খগেন্দ্রনাথ মিত্র
পৌষের রোদে ঝলমল সকাল। পথে লোকজনের চলাফেরা তখন কম। ছেলে, বুড়ো বাড়ির আঙিনায় বসে আগুন বা রোদ পোহাচ্ছে। কেউ কেউ গায়ে মাথায় কোঁচার ওপর আলোয়ান বা মোটা চাদর জড়িয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে হুঁকো টানছে। চারধারে একটু জড়োসড়ো ভাব। ভোম্বলের বিপরীত দিক থেকে আস্তে আস্তে আসছে খান তিনেক বাঁশের গাড়ি, যেন হাতি। প্রত্যেক গাড়ির বাঁশের বোঝার আগার কাছাকাছি গাড়োয়ান – না না -মাহুত —দুপাশে পা দিয়ে এক হাতে গোরু দুটোর দড়ি আর এক হাতে লকড়ি ধরে বসে আছে। আর গাড়ির পাশে পাশে বাঁশের আগা ধরে গল্প করতে করতে আসছে একজন। সামনে থেকে লোকজন সরে যাচ্ছে আগার খোঁচার ভয়ে। গাড়োয়ান আসছে আর সামনে থেকে লোকটির সঙ্গে জোরে কথা কইছে, মাঝে মাঝে গোরু দুটোকে পিটছে, বকছে, খোঁচা মারছে। গাড়িগুলো যাবে শহরের মধ্যে রাজকাছারির সামনের মাঠে। জায়গাটা অর্ধভুক্ত খড়, গোবর ও চোনার বিশ্রী ও নাক জ্বালা করা গন্ধে ভরা।
ভোম্বল তাড়াতাড়ি হেঁটে শহর ছাড়িয়ে গাঁয়ে এসে পড়ল। মনে করেছিল, চেনা বা অচেনা কেউ না কেউ তার সঙ্গী হবে। কিন্তু দেখলে চেনা কেউ নেই এবং প্রায় সকলেই যাচ্ছে তার বিপরীত দিকে। যারা তার পাশ দিয়ে এগিয়ে হাচ্ছে, তারাও কেউ বাঁয়ে, কেউ বা ডাইনের পথে গাঁয়ে ঢুকছে। হঠাৎ দুখানা বাইসাইকেল টিং টিং করে ঘণ্টা বাজিয়ে পিছন থেকে এসে তাকে ছাড়িয়ে গেল। সে শুনতে পেল আরোহীদের একজন অপরজনকে বললে, “আধ ঘণ্টায় মেলায় পৌঁছে যাব।”
চলন্ত সাইকেলের চাকার সামান্য ধুলো উড়তে লাগল। এবার ভোম্বলের বেশ উৎসাহ বোধ হল।
ক্রমেই পথের দুপাশের গাছপালা ঘন হচ্ছে৷ ঘরবাড়িগুলো কিছু ঘেঁষাঘেঁষি। শীতকাল, তাই গাছপালা নিস্তেজ। কোনো-কোনো গাছের পাতা খসে পড়ে তলায় বিছিয়ে আছে। সরু ডালগুলো কঙ্কালের আঙুলের মতো দেখাচ্ছে। ঝোপ-ঝাড় পাতলা। পাখির কণ্ঠেও যেন ডাক নেই। গাঁয়ের ভেতরে ঘন ছায়া, ঠাণ্ডা কনকনে। বাইরে খোলা খেত-খামারে রোদ, ভারি মিঠে খেতের কাঁচা, কচি মটরশুঁটি ও ছোলার মতো। খেত ভরা মটর কলাই, সর্ষে ও তিল ফুলে এবং পাতার মেলামেশায় বড়ো বাহার হয়েছে - যেন সোনালি, সবুজ ও সাদা কার্পেট পাতা খেতগুলোর ওপর গঙ্গাফড়িং উড়ছে। ছোলায় যখন পাক ধরেবে তখন মাঠের ধারে গাছ-ছোলা পুড়িয়ে খাবে রাখাল ছেলেরা। ভোম্বল যায় আর এদিক ওদিক তাকায়। মেলার পথ গেছে খেতের মাঝ দিয়ে। ভোম্বল পথের পাশে একটা মটর গাছ থেকে কয়েকটা শুঁটি ছিঁড়ে নিলে। কিন্তু মাত্র একটির মধ্যে কয়েকটি ছোটো ও নরম দানা ছিল। বাকিগুলোয় সবে এক সার কুটি কুটি দানা দেখা দিয়েছে। পাতলা খোসা ছাড়ালেই ফাঁকা। ছোলা এখনও পুষ্ট হয়নি। তবু সে একটা গাছ তুলে, তা থেকে ছোলা ছিঁড়ে ছাড়িয়ে গালে ফেলে চিবতে চিবতে চলতে লাগল। কাঁচা কচি ছোলা কড়াইশুঁটির মতোই নরম ও মিষ্টি। গাছগুলো যেন মাটির মিঠে রস শুষে ফেলে জমিয়ে ফুলে উঠেছে। ওই দেখে যায় ধল-গাং -জলচিকচিক করছে। ওই সাদা ডানা মেলে বক উড়ছে, ওই যে ডিঙি। পথটা ক্রমে গাংমুখো হছে। লোক চলাচলও বাড়ছে। কেউ চলেছে মেলা দেখতে বা কেনা-কাটা করতে, কেউ চলেছে বেসাতি মাথায় বেচতে। ওই চলেছে ছেলেমেয়েরা-একা, দোকা বা বড়োদের হাত ধরে। কেউ কেউ সকৌতুহলে ভোম্বলের দিকে তাকাতে লাগল –ভোম্বলের চেহারা ও পোশাকে যে শহুরে ছাপ।
শীতের বেলা হলেও পথ চলায় ও চনমনে রোদের গরমে ভোম্বল গা থেকে আলোয়ান খুলে কোমরে জড়িয়ে বাঁধল।
একবার ট্যাঁকে হাত দেখে নিলে আধুলিটা ঠিক আছে কিনা। টাকা পয়সা পকেটে রেখে বিশ্বাস নেই, ছুটোছুটিতে পড়ে যেতে কতক্ষণ? গ্রামে ও তাদের শহরে কারো পকেটমারা গেছে এমন কথা সে শোনেনি। কিন্তু শুনেছে, কলকাতার পথে-ঘাটে চলাফেরা করছে পকেটমার, যার ইংরেজি নাম-পিকপকেট। সেখানে লোকে টাকা-পয়সা নিয়ে চলে কী করে? সেদিন একজন কলকাতার গল্প করতে করতে বললেন, “সেকালের লোকে কলকাতা সম্বন্ধে বলত, জাল, জোচ্চুরি মিছে কথা, তিন নিয়ে কলকাতা।” ভোম্বলের তা বিশ্বাস হয় না।
পথটা এবার গাঙের পাশে পাশে চলেছে। জলের কূলে একটু একটু বালুচর। তার ওপরেই এদিকেওদিকে খঞ্জন পাখি চরতে চরতে ঘন ঘন লেজ দোলাচ্ছে। পাখিগুলো ভারি চঞ্চল, এক মুহূর্ত স্থির থাকে না। দেখতেও সুন্দর। কেউ ওদের শিকার করে না, ধরেও না। ওরাও ধরা দেয় না। নদীকূলেই ওদের বাস। কিন্তু অনেক খুঁজেও ভোম্বল ওদের বাসার খোঁজ পায়নি। কেউ কেউ ওদের দেখলেই নমস্কার করে। ওই যে লম্বা পা ফেলে চরছে কাদাখোঁচা। ওই সাদা গোরুটার পিছন পিছন চলেছে লম্বা-গলা কোঁচ বক।
এপারে-ওপারে গাঁ ও খেত-খোলা। যেমন খেতে খেতে ফসল, তেমনি আখখেতের কোলে রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হছে এখো-গুড়, গাঁয়ের ধারে বা বাড়ি উঠোনে তৈরি হচ্ছে রস ফুটিয়ে খেজুরে গুড় বা তাতারসী। বাতাসে টাটকা, তপ্ত রস ও গুড়ের মিষ্টিগন্ধ। ভোম্বলের জিভে জল এল। টাটকা খাঁটি দুধে কামিনী চাল ও তাতারসীর পায়েসের তুলনা না কী পৃথিবীতে নেই। ভোম্বল পৃথিবীর কথা জানে না। তবে পণ্ডিতমশাইয়ের মুখে শুনেছে ধর্মগ্রন্থ বেদে ও না কী পায়ের, দই ও ক্ষীরের কথা আছে। ভোম্বল জিজ্ঞেস করেছিল, “স্যার, ওঁরা পায়েসে পেস্তা-বাদাম-কিসমিস দিতেন? তখনও কাবলিওয়ালারাই কিসমিস পেস্তা বেচত?” তার কথা শুনে ক্লাস সুদ্ধ সবাই হেসেছিল। আর পণ্ডিতমশাইয়ের মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। ধমক দিয়ে বলেন, ‘ধৃষ্ট’। দুধের ওই তিনটে খাবারে ভোম্বলের ভারি লোভ। ‘না বলে নিয়ে’ খেতেও তার বাধে না।
এই দ্যাখো, কী কথায় কী এসে পড়ল। ভোম্বলের মনই এই রকম। ভাবনার পর ভাবনা, কথার পর কথা এসে যায় মনে। সব কেমন এলোমেলো, বাঁধনহারা। তাই বোধ হয় মুনি-ঋষিরা নাকের ডগায় মনকে আটকে রাখার উপদেশ দিয়েছেন। ভোম্বল মনে মনে হাসল।
আরে! ওই বেদেটার হাতে ওটা কি? গুলতি? ওই যে আমতলায় দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকিয়ে গুলতি ছুড়ল। একটা ঘুঘু করুন সুরে ডাকছিল সঙ্গে সঙ্গে ওর ডাক থেমে গেল। ভোম্বল এক ছুটে বেদেটার কাছে গিয়ে তাকিয়ে দ্যাখে, একটা মরা ঘুঘু একটা ছোটো ডালে আটকে আছে। আর তার মাথাটুকু ঝুলছে। বেদেটা আবার একটা গুলতি ছুঁড়ে ডালটা ভেঙে ফেলতেই ঘুঘুটা পড়তে লাগল এবং মাটিতে পড়বার আগেই লোকটা সেটা লুফে নিয়ে ঝোলায় পুরে গুলতি কাঁধে ঝুলিয়ে মেলার দিকে চলতে লাগল। লোকটা কোন দেশি কে জানে! ওর পোশাকের রং গেরুয়া, মাথায় পাগড়ি, মুখে দাড়ি, গায়ে পাঞ্জাবি, পরনে ধুতি –লুঙ্গির মতো করে পরা; পায়ে নাগরাই, কাঁধে ঝোলা। ঝোলায় কী আছে কে জানে! লোকটা ভোম্বলের দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। বেদেটা যে সাপ খেলায় না এ সম্বন্ধে ভোম্বল নিশ্চিত। তাহলে বাঁশি ও ঝাঁপি থাকত। মাঝে মাঝে বাঁশি বাজাত। ও বোধ হয় জাদুর খেলা দেখায় —বাতাস থেকে টাকা ছিঁড়ে নেয়, আমের আঁটি থেকে গাছ গজিয়ে তোলে, এক মুঠো ধুলো থেকে একটা খরগোশের ছানা বার করে। হয়তো মন্তর দিয়ে ওই মরা ঘুঘুটাকে বাঁচিয়ে তুলবে। ওরা সব পারে। ফুস মন্তরে মানুষকেও টিকটিকি বা ব্যাং করে দিতে পারে। সে শুনেছে, কোনো-কোনো গাঁয়ে ডাইনি বুড়ি থাকে। সে কোনো ছেলে বা মেয়ের দিকে একবার তাকালেই সে পুঁটি বা ল্যাটার বাচ্চা হয়ে জলে ঘুরপাক দেয়, নয়তো পায়রা হয়ে ছাদের কার্নিশের তলায় থাকে। কিন্তু ভোম্বল কোনো গাঁয়েই এমন কাউকেই দ্যাখেনি, যাকে মনে হয়েছে ডাইনি।
সে মেলা থেকে কাউকেই ফিরতে দেখছে না, মেলায় যেতেই দেখছে। ওই মেলায় কলকলানি শোনা যাচ্ছে। আরে! ওই যে দূরে একখানা ‘কোয়াড়’ ঘুড়ি উড়ছে। ওর মাথায় বাঁধা বেতের ডবল চটায় টানা বাতাস লেগে শব্দ হচ্ছে - বোঁ-বোঁ-বোঁ-ও। শীতকালে সে কোয়াড় উড়তে দ্যাখেনি। অমনি তার মনে পড়ল ছড়াটা—
‘চিলে করে ঢিলে-মিলে
কোয়াড়ে দেয় টান,
ঢাউস ঘুড়ি উঠে বলে
আরও সুতো আন!’
কিন্তু কোয়াড় আর ঢাউস ওড়ে দড়িতে। নইলে এমন মস্ত আর ভারী ঘুড়ির টান সামলানো যাবে কীসে? ওগুলো হাতে ধরেও রাখা যায় না গাছের গায়ে বা মোটা ডালে বেঁধে দিতে হয়; ওঠানো-নামানো একজনের সাধ্য নয়, কয়েকজনের কাজ। ঢাউস ঘুড়িরও নাকের ডগায় বাঁধা থাকে তারের মতো বেতের ডবল চটা। কোয়াড় বা ঝাঁপঘুড়ি ও ঢাউসঘুড়ি কিন্তু চিলের সঙ্গে প্যাঁচে পারে না। কোয়াড় ও ঢাউস ওড়ানোর সাধ থাকলেও সাধ্য হয়নি। সে কোয়াড়খানা দেখতে দেখতে চলল।
সামনেই মেলা। লোক গিজগিজ করছে। ভোম্বল মেলায় ঢুকল। মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি, লুঙ্গিপরা, পাঞ্জাবির ওপর আলোয়ান বা চাদর জড়ানো লোকই যেন বেশি। মেলায় দামি জিনিস চোখেই পড়ে না। পড়বে কী করে। চারধারে যে গরিব চাষি মজুরের গাঁ। ওরা বাবুয়ানি কাকে বলে জানেই না। ওরা জানে জমির কথা, চাষ-আবাদের খবর। কাঁচা ঘরে ওদের বাস। শীতে কাঁপে, রোদে পোড়ে, জলে ভেজে।
ভোম্বল যথেচ্ছ ঘুরে বেড়াতে লাগল। দেখলে সস্তা ও ফঙফঙে জিনিসের মনিহারি দোকান - টিনের আয়না, কাঠের কাঁকই, ঘুনসি, পুঁতির মালা, ঝুটো মুক্তোর নোলক, কাচের চুড়ি ইত্যাদি সাজানো রয়েছে। যত লোকে দেখছে, তত লোকে নিচ্ছে না। কাপড়ের দোকানে লুঙ্গি, টুপি, ডুবে ও নকল পাড় শাড়ি, নকশা কাটা রাপার, ছোটো-বড়ো পিরান, গামছা; খাবারের দোকানে চিঁড়ে-মুড়ি-খাগড়াই-সাদা বাতাসা-খই; গুড়ের দোকানে নাগরি ভরা এখো বা খেজুরে-গুড়, পাতালি, হাজারি-তিলে লাঠি, ছোটো বড়ো কদমা। তিলমাখনো লাঠিগুলো চিবতে ভারি মজা। মাড়িতে জড়িয়ে যায়। ভোম্বল ঘুরতে ঘুরতে এল, যেখানে ভানুমতীর খেলা দেখানো হচ্ছে সেখানে; সেখান থেকে পান-চুনের দোকান বাঁয়ে রাখে, কেতাবপুঁথির দোকান ছাড়িয়ে এল কামারহাটের সামনে সেখানে বসেছে কাস্তে-কুডুল, কোঁচ, কোদাল-কাটারি-খুরপি-খোনতা-নিড়েন ফাল এবং আরও কত রকমের লোহার জিনিসের মেলা। তার কাছেই বাক্সতে চোখ দিয়ে ছেলেবুড়ো এক পয়সার বায়স্কোপ দেখছে। বায়স্কোপওয়ালা বাক্স পিটতে পিটতে বলছে, ‘আরে, বোম্বাইকা বিবি দেখো, দেখো রাজা-রানি, যেখানেতে যাইতে হলে, পারায় কালাপানি।-’
আর, এক জায়গায় দেখলে, কানে নল লাগিয়ে ছেলেবুড়ো শুনছে কলের গান। তার জন্যেও হচ্ছে একটি করে পয়সা। ভোম্বলের ইচ্ছা হল বায়স্কোপ দ্যাখে ও গান শোনে। কিন্তু আধুলিটা ভাঙাতে কেমন মায়া করতে লাগল। দেখলে শুনলেই তো পয়সা দুটো ফুসমন্তর। অথচ মেলায় এসে শুধু হাতে, খালি পেটে ফিরে যাওয়ায়র মতো আহম্মকী আর নেই। সে ভিড় ছেড়ে আরও ঘুরতে লাগল। ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পড়ল দরগার একেবারে সামনে যেখানে সবচেয়ে বেশি ভিড়। চেষ্টা করেও সে দরগার কাছে পৌঁছতে পারল না। লোকগুলো কী কারণে যেন মাঝে মাঝে বলে উঠছে, ‘আল্লাহ্-’। হঠাৎ তার জামায় টান পড়তেই মনে করলে পকেটমার। কিন্তু ফিরে দ্যাখে তাদের ক্লাসের আতাহার হোসেন - মাথায় ফেজ, পরনে পাজামা, গায়ে পাঞ্জাবির ওপর কালো কোট, পায়ে ডার্বি-কাট টকটকে লাল জুতো, হাতে ফুলকাটা রেশমি রুমাল।
আতাহার সহাস্যে জিজ্ঞেস করলে, “কী রে, তুই এখানে?”
ভোম্বল পালটা প্রশ্ন করলে, “তুই কী দরগায় এসেছিস?”
আতাহার বললে, “ওই গাং পারে আমার খালার বাসা। বেড়াতে আলাম। তুই আলি মেলা দেখতে?”
ভোম্বল বললে, “হ্যাঁ। কিন্তু মজার কিছু নেই।”
—“মেলাটা থাকবে তিনদিন। আজ সবে শুরু। জমবে কাল। আজ সাঁঝে বাউল গান হবে।”
—“ততক্ষণ থাকতে পারব না। তুই কবে ফিরবি?”
—“পরশু। চল। আমার খালার বাড়ি। এ বেলা থেকে ও বেলা যাস।”
—“কী হবে থেকে?”
—“পরোটা-গোস্ত খাওয়াবো।”
ওই ‘গোস্ত' মানে মুরগির মাংস। ভোম্বলের লোভ হতে লাগল, জিভে জলও এল, কিন্তু কাকিমা জানেন, সে এ বেলায়ই ফিরবে। না, ফিরলে ফলটা ভালো হবে না। মনের ভাব চেপে নিতান্ত উদাসীনের মতো বললে, ‘নাঃ’।
আতাহার বললে, “—তবে ওই মেঠাইয়ের দোকানে চল, গরম সিঙাড়া জিলিপি খাওয়া যাক।” ও অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। ওর হাতও কিছু দরাজ; ভোম্বলকে পছন্দও করে।
দুজনে সেখান গিয়ে পেল কেবল গরম জিলিপি, ঘিয়ে ভাজা। দাম মোটে এক পয়সা। ভোম্বলের এক আধলাও খরচ হল না, ট্যাঁকের আধুলি ট্যাঁকেই রয়ে গেল।
জল খেয়ে কোঁচার খুটে মখ-হাত মুছতে মুছতে ভোম্বল বললে, ‘চললাম।’ এবং দুই সহপাঠী সহাস্যে পরস্পরের করমর্দন করলে।
মেলায় ভিড় থেকে বার হতেই ভোম্বল দেখলে, আসবার পথে যে দুজন সাইকেল সওয়ারকে দেখেছিল তারা ক্যারিয়ারে কী সব বেঁধে নিয়েছে। একজনের গাড়ির হ্যান্ডেল থেকে ঝুলছে এক জোড়া মুরগি। সওদা ঘাড়ে নিয়ে মেলা ফিরছে অনেকে। কোনও কোনও ছেলে যেতে যেতে টিনের বাঁশি বাজাচ্ছে। তাদের কারো হাতে দাঁড়ে বসা সোনার টিয়া, কেউ কিনেছে সোনার কাকাতুয়া, কারো মাথায় জরির টুপি, কারো গলায় রেশমি রুমাল। সকলেরই মুখে হাসি। আবার অনেকে চোখে মুখে আগ্রহ নিয়ে তাড়াতাড়ি হেঁটে চলেছে মেলার দিকে। ছেলেদের মধ্যে একজন ফিরে যেতে যেতে কী না পাওয়ার জন্যে কাঁদছে। কিন্তু তার হাতে রয়েছে কী একটা খেলনা। একটা ছেলে মেলা দেখতে চলেছে এক আধবুড়োর কাঁধে চেপে। লোকটা বোধ হয় ওর বাবা।
এদিকে সূর্য মাথায় ওপর ওঠে ওঠে; ছায়া ছোটো হয়ে এসেছে। গাঁয়ের বউ-ঝিরা গাং থেকে স্নান সেরে, কাচা কাঁথা-কাপড় কাঁখে বা মেটে কলসিতে জল নিয়ে গাঁয়ে ফিরছে; কেউ কেউ তখনও গাঁ থেকে গাঙে আসছে এবং সঙ্গে কেউ থাকলে তার সঙ্গে বকর বকর করছে; কেউ আসতে আসতে কোনও অনুর্দিষ্ট অপরাধীকে তিরস্কার করছে।
ভোম্বল যে উৎসাহ-আগ্রহ নিয়ে মেলায় এসেছিল ফিরে যাবার পথে তা যেন উবে গেল। সে অযথা একটা কুকুরকে ঢিল ছুঁড়ে মারলে। তার অপরাধ সে ভোম্বলের গা শুঁকেছিল।

এক জায়গায় হট্টগোল শুনে ভোম্বল তাকিয়ে দ্যাখে একটা আমতলায় আট-দশটা রাখাল ছেলে জটলা করছে; কয়েকটা গাছে উঠেছে, একটা মাথায় নোনাপাতার মুকুট পরে গাছের গুঁড়িতে এমন ভাবে হেলান দিয়ে বসে লকড়ি-খানা হাতে ধরে রয়েছে যে, মনে হচ্ছে রাজামশাই সিংহাসনে বসে রাজদণ্ড ধরে আছেন। তার দুপাশে ও সামনে কয়েকজন রাখাল দাঁড়িয়ে তাকে কী যেন বলছে। ভোম্বলের মনে পড়ে গেল, বত্রিশ পুতুলের গল্প। সে একটু দাঁড়িয়ে মজা দেখতে লাগল। কিন্তু কেউ তাকে লক্ষই করলে না। এতে ভোম্বলের অহংকারে একটু ঘা লাগল। কিন্তু করবেই বা কি? সে তাদের দিকে মনোযোগ না দিয়ে এগোতে লাগল। আর এক জায়গায় দেখলে, একটা মস্ত টোপা কুল গাছে সবুজ ও রংধরা কুলে ডালগুলো নুয়ে পড়েছে। চার পাঁচটা ছেলে এড়ো বা ঢিল ছুড়ে কুল পাড়ছে, কুড়োচ্ছে, খাচ্ছে, হইচই করছে। ভোম্বলেরও কুল খেতে ইচ্ছা হল কিন্তু বিনা নুনে টোপাকুল খাওয়ার মজা কি? সে চলতেই লাগল। এবং যখন বাড়ি এসে পৌঁছল তখন খাওয়া-দাওয়ার পাট প্রায় চুকে গেছে, উঠোনে ঘরের ছেঁচের ছায়া চওড়া হয়ে পড়েছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন