চর্য রকমের মিল রয়েছে ঊর্মির স্বপ্ন কল্পনার সেই প্রেমিক এর।
যৌনকর্মী নয়নকে দেখে, তার কদর্য ব্যবহারে স্বপ্নের মায়াজালটা টুকরো টুকরো হয়ে ছিঁড়ে গেছে ঊর্মির। নিজের স্বপ্নের মানুষের এ হেন হীন বাস্তবরূপ এক ধাক্কায় বাস্তবের মাটিতে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ওকে। আঘাতের প্রাথমিক অভিঘাতের পর প্রথম ফোনটা ওকেই করেছিল ওর ঊর্মি। ডেকেছিল আকুল হয়ে।
ঠিক পরের সন্ধ্যাতেই ফিরে এসেছিল আকাশ। ঊর্মির আলুথালু বেশ, দু গালে চোখের জলের শুকনো রেখার দাগ কেমন দেখে কেমন যেন মুচড়ে উঠেছিল ওর বুকটা। ওকে দেখেই আহত হরিণীর মত ওর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঊর্মি। একটাও কথা বলে নি। শুধু ওকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে হুহু করে কেঁদেছিল। আকাশের মনে হচ্ছিল যেন ওর এতদিনের সবটুকু জমান যন্ত্রণা বাঁধ ভাঙ্গা প্লাবনের মত সেদিন ঝরে পড়ছে কান্না হয়ে। ওর চোখের জলের ফেঁটা গুলো যেন অস্থি মজ্জা ভেদ করে স্পর্শ করছিল আকাশের ক্ষত বিক্ষত হৃদয়টাকে। আকাশও সেদিন কোন শব্দ জালে আটকাতে চায়নি সেই মুহূর্তটা। শুধু নীরবে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল ঊর্মির মাথায়। সেই রাতে মানসিক ভাবে নিজেকে ঊর্মি সমর্পণ করেছিল আকাশের কাছে। আজকাল ঊর্মির চোখে আকাশ সেই ভালবাসার বাঙময় অনুভূতিই নিজের জন্য দেখতে পায় যেটা খুঁজে পেতে বহু যুগ ধরে অপেক্ষামান ছিল ও।
নয়নকে আজকাল কেমন যেন দেবদূতের মত মনে হয় আকাশের যে এক লহমায় সব কিছু ফিরিয়ে দিল আকাশের জীবনে। ঊর্মিকে নিজের করে ফিরে পাওয়ার পর আরও একবার ও দেখা করেছিল নয়নের সাথে। ওকে বেশ কিছু টাকা পয়সা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ছেলেটা নেয়নি। উল্টে শুকনো হেসে বলেছিল
-''এটা ঠিক স্যার যে যৌনকর্মীর পেশাটা আমি অর্থের প্রয়োজনেই নিয়েছিলাম। কিন্তু আজকাল অর্থও বড় একঘেয়ে লাগে। হয়তো প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। তাই আমায় খুশি করতে পারবে না আর এই টাকা পয়সা। বরঞ্চ এই যে আপনার তৃপ্তি মাখা মুখটা আমাকে অনেক বেশি ভাল লাগা দিচ্ছে। পারলে আমায় একটু সম্মানের সাথে মনে রাখবেন স্যার। সেটাই আমার কাছে অনেকটা পাওয়া হবে। শুধু জিগেলো নয়ন নয় মানুষ নয়ন হিসেবে যদি আপনার স্মৃতিতে বেঁচে থাকতে পারি তবে সেটাই হবে আমার উপযুক্ত পুরস্কার। এই যে আপনারা ভাল আছেন এখন সেটাই অনেক। ভগবান আপানাদের ঘরে নতুন অতিথি দিন তাড়াতাড়ি। এটাই যথেষ্ট।''
নয়নের শেষ কথাটায় সেদিন পলকেই নিভে গেছিল আকাশ। নতুন করে আবার মনে পড়ে গেছিল কোনদিন ঊর্মিকে একটা সন্তান দিতে পারবে না ও। কারণ ও একজন অসম্পূর্ণ পুরুষ। হয়তো এই অনিচ্ছাকৃত অসম্পূর্ণতাই আবার একদিন বিষিয়ে তুলবে ওর সাথে ওর প্রিয়তমার সম্পর্কটা। অনেক রকম ডাক্তার তো দেখিয়েছে ও। কেউই তো আশা দিতে পারেননি। অজান্তেই তাই নয়নের শেষ কথাটায় চোখ ভিজেছিল ওর।
-''কি হল স্যার? আমি কি আপনাকে কোন দুঃখ দিয়ে ফেললাম''? আচমকাই বলে উঠেছিল নয়ন।
-''না তা নয়। আসলে আমাদের জীবনে কোনদিন নতুন অতিথি আসবে না নয়ন।''
-''কেন স্যার? এভাবে কেন বলছেন''?
নয়নের সামনে সেদিন আর চেপে রাখতে পারেনি ও। খুলেই বলেছিল নিজের অসম্পূর্ণতার কথা। এও জানিয়েছিল ডাক্তাররাও বলেছেন কোনভাবেই কাটার নয় এই অসম্পূর্ণতা।
-''এর জন্য কেন আপনি এত কষ্ট পাচ্ছেন স্যার? আজকাল তো অনেক কিছুই হয়। আপনি কি অত্যাধুনিক ফারটিলিটি ক্লিনিকের কথা শুনেছেন? সেখানে স্পারম ডোনেশন পদ্ধতির মাধ্যমে অনেক নিঃসন্তান দম্পতি বাবা মা হচ্ছেন। কোন ইচ্ছুক স্পারম দাতার বীর্যের মাধ্যমের সন্তান আসবে আপনার স্ত্রীয়ের কোলে, আপনারা মা বাবা হয়ে উঠবেন এক ছোট্ট ফুটফুটে শিশুর''।
-''সত্যি বলছ তুমি''? আনন্দে চকচক করে উঠেছিল সেদিন আকাশের চোখ।
-''হ্যাঁ স্যার একদম সত্যি বলছি। আমার চেনা এমন ফারটিলিটি ক্লিনিক আছে আমি নিয়ে যাব আপনাকে। নিজেই কথা বলে সব দেখে শুনে আসবেন আপনি''। নয়ন অনেকটা ভরসা নিয়ে সেদিন শক্ত করে চেপে ধরেছিল আকাশের হাত।
আজ সত্যি নয়ন নিয়ে গিয়েছিল ওকে সেখানে। সত্যি সব কিছু দেখে শুনে এসেছে আজ আকাশ। এবার ও পারবে ঊর্মির কোলে সন্তান তুলে দিতে। আর ঊর্মিকে কোনদিন হারানোর ভয় থাকবে না। আকাশ বাবা হবে ঊর্মির সন্তানের। ওদের ভালবাসার এক নতুন সেতু বন্ধন তৈরি করবে আগামী দিনের অনাগত অতিথি।
ব্যালকনি থেকে শোবার ঘরে চলে এক আকাশ। ঊর্মিও চলে এসেছে ঘরে। গালে নাইটক্রিম ঘষছে। রাতবাতির আবছা গোলাপি আলোয় ওকে আরও মায়াময়ী লাগছে যেন। ওর উপস্থিতি আয়না দিয়েই দেখতে পেল ঊর্মি। ভীষণ মিষ্টি করে হাসল মেয়েটা।
-''ঊর্মি, জান একটা কথা ছিল।'' মুখ খুললে আকাশ। বুকের ভেতরটা বেশ অনেকটা ধুকপুক করছে।
-''হুম বল না''।
-''ঊর্মি আমাদের সন্তান সত্যি এবার আমাদের কাছে আসতে পারবে জান। আর কোন বাধা থাকবে না''।
-''মানে''। থেমে গেছে ঊর্মির নৈশ প্রসাধন।
-''আজ আমি এক জায়গায় গেছিলাম। আমার এক বন্ধু নিয়ে গেছিল। একটা ফারটিলিটি ক্লিনিক। সেখানে অত্যাধুনিক স্পারম ডোনেশন পদ্ধতির মাধ্যমে আমাদের মত অনেক দম্পতি সন্তান সুখ পাচ্ছেন। আমি কথা বলেছি। আমাদের সব রিপোর্টস নিয়ে কথা হল ডাক্তারের সাথে। আমাদেরও হয়ে যাবে। আশ্বস্ত করেছেন ওখানকার ডাক্তাররা আমায়। যেমন তুমি দুজন মা পেয়েছিলে, তেমনি আমাদের সন্তান দু জন বাবাকে পাবে। যে স্পারম দেবে সে এক পিতা আর আমি আর এক। তোমার আমার সন্তান আসবেই ঊর্মি''।
—''সত্যি বলছ তুমি? আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না আকাশ''। আকাশের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঊর্মি। খুশিতে আত্মহারা লাগছে ওকে।
—''হ্যাঁ রে বাবা একদম সত্যি''। বউয়ের নাকে নাক ঘষে দিল আকাশ। ঊর্মিও আলতো চুমু খেল ওর গালে। ওর শরীর থেকে ভেসে আসছে সুগন্ধি ক্রিমের গন্ধ। আকাশ এবার ঠোঁট ডোবাল ঊর্মির ঠোঁটে। গোলাপি মায়াবী আলো ভেজা ঘরটায় আস্তে আস্তে আকাশের শরীর মিশে যাচ্ছে ওর প্রিয়তমার শরীরে। ঊর্মি আজ একেবারে সমর্পিত হরিণী। ভালবাসার অনুচ্চারিত আবেগ ঝরে পড়ছে ওর শরীরের প্রতিটি রন্ধ্র থেকে। ভাল লাগার আবেশ আর ভালবাসার বৃষ্টিতে ভিজে আপ্লুত হচ্ছে আকাশ।। শুধু এই মুহূর্তটার জন্যই যে ও অপেক্ষা করেছিল কতগুলো বছর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।