চাটুয্যে বাড়ি

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

ভোম্বল দেখলে, অনেকটা জায়গা নিয়ে পাঁচ-ছখানা আটচালা, বাংলা ঘর, গোয়াল, ঢেঁকিঘর, তার মধ্যে একখানি ঘর পাকা। মাথায় লেখা ‘শ্রী শ্রীগোপাল জিউ।’


তার ওধারে ধানের গোলা, মস্ত বিচালীর পালা, আম-কাঁঠাল, নারকোল-সুপুরির গাছ। একদিকে যেন সবজির ক্ষেত। খানিক তফাতে বাঁশঝাড়। বাড়িতে বেশ লোকজন ঘোরাফেরা করছে। এমন বাড়িতে ভোম্বল কখনও আসেনি।

সুধীর সামনের আঙিনা পার হতে হতে বললে, ‘ঐ আমার বড়মামা৷ বাড়িতে থাকেন কেবল বড় আর সেজমামা৷ ওঁরা জমি-জায়গা দেখাশুনো করেন। আর তিন মামা বিদেশে বড় বড় চাকরি করেন। চল বড়মামাকে প্রণাম করি।’


বলতে বলতে সুধীর এগিয়ে গেল৷ মামা ভিজে কাপড়ে গামছা কাঁধে খড়ম পায়ে, হাতের কর গুণতে গুণতে ঠোঁট নাড়তে নাড়তে বাড়ির ভেতর ঢুকছিলেন। তাঁর গলায় একগোছা মাজা পৈতে ও কণ্ঠী।

সুধীর পিছন থেকে গিয়ে, 'বড়মামা' বলে তাঁর পায়ে হাত দিতেই তিনি চমকে উঠে সঙ্কুচিত হয়ে একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

সুধীর বললে, ‘মার সঙ্গে এলাম। ঐ যে মা আর বুলি।’


সুধীরের মা তখন গাড়ি থেকে নামছিলেন।

মামা কর গুণতে গুণতে নীরবে ঠোঁট নাড়তে নাড়তে সেদিকে একবার তাকালেন। মনে হলো যেন গোল মুখখানার ঠোঁটের কোণে একটু হাসির রেখা ফুটেই মিলিয়ে গেল।

সুধীরের মা কিন্তু তাঁর কাছে এলেন না। অন্য পথে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন।

সুধীর বললে, “বড়মামা, এই আমার ক্লাস ফ্রেণ্ড ভূপেন—ভূপেন চাকী। আমাদের পাড়াতেই ওদের ‘বাসা।’ পথ থেকে ধরে এনেছি বলুর পৈতের নেমন্তন্ন খেতে।”

সুধীরের কথা শুনে তার বড়মামা খুশী কি বিরক্ত হলেন বোঝা গেল না।

ভোম্বল তাঁকে প্রণাম করবার জন্যে এগোতেই তিনি হাতখানেক পিছিয়ে বাঁ হাতখানা একটু তুলেই ভেতরে চলে গেলেন। ভোম্বলের প্রণাম করা হলো না। সুধীর তাকে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকল।

ভোম্বল দেখলে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মস্ত উঠোন। মাঝখানে তুলসী-মঞ্চ; ওপরে ঝারা। উঠোনের চারদিকে পাঁচ ছখানা ছোট-বড় ঘর। কোনটা খড়ের, কোনটা কানেস্তারা কাটা আলকাতরা মাখানো টিনের। খড়ের চাল বেশ পুরু ও ছেঁচগুলো পরিপাটী করে ছাঁটা। সব ঘরেরই খুটি শালের, মেঝে পাকা, সামনে বারান্দা। বারান্দায় ওঠবার সিঁড়ির ধাপগুলোও পাকা। বারান্দার কোলে একটু নালা৷ ভোম্বল আন্দাজ করলে, ও নালা তৈরী হয়েছে চাল থেকে বৃষ্টির জল পড়ে। ঘরগুলোর জানলাগুলো বড়। একখানা মাঝারি বাংলা ঘরের চাল ও ওপরে তার দু'কোণ দিয়ে একটু একটু ধোয়া উঠছিল। ওখানা বোধ হয় রান্নাঘর; তার পাশের ওটা ভাঁড়ার ঘর কি? ঘরগুলোর পিছনে চাল ছাড়িয়ে উঠেছে, বাঁশঝাড়ের আগা, আম-জাম-কাঁঠালের আগডালের জট। সবগুলো উত্তরে বাতাসে দুলছে।

এক ঝলকে যতটুকু দেখা যায় তাতেই ভোম্বলের ধারণা হল, সুধীরের মামারা মস্ত লোক, জটা গাঁয়ের মাথা। এ সব লোকের বাড়ি তার ভালো লাগে না।

ভোম্বল আস্তে আস্তে বললে, ‘এই! খাবার জল।’

এমন সময় দেখলে রান্নাঘরের বারান্দা থেকে নামছেন মোটা-সোটা, গিন্নি-বান্নী মতো একজন। তাঁর গায়ের রং মাজা, মুখখানি গোল, সিঁথিভরা সিঁদুর, চোখ দুটি ছোটো, হাতে সোনার বালা, সাদা শাঁখা, লোহা, গলায় বিছে হার, কানে মাকড়ি, পরনে লাল পেড়ে শাড়ি, খুঁটে বাঁধা চাবির গোছা।

সুধীর তাঁর দিকে সহাস্যে এগিয়ে যেতে বললে, ‘বড়োমামি, খুব জল তেষ্টা পেয়েছে আমাদের। এই ভোমু, এই আমার বড়োমামি। আয়, প্রণাম কর।’ বলতে বলতে তাঁর পায়ের ধুলো নিতে গেল। এবং তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলে, – “বলু, কানু কোথায়?”

মামি ‘থাক থাক’ বলতে বলতে যেন একটু সরেও গেলেন।

ভোম্বলও সুধীরের পিছু পিছু গিয়ে তাঁর পায়ের দিকে হাত বাড়াতেই বললেন, - ‘ওইখেন থেকেই পেন্নাম কর। তোদের সাড়া পেয়ে দেখতে এলাম। এখনই পাকের ঘরে ঢুকব। তোর মা কই? এ ছেলেটা কে?’

এ আমাদের দুর্গাপুরের। আমরা একসঙ্গে পড়ি - এর নাম ভূপেন চাকি - ডাকনাম ভোম্বল। একে পথ থেকে ধরে এনেছি, বলুর পৈতের নেমন্তন্ন খেতে। মা ওই ঘরে ওই যে সেজোমামির সঙ্গে কথা কইছে। ওই যে বুলি। তুমি আগে আমাদের দু'গেলাস জল দাও। খানিকটা পথ হেঁটে এলাম। রোদে গা চিড়বিড় করছে, মাথা তেতে চাটু, গলা শুকিয়ে কাঠ। মামি বললেন, ‘চাকিরা কি? বেনে না কুমোর?’

—‘ধ্যেৎ। কায়স্থ৷’

-‘শুদ্দুর তো?’

-‘তাতে কি? তোমার ভারি বাছ-বিচার।’

-‘মনে রাখবি, এটা বামুন-বাড়ি। তুইও বামুনের ছেলে, পৈতে হয়েছে।’ বলতে বলতে বড়মামী রান্নাঘরে উঠে ভেতরে ঢুকলেন এবং একটু পরেই দুট গেলাসে জল এনে বারান্দায় রেখে সুধীরকে বললেন, ‘এই কাসারটা তোর, ঐ পেতলেরটা ওর। খাওয়া হয়ে গেলে বারান্দার ঐ কোণে উপুড় করে রাখবি। মন্টের মা এসে মেজে রাখবে।’

এই বাড়িতে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে ভোম্বলের মনে সেখান থেকে ‘পালাই-পালাই' ভাব জেগেছিল। মামীর কথায় সে ভাব জোর হয়ে উঠলো।

সুধীর আবার জিজ্ঞেস করলে, ‘বললে না তো বলু আর কানু কোথায়?’

তারা গেছে সেজো ঠাকুরপোর সঙ্গে কাঁঠালে - নেমন্তন্ন করতে এক পেট ফ্যানে-ভাত খেয়ে। গেছে গরুর গাড়িতে।’

সুধীর বললে, ‘বলু কেন গেল? তার না পৈতে?’

-‘তোমরা আজকালকার ছেলেরা কি বাপ-মা-গুরুজনদের কথা শোনো? কত বারণ করলাম। বললাম, যেতে নেই। অসুখ-বিসুখ হলে পৈতেই বন্ধ। কে কার কথা শোনে!’

বলু বড়োমামার ছেলে, কানু সেজোমামার ছেলে।

সুধীর বললে, ‘ওরা থাকলে মজা হত। এখন আমরাই দুজনে গাঁয়ে ঘুরব। জানিস ভোমু, কাঁঠালে এখান থেকে দু ক্রোশ, মাঝে ঘাড়ভাঙার খাল। ওই খালের গল্প তোকে পরে বলব। খুব সাংঘাতিক জায়গা। আমি ওখানে গেছি।’

এমন সময় সুধীরের মায়ের সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সেজোমামি। দোহারা ফর্সা চেহারা, টানা চোখ, হাসি মুখ, মানুষটি লম্বা; কানে সোনার ফুল, নাকে নাকছাবি, গলায় চিকি হার, হাতে এক গোছা সোনার চুড়ি, সাদা শাঁখা, লোহা, আঙুলে আংটি, পরনে গঙ্গা-যমুনা-পাড় শাড়ি, মাথায় টানা সিঁদুর, এলোখোঁপায় আধ ঘোমটা আটকে আছে। সুধীরের দুই মামিকে ভোম্বলের মনে হল যেন গ্রামছাড়া, একটু শহুরে।

সেজোমামির চোখে-মুখে কথা। সুধীররা তার পা ছুঁয়েই প্রণাম করলে। তিনি বাধা না দিয়ে বরং থুতনি ছুয়ে চুমো খেলেন। বললেন, ‘চল তোদের জলপান দিই। খেতে বেলা হবে।’

তাঁর কথায় ও ব্যবহারে ভোম্বলের মনে অস্বস্তি ভাব কেটে গেল। মনে হল, মামির পায়ের পাতা দুখানি কী সাদা। শাঁখা দুগাছি সুগোল হাতের রঙের সঙ্গে কেমন মিশে গেছে। কপালখানি কি চকচকে।

মামি তাদের তিনজনকে বারান্দায় বসিয়ে ধামি ভরে জলপান দিলেন। সবই ঘরের—মুড়ি ও বড়ো বড়ো নারকোল নাড়ু।

খাওয়া হলে আবার কাঁসা ও পেতলের গেলাসে জল। আবার ভোম্বলের মন ক্ষুব্ধ হল। কিন্তু সুধীর তার হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে বললে, ‘কি রে! গুম হয়ে গেলি কেন? চল্, গাঁয়ের ধারে সেই শিব মন্দিরে যাই।’

এবং যেতে যেতে বললে, ‘বড়োমামা এখন গোপালের মন্দিরে। ওই শোন ঘণ্টার শব্দ। ওই দ্যাখ বৈঠকখানায় বসে আছে লম্বা ঠেঙো সীতেশ রায়তা। ওটাকে দেখলেই আমার গা জ্বলে। ও মামার পা ধোয়া জল খায় - মামাও দেয়। ওর কীসের যেন - অসুখ আছে। লোকটা একদম পাগল।’

