খগেন্দ্রনাথ মিত্র
পরদিন—
তখন ঘরের চালে কাক ভাকছে, অনেকে ফরাসের ওপর উঠে বসেছে। কেউ কেউ শুয়ে শুয়েই হাই তুলতে তুলতে মুখে তুড়ি দিচ্ছে। ভোম্বল উঠে বসলো।
ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখে, সব পরিষ্কার, কিন্তু ভিজে ভিজে, সারা আকাশে কোদাল কোদাল মেঘ, যেন মাটি ফেলা। সে বেরিয়ে পড়লো।
আগের দিন যে পথে এসেছিল আজও সে পথ ধরে ফিরে চললো। গাঁয়ের শেষে পৌঁছতেই এক চাষীর সঙ্গে তার দেখা। ভোম্বল তাকে জিজ্ঞেস করলে :—“এ পথ দিয়ে রেল-রাস্তায় যাওয়া যাবে?”
চাষী বললে,—“রেলগাড়ি? ইদিকে রেলের গাড়ি কোথায়?”
—“তবে কোথায়?”
—“সেই শালুকভাঙায়। ইদিকে রেল-টেল চলে না।”
–“তবে কাল আমায় যে একজন বললে, এইদিকে রেল-রাস্তা আছে।”
—“ইদিকে? হাঁ — হাঁ। তা সে কান্তিনগরের ওধার দিয়ে। তুমি -যাবা কোথা?”
—“রেলরাস্তা—”
—“সেখানে কী আছে? সেই রেলের গাড়িতে চাপবা নাকি?”
ভোম্বল বললে, “হুঁ”
—“সিদিক দিয়ে তো কেবল মালের গাড়ি চলে। তুমি মালের গাড়ি চাপবা?” তারপর বললে—“ছোঁড়াটা কল্লা।”
ভোম্বল চুপ করে রইলো।
লোকটা বললে—“কার ছাওয়াল তুই? রাইমশাইয়ের বাড়ি এয়েছিলি বুঝি? যা ঘরