খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ভোম্বল ভদ্রলোকটির পিছন পিছন যায়, এদিক-ওদিক তাকায়, লক্ষ্য করে—
লক্ষ্য করে, বাড়িখানি কাঁচা-পাকা; আর, আধপাকা—মানে দেওয়ালমেঝে পাকা, খান দুই ঘরের চালে টালিখোলা; আবার, একখানিতে চাটাইয়ের বেড়া, টিনের চাল, মেঝে পাকা। একখানি কাঁচা —চালে খড়ের ছাউনি। বা’রবাড়ির আঙিনার ডান ধারে মস্ত কামিনী ও করবী গাছ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। বাঁ পাশে একটা ঝুমকো জবার ঝাঁকড়া গাছ- যেন ডাল-পাতার সবুজ ছাতা। রোদে কয়েকটা ফুল নেতিয়ে পড়েছে। গাছটা থেকে খানিক তফাতে এক জোড়া তালগাছ। তার কতকগুলো ডেগোর পাতার আগায় বাবুই বাসা। শীতের টানা বাতাসে বাসাগুলো দুলছে। একটা বাসা থেকে একটা বাবুই পাখি মুখ বার করছে। একটা বোতল-মুখো বাসা থেকে একটা বাবুই উড়ে গেল। ভোম্বলের ভারি মজা লাগলো।
ভেতরবাড়ির উঠোনে পা দিতেই যেন একটা মেয়েলি গলা বলে উঠল, ‘তুই কে রে, অ্যাঁ? তুই কে রে, অ্যাঁ?’
ভদ্রলোকটি জাবব দিলেন, ‘অতিথি?’
তবু প্রশ্নের শেষ হল না। আবার জিজ্ঞেস করলে, ‘তুই কে রে, অ্যাঁ?’
ভদ্রলোকটি আর জবাব না দিয়ে ভোম্বলকে নিয়ে বাঁয়ের ঘরখানির বারান্দায় উঠতে যেতেই ভোম্বলের চোখে পড়ল, মস্ত পেতলের খাঁচায় বেশ বড়ো একটি পাখি গলার রোঁ ফুলিয়ে ঘাড় বেকিয়ে, চোখ পাকিয়ে শব্দ করলে, ‘কটরর।’ বোধ হয়, ভোম্বলকে দেখে ওর রাগ হয়েছে। তার পরই দাঁড়ে এদিকে-ওদিকে ঘুরতে লাগল।
ভোম্বল পাখিটাকে চিনতে পারলে না। একবার ভাবলে টিয়া, আবার ভাবলে, চন্দনা। কিন্তু এত বড়ো বাড়ি, এমন ফাঁকা কেন?
হঠাৎ তার কানে এল কাশির শব্দ। সে ফিরে দ্যাখে, ভিজে কাপড়ে কাঁখে এক কলসি জল নিয়ে অন্য দিক দিয়ে বাড়ি ঢুকলে মাঝবয়সি, দোহারা গড়ন, আধ ফরসা একটি স্ত্রীলোক। তাঁর দুহাতে মাত্র দুগাছি মোটা মোটা লাল-সাদা শাঁখা ও বাঁ হাতে তার পাশে একগাছি লোহা। তিনি উঠোনে দাঁড়িয়েই কাঁখের জলভরা কলসিটা ঘরের বারান্দায় রেখেই মাথায় কাপড় খুলে ফেললেন। ভোম্বল দেখলে, তাঁর মাথাভরা কাচা-পাকা চুলের রাশ থেকে তখনও জল পড়ছে। ভোম্বলদের দিকে না তাকিয়ে গায়ে শাড়ির ওপর ভিজে গামছাখানা খুলে নিংড়ে মাথায় দিয়ে চুলে পেঁচিয়ে একদিকে শরীরটা বেঁকিয়ে তিনি চুলের জল নিংড়াতে লাগলেন।

ভদ্রলোকটি এবার বললেন, ‘এই অবেলায় পুকুরে স্নান—’
স্ত্রীলোকটি একটু শক্তভাবে জবাব দিলেন, “কুয়-পুকুরের রাজ্যে সোঁতার জল কোথায়? কথায় বলে, ‘গঙ্গা গঙ্গা জপ তুমি গঙ্গা মনে রয়। মা গঙ্গায় ডুবতে হলে পথ ভাঙতে হয়।’ আমার কি সে ভাগ্যি? সংসারের সিষ্টি কাজ সাঙ্গ করতেই বেলা ডুবু ডুবু -”
ভদ্রলোকটি তাঁর কথায় জবাব না দিয়ে ভোম্বলকে বললেন, ‘তোমার জামা-আলোয়ান খুলে ওই ছেলের বাঁশের আলনায় রাখো। সঙ্গে ওই পুঁটুলিটা কীসের?’
—‘জামা-কাপড়ের’ বলে ভোম্বল পুঁটুলিটা বাঁ হাতে নিরলেন এবার স্ত্রীলোকটি, ভোম্বলের মনে হল বাড়ির গিন্নি, তার দিকে ফিরে তাকিয়ে ভ্রূ একটু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও কে? কাদের ছেলে? এত বেলায়?’
ভদ্রলোকটি বললেন, ‘সব বলছি। উপস্থিত ওর স্নানাহারের দরকার। পথ থেকে ধরে এনেছি। একমুঠো হবে তো?’
গিন্নি বললেন, ‘সে ভাবনা তোমার কেন? এক মুঠো চাল ফুটিয়ে দিতে কতক্ষণ?’
—‘তা জানি। আবার এ জানি, মুখের ভাত পরকে ধরে দিতে নিজে করো একাদশী।’
—‘কোন পাপে একাদশী করতে যাব? তোমার মুখে বাধল না কথাটা?’
—‘ঘাট স্বীকার করছি।’
—‘একরত্তি একটা ছোঁড়া! না খেয়ে পথে পথে ঘুরছে। তাকে এক মুঠো ভাত দিতে হাত দুটো ঘুঁটো হবে? আমার শ্বশুরের ভিটেয় এমন কাণ্ড হয়েছে? না তা হতে দেব?’
ভোম্বল কেমন যেন হয়ে গেল। তাকে নিয়ে কর্তা-গিন্নির, ভদ্রলোকটি এ বাড়ির কর্তা না হয়ে যান না, এমন কথা কাটাকাটিতে, সে এতখানি অপ্রস্তুত হল যে, তার সেখান থেকে ছুটে পালাতে ইচ্ছা করল। সে তো নিজে থেকে আসতে চায়নি। সে কারো বাড়িতেই যেতে চায় না। পথই তার আপন। পথই তার আশ্রয়। পথই তাকে লক্ষে পৌঁছে দেবে। আর, পথ চলার শক্তি জোগাবে তার উদ্যমভরা মন।

কিন্তু সে বুঝতেই পারল না যে সেই মানুষ দুটি তার মতো এক ক্ষুধার্ত ঘড়ছাড়া কিশোরের প্রতি স্বাভাবিক স্নেহবশেই নিজেরা না খেয়েও সেই দুপুরে তাকে খাওয়াবেন এটা তারই প্রতিযোগিতা। তাঁদের ঘরে যে অন্নের অভাব তা নয়। বাড়ির কর্তা গিন্নিকে আবার রাঁধবার কষ্ট দিতে চান না। গিন্নিও কর্তাকে অতিথির জন্য অভুক্ত থাকতে দেবেন না। শেষে তাঁর জিত হল। বললেন, ‘আমি কাপড় বদলে ওর হাতে তেল দিচ্ছি। ও গায়ে-মাথায় দিয়ে কুয়োতলা থেকে নেয়ে আসুক—পুকুরে যেন না যায়। হয়তো সাঁতার জানে না। আমি উনুন জ্বেলে আলু-বেগুন দিয়ে এক মুঠো চড়িয়ে দিচ্ছি। নেয়ে আসতে আসতেই আমার বোকনো নামবে।’
গিন্নীর চুল ঝাড়া আর হল না। ভিজে কাপড়ে সপসপ করতে করতে ঘরে ঢুকে গেলেন। একটু পরেই একখানি লাল পেড়ে ধোয়া শাড়ি পরে, এলোচুলের আগায় গিঁট বেঁধে ঘর থেকে বেরিয়ে সেই কাঁচা ঘরখানিতে উঠে গিয়ে এক শিশি সরষের তেল হাতে বারান্দায় বেরিয়ে ভোম্বলকে ডাকলে, ‘ইদিকে এসো।’
ভোম্বল তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বললেন, ‘হাত পাতো। আগে বেশ করে মাথায় ঘষো। হ্যাঁ। ধরো, এবার গায়ে মাখো, হাতে-পায়ে দাও। গা দিয়ে যেন খড়ি ঊঠছে। তোমার মা তোমায় দ্যাখে না? লাউডগার মতো শরীরটা! যত্ন করতে হয়। পরনের কাপড়খানা ছেড়ে এই গামছা পরে নেয়ে এসো।’
ভোম্বলের মুখে ম্লান হাসি মাখিয়ে গেল। সে আস্তে আস্তে বললেন, ‘আমার সঙ্গে কাপড় আছে।’
শুনে গিন্নী কিছু অবাক হলেন; একটু থেমে বললেন, ‘ওই ডান ধারে এগিয়ে গেলেই কুয়োতলা। দড়ি-বালতি আছে। জল তুলতে পারবে? না থাক, হয়তো অভ্যাস নেই। নীচু পাড়।’ তারপর কর্তার উদ্দেশ্য গলা চড়িয়ে বললেন, ‘তুমি পুকুরে যাচ্ছ, একেও নিয়ে যাও।’
এমন সময়ে বাড়ি ঢুকল একটি সতেরো-আঠারো বছরের ঢ্যাঙা, কালো ছেলে। তার পরনে হাঁটুসমান ধুতি, গায়ে আধময়লা কামিজ, মাথায় একটা একটা মুখবাঁধা নাগরী, বোধ হয় গুড়ের। সে নাগরীটা বারান্দায় নামিয়ে মাথার বিড়েটা খুলতেই ভোম্বল দেখলে, সেটি একখানি আধ ময়লা গামছা।
গিন্নি বললেন, ‘কি রে! এত বেলা করলি?’
ছেলেটি বললেন, ‘পত্তনির হাট কি এখেনে? যেতে-আসতে সাড়ে তিন ক্রোশ। দোকান ছিল পুরোনো গুড়। গাঁ থেকে গুড়ের গাড়ি এল - তবে না নিলেম।’
ছেলেটি ভোম্বলের দিকে আড়চোখে কয়েকবার তাকাল; ভাব যেন এই, এ আবার কে?
ভোম্বল আন্দাজ করে নিলে, ছেলেটা এ-বাড়ির চাকর। তার সঙ্গে আলাপ করতেই ইচ্ছা হল। কিন্তু কর্তা ডাকলেন, ‘ভূপেন এসো।’
ভোম্বল খিড়কি-পথে তাঁর পিছন যেতে যেতে দেখল, চার ধারে গাছ-গাছালির জঙ্গল। তার মধ্যে এক জায়গায় একটা পোড়ো মন্দির - গায়ে-মাথায় লতা জড়ানো, হাঁ করে খাড়া হয়ে আছে। তার চূড়ায় একটা অশ্বত্থ গাছ।
কর্তা বললে, “ওই মন্দিরটার বয়স আড়াইশো বছর। ওই দেখা যায় পুকুর। পুকুরটার মালিক এখন আমাদের গাঁয়ের সবাই। ওই যে কথায় বলে, ‘ভাগের মা গঙ্গা পায় না?’ ওর দশাও তাই। মন্দিরটা সাপের বাসা। গত বছর এক বেদে ওখান থেকে এক জোড়া খয়ে-গোখরো ধরে নিয়ে গেছে। লোকটা বলেছিল, ওখানে আরও সাপ আছে। আবার আসবে। কিন্ত আর আসেনি। সাপের ওঝা সাপে মরে। হয়তো মরেই গেছে। কি খেলা দেখাতে দেখাতে দূর দেশে গিয়ে পড়েছে। ওই দ্যাখো পুকুরটা কুচিপানায় ছেয়ে গেছে।”
ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, ‘মাছ নেই?’
—“মাছ ছাড়লে তো মাছ হবে? হয়তো কিছু শোল-ল্যাঠা-কাঁকড়া আছে। তুমি পুকুরে নেমে কখনো স্নান করেছো?”
ভোম্বল বললে, ‘আমাদের বাড়ির কোলেই নদী। আমরা নদীতেই স্নান করি, সাঁতার কাটি।’
‘বটে! তবে তো তুমি সাতারু।’
ভোম্বল খুশি হল। সে দেখলে, পুকুরটার একটা দিক প্রায় মজে এসেছে; চারধারেই নারকোল গাছ। তবে সবগুলো খাড়া নয়; কয়েকটা জলের দিকে ঝুঁকে আছে। একদিকে মস্ত মস্ত কয়েকটা শিরীষ গাছ। আর এক দিকে একটা বুড়ো সজনে গাছ, গুঁড়ি মোটা, মাথা ভাঙা তার তলার দিক থেকে একদিকেওদিকে কয়েকটা মোটা মোটা ডাল বেরিয়ে আছে। সজনে ফুলের দিন এল। ওর ফুল-ডাঁটা-পাতা নিয়ে হয়তো কখনো-কখনো দাঙ্গা বাধবে। কারণ, সবাই মালিক৷
ভোম্বল কর্তার পিছনে পিছনে ঘাটে এল। দেখলে, ঘাটের চাতাল, রানা বলতে কতকগুলো ভাঙা-আধভাঙা পায়ে পায়ে, জলে জলে ক্ষয়ে যাওয়া অতি পুরোনো ইট। ঘাটে তখন কেউ ছিল না। কেবল কিছু তফাতে এক ছাগী তার ছানাকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দুধ খাওয়াচ্ছে; ওপারে দাঁতছোলার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আস্তে আস্তে যাচ্ছে পেটমোটা সাদা রঙের একটা
গোরু, যেন হাটতে পারছে না। সমস্ত জায়গাটা গাছপালায় রোদের অভাবে, একটু অন্ধকার ও ঠাণ্ডা —গ্রীষ্মের দিনে আরামের, কিন্তু সেই শীতে কনকনে।
যা হোক, কর্তার সঙ্গে জলে নেমে দু হাতে পানা সরিয়ে সে কয়েকটা ডুব দিলে। কনকনে উত্তরে বাতাস, শরীরে কাঁপন ধরে গেল। শীতের বেলায় রৌদ্র মাখনো নদীর স্রোতের জলে তার কোনোদিন এমন হয়নি।
কর্তা বললেন, ‘এই নাও গামছা। গা রগড়ে, গা-মাথা মুছে তুমি উঠে এগোও। আমি যাচ্ছি পরে।’
ভোম্বল অনিচ্ছার সঙ্গে গামছাখানা নিয়ে গা না রগড়ে জলে দাঁড়িয়েই কোনও রকমে গা-মাথা মুছে কর্তাকে গামছা ফিরিয়ে দিয়ে ঘাটে উঠে কাপড়ের জল যথাসম্ভব নিংড়ে এগোতে লাগল। খিড়কিতে ঢোকবার প্রায় মুখে একটা ঝাঁকড়া আমগাছ। তার ডালে এক ঝাক শালিক বিষম ঝগড়া করছিল। হঠাৎ একজোড়া শালিক জড়াজড়ি করে গাছ থেকে ঘুরতে ঘুরতে পাকা ফলের মতো ভোম্বলের প্রায় সামনে পড়ল। একটা ছিল চিত হয়ে, অন্যটা তার বুকের উপর হুমড়ি খেয়ে বসে ঘাড় বেঁকিয়ে শালিকী সুরে যেন বললে, ‘এবার? এবার? টুঁটি ছিঁড়ি? টুঁটি ছিঁড়ি?’
আর নীচেরটা যেন বলছে, ‘ছাড়-ছাড়-ছাড়।’
ভোম্বল একছুটে তাদের কাছে গিয়ে পড়তেই বিজয়ী পাখিটা প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছেড়ে হুট করে উড়ে পালাল। পরাজিতটাও অমনি উঠেই হাওয়া। ভোম্বলের জানতে ইচ্ছা হল, পাখিদের রাগ কতক্ষণ থাকে? ওরা কি পরে পরস্পরকে আক্রমণ করবে না?
বাড়িতে ঢুকতেই সেই ছেলেটি তার পাশ দিয়ে পুকুরের দিকে চলে গেল। ভোম্বল কাপড় ছেড়ে জামা পরতে পরতে কর্তা এলেন। বললেন, ‘ভিজে কাপড়খানা নিংড়ে ওই দেয়ালের গায়ে হুকে বেঁধে রোদে মেলে দাও। আর —আচ্ছা পরে হবে।’
ভোম্বল কাপড়খানা রোদে মেলে দিয়ে এলে কর্তা নিজে চুল আঁচড়ে চিরুনিখানা গামছায় মুছে বললে, ‘চুল আঁচড়াও। এই নাও চিরুনি।’
সেই কাঁচা ঘরখানার ভেতর থেকে গিন্নি বললে, ‘আমারও বোকনো নামল।’ এবং বারান্দায় বেরিয়ে এসে ঝাড়ন দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে জল ছিটিয়ে দুখানি পিঁড়ে পাশাপাশি পেতে দিলেন। কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ে - একটু হলদে, পুরু। প্রত্যহ ব্যবহারে বেশ মোলায়েম। কর্তা ভোম্বলকে পাশে নিয়ে খেতে বসলেন। ভাত-তরকারি অত বেলায় সবই ঠাণ্ডা। কিন্তু ভোম্বলের পাতে সবই তপ্ত-ভাত, আলু-বেগুন সেদ্ধ ও একপলা গাওয়া ঘি। তার ওপর একটি কাঁচা লংকা। শীতে ঠাণ্ডা, গ্রীষ্মে গরম অন্নব্যঞ্জন খাওয়ায় সে অভ্যস্ত। তার ভাগ্যে সেদিন হঠাৎ ভালো হয়ে গেল। তবে এ নিয়ে সে কখনো মাথা ঘামায় না, রান্নার ভালোমন্দও বিচার করে না, চেয়েচিন্তেও নেয় না। কেবল খিদেটা শান্ত হলেই হল। তবে খাদ্যের ভালোমন্দ বিচার, পছন্দ-অপছন্দ এবং কোনও কোনওটায় লোভ তার আছে যেমন পুরু সর, চাপ দই, না বলে নিয়ে খেতে তার বাধে না। ওই জন্যে তার বাড়িতে একটু দুর্নামও।
যাহোক, খাওয়া-দাওয়া সেরে সে বাইরে রোদে এসে দাঁড়াল এবং পরে এক পা, দুপা করে পথের ধারে সেই আমগাছটার গোড়ায় এল। দেখলে, গাছের গুঁড়িতে একটা কাঠঠোকরা দুএকটা ঠোকর দিতে দিতে ওপর পানে উঠে যেতে যেতে হঠাৎ ক্যার ক্যার করে ডেকে একদিকে উড়ে গেল। কোথায় বসে যেন একটা দাঁড়কাক মোটা গলায় ডাকছিল ‘আহা কাহা।’
পথ দিয়ে একটি লোক খুব তাড়াতাড়ি বাইসাইকেল চালিয়ে চলে গেল। ভোম্বল রাস্তাটি ধরে এগিয়ে চললো। পথের দু-পাশে ঝোপ-ঝাড়, মাঝে মাঝে আম-কাঁঠাল গাছ, কাঁচা ঘর-বাড়ি। একখানি বাড়ির উঠোনে একটি লোক রোদে পিঠ দিয়ে বসে জাল-কাঠি দিয়ে জাল বুনছে; এক বৃদ্ধ পাটি বিছিয়ে দিব্যি শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে, কি ঘুমিয়েই পড়েছে। বাঁ ধার থেকে একটা পায়ে-চলা-কাঁচাপথ এসে সেখানটিতে মিশে গেছে ভোম্বল আর না এগিয়ে সেখান থেকে ফিরে চলল।
সে বাড়ি ফিরে এসে দ্যাখে সেই ছেলেটি মানে, ঝড়ু রোদভরা উঠোনের এক কোণে টাকুতে পাটের ফেঁসো পাকাচ্ছে। তার পাশে এক বোঝা চ্যালা কাঠ; তার পাশে একটা আধশুকনো আচিন-গুঁড়ি ও একখানা বেশ ধারাল কুড়ুল। ভোম্বল এগিয়ে গিয়ে কুড়ুলখানা তুলতেই ঝড়ু বললে, ‘রাখেন। পা কাটবে।’
ভোম্বল বললে, ‘আমিও কাটতে ফাড়তে জানি।’ বলেই কুড়ুল তুললে এবং সেই অবস্থায়ই বললে, ‘এইগুঁড়িটা চ্যালা করতে হবে? করব?’
—‘রাখেন-রাখেন। কাল চ্যালা করবেন।’
—‘কাল তো থাকব না।’
—‘কোথা যাবেন?’
—‘কর্তার সঙ্গে যাব টাটায়।’
ঝড়ু চুপ করে কী যেন ভাবলে।
ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, ‘এ গাঁয়ের নাম কী?’
—‘মালঞ্চ। আপনি কোন গাঁয়ে থাকেন? কর্তাবাবু আপনার কুটুম?’
এতগুলো প্রশ্নের জবাব ভোম্বল দিলে এক কথায়, —‘আমি এদের কেউই হই না।’
আবার প্রশ্ন, ‘তবে যে এ বাড়িতে?’
ভোম্বল বললে, ‘পথ দিয়ে যেতে যেতে ওই আমতলায় জিরোচ্ছিলাম। কর্তা আমায় টেনে এনেছেন? ওঁর নাম কী?’
—‘তৈলক্ষ্য। তা কোথায় যাচ্ছিলেন?’
—‘তৈলক্ষ্য না ত্রৈলোক্য?’
—‘সবাই বলে তৈলক্ষ্য। ওই নামটা তো কারো মুখে শুনি না।’
—‘কর্তার ছেলে টাটানগরে কাজ করে? তুমি গেছ সেখানে?’
—‘একবার গিয়েছিলাম।’
—‘কর্তা কাল-পরশু সেখানে যাবেন?’
—‘শুনিনি। যেতেও পারেন।’
ভোম্বল মনে মনে ভাবতে লাগল; ঝড়ু কুড়ুলখানা তার তার কাছ থেকে সরিয়ে এনে আবার টাকুতে পাটের ফেঁসো পাকাতে বসল।
ভোম্বলের কি মনে হল। সে বাড়ির ভেতরে গেল; দেখলে গিন্নি রোদভরা উঠোনে পাটি বিছিয়ে বসে চুল এলিয়ে চোখে চশমা দিয়ে বেশ মোটা ও বড়ো একখানা বই গুনগুন করে পড়ছেন। সে আর একটু কাছে যেতেই গিন্নি চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, ‘এইখানে বোস।’

ভোম্বল দেখলে, বইখানি ‘মহাভারত।’
তিনি যে জায়গাটি পড়ছেন, সেটি শান্তিপর্ব। বইখানা বেশ পুরানো। এ সব পর্ব তার ভালো লাগে না। না আছে যুদ্ধ, না আছে বীরপণা। সে গিন্নির প্রায় সামনে বসল।
গিন্নি বললেন, ‘এই কচি বয়সে ঘর ছেড়ে কোথায় যাচ্ছ, বাবা? সব শুনেছি। মা-বাপ নাই বা থাকল। যারা আছে তাদের আদর-যত্ন তো পাও? পাও না? ছেলে-মেয়েকে কে না শাসন করে? আমার কিন্তু মনে হয়, ছেলে-মেয়েকে যারা শাসন করে না, ছেলে-মেয়ের তারা শত্রু। আমার এক ছেলে, এক মেয়ে। কত শাসন করেছি। তবেই না মানুষ হয়েছে! তুমি কচি-বাচ্চা এসব বুঝবে না। আমি বলি, তুমি ঘরে ফিরে যাও। উনি চিঠি লিখে দেবেন। তোমার বাড়ির কেউ এসে তোমাকে নিয়ে যাবে। যে কটা দিন কেউ না আসে এখানেই থাকো। ছেলে-মেয়ে না থাকলে বাড়ি খাঁ খাঁ করে। আমার ছেলেটা পড়ে আছে বিদেশে। নাতিটার জন্যে মন কেমন করে। যে - কটা দিন এখানে থাকে, বাড়ি মাথায় করে রাখে। মেয়েটা থাকে কেষ্টনগর - শ্বশুরবাড়ি সেই জলঙ্গীর ধারে। তারও ছোটো ছোটো দুটো ছেলে-মেয়ে। পুজোয় তারা সবাই আসে। আনন্দের হাট বসে যায়। তোমার কটি খুড়তুতো ভাই বোন?’
ভোম্বল আস্তে আস্তে বললে, ‘এক বোন - আমার চেয়ে বড়ো। শ্বশুরবাড়ি থাকে।’
—‘বাড়িতে তুমিই সবেধন নীলমণি? বলে একটু হাসলেন।’
ভোম্বল বলতে যাচ্ছিল, ‘নীলমণি নয়, কিলমণি।’
কিন্তু সামনে নিয়ে খোলা বইখানার দিকে তাকিয়ে রইল।
তিনি বললেন, ‘তুমি তো বড়ো ইস্কুলে পড়ো । এই বইটা আমার পড়ে শোনাও দেখি। আচ্ছা থাক,
আমিই পড়ি, তুমি শোনো।’
ভোম্বল বললে, ‘ও পর্বটা আমার ভালো লাগে না।’
গিন্নি হাসলেন; বললেন, “মারামারি, কাটাকাটি, তির-ধনুক-গদা এ বয়সেরই বটে! যাও গাঁখানা দেখে এসো। বেশি দূরে যেয়ো না; পথ হারাবে। হারিয়ে গেলে লোককে বলো, ‘মিত্তির মশায়ের বাড়ি। ’এই পাড়াটার নাম, বুনোপাড়া। অনেক আগে নাকি এখানে ঘোর জঙ্গল ছিল। তার মধ্যেই কয়েক ঘর বুনো থাকত। তারা ছিল ডাকাত গোছের। পুকুরে যেতে যেতে যে পোড়ো মন্দিরটা দেখেছ, ওখানে নাকি কালীমূর্তি ছিল। লোকে বলত ‘ডাকাতে কালী।’
বুনোরা ‘ডাকাতে কালী’ পুজো করত, নরবলি দিত। এসব শোনা কথা। কেউ স্বচক্ষে সে মূর্তি দেখেনি, তবে দু-এক ঘর বুনোকে দেখেছে। তারা মুনিষ খাটত। ক্রমে লোকের বাস বাড়তে তারা সব কোথায় উঠে গেল। ওই যে ঝড়ুটা। ওটা একটা বুনোর ছেলে। তখন ওর বয়স দু-তিন বছর, আমার শ্বশুর বেঁচে ছিলেন। সেবার খুব ঝড় হয়েছিল। সেই ঝড়ে ওদের ঘর উড়ে যায়, ওর মা গাছ চাপা পড়ে মরে। ও বেঁচে যায়। ওর বাপ ছিল না। আমার শ্বশুর ওকে নিয়ে আসেন। সেই থেকে ছেলেটা এ বাড়িতে আছে। তিনি ওকে ‘ঝড়ু' বলে ডাকতেন। তাই ওর নাম হয়েছে ‘ঝড়ু’। ওর বাপ-মা কি বলে ডাকত, আমরাও জানি না, কলেতে পারেনা।”
ভোম্বল চুপ করে শুনে গেল। তারপর বাইরে এসে দেখে, ঝড়ু পাটের ফেঁসোর গোছটা গুছিয়ে রাখছে। সে জিজ্ঞেস করলে, ‘ওই পথটা কতদূর গেছে?’
ঝড়ু বললে, ‘কোন পথ? - ঐটে। গাঁয়ের শেষে সেই বিবিতলাতক। তারপর বড়ো রাস্তা। সেটা ধরে গেলে চূর্ণি পার হয়ে ওপারে এদিকে-ওদিকে ঘুরতে ঘুরতে মাথাভাঙাতক।’
—‘তুমি ওপথ ধরে কতদূর গেছ?’
—‘বেশি দূর নয়। মাথাভাঙার পাড় অবধি। নদীগুলো ছোটো। শুনেছি, আরও নদী আছে।’
সে আরও কি যেন বলতে যাচ্ছিল, কর্তাকে দেখে থেমে গেল৷
কর্তা বললেন, ‘ভুপেন তুমি শহুরে ছেলে। আমাদের গাঁ কেমন লাগছে? এ গাঁয়ে নদী-নালা নেই। তাই চাস-আবাদ কম। জায়গাটা ডাঙা। গাঁয়ের বাইরে খেতি-খোলা ফাঁকা ফাঁকা। কয়েকটা দিন থাকলেই দেখতে পেতে। তবে আম-কাঁঠাল গাছ অনেক। মাঘ-ফাগুনে আমের বোলের গন্ধে বাতাস ম ম করে। নদীর ধার বরাবর গেলে অবশ্য চাষ-আবাদ চোখে পড়বে। তোমার এসব ভালো লাগবে না।’
ভোম্বল বললে, ‘আমি গাঁ ঘুরতে যাচ্ছি।’
কর্তা সহাস্যে বললেন, ‘বসে গল্প করতে ভালো লাগে না?’
ভোম্বল কোনও জবাব না দিয়ে বেরিয়ে পড়ল আগের পথে। একটা সাদা রঙের কুকুর কোথা থেকে এসে তার গা শুঁকে পিছু নিলে। কুকুরটার গলায় দড়ি বাঁধা। কিন্ত সে বেশি দূরে গেল না, বাঁ দিকে একটা বাড়ির দিকে ছুটে চলে গেল। এ গাঁয়ের গাছপালাগুলোর তার অচেনা নয়। তাদের মধ্যে এক জায়গায় দেখলে, একটা নোড়ফলের মস্ত গাছ। আঁকাবাঁকা ডাল ছড়িয়ে বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। তার কাছেই হাতজোড় লতা বেড়াটাকে জড়িয়ে ধরে খানিক ঝুলছে।
আরও খানিক গিয়ে দেখলে, চার-পাঁচটা ছেলে চার-পাঁচ হাত বাঁখারির গলায় দড়ি বেঁধে বাঁখারির দুপাশে পা দিয়ে হাতে সরু খেজুর ডাল চাবুকের মতো উঁচিয়ে পাশাপাশি ছুটছে। আর বলছে, ‘সরে যাও-সরে যাও। ঘোড়া ছুটছে - টকাটক-টকাটক।’ তাদের মধ্যে একজন সকলের আগে আগে ছুটতে ছুটতে বলছে, ‘দুয়ো-দুয়ো।’
ডান দিক থেকে একটা কাঁচা পথ এসে সামনেই এক জায়গায় মিশেছে। ঘোড়সওয়ারের দল সে পথে ঢুকে বনজঙ্গলের আওতায় অদৃশ্য হয়ে গেল৷
ভোম্বলের মনে পড়ল, তারাও কখন কখন ওই রকম ঘোড়সওয়ার হয়ে দৌড়ের পাল্লা দিয়েছে। সে চলতে চলতে একখানা বাড়ির প্রায় উঠোনে ঘেঁষে যেতে লাগল। যেতে যেতে দ্যাখে এক আধবুড়ি রোদে বসে কাঁথা সেলাই করছে। তার কাছ থেকে খানিক তফাতে একটি স্ত্রীলোক আর একজনের মাথার উকুন বেছে দিচ্ছে। এদের সবার পরনেই ময়লা শাড়ি। একজন চিৎকার করে ডাকলে, ‘ফুলটুসি-ই-ই?’
উত্তর শোনা গেল, “ক্যানো-ও-ও?”
সেই গলাটি বললে, ‘কুলোর নংকাগুনো আউলে দিয়ে যা। ছায়া পড়েছে।’
ভোম্বলের মনে হল, সে যেন নতুন গাঁয়ে এসেছে। এরা যে ভাষায় কথা কইছে তার সঙ্গে তাদের ওদিককার ভাষার মিল নেই। এদিককার গাঁয়ের গাছপালাও কিছু পাতলা। কিন্তু এ সবও তার ভালো লাগছে।
চলতে চলতে সে গাঁয়ের শেষে এসে পড়ল। তার সামনে মাঠ ও খেত। ওই দেখা যায় উঁচু রাস্তা । হাঁ - হাঁ - রাস্তাই। ওই যে একসারি গোরুর গাড়ি চলছে, বিচালি বোঝাই; ওই চলছে বাইসাইকেল, ওই চলছে এক পাল গোরু, পিছনে দু-তিনজন রাখাল। আরে ওটা কী? কালো ধোঁয়া ওই যে দূরে, অনেক দূরে গাছপালার মাথায় দেখা যায়। নিশ্চয়ই ওখান দিয়ে রেলগাড়ি চলে। ওখানে রেলস্টেশন আছে। ও ধোঁয়া ইঞ্জিনের। গাড়িখানা নিশ্চয় স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। তার মন ছুটে গেল তার উদ্দেশ্যে৷ সে ফসলশূন্য মাঠের ধারে বসে সেদিক পানে তাকিয়ে রইল। মাঠে তখন কয়েকজন লাঙল দিচ্ছে —বোধ হয় চোতেলি বুনবে।
এদিকে সূর্য ঢলে পড়ছে। মাঠে পড়ছে গাছপালার লম্বা ছায়া। সে বাড়ি থেকে অনেকটা দূরেই এসে থাকবে। উঠে তাড়াতাড়ি ফিরে চলল। যখন বাড়ি এসে পৌঁছলো তখন দিনের শেষবেলার সোনালি আলো পশ্চিম আকাশের গায়ে। তার মাঝে একটি মাত্র তারা জ্বলজ্বল করছে।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর তার শোবার ব্যবস্থা হল বাইরের ঘরে, চৌকিতে। মেঝেয় ঝড়ু তার ‘শেজ-সিথেন' পেতে শুয়ে পড়ল। তারপর এক ঘুমে ভোম্বলের রাত কাবার হয়ে গেল এবং ঘুম ভাঙল কাকের ডাকে৷
আজ তার মনে ভারি আনন্দ টাটানগর যাওয়া হবে। বেলা যত বাড়ে তার মন তত অস্থির হয়৷ ঝড়ু কাজ-কর্ম করছে; কর্তা গেছেন ইছামতীর ধারে সেই সতুমণিগঞ্জের ডাকঘরে। দু-একদিন অন্তরই যান। না গেলে পাশের গ্রামে বটতলার হাটে গিয়ে তিন-চার দিন পরে চিঠি আনতে হয়। পিয়োন গাছতলায় চিঠি সাজিয়ে বসে। এইভাবে দুদিনের চিঠি হাতে আসে সাতদিন পরে।
যাহোক, কর্তা দুপুরে ফিরলেন, চিঠি নিয়ে। ভোম্বল শুনলে, তার ছেলে দশদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি আসছে। সুতরাং কর্তার আর যাওয়া হবে না। শুনেই ভোম্বলের সব আনন্দ ও উৎসাহ উবে গেল। তিনি ভোম্বলকে বললেন, ‘তোমার বাড়িতে চিঠি লিখে দিচ্ছি। কেউ এসে তোমাকে যেন নিয়ে যান। আচ্ছা, তারই বা দরকার কি? আমিই বরং তোমাকে কাল বেলা দশটার গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি। বাড়ি গিয়ে আমাদের ভুলে যেয়ো না, মাঝে মাঝে এসো। আর, আমার সেই চরমাদারিপুর কাছারির আত্মীয় টির সঙ্গে দেখা হলে আমাদের কথা বোলো। তোমাকে আমাদের খুব ভালো লেগেছে।’
ভোম্বল নীরবে সব কথা শুনে গেল। তার বুক থেকে —ছোটো একটি নিশ্বাস বেরিয়ে এল। তারপর থেকে সে আনমনে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াল। সন্ধ্যা হল, রাত এল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন