রতনতনু ঘাটী

এ শহরে আমি গ্রাম থেকে আসা একঝাঁক নীরবতা
সময় পেলেই সবাইকে বলি আমার জীবনকথা।
মা বাসন মাঝে বাবুদের বাড়ি এই বেলা ওই বেলা
আমি আর বোন খালি পেটে খেলি ভাত-রাঁধা-রাঁধা খেলা
আমাদের কোনো স্কুলটুল নেই, বইটই নেই কোনো
তোমরা যারাই ইশকুলে পড়ো তোমাদের বলি শোনো
সেরকম এক রঙিন দুপুরে কদমগাছের গায়ে
আমি আর বোন ঘুমিয়ে পড়েছি। একজন পায়ে-পায়ে
এসে দাঁড়ালেন, গেরুয়া বসন, বিবেকানন্দ যেন!
বললেন, ‘‘এই দুপুরে তোমরা ঘুমিয়ে পড়েছ কেন?
শহরে যাও না, ফেরিটেরি করো, এভাবে ঘুমোয় কেউ?’’
চোখ মেলে দেখি, কেউ নেই, শুধু গেরুরা রোদের ঢেউ।
সন্ধেবেলায় মাকে বললাম, ‘‘আমি ছোটো তাও মানি,
কিছু নাই হলে ফিরে আসবই, নাম-ঠিকানা তো জানি।
তোমার কষ্ট ভাল লাগে না তো, দেখি না চেষ্টা করে...’’
বলে মাকে আমি প্রণাম করেই বেরিয়েছি খুব ভোরে।
বোনটার কাছে রঙিন পৃথিবী, মা’র কাছে ছেলেবেলা
গচ্ছিত রেখে এ শহরে আমি, এই বেলা ওই বেলা
গলিতে গলিতে ছোট জানালায় কখনও করিনি দেরি।
এ শহরে আমি ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন করছি ফেরি।

মা-বাবা অফিসে যে ছেলেটি একা সারাদিন বসে ঘরে
একা একা শুধু সারাটা দুপুর ছুটির অঙ্ক করে
আমিতাকেবলি,‘‘এইযেখোকন, এখনই দ্যাখো নাভেবে,
টইটই মাঠে ঘুড়ি ওড়ানোর স্বপ্ন এনেছি, নেবে?’’
গোটা স্বপ্নটা দশ পয়সায়, তার হাতে দিয়ে বলি,
‘‘আবার আসব শুক্কুরবার, আজ তবে ভাই চলি।’’
ভাইবোন নেই ঘরভরা দামি পুতুলেরা চারপাশে
গালে-হাত মেয়ে একা বসে, চোখে বৃষ্টিরা ঝেঁপে আসে।
তাকে বললাম,‘‘কী নেবে গো খুকু?’’ বলল সে, ‘‘ভাই, ভাই!’’
‘‘এই নাও, ধরো, ভাইবোনে ভরা গোটা খেলাঘরটাই।
বারো পয়সায়, জলের দামই, কিনে নাও এক্ষুনি
এত সস্তার স্বপ্নওয়ালা পাবে না গো খুকুমণি।’’

যেই দেখলাম ছোট্ট গলির শেষ জানালায় থেমে
উদাস রঙের ছেলেটি ক্লান্ত কম্পিউটার গেমে।
তাকে বললাম, ‘‘জানলায় এসো, যে স্বপ্ন চাও তাই
বেচতে এসেছি খুব সস্তায়, বলো না কোনটা চাই?
আবির মাখানো ছুটির বিকেল? পঁচিশ পয়সা দাম।
গুঁড়িগুঁড়ি কিছু বৃষ্টিও নাও, আজ তবে চললাম।’’
বাবা-মা ঘুমিয়ে, ভোরবেলা উঠে যে মেয়েটি খুলে দোর
ইতিহাস পড়ে, তার হাতে দিই বকুল কুড়নো ভোর,
কুড়ি পয়সার এই স্বপ্নটা। ফ্রিতে কিছু পাবে নাকি,
এই ভেবে যেই তাকায় মেয়েটি, বলি, ‘‘আরও আছেবাকি।
চাইলেই কিছু মন খুলে চাও কোরো না তো ছলছুতো
এই নাও তুমি মালা গাঁথবার কল্পনামাখা সুতো।’’


বেলগাছিয়ায়, হাতিবাগানেও, বিডন স্ট্রিটটা ঘুরে
চলে যাই আমি শিয়ালদা থেকে বেহালা, ভবানীপুরে।
রাসবিহারীর পরে বালিগঞ্জ, ঢাকুরিয়া, গড়িয়ায়
স্বপ্ন বেচতে বেচতে আমার বিকেল গড়িয়ে যায়।
আমি হেঁকে বলি—‘‘স্বপ্ন নেবে গো, সস্তা আমার কাছে
এ-যুগের সব ছেলেমেয়ে শোনো, অনেক স্বপ্ন আছে—
‘‘আম কুড়নোর, নদীতে সাঁতার, তিলের নাড়ুও চুরি
রথের মেলার হাওয়াই মিঠাই, আরও কত ভূরি ভূরি।
খেজুর পাতার ঘুরনচরকি, তালপাতা হাতঘড়ি
খোলামকুচির মাছের ঝোলে নুড়ি পাথরের বড়ি।
ধুলোর ভাতের খেলাঘর আছে, পরনকথার ঠামি
আকাশজোড়া সেরামধনুকের স্বপ্ন বেচছি আমি!
নতুন ভারতবর্ষ তোমরা সব সেরাদের দলে
টেলিভিশনের একশো চ্যানেল রূপকথা এঁকে চলে।
ভাইবোন নেই, কাকু-কাকিমাও, ঠাম্মা-দাদুও নেই
ব্যস্ত বাবা-মা, বন্ধু করেছ কম্পিউটারকেই।
প্রথম হওয়ার দৌড়ে তোমরা সকলেই ফার্স্ট হবে
স্বপ্ন তো নেই ব্যস্ততাভরা অদ্ভুত শৈশবে!
‘‘ময়নামতী নদীর ওপারে অবাকপুরের ছেলে
স্বপ্ন বেচতে শহরে এসেছি বোনকে ও মাকে ফেলে।
স্বপ্ন নেবে গো, অনেক স্বপ্ন, কাঁধে স্বপ্নের ঝোলা
এ-কলকাতায় আমিই প্রথম স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।’’

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন