ইচ্ছেপুরের গল্প

রতনতনু ঘাটী

দশটা বাজে প্রেয়ারও শেষ রোদ লেগেছে ফুলে

ক্লাস হবে না সিঁদুরটিয়া প্রাইমারি ইশকুলে।

স্যার বললেন, ‘‘গোল কোরো না, চুপটি করে শোনো—

বাংলা বইয়ের গোয়েন্দাদের দ্যাখোনি কক্ষনো!

অতিথি আজ তাঁরাই নানান কাজের অবকাশে

বলো কাদের হারিয়েছে কী যার যা মনে আসে।’’

হেমেনকুমার রায়ের লেখার জয়ন্ত ও মানিক

হেসে বললেন, ‘‘দেবার্চনা, তুমিই বলো খানিক।’’

‘‘নাম জানলেন কেমন করে? ম্যাজিক নাকি তাই!’’

ফিসফিসিয়ে বলল আবির। আমি বললাম, ‘‘ভাই,

গোয়েন্দারা সবই জানেন। চুপ কর তো আগে!’’

দের্বাচনা নখ খুঁটল, ‘‘ছবিই ভাল লাগে!

অঙ্ক খাতায় ছবি আঁকছি, মা বকলেন খুব!

সেদিন থেকেই রং আর তুলি কোথায় দিল ডুব?

দিন না খুঁজে। আর হ্যাঁ, যদি বুঝিয়ে বলেন মাকে...!’’

দূরের কদমগাছে কোকিল ঠিক তখনি ডাকে।

নীহাররঞ্জনের লেখার কিরীটি রায় যেই

ডেকে বললেন, ‘‘পলাশ, কিছু শোনাও আমাকেই।’’

মাথা চুলকে, চোখ পিটপিট, ‘‘নৌকো ভাসাই ড্রেনে

রংবেরঙের কাগজ কেটে। বাবা বলেন, ‘নে নে,

রাখ তো ওসব, ইতিহাস পড়, সামনে পরীক্ষা না!

একশো না হোক, পঁচাশি চাই। এসব এখন মানা।’

ইতিহাসের সাল-তারিখ আর শেরশাহ, আকবর...

অত্তগুলো নৌকো আমার হারাল তারপর।

বলুন, বলুন, কোথায় পাব, পাচ্ছি না তো মোটে!’’

উদাস একটা ছেলের ছায়া দিকদিগন্তে ছোটে।

দীনেনকুমার রায়ের লেখার রবার্ট ব্লেকও দেখি

বলে উঠলেন, ‘‘তিতির, তুমি হারালে সব কী কী?’’

‘‘আমি মানে...,’’ তিতির বলল জামার কলার মুড়ে,

‘‘নদীর পারের ছোট্ট ঘরে সেই যে থুত্থুড়ে

ইচ্ছেদাদু থাকেন, তাঁর গল্পে উধাও হই!

দাদার চাঁটি, দিদিরও বকা, ‘ফার্স্ট তোকে করবই!’

সেই থেকে তো ইচ্ছেদাদুর দরজাতে ঝাঁপ ফেলা,

কোথায় গেলেন? খুঁজুন দেখি! হাসছেন যে মেলা!

সেদিন থেকেই বন্দি ঘরে। ফার্স্ট না হলে ক্ষতি?’’

এখন দূরের হলদি নদী হঠাৎ বেগবতী।

প্রেমেন মিত্তিরের লেখার শ্রীপরাশর বর্মা

কাব্যে ভরা খাতা যে তাঁর পাঁচ-সাতটি ফর্মা

সরিয়ে রেখে তিনি বললেন, ‘‘বিলম্বিতা সেন,

কখন যে কী হারিয়েছে সব আমাকে বলবেন?’’

লজ্জা-রঙিন বিলম্বিতা যেন উঠল বেজে,

‘‘পদ্য লেখার খাতা আমার লুকোল সব কে যে!

ভূগোল পড়তে ভাল্লাগে না। দাদু বললেন তবু,

‘এই বিষয়ে একশো পাওয়ান জগদগুরু প্রভু!’

পদ্য লেখার খাতা কোথায়? দিন না খুঁজে আজ।’’

অনেক দূরের বনে ফুটল একলা গন্ধরাজ।

সত্যজিৎ রায়ের লেখার ফেলু মিত্তির আর

লালমোহনবাবুও আছেন, তোপসে, চমৎকার!

ফেলুদা বললেন আমাকে, ‘‘ম্যাল্যবান বলো,

তোমারও কী হারিয়ে গেছে, দু’ চোখ ছলছল?’’

আমার চোখে বৃষ্টি তখন, মেঘ জমেছে মনে,

আমি বললাম, ‘‘একটা বিষয় পড়ান যে তিনজনে।

কম্পিউটার, তবলা, সাঁতার, আবৃত্তি আর গানে

ব্যস্ত আমি। হারিয়েছে আজ ছেলেবেলার মানে!

ও ফেলুদা, দিন না আমায় গোট্টা ছেলেবেলা!’’

তখন দূরে আকাশপারে একশো রঙের খেলা।

গোয়েন্দারা সক্কলে চুপ। আমরা উড়ে-উড়ে

হারিয়ে যাচ্ছি মনের মেঘে দূরের ইচ্ছেপুরে।

স্যার বললেন, ‘‘আপনারা সব রহস্যসন্ধানী,

সামান্য এই ক’টা জিনিস খুঁজে দেবেন জানি!

শহরতলির ইশকুলে আজ বড়ো খুশির দিন

সময় করে এলেন সবাই, কৃতজ্ঞতা নিন!’’

সকল অধ্যায়
১.
ছেলেবেলা
২.
পাসওয়ার্ডের বাড়ি
৩.
কিচ্ছুটি বলব না
৪.
হস্টেলের চিঠি
৫.
টিকিটামা
৬.
ইতি ছোটো বোন তুলি
৭.
হুঁহুঁব্বাবা
৮.
স্বপ্ন-বলা কম্পিটিশন
৯.
জন্মভূমি
১০.
আকাশ-চোর
১১.
তাদের জন্যে
১২.
আধখানা ছেলেবেলা
১৩.
পাপানের প্রশ্ন
১৪.
বীরপুরুষ রবীন্দ্রনাথ
১৫.
চাঁদ-চোর
১৬.
নদীর ছবি
১৭.
গল্প-খেলার সময় তো নেই
১৮.
বাঘবিশারদ
১৯.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২০.
স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
২১.
ভুলো মনের গল্প
২২.
এবং কিন্তু যদি
২৩.
পৃথিবীকে ভালবেসে
২৪.
বাংলা ভাষা
২৫.
আকাশকুসুম
২৬.
চাঁদ ভেসে যায়
২৭.
বনের গল্প
২৮.
ঘোড়ার ডিম
২৯.
আমাদের নতুন বাড়ি
৩০.
বই-চোর ভূত
৩১.
টিয়াটারা-টের
৩২.
খেলোয়াড় ছেলে
৩৩.
চুপকথা
৩৪.
অবাক ভোজন
৩৫.
পুষ্পক-প্রাইমারি
৩৬.
চাই মহাকাশযান
৩৭.
অঙ্ক-পাখি
৩৮.
লালটুলি নীলটুলি
৩৯.
ভাইফোঁটা
৪০.
ইচ্ছেপুরের গল্প
৪১.
বেশ আছি
৪২.
সাক্ষাৎকার
৪৩.
বিল্টু যাবে বিশ্বকাপে
৪৪.
রূপকথা
৪৫.
নতুন ভারতবর্ষ
৪৬.
মেলানকলি
৪৭.
ছুটির বাঁশি
৪৮.
প্রকৃতিপাঠ
৪৯.
মিথ্যে রাজার দেশে
৫০.
গ্রামের গল্প
৫১.
জল্পনা-কল্পনা
৫২.
ভূতুড়ে কলকাতা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%