ভোম্বল দেখলে বার-বাড়ির উঠোনের শেষে পথের ধারে এক জোড়া চারা তালগাছ। তাদের ছোট ছোট ডেগোর মাথায় বড় বড় গোল গোল পাতাগুলোর ধারে লতিয়ে উঠেছে ঝুমকো লতা। গোড়া ঘিরে কালকাশুন্দী ও ভাঁট ঝোপ। তলায় এক জোড়া সাহেববুলবুলি পোকা খুঁজছে আর থেকে থেকে ঝংকার দিচ্ছে। এধারে একটা সজনে গাছ। তার মোটা গুঁড়িতে শুকিয়ে আছে স্বচ্ছ আঠা। মনে হচ্ছে, গাছটার ডালে ডালে যেন কুঁড়ি ধরেছে। সামনে যে মাঘ মাস। ওধারে কয়েকটা বুড়ো আমগাছের ডাল থেকে ঝুলছে গুলঞ্চ, একটার ডালে পরগাছা। তার পাশে কাকের বাসা—এখন শূন্য; ওতে ডিম থাকবে ফাল্গুনে— কাককোকিলের এক সঙ্গে।

শীতকাল, তাই ডালে-পাতায়, লতায় লতায়, ঝোপেঝাড়ে নেই সবুজের মোলায়েম চিকচিকিনি রঙ। সব যেন কেমন মরা মরা, ঝিমধরা; গাছপালার গন্ধও যেন ডালে-পাতায় ঘুমিয়ে আছে। পথের দু'পাশে দাঁতছোলার জঙ্গলের বুনো গন্ধ নাকে লাগছে। -আশশেওড়া গাছটার মাথায় স্বর্ণলতার ঝাপটা-ঝালরের সোনালী রঙেও যেন একটু ঝিম ধরেছে। শালিকগুলো বনে-জঙ্গলে বৃথা পোকা-মাকড় খুঁজছে, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া মারামারি করছে। একটা কাঠবেরালী লেজ তুলে খুর খুর করে একটা আমগাছে উঠে গেল।

গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে দূরে-কাছের কাঁচা ঘরবাড়িগুলোর একটু একটু চোখে পড়ছে। মাঠে গরু চরছে, চাষী-বউ ও চাষীর মেয়ে ঝুড়ি কাঁখে গোবর কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ঐ যেন কিসের ক্ষেত দেখা যায়। ক্ষেতের ওপর দিয়ে একটি লোক হেঁটে যাচ্ছে। কে যেন কাকে ধমক দিচ্ছে।

ওই খেতের ওপারে দেখা যায় সেই মন্দির। পথটা ঘুরে মন্দিরের সামনে গিয়ে পড়েছে। সুধীর বললে, ‘মন্দিরের সামনে বসে চোত সংক্রান্তির মেলা। আমি গত বার দিদিমার শ্রাদ্ধে এসে দেখেছিলাম। তখন গাছে গাছে আমগুটি, কাঁঠালের মুচিগুলোর গায়ে খুদে খুদে ফুল। তার গন্ধ নাকে লাগছে, সজনের ডাঁটাগুলো ফেটে ফাঁক।’
বলতে বলতে সে বাঁয়ে একটা সরু পায়ে-চলা পথে ঢুকল।

ভোম্বল বললে, ‘এ কি পথ রে? নোংরা, ঝুপসি, পচাগন্ধভরা, পচাডোবা দূর, এ পথে আমি যাব না।’ বলে সুধীরের হাত ধরে আগের পথে নিয়ে এসে বললে, ‘ওই দূরে ধোঁয়া দেখা যায়। ওটা কী?’

-‘ওই তো শ্মশান-মন্দির থেকে আধক্রোশটাক দূরে। আশ-পাশের গাঁ থেকে লোকে ওখানে মড়া পোড়াতে আসে৷’

ভোম্বল বললে, ‘চল, ওখানে যাই।’

-‘না, আমার গা ছমছম করে। একবার গিয়ে দুরাত ঘুমোতে পারি না। মড়ার মাথা, আধপোড়া হাড়, ছেঁড়া কাপড়, ভাঙা কলসি, পোড়া কয়লা, চিতা না না, এসব আমাকে - চল ফিরে চল।’ বলে সুধীর ভোম্বলের হাত ধরে টানতে লাগল।

ভোম্বল বললে, ‘তুই ফিরে যা। আমি দেখে আসি। আর তোর ভয় কি? ভূত এলে গায়ত্রী আওড়াবি। শুনে ভূত-প্রেত পালাতে পথ পাবে না।’

-‘তখন মন্ত্রই ভুলে যাব। না না- কী দেখবি? শুনলে বড়মামা আমায় ধমকাবেন। সেজমামা হয়তো মেরেই বসবেন। —চল— ফিরে চল্।’ বলে সুধীর ভোম্বলের আলোয়ান ধরে টানতে লাগলো।

ঠিক তখনই কে যেন পাশের ঝোপ-ঝুপসি থেকে বেরিয়ে এসে বললে, ‘পচু নয়? এখানে কি করো? কবে আলে? ও কেডা?,’

সুধীর ফিরে দ্যাখে, মামাদের পাশের বাড়ির নোসো ‘নোসো মোত্তির’ (মৈত্র)। লোকটার হাতে একখানা ছোটো খোনতা, কাঁধে একটা চুবড়ি, গায়ে ময়লা গেঞ্জি, পরনে আট-হাতি ধুতি, গলায় জড়ানো ময়লা পৈতেগাছির খানিকটা গেঞ্জির তলায় বেরিয়ে আছে।

সুধীর বললে, ‘এসেছি আজ সকালে। এ আমার ক্লাস ফ্রেন্ড। বাড়ি দর্গাপুর। নাম ভূপেন চাকি।’

নোসো আবার বললে, ‘কী কইলে? ফেরেনড? নাম কী? চাকি? শুদ্দূর? এখানে কেন?’

ভোম্বল মনে মনে বললে ‘একদম গেঁয়ো।’

-‘বলুর পৈতের নেমন্তন্ন খেতে এসেছে। বলুর তিনদিন সুজ্যু আর শুদ্দুরের মুখ দেখতে নাই, জানো তো?’

-‘জানি জানি। আপনার চুবড়িতে কী?’

-‘শাক আলু। বলে ছোপধরা দাঁতগুলো বার করে একটু হাসলে৷’

-‘কিনে আনলেন?’

—‘তোমার দরকার কি?’ বলেই নোসো ঠাকুর বিরক্তির সঙ্গে সরে গেল৷

সুধীর বললে, ‘লোকটা ওধারের কারো খেত থেকে আলুগুলো তুলে এনেছে। ওর কাজই ওই। ওপাশে মাঠের ধারে ওর এক চিলতে বাগান আছে। তিন চারদিন অন্তর ও তার বেড়া বাঁধে। সেই ফাঁকে মাঠের একটা খেজুর গাছই ওর জমিতে ঢুকে গেছে। চল চল বাড়ি ফিরি।’

-‘বাড়ি গিয়ে কী করব?’

-‘এখানেই বা কী করবি?’

ভোম্বল বললে, ‘তাই তো শ্মশানের দিকে যেতে চাইছিলাম।’

-‘আবার শ্মশানের কথা।’

-‘তবে চল ওই চোতেলির খেতগুলোর আলে আলে খানিক ঘুরি, কি ওই গাঁখানার দিকে যাই।’

-‘এদিকে বেলা বাড়ছে, খেয়াল আছে? ওদিকে যেতে আসতে দুক্রোশ।’

অগত্যা ভোম্বলকে ফিরতেই হল। তবে যে পথে এসেছিল সে পথে নয়। ডাইনে কুমোর পাড়া, মুচি পাড়া ঘুরে, কারো গোয়ালের কোল ঘেঁষে, কারো বাড়ির উঠোন মাড়িয়ে, কারো ঢেঁকিশালের পিছন দিয়ে, বাঁশতলা পার হয়ে, শুকনো সরু খাদ ডিঙিয়ে—

বাড়ি ঢুকতেই সুধীরের মা বললেন, ‘কতদূর যাওয়া হয়েছিল? কত বেলা হল সে হুঁশ আছে? বাড়িতেও যেমন এখানেও তেমন? তাড়াতাড়ি পুকুরে ডুব দিয়ে এসো।’

সুধীর বললে, ‘মামার বাড়ি বড়ো মজার কিল-চড় নাই৷'

সুধীরের বড়ো মামিমা বললেন, ‘খাবার রিডি।’

একখানা ঘরে ছেঁচে ঝুলছিল বাঁশ-আগালের আলনা। দুজনে গায়ের কামিজ-আলোয়ান খুলে তাতে ঝুলিয়ে রাখলে। ভোম্বল সেখানেই ঝুলিয়ে রেখেছিল তার পাটকরা আধময়লা ধুতিখানা। সে সেটা টেনে নিয়ে ছেঁচতলাতেই জুতো খুলে রেখে সুধীরকে বললে, ‘চল।’

সুধীর হাঁকলে, ‘সেজোমামি, তেল।’

সেজোমামি একটা ছোটো পেতলের বাতিতে খানিকটা সরষের তেল এনে রাখলেন বারান্দায়। দুজনে তা থেকে দু খাবলা তেল নিয়ে খিড়কির দিকে এগোতেই সেজোমামিমা বললেন, ‘এই, গামছা নিলি না?’

-‘ওহো। দাও’ - বলে সুধীর হাত বাড়াতেই তিনি একখানা শুকনো গামছা ছুড়ে দিলেন।

সুধীরের মা বললেন, ‘নাকে-কানে তেল দে। শীতকাল। গায়ে মাখ, মাথায় ঘষলেই হয়ে গেল?’

-‘ওঃ! তেলতার কী ঝাঁঝ। চোখ-নাক জ্বালা করছে - বলতে বলতে সুধীর গলায় গামছা জড়িয়ে - ভোম্বলের হাতে টান দিয়ে বললে, ‘চল-ওধারের পাড়ার কোলে পুকুরটা।’

খিড়কির পরই আমকাঁঠালের মস্ত একটা বাগান। তারপর পুকুরটা-মস্ত, যেন একটা দিঘি। চার পাড়ে নারকোল ও কয়েকটা তালগাছ। একদিকে একটা নিম ও একটা বেলগাছ। ওধারে দেখা যাচ্ছে, পাড়া ঘরবাড়ি, ঘেঁষাঘেঁষি, এদিকে-সেদিকে গাছ-গাছালি, ধানের মরাই, জাবনা দেবার বাঁধা গামলা, কয়েকটা ছাগল ও তাদের ছানা চরছে, একটা গোরু ঘাস খাচ্ছে, একটা বাছুর লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। বাঁধা ঘাটে ছেলে মেয়ে পুরুষ স্নান করছে। কিন্তু কনকনে শীতের বাতাসে, ঠাণ্ডা জলে কয়েকটা ডুব দিয়েই উঠে পালাচ্ছে।

ইচ্ছে থাকলেও ভোম্বলেরাও বেশিক্ষণ জলে থাকতে পারলে না, একটু সাঁতার কেটে, কয়েকটা ডুব দিয়েই কানায় উঠে রোদে দাঁড়িয়ে দুজনেই একই গামছায় গা-মাথা মুছল। ভোম্বল শুকনো কাপড়খানা পরে অপর মুড়ো গায়ে জড়িয়ে ভিজে কাপড়খানা কাচতেরনীচে নামতেই ‘আমি চললাম, তুই আয়’ বলে সুধীর বাড়ির দিকে দিলে ছুট।

উঠোনে উত্তর দিকে ততক্ষণে ছেঁচের একটু ছায়া পড়েছে। ভোম্বল এসে ভিজে ধুতিখানা বেড়ায় রোদে টান করে মেলে দিয়ে মাথার লম্বা চুলগুলো হাত দিয়ে এধার ওধার নামিয়ে দিলে। সুধীর চিরুনি দিতে চাইলেও নিলে না।

সুধীর জিজ্ঞেস করলে, ‘মা কই?’

সেজোমামি জবাব দিলেন, ‘তিনি বুলিকে পাকের ঘরে খাওয়াচ্ছেন। তোমাদেরও পিঁড়ে পাতা হয়েছে।’

-‘কোথায়?’

-‘বড়ো ঠাকুরের আর তোমার পাকের ঘরে। তোমার বন্ধুর ওই যে বারান্দনার কোণে।’

সুধীর বললে, ‘আমিও ওর পাশে বসব।’

বড়োমামিমা বললেন, ‘তোমার পৈতে হয়েছে না?’

-‘তাতে কী? অতিথি নারায়ণ।’

-‘সে বামুন অতিথি।’

-‘ও মা-?’

সুধীরের মা ঘরের ভেতর থেকে ভারী গলায় বললেন, ‘কেন?’

-‘তুমি বলো না!’

সুধীরের মা নিরুত্তর।

যাকে নিয়ে এই ঘটনা তার আত্মমর্যাদা তখন উগ্র হয়েছে যে, ভাবছে তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে চলে যায়। সে ক্ষুধা ভুলে গেল। বাঁশের আলনা থেকে কামিজটা পেড়ে গায়ে দিয়ে আলোয়ানখানা জড়িয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

বড়োমামা তখন তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘জায়গায় গিয়ে বোসো হে ছোকরা। অনেক বেলা হল।’ বলতে বলতে বারান্দায় উঠে দরজার পাশে খড়ম জোড়া রেখে ঘরে ঢুকে গেলেন।

ভোম্বলের পিঁড়ের সামনে কলাপাতা, পাশে মাটির গেলাসে জল। সুধীরের সেজোমামি এসে বললেন, ‘জল ছিটিয়ে পাতাখানা ধুয়ে নাও। পাতায় অভ্যেস নেই বুঝি?’

ভোম্বল কি একটা জবাব দিলে। তার কানে এল বড়োমামা সুধীরকে বলছেন, ‘ব্রাহ্মণের ছেলে। পালনীয় বিধি মানতে এত অবহেলা কেন? আজকাল শহরে নানা ম্লেচ্ছাচার চলছে। আচমন করো।’


ভোম্বলকে সেজোমামিই কিছু তফাত থেকে আলগোছে অন্ন-ব্যঞ্জন পরিবেশন করতে লাগলেন। কিন্তু সে কি খেল। কতটা খেল সেদিকে খেয়ালই করলে না। সে পাতাখানা গোটাতে গোতাতেই সুধীরের মা তাঁর মেয়েটিকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এবং সামনে দিয়ে যেতে যেতে ভোম্বলকে ম্লান মুখে বললেন, ‘অত ভাত-তরকারি ফেললি রে বাবা? সারাদিন পেটে খিদে নিয়ে থাকবি।’

মামি বললেন, ‘পাতা-গেলাস খিড়কির বাইরে আস্তাকুড়ে ফেলে দিয়ে এসো। গোবরজল দিচ্ছি এঁটোটায় হাত বুলিয়ে দাও।’

ভোম্বল অন্ন-ব্যঞ্জনসমেত পাতা ও গেলাস তুলে খিড়কির দিকে চলল। যে কালো রঙের কুকুরটা উঠোনে রোদে শুয়েছিল, সে উঠে লেজ নাড়তে নাড়তে পাতার দিকে তাকাতে তাকাতে চলল। ভোম্বল ফিরে এসে এঁটো পাড়তে পাড়তে মনে মনে সংকল্প করলে, ‘বামুনবাড়িতে আর কখনও জল খাব না।’

তারপর হাত-মুখ ধুয়ে জুতো পরে বেড়ার গা থেকে আধ শুকনো ধুতিখানা তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

খানিক পরে সুধীর খেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসে তাকে এদিক-ওদিক খুঁজলে। কিন্তু কোথাও দেখতে পেল না। ম্লান মুখে শূন্যপথের দিকে তাকিয়ে সমস্ত ঘটনা অসহায়ের মতো ভাবতে লাগল।

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%