সপ্তম অধ্যায়

পল্লবী সেনগুপ্ত

বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিল তিস্তা। কিচ্ছু ভাল লাগছে না। খারাপ লাগার তীব্র অনুভূতিটা যেন ক্রমশঃ বড্ড বেশি পেয়ে বসছে ওকে। নিঃসঙ্গতার অসুখটা আরও বেশি জাঁকিয়ে বসছে। অবশ্য সেটা হওয়াই তো বোধ হয় বেশি স্বাভাবিক এই মুহূর্তে তিস্তার জন্য।

নিজের একা, ভালবাসাবিহীন জীবনটার পরিসমাপ্তি ঘটাতেই তো অরূপ দাসকে বিয়ে করেছিল। অনেক স্বপ্ন চোখে নিয়ে উঠে এসেছিল দক্ষিণ কলকাতার এই আভিজাত্যময় ফ্ল্যাটে। ও তো তখন একবারও ভাবে নি আসলে এই আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে শুধুই কিছু দমচাপা অন্ধকার।

অরূপ দাস লোকটা ফুলশয্যার রাতেই জানিয়েছিল সে এই বিয়েটা সংসার ধর্ম পালন করার উদ্দেশ্যে করেছে এমন নয়। এই বিয়ে সে করেছে তার বাপের শেষ ইচ্ছা রাখতে। সে আসলে ভালবাসত তার ছোটবেলার প্রেমিকা কোন এক নলিনীকে। কিন্তু সেই মেয়েটা প্রতারণা করেছিল অরূপ এর সাথে। বেশি পয়সার লোভে অরূপ এর ভালবাসার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অন্য কোন এক এন আর আই কে বিয়ে করে নেয়। বিয়ের আগে সে শুধু অরূপকে বলে গেছিল

—''আমার জন্য হা হুতাশ করে নিজের জীবনের বাকী দিন গুলো নষ্ট না করে নিজেকে যথেষ্ট যোগ্য করে তোলার চেষ্টা কর। তাহলে একদিন আমার থেকে অনেক বেশি ভাল কাউকে নিজের পাশে নিয়ে সারাজীবন চলতে পারবে''। সেই থেকেই নাকি জেদ চেপে গেছিল অরূপের। তাকে বড়লোক হতেই হবে। অনেক টাকা রোজগার করতেই হবে। পঁচিশ বছর বয়স থেকে সেই সংগ্রামটা শুরু হয়েছিল লোকটার, কিন্তু আজ চল্লিশে পৌঁছে রীতিমত বিত্তশালী হয়েও খুশি হতে পারে নি সে। এখনও নিজের কাছে অসফল সে। আরও অনেক বেশি সফলতার নেশা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে।

—''তিস্তা আমি হয়তো অনেক টাকা রোজগার করেছি। কিন্তু আমি এখনও সেই রাতটা পাই নি, যে রাতটায় আমি নিজের অপমানের জ্বালা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব। এখনও প্রতি রাতে ঘুমালেই যেন আমি দেখতে পাই নলিনীর ব্যঙ্গ আর তাচ্ছিল্য ভরা সেই মুখ টা। বাঁকা হাসির রেখাটা। আর অমনি সব ঘুম চটকে যায় আমার। ঘেন্নায় গুলিয়ে ওঠে আমার শরীর। মনে হয় আমায় আরও উপরে উঠতে হবে। আরও উপরে। আরও অনেক উপরে''।

—''কিন্তু নলিনী তো বিয়ে করে বিদেশ চলে গেছে বহুদিন হল। সে তো ভাল আছে এখন। তাহলে আপনি কেন আটকে পড়ে রয়েছেন সেই চক্রব্য হতে? কেন বেরিয়ে আসতে চাইছেন না?'' নিজের দীর্ঘশ্বাসটা আড়াল করেই বলেছিল সেদিন তিস্তা।

—''কারণ আমি বেরিয়ে আসতে চাই না। আমি এমন একটা উচ্চতায় পৌঁছে যেতে চাই যেখান থেকে নলিনী আমায় ঘাড় উঁচু করে দেখতে গেলে ওর ঘাড়টাই ভেঙ্গে যায়''।

—''এভাবে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত লাগে না? কোনদিন কাউকে ভালবাসতে ইচ্ছা করে না''?

—''না ইচ্ছা করে না। কারণ ভালবাসা শুধু দুর্বল করে মানুষকে, শক্তি দিতে পারে না। শক্তি দেয় শুধু ঘৃণা। আমি ঘৃণা করি নলিনীকে। সেই নলিনীকে ঘৃণা করতে করতেই সেদিনের সেই অতি সাধারণ ছেলেটা আজ এত বড় ব্যবসায়ী। তবে হ্যাঁ শরীরের তাগিদ আছে বই কি। কিন্তু পকেটে মোটা টাকা থাকলে সেই তাগিদ মেটান কত সহজ কলকাতার মত মেট্রোপলিটন শহরে তা হয়তো আপনি ভাবতেও পারবেন না ''। বলেই অদ্ভুত ভাবে হেসেছিল সেদিন লোকটা।''

—''তাহলে কেন বিয়ে করলেন আমাকে? কেন নষ্ট করলেন আমার জীবন''? আর সহ্য করতে পারে নি তিস্তা। ছুটে গিয়ে কলার চেপে ধরেছিল লোকটার।

সাবধানে তিস্তার হাত সে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল

—''সবই অদৃষ্ট। আসলে বাবার জন্য তিস্তা। বাবা ক্যান্সারে ভুগছেন। শেষ পর্যায়। বাবার একই ঘ্যানঘ্যানানি বারবার। আমার ঘরে বউমা চাই। লোকটা কোনদিন কিচ্ছু চায় নি আমার থেকে। আমারও দেবার কথা মনে হয় নি কোনদিন। কিন্তু আজ এই শেষ সময়ে সে কিছু চাইলে আমি কিভাবে না দিয়ে থাকি বলুন''।

—''কিন্তু আমিই কেন? কি দোষ করেছিলাম আমি''? নিজের সব সংযমের বাঁধ পেরিয়ে হাউহাউ করে শেষমেশ কেঁদেই ফেলেছিল তিস্তা।

—''দোষ আপনার নয়। দোষ আপনার কপালের তিস্তা। আসলে আমি বাবার ইচ্ছা পূরণ করে ঘরে বউ আনার জন্য আপনার মতই কাউকে খুঁজছিলাম। বাবা মা বা সঠিক কোন অভিভাবক না থাকা মানে সে যথেষ্ট দুর্বল। তার হয়ে কে এসে আর কৈফিয়ত তলব করবে? কোন বড় সড় চাকরিও নেই আপনার । তাই আমার এই বিয়ে নামক ধোঁকার টাটি সামনে ঝুলিয়ে ফাঁদে ফেলার মত মেয়ে আপনার চেয়ে ভাল আর কে ছিল বলুন? এমনিতেই মেয়েরা কি চিজ তা আমার হাড়ে হাড়ে জানা হয়ে গেছে, তাই কোন মেয়ে ঠকল বা কার মন ভাঙ্গল তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আসলে মেয়েদের মন বলে কিছু থাকেই না তা আমি ষোল আনা জানি। নইলে নলিনী, বারো বছরের সম্পর্ক একদিনে কি শেষ করতে পারত নাকি আমার জন্মদাত্রী পারতেন ছয় বছরের শিশু পুত্র আর স্বামীকে ফেলে রেখে প্রেমিকের সাথে ঘর বাঁধতে?

যাক সে কথা। কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনাকে দেখে মনে হয়েছিল আপনি হয়তো অতটাও খারাপ নন। তাই আমি আপনাকে ব্যবহার করতে চাই না। নইলে আমিও পারতাম আজকের এই ফুলশয্যার রাতের অছিলায় আপনার শরীরটাকে ব্যবহার করে আপনাকে পরিত্যক্ত আসবাবের মত ছুঁড়ে ফেলে দিতে।

কিন্তু আমি সেটা করতে চাই না। তাই আমি সব কথা খুলেই আপনাকে বললাম। আপনি এখানে থাকুন। কোন অমর্যাদা আপনার হবে না। তবে হ্যাঁ আমার বউ হবার চেষ্টা ভুলেও করবেন না। আর আপনি পালাতে চাইলেও পারবেন না, মানে আপাতত। আমার বাবা যতদিন বেঁচে আছেন, আপনাকেও থাকতে হবে। আমার বউ এর রোলে অভিনয় করে যেতেই হবে। পালাবার চেষ্টা করলে বিপদ অকারণে আপনারই বাড়বে। কারণ আমার হাত কতোটা লম্বা হয়তো আপনার ধারণা নেই।

যাইহোক রাত অনেক হল। ঘুমিয়ে পড়ুন।আমিও শুয়ে পড়ি। কাল অনেকগুলো জরুরী মিটিং আছে।

লোকটা নির্বিকার ভাবে শুয়ে পড়ে দশ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

লোকটার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বাংলা মেগা সিরিয়ালের নায়িকাদের মত তিস্তার একবারও মনে হয় নি সেদিন না যেভাবেই হোক স্বামীর ভালবাসা আমি আদায় করবোই বা এই জাতীয় কিছু। ওর মনে হয়েছিল লোকটা স্বাভাবিক নয়। ওর মানসিক ভারসাম্য ঠিক নেই। ছোটবেলায় মায়ের চলে যাওয়া, তারপর প্রেমিকার চলে যাওয়া সব কিছু মিলিয়ে লোকটার মধ্যে অদ্ভুত কিছু মানসিক অস্থিরতা নির্ঘাত তৈরি হয়েছে। আর সেইজন্যই এমন অস্বাভাবিক ভাবনা চিন্তা এর। স্যাডিস্ট লোকটা। মেয়েদের কষ্ট দিয়ে এর শান্তি।

কিন্তু তিস্তাই কেন? কেন তিস্তা মানবে এসব? ওর তো কোন দোষ নেই। রাগে, দুঃখে অপমানে সেদিন দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছা করেছিল ওর।

তারপর আস্তে আস্তে নিজের অদৃষ্ট মেনে নিতেই চেষ্টা করছে ও, কারণ এর থেকে এক্ষুনি বেরনো হয়তো ওর পক্ষে সম্ভবও নয়। লোকটা তো হুমকি দিয়েই রেখেছে। তাছাড়া ও হঠাৎ করে এখন যাবেই বা কোথায়?

বিয়ের দু মাস হয়ে গেছে। অরূপ প্রায় সারাদিনই বাড়িতে থাকে না। শুধু রাত টুকু ঘুমাতে আসে। মাঝে মাঝে আবার বাড়ি ছেড়ে বেশ কয়দিনের জন্য বাইরে চলে যায় ব্যবসার কাজে। বাড়িতে অনেকগুলো ঝি চাকরের সাথে মিথ্যা বিত্তের আতিশয্য নিয়ে অপ্রয়োজনীয় আসবাবের মতই পড়ে থাকে তিস্তা। কখনও সখনও শপিং করতে গিয়ে গাদা খানেক টাকা উড়িয়ে নিজের হতাশা প্রশমিত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে। আর বেশির ভাগ সময়ই গল্পের বইয়ের কল্পকাহিনীর পাতায় মুক্তি খুঁজতে চেষ্টা করে।

না আর পারছে না তিস্তা এই নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণাটা বয়ে বেড়াতে। কবে মুক্তি ওর এর থেকে? অরূপ দাস বলেছে তার বাবার মৃত্যুর পরই নাকি সে মুক্তি দেবে তিস্তাকে এই মিথ্যা জীবন থেকে । কিন্তু সত্যি কি মুক্তি লেখা আছে ওর কপালে? আর এ জীবন থেকে বেরোতে পারলেই বা কি লাভ! ও কি কোনদিন আদৌ খুঁজে পাবে কোনদিন কোন সত্যিকারের মনের মানুষকে? না আজকাল আর সদর্থক কিচ্ছু ভাবতে পারে না ও। মাঝে মাঝে মনে হয় বোধ হয় এর থেকে অরূপের বাবার মত হলেও বোধ হয় ভাল ছিল। নার্সিং হোমে পড়ে মৃত্যুর সাথে লড়ছে লোকটা। কিন্তু তবুও জানা আছে কি আছে এই লড়াইয়ের শেষে। তিস্তা তো সেটুকুও জানে না।

দ্রিম দ্রিম করে হঠাৎ বেজে উঠল ভাইব্রেশান মোডে রাখা তিস্তার দামী মোবাইলটা।

—''হ্যালো'' ফোন কানে চাপল ও।

—''হ্যালো মিসেস দাস কথা বলছেন তো''?

—''হ্যাঁ বলছি। কে বলছেন''?

—''আমি সানরাইজ নার্সিং হোম থেকে বলছি ম্যাডাম। মিস্টার দাসকে ফোনে রিচ করতে পারছি না, তাই আপনাকে কল করলাম। আসলে আপনাদের পেশেন্ট মিস্টার অঘোর দাস এর কন্ডিশন হঠাৎ খুব খারাপ হয়ে গেছে। আপনারা এক্ষুনি একবার চলে আসুন''।

—''সেকি! ঠিক আছে আমরা এক্ষুনি আসছি''।

ফোন কেটে গেল। মুঠো ফোন হাতে চেপে কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল তিস্তা। তবে কি খুব খারাপ কিছু ঘটেছে ওখানে? অরূপের বাবা কি তবে মারা গেলেন? যদি মারা যান ভদ্রলোক সেটা কি ভাল হবে তিস্তার জন্য? হ্যাঁ তবে তো ওর ছুটি এই মিথ্যা শ্বাসরোধকারী বিয়েটা থেকে। কিন্তু তারপর? কি হতে চলেছে ওর সাথে? কোন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে তিস্তার আগামী দিনগুলোতে? উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না ও। শুধু দেখতে পাচ্ছে একরাশ ঘন কালো অন্ধকার।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%