খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ভোম্বল যায় আর পিছন ফিরে তাকায়। এবার যদি কেউ তাকে তাড়া করে তাহলে সে আর ছুটতে পারবে না। অথচ ব্রজবাবুর এলাকা ছাড়িয়ে যাওয়া চাই।
কিন্তু জমিদারের পিয়াদা সব জায়গায় ঘোরে। এই রাস্তা ধরে কিছুদুর গিয়ে কোথাও বসে জিরোবে। ব্রজবাবু তাকে চিনলেও পিয়াদারা তো তাকে চেনে না। তবে একবার দিকটা ঠিক করে দেখা যাক্। তো তার সামনে সূর্য ঢলে পড়েছে। সে ঠিক পথেই যাচ্ছে।
পথের দু'ধারে ঘন বাঁশবন। বাতাসে বাঁশপাতাগুলো থরথর করে কাঁপছে, ওলট-পালট খাচ্ছে। বাঁশগাছগুলো গায়ে গায়ে ঢলে পড়ছে। আর শব্দ হচ্ছে—‘টাস টাস্।’
একটা চাষীর ছেলে হাট থেকে ফিরছিল। তার মাথায় সওদা। ভোম্বল তাকে জিজ্ঞেস করলে, “—এপথ কোথায় গেছে রে?”
ছেলেটা ভোম্বলের দিকে একবার আড়চোখে তাকালো। তার কথার কোনো জবাব দিলে না।
ভোম্বল আবার জিজ্ঞেস করলে, —“এই, পথটা কোন দিকে গেছে?”
ছেলেটা আস্তে আস্তে বললে,—“পুটিমারী।”
—“তোর বাড়ি কোথায়?”
ছেলেটা এবার চট করে পিছন ফিরে হাটের দিকে মুখ করে চিৎকার করে ডাকলো,—“ও আব্বা-আ—”

ভোম্বলের হাসি এলো। ছোঁড়াটা ভয় পেয়েছে। তাকে দেখাচ্ছে সত্যি যেন ওর বাবা পিছন পিছন আসছে। ভোম্বল বললে, —“ভয় কী রে? আমি পুঁটিমারী যাবো। এখান থেকে কদ্দুর বল না?”
ছেলেটা তার কথায় সাহস পাওয়া দূরে থাক, হাটের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল। ভোম্বলের ইচ্ছে হলো, বোকা ছোঁড়াটার গালে দেয় দুটো চড় বসিয়ে।
সেই সময় জনকয়েক লোক তাড়াতাড়ি হাটের দিকে আসছিল।
ভোম্বল তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলে—“পুঁটিমারী কতদূর গো?” লোকটা ঘাড় না ফিরিয়ে পিছন দিকে হাতটা একটু বেঁকিয়ে বললে,
—“এই ছামনে।”
—“সামনে কদ্দুর?”
“ঐ খাল-পার” বলতে বলতেই লোকটা চলে গেল।
কী বিপদ! গাঁয়ের মানুষ কিছুতেই দূরত্বের কথা ঠিক বলবে না। ওদের কাছে চারক্রোশ দূরের গাঁ-ও,—'ঐ যে!'
এদিকটায় পথের ধারে ধারে লোকের বসতি। কোথা থেকে যেন এসে ভোম্বলের সমুখ দিয়ে নাকে দড়ি গাঁথা একটা মোষ উটের মতো মুখ তুলে বড় বড় চোখ বার করে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে চলতে লাগলো। ভোম্বল মোষের ডাক নকল করতে পারে। সে একবার পিছন ফিরে তাকালো। সর্বনাশ! লাঠি হাতে বাবরি চুলো ঐ লোকটা ছুটে আসছে কে? পিয়াদা নাকি? সে এক দৌড়ে পথ থেকে একখানা বাড়ির ঘরের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালো।
ঘরধানা ঢেঁকি-শাল। গৃহস্থ-বউ তখন ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে। ঢেঁকির শব্দ হচ্ছে—ক্যাচোর ধপ্। ক্যাচোর ধপ। বউ বোধ হয় চিঁড়ে কুটছে।
ভোম্বল ঘরখানার বেড়ার পাশ থেকে একটা চোখ বা’র করে দেখলে, লোকটা ছুটতে ছুটতে মোষটার সামনে এসে তাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি দিতে দিতে তার পিঠে নির্দয়ভাবে লাঠি চালাতে লাগলো। মার খেয়ে মোষটা ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে হাটের দিকে ফিরলো। ভোম্বলের বুকটা হালকা হলো। লোকটা পিয়াদা নয়, গাড়োয়ান। গাড়োয়ান না হলে মোষটাকে অমন করে ঠ্যাঙায়?
সে আবার পথে উঠে চলতে লাগলো। বাঁশবনের শেষে ক্ষেত; বেশি বড় নয়। তার মধ্যে একটা খাল দেখা যাচ্ছে। খালের ওপারে একখানা গাঁ। গাঁ থেকে ঢোল-কাঁসির আওয়াজ ও সানাইয়ের সুর ভেসে আসছে, অল্প অল্প।
ভোম্বল খালের ধারে পৌঁছবার আগেই দেখলো, ও-পার থেকে একখানা ডুলি আসছে। ডুলিখানা সাদা কাপড়ে ঘেরা। ওর মধ্যে নিশ্চয় কোন বউ আছে। পুজো এলো। বউ বোধহয় বাপের বাড়ি যাচ্ছে! পুজোর সময়ে তার খুড়তুতো বোন রানী-দিদিও বাড়ি আসবে! রানী-দিদিও পাল্কিতে আসে। অনেক দূর থেকে বেহারাদের ‘হুম্ হুম, হো-ও; হুম, হুম, হো-ও' শোনা যায়! আর সেই সুর শুনে সকলে বাইরে এসে দাঁড়ায়। পালকি এসে বা’র-বাড়ির উঠোনে নামতেই দিদি দরজা খুলে তার মধ্য থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে।
রানী-দিদির ছেলে খোকনটা ভারী দুষ্টু। সকলে বলে—সে ভোম্বলমামার মতো দুষ্টু হয়েছে। ভোম্বল খোকনকে খুব ভালোবাসে। খোকনটা রোজ তার কালির দোয়াত উল্টে ফেলবে; ইংরেজী বইখানা তো ছিঁড়ে-কুটে তার একখান! পাতাও আস্ত রাখেনি। বই দেখলেই সেখানা তার চাই-ই। বই খুলে পা ছড়িয়ে বসে বলবে—'অ'। রানীদিদি বলে,—“কেড়ে নে না—একটা থাপ্পড় মার না।”
কিন্তু অতটুকু ছেলেকে কী মারা যায়? খোকনের জন্যে ভোম্বলের মন কেমন করে উঠলো, সে এসে তাকে এ-ঘর, ও-ঘর নিশ্চয় খুঁজবে। খুঁজুক—ভোম্বল অনেক দিন পরে তার জন্যে অনেক রকমের খেলনা নিয়ে যাবে।
ডুলিখানা ‘হু’ হু’ করতে করতে তার পাশ দিয়ে চলে গেল!
সরু খাল; অল্প জল। ভোম্বল স্বচ্ছন্দে পার হয়ে গেল। ও-পারে ঊঠে কিছুদূর গিয়েই ঢোল-কাঁসি ও সানাইয়ের আওয়াজ বেশ স্পষ্ট শুনতে পেল - ওরা যেন বলছে- দুম্বা ছাগল ঠ্যাং ঠ্যাং-উহু-হু-উ-উ।
এখন আবার কী রে বাপু? পুজোর তো এখনও চারদিন বাকী। কিন্তু এ কী? সে যে দক্ষিণ দিকে চলেছে। তা’হোক রাতখানা ঐখানে কোথাও কাটিয়ে সকালে পশ্চিমের পথ ধরবে।
সে গাঁয়ে ঢুকে খান কয়েক বাড়ি ছাড়িয়েই দেখে সামনে একখানা বাড়ির বাইরের উঠোনে মস্ত সামিয়ানা খাটানো। তার নিচে লোকজন চলা-ফেরা করছে; আর, তার এধারে আমতলায় চাটাইয়ে বসে ঢুলিরা বাজাচ্ছে। আর একটু এগোতেই গাওয়া ঘিয়ে লুচি ভাজার গন্ধ নাকে এলো। ভোম্বল একজনকে জিজ্ঞেস্ করলে,—“কী হচ্ছে গো?”
লোকটি সেখান থেকে খেয়ে ফিরছিল। তার বাঁহাতে পান ও এক গেলাস পানতুয়া; ডান হাত এঁটো—বাড়ি গিয়ে ধোবে; পেটা ভূষির বস্তার মতো। লোকটা বললে, —“রায়মশাইয়ের নাতির অন্নপেরাশন। যাও–যাও —ছেলেরা সব বসেছে—”
ভোম্বলের খাবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বিনা নিমন্ত্রণে সে কী করে খাবে? তবু সে এক পা এক পা করে এগিয়ে সামিয়ানার তলায় গিয়ে দাঁড়াতেই তার পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলেন, “আরে ছোঁড়া! তুই এখানে দাঁড়িয়ে কেন —যা-যা। আচ্ছা, চল আমার সঙ্গে—”
ভোম্বল ফিরে দেখে, মোটা-সোটা, ফর্সা, হাসি হাসি মুখ একজন লোক! তাঁর মাথায় মস্ত টাক—টাকটা চক্চক্ করছে— হাতে নতুন ডাবা-হুঁকো, পায়ে বোলে লাগানো খড়ম। তিনি বললেন,—“ওরে নয়হরি! এই ছেলেটিকে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দে। অন্নপ্রাশনে ছেলেদেরই পেট ভরে আগে খাওয়াতে হয়। কিন্তু তোমরা তো তা করছো না—“বলতে বলতে তিনি খট্ খট্ করে দু’পা এগিয়ে গেলেন।
নরহরি বললে,—“আজ্ঞে –হাঁ—এই যে—মানে সব এক সঙ্গে বসে গেল কিনা, তাই জায়গার একটু টান পড়লো।” চলো খোকা বলে নরহরি ভোম্বলের হাত ধরে নিয়ে চললো। যেতে যেতে একটা চাকরকে বললে,—“বেটা, শিগ্গির যা–কর্তার কলকে আগুন নেই-” চাকরটা ছুটলো। ভোম্বলের মনে হলো উনিই রায়মশাই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন