খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ভোম্বল পাড়ে উঠে গেল। সেদিন ছিল হাটবার। বাজারেরই একধারে হাট বসে। কিন্তু ততক্ষণে হাট ভেঙে গেছে। তবুও দু চারধানি দোকানে আলো জ্বলছে-হারিকেন, কাচের চৌকো লণ্ঠনের মধ্যে মোমবাতি বা কেরোসিনের কুপী। দু-একখানি দোকানে মালপত্র গোছানো হচ্ছে, তবিল গোনা হচ্ছে , দু-একখানির ঝাঁপ বন্ধ হচ্ছে । দুটি-চারটি খদ্দের তখনও এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছে বা সওদা মাথায় রওনা হয়েছে।
ভোম্বলের ইচ্ছা বাজারটা একবার বেড়িয়ে যায়। সারাদিন নৌকোয় বসে ডাঙার জন্যে তার মন ছটফট ও উসখুস্ করছিল। কিন্তু বাজারের যা ‘ছিরি’! ছেঁড়া কলাপাতা, খড়, জল, পচা তরি-তরকারি, ছেঁড়া তেজপাতা ও পানের বোঁটায় একেবারে বিপথ হয়ে আছে। ভোম্বল তার ওপর দিয়েই চলল।
এক জায়গায় খানকতক গোরুর গাড়ি ছিল। খানিক দূরে বলদগুলো ছিল কয়েকটা খোঁটায় বাঁধা। তারা শুয়ে শুয়ে জাবর কাটছে। আর, গাড়োয়ানেরা আমগাছের তলায় ইটের উনুন জ্বেলে রান্না চড়িয়েচে। তাদেরই মধ্যে একজন গলা ছেড়ে গান ধরেছে—
“ও—কি কোরবে তার মনকুমীরে এ এ”
একজন নিশ্বাস ফেলে বলে উঠল—“মা—লে—ক!”
আগুনের কম্পিত আলোয় লোকগুলোর ছায়া এক একবার দুলচে, এক একবার মিলিয়ে যাচ্ছে। দূরে নদীর ধারে মাঠে একপাল শিয়াল ডেকে উঠল। তাদের স্বর নকল করে ডেকে উঠল কয়েকটা বাজারে কুকুর। শিয়ালগুলো থামল তো তারা থামে না।
ভোম্বলের বাঁ ধারে দু’সারি ছোট ছোট টিনের চালা। চালাগুলোতে দোকান বসে। চালাগুলোর মাঝ দিয়ে খানিকটা গিয়েই সে দেখতে পেল, একটি গাছতলায় একখানি মিঠাইয়ের দোকান। দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসে আছেন মুহুরিমশাই। মাটিতে হারিকেনটি রেখে তাঁর পিছনে লাঠিহাতে দাঁড়িয়ে আছে সুচি। ভেতরে একজন কারিগর একখানি বড় বারকোশে ময়দা মাখছিল। উনুনে খুব বড় একখানি কড়া চাপানো। কড়া থেকে ধোঁয়া উঠচে, গরম রসে ছানা-সিদ্ধর গন্ধ ভেসে আসচে। কড়ার সামনে একখানি জলচৌকিতে ভুড়িওয়ালা একটি লোক কড়ার ভিতরটা ঝাঁঝরি দিয়ে মাঝে মাঝে নাড়চে। লোকটির গায়ের রঙ কালো, সারা বুক কালো লোমে ভরা, মুখে প্রকাণ্ড গোঁফ, মাথায় লম্বা চুল তেলে চক্চক্ করছে-পরনে গামছা। সে বড় বড় চোখ তুলে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। ও-ই বোধ হয় লক্ষ্মীময়রা!
ভোম্বল বুঝলে, লুচির যোগাড় হচ্ছে । ডানদিক থেকে খোলকরতালের শব্দ ও কতকগুলো লোকের কীর্তনের সুরে চিৎকার ভেসে আসছিল। ওদিকে বোধ হয় কোন বাউলের আখড়া। সে আর না এগিয়ে নৌকোয় ফিরে চলল। ততক্ষণে হাট-বাজার ও ঘাট আরও শান্ত ও নির্জন হয়ে এসেছে। ওপার থেকে কাঁসর-ঘণ্টার অস্পষ্ট আওয়াজ ভেসে আসছিল।
জ্যোৎস্নায় যেন সব ভিজে গলে ঝকঝক করছে। টিনের চালে চিকচিক করছে শিশির।
ভোম্বল নদীর ধারে গিয়ে দেখে, কয়েক জায়গায় মাঝিরা রান্না চড়িয়েচে। পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ আসছে। একখানি নৌকোর সামনে পাটাতনে বসে চারটি লোক ভাত খাচ্ছে। একটা বড় গামলা ঘিরে বসে তারা চারদিক থেকে ভাত তুলে খাচ্ছে। ভাতগুলো বোধ হয় ডাল বা ঝোল দিয়ে মাথা। আর কোনও তরকারি নেই। তাদের পাশে একটি উঁচু জায়গায় জ্বলছে হারিকেন।
সে নিচে নামতে নামতে দেখলে, ফজর কানে হাত দিয়ে বেশ গলা ছেড়ে গাইছে—“এ দুনিয়া বড় কটিন টাই, ও ভাই—”
ভোম্বল ভাবতে লাগল। যত জায়গায় গান শুনেছে, সবই কি কান্নার সুর? ওদের কারো মনে কি আনন্দ নেই? কেন?
তাদের নৌকোখানা ছিল সকলের শেষে বাঁধা।সে লগি ধরে গলুইয়ে পা রাখতেই নৌকো দুলে উঠল আর ছইয়ের ভেতর থেকে মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী সভয়ে বললেন, “কে? কে?”
ভোম্বল, “আমি ভোম্বল” বলে পা থেকে কাদামাথা জুতো জোড়া খুলতে লাগল।
মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী ডাকলেন— বললেন, “ভেতরে এসে বসো। আমরা একলা আছি।”
ভোম্বল যেতে যেতে বললে, “ভয় কিসের?” এবং তাঁর সামনে গিয়ে বসল। মালতী তাঁর কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিল।
মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, “ওঁদের সঙ্গে দেখা হয়েছে? আচ্ছা, বাবা, তুমি এত চঞ্চল কেন? কিন্তু তোমাকেই বা কি বলব? এই আমার মালতীও তোমার মতো ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। কত বকি, কত বলি, কিছুতেই শোনে না। আচ্ছা, তুমি আমাদের বাড়িতে দু’দিন থেকে, তারপর যেও। কেমন?– উত্তর দিচ্ছ না যে? কাকা-কাকিমা বকবেন?” বলে তিনি পানের ডাবরটি নিয়ে পান সাজতে লাগলেন। একটি পানকে মুড়ে বোঁটা ধরে চিরতে চিরতে বললেন, “তুমি পান খাও? খাও না ? মালতী কিন্তু পানের ভারী ভক্ত। তুমি কী খেতে ভালোবাস?”
ভোম্বল চুপ করে রইল।
“বলতে লজ্জা করছে?” বলে তিনি একটু হাসলেন। তারপরই একটি নিশ্বাস ফেললেন এবং মুখের দিকে সস্নেহে তাকালেন।
ভোম্বল পিছন ফিরে দেখলে ঘাটের ওপর থেকে একটি আলো নেমে আসচে। “লুচিরা আসচে” বলে সে বাইরে এসে দাঁড়াল।
একটু পরেই মুহুরিমশাইরা এসে নৌকোয় উঠলেন। সুচির হাতে কলাপাতার মস্ত ভার।
মাঝিরা গোল হয়ে খেতে বসেছিল। মুহুরিমশাই যা এনেছিলেন, তাঁরা সকলে তাই খেলেন, খেল না মালতী। তাকে ঘুম থেকে তোলাই গেল না।
ক্রমে বাজারের আলো নিভে গেল। মাঝিরা কেউ গেল হাটের চালায় শুতে, কেউ শুয়ে পড়ল সামনের পাটাতনে। ভোম্বলরা শুয়ে পড়ল ভেতরে। সুচিও শুল সেখানে।
নদীর ধারে দূরে শিয়াল ডেকে উঠল। ওপার থেকেও শিয়ালের অস্পষ্ট ডাক ভেসে এল। নদীতে ঝপাৎ করে একটা শব্দ হল। হুস্ করে শুশুক ভেসে উঠলI জ্যোৎস্নায় নদীর জলকে মনে হচ্ছে ,গলা-রুপালীর স্রোতছোট ছোট ঢেউ তুলে বয়ে চলেছে। ডাঙায় ঝিঁ ঝিঁ ও ব্যাঙ ডাকচে। তীরে গাছের ডালে একটা পাখি ডানা ঝট্পট্ করে উঠল। কূলে ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ উঠচে। নৌকো একটু দুলচে। সেই দোলায় ভোম্বলের চোখে তন্দ্রা নেমে আসছে। কিন্তু যে মশা! যেমনি কানের কাছে পোঁ করে ওঠে অমনি তার তন্দ্রা ছুটে যায়। মশার জ্বালায় সে উসখুস্ করতে লাগল। আর সবাই দিব্যি ঘুমোচ্ছে। সে শেষে কোঁচা-কাছা খুলে তাই দিয়ে মুখ ও পা ঢেকে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ল।
ভোরের দিকে শিরশিরে বাতাসে ভোম্বলের ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু চোখ মেলতে বা উঠতে ইচ্ছা হল না। আধ ঘুমঘোরে সে পড়ে রইল।
একটু পরে একটা কাক ডেকে উঠল। ভোম্বল চোখ মেলে দেখলে, বাইরে-একটু ফর্সা হয়ে এসেছে। মালতী ততক্ষণে উঠে বসেচে। ভোম্বলও উঠে বসল। মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রীও উঠে বসলেন। মাঝিরা ও সুচি কখন যেন উঠে নৌকো থেকে নেমে গেছে। কিন্তু মুহুরিমশাই তখনও নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন। ভোম্বল পিছনের গোলুই দিয়ে ছইয়ের ওপর উঠে বসে চারধার দেখে নিলে।
চাঁদ কখন অস্ত গেছে। তখনও আকাশে দুটো একটা তারা দেখা ষাচ্ছে। নদী চলেছে বিরামহীন। একখানি ডিঙি ভাঁটিতে ভেসে চলেছে; একটি কাক উড়ে চলেছে পারের দিকে, দূরে একটা গাংচিল ডেকে উঠল; একটা বক উড়ে এসে বসল কূলে; একটা কাছিম জল থেকে মুখ বাড়িয়ে যেন ভোম্বলকেই ছইয়ের ওপর দেখে তৎক্ষণাৎ ডুব দিলে। পাশের নৌকোয় কে হাই তুললে, ঘাটের ওপর টিনের ঝাঁপ তোলার শব্দ হল। আর তাদের নৌকোর ছইয়ের তলায় একটি মেয়ে ডাকল, “মা—”
তারপর মা মেয়ের কথাবার্তা শুরু হল। কিন্তু ভোম্বল তাদের ও একটি কথাও বুঝতে পারলে না—বুঝতেও চাইলে না। সে নৌকো থেকে নেমে পাড়ের নিচ দিয়ে সাবধানে এগিয়ে চলল।
সে যখন ফিরে এল তখন ওপারের গাছের সারির মাথা সোনালী আলোয় ঝিক্মিক্ করছে। নৌকোও ছেড়ে দিলে। মুহুরিমশাইয়ের বাড়ি সেখান থেকে উজানে আরও একবেলার পথ। বাতাস নেই। দাড়িরা পাড়ের কোল দিয়ে গুণ টেনে চলল। ভোম্বল আর ছইয়ের নিচে গেল না, ওপরেই বসে রইল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন