খগেন্দ্রনাথ মিত্র
কনসার্ট পুরোদমে বেজেই চলেছে। ঢোলক-বাজনদার ঢোলকের ওপর ঝুঁকে পড়ে দু'হাতে ঢোলক থাবড়াচ্ছে। তার চোখ-মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, লোকটা আর বাজাতে পারছে না, হাত দুখানা ভাঙোভাঙো। শ্রোতারাও সকলে বিরক্ত হয়ে উঠলো। প্রথমে বেশ চুপচাপ ছিল। কনসার্টের ঠেলায় সকলে হট্টগোল শুরু করে দিলে। তার ওপর ভ্যাপসা গরম ও বিড়ি-সিগরেটের ধোঁয়ায় অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। হঠাৎ কন্সার্ট থেমে গেল।
চারধারে চাপা গোলমাল। এইবার বোধ হয়, ‘প্লেয়াররা’ আসবে। ভোম্বল ‘প্লেয়ার’ আসবার পথের ভিড়ের দিকে তাকায়, যদি রাজার মুকুটের পালক কি তপস্বীর দাড়ি ও জটা দেখা যায়। একটা ছেলে বললে,“—ঐ যে নারদ আসছে।”
ছেলেরা সেদিকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে লাগলো। একজন জিজ্ঞেস করলে,—“কৈ রে?”
—“ঐ যে সাদা দাড়ি! মাথায় পাকাচুলের চুড়ো—”
—“যাঃ! ও তো নিতাইয়ের পিসে—উদ্ধব হালাদার।”
ছেলেরা খিল খিল করে হেসে উঠলো। তারপর ‘এই আসে, এই আসে’ করে প্রায় পাঁচ মিনিট কেটে গেল। আসরের দক্ষিণ দিকে ফরাস বেঞ্চির ওপর গাঁয়ের ভদ্রলোকেরা বসেছেন। এবার সাদা পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে রায়মশাই এসে তাদের মধ্যে বসলেন। আবার হুংকার দিয়ে কনসার্ট বেজে উঠলো। ভোম্বলের বাঁ ধারে কয়েকটা ধাড়ি ছেলে বসেছিল। তাদের একজন বললে, —“এইবার শুরু হবে।”
—“আর একজন জিজ্ঞেস করলে,—“কী করে বুঝলি?”
—“রায়মশাই এসে বসলেন যে।”
তার কথাই ঠিক হলো। এবার কনসার্ট আর বেশিক্ষণ বাজলো না। থামতে না থামতেই ভিড়ের মাঝ থেকে সার বেঁধে বেরিয়ে এলো। ‘প্লেয়াররা’—নারদ, বিষ্ণু, লক্ষ্মী আরও যেন কে—বোধহয় দৌবারিক।
তাদের দেখে গোলমাল আরও বেড়ে উঠলো। অধিকারী শশী বাগদী বসেছিল বেড়ার মধ্যে ভোম্বলের সামনে। সে পাশের একজনকে বললে,–“চিয়ার চেয়ে নাও, বিষ্ণু বসবে।”
লোকটা গুঁড়ি মেরে হাত কয়েক এগিয়ে গেল। তারপর তিন হাতপায়ে ভর দিয়ে ডান হাতখানা তুলে রায়মশাইয়ের সামনে দু-আঙুলে তুড়ি দিতে দিতে বললে,—“কর্তা, চিয়ার—”
অমনি একজন বাজখাই গলায় হেঁকে উঠলো,—“চেয়ার—এই, একখানা চেয়ার—বিষ্টু বসবে—”
অধিকারী বললে,—“আর লক্ষ্মী কী দাঁড়িয়ে থাকবে, বাবু?”
—“ওহে, দু'খানা—–দু'খানা চেয়ার।”
সকলের মাথার ওপর দিয়ে হাতে হাতে দুখানা চেয়ার চলে এলো। একখানায় বসবার জায়গায় ছিল বেতের ছাউনী। বিষ্ণু ও লক্ষ্মী বসলো। সঙ্গে সঙ্গে নারদ অ্যাকটিং আরম্ভ করলে। কিন্তু চারধারে গোলমালে কিছুই শোনা যায় না। কেবল দেখা যায়-নারদের একখানা হাত ও দাড়ি নড়ছে।
সেই বাজখাই গলাটি চিৎকার করে উঠলো,—“চুপ –চুপ –বড় গোল হচ্ছে—”
অমনি চারধার থেকে চিৎকার আরম্ভ হলো,—“চুপ,—চুপ,—বড় গোল হচ্ছে—!”
মিনিট দুই ধরে ধমক্কা-ধমকির পর গোলমাল থামলো। তবু নারদের গল৷ শোনা যায় না, কেবল দাড়ি নড়ে। গলাটা একেবারে বসে গেছে। সে ধরা গলায় বিষ্ণুকে বললে,—“প্রভো—”
একজন শ্রোতা সেই কোণের দিক থেকে বলে উঠলো, –“জোরে।” আর একজন এই কোণ থেকে বললে –“লাউডার, প্লীজ।”
অধিকারী বিরক্তির সঙ্গে নারদকে বললে,—“বেটাকে বারণ করলেম, দই খাস নে। তোর গলা ধরে গেছে। এখন সাঁ সাঁ করছে—” লক্ষ্মী বসেছিল বেতের ছাউনি দেওয়া চেয়ারে। সে মিনিট দুই বসেই উসখুস করতে লাগলো। একবার একখানা পা একটু চুলকে ফেললে। ভোম্বল বুঝলো, লক্ষ্মীকে ছারপোকা কামড়াচ্ছে। তখন নারদ পুরোদমে অ্যাকটিং করছে। লক্ষ্মীর স্থির হয়ে বসে থাকা দায় হলো। ছারপোকাগুলো কতকাল যে মানুষের রক্ত খায়নি! লক্ষ্মী বিষ্ণুর দিকে হেলে বললে, –“ছারপোকার কামড়ে পা দুখানা কাঁঠালের মতো হয়ে উঠলো যে! আর বসতে পারছি নে।”
বিষ্ণু বললে,—“উহুঁ হুঁ—বোসে থাক।”
ভোম্বল বসেছিল তাদের কাছেই। দু'জনে ফিস ফিস করে কথা বললেও তার কানে আসছিল সব। লক্ষ্মী বললে,—“তুই বসে দেখ, না, ঠেলা কেমন!”
—“তবে উঠে দাঁড়া।”
বিষ্ণু আর বলতে পারলে না। এবার তার ‘অ্যাকটিং’। লক্ষ্মী মুখ কুঁচকে কোন রকমে বসে রইলো। সে মাঝে মাঝে বিড় বিড় করে কী বকছে। ভোম্বলের ভারি মজা লাগছে। শেষে তার 'অ্যাকটিংয়ের পালা এলো। সে বসে বসেই দু'চার কথা বলে চট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর সকলে চলে গেল।
এবার আর এক ‘সিন'। 'প্লেয়ারদের’ আসা-যাওয়াব পথের দিকে ভোম্বল তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ভিড়ের একধারে ভয়ানক ধাক্কাধাকি শুরু হলো। চটাচট্ চড়-চাপড় চলছে। ভোম্বল শুনলে হাটের লোকেরা ফিরে এসেছে। তাদের মধ্যে আট-দশজন গোয়ালা আছে। তারা বসার জায়গা নিয়ে বাঁক হাতে ক্ষেপে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু রায়মশাইয়ের বাড়ি বলেই রক্ষা। বারোয়ারিতলা হলে এতক্ষণে সামিয়ানার আগুন ধরে যেতো। রায়মশাইয়ের লোকজনেরা সকলকে থামিয়ে দিলে।
সব চুপচাপ, অ্যাকটিং শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই পালাটা বেশ জমে উঠলো।

একটা 'সিন' এলো— 'রাজা কংসের কারাগার'। দেবকী ও বসুদেব বন্দী হয়ে পড়ে আছেন। তাঁদের বুকে মস্ত মস্ত দু'খানা কালো পাথর চাপানো। তাঁরা শুয়ে শুয়েই অ্যাকটিং করছেন। গলা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু তাঁদের দেখা যাচ্ছে না! দু’জনকে দেখবার জন্যে ভোম্বল ও আরও অনেকে হাঁটু গেড়ে বসে সারসের মতো গলা লম্বা করে দিলে। অমনি পিছনে যারা বসেছিল, তারা চিৎকার করে উঠলো,—‘বোসে পড়ো —বোসে পড়ো—ও।’
কিন্তু কে কা’র কথা শোনে? ঐ যে দেবকী আর বাসুদেব শুয়ে। তাঁদের বুকে কালো পাথর। ভাগ্যে ও দুটো সত্যিকারের পাথর নয়, বেহালার বাক্স। দেবকী আর বসুদেবের যা চেহারা! সত্যিকারের পাথর হলে, দুটিতে এতক্ষণে চিঁড়ের মতো চেপটে পড়ে থাকতেন। কংসের ওপর ভোম্বলের খুব রাগ হলো। কী শয়তান! কত ছেলেকে মেরে ফেলেছিল!
অধিকারী তামাক টানতে টানতে পাশের লোকটার পাঁজরে খোঁচা দিয়ে বললে, – “ও গণেশ, জুড়ী তোল—”
গণেশের ইসারায় বেজে উঠলো ‘কনসার্ট'; আর চারধার থেকে উকিল-মোকতারের মতো চোগা-চাপকান পরা জুড়ীর দল সরু-মোটা স্বরে গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে উঠে দাঁড়ালো। তাদের পিছু পিছু উঠলো একপাল কালো কালো, রোগা রোগা ছোঁড়া। ছোঁড়াগুলোর মাথায় কালো পাথরের খোরার মতো জরিদার টুপি, গায়ে সলমা-চুমকি বসানো, লাল-কালো সাটিনের ঢিলে জামা। জামাগুলোর হাতা লম্বা, আঙ্গুল ছাড়িয়ে ঝুলে পড়েছে। ছোঁড়াগুলো লম্বা হাতা ঝুলিয়ে গাইতে লাগলো—
‘ওরে রাজা কংস,
হবি রে নির্বংশ।
তোর যে কৃতান্ত
জন্মিল ধরায়—এ-এ-এ—'
গায়কদলের মাঝে চোগা-চাপকান পরা দু'জন বেহালাদার—লম্বা, রোগা, একমুখ গোঁফ, যেন দুটো পেশকার দাঁড়িয়ে বেহালায় ঘাড় কাৎ করে চোখ বুজে ছড় টানছে। আর বেহালা বাজছে— 'ক্যাঁ-কো, কোঁ-কোঁ—কংক; কোঁ-কোঁ, কোঁ-কোঁ—কংক—হুঁম্।
হঠাৎ বাইরে থেকে কে যেন বাজখাই গলায় চিৎকার করে উঠলো “ঝড় আসছে—ঝড় আসছে—সামাল সামাল!”
সঙ্গে সঙ্গে প্রকাও সামিয়ানাখানা ঝুলন্ত বাতিগুলো সমেত দড়ি-টানা: ছিঁড়ে আকাশে উড়ে যাবার মতো হলো। আলোগুলোর শিখা চিমনির মধ্যে প্রচুর ভুষো ছেড়ে নেচে উঠলো। আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ চমকালো; মেঘ ডাকলো, কড়, কড়, কড়া, যেন আকাশের দরজা খুলে ফেললো।
ঐ এলো—ঐ এলো। ঠাণ্ডা বাতাসের একটা দমকা এসে গায়ে লাগলো। সেই ভ্যাপসা গরমে ভোম্বলের ভারি আরাম বোধ হল।
দেখেতে দেখতে যাত্রার আসর ফাঁকা। সামিয়ানা হুম্ হাম, শব্দে লাফাচ্ছে, আলোগুলো গেছে নিভে। নামলো বৃষ্টি। ভোম্বল ততক্ষণে
রায়মশাইয়ের কাছারি-ঘরের বারান্দায় উঠে পড়েছে। রাতে সে ফরাশের একধারে একটু শোবার জায়গা পেল। ঘুমও হলো বেশ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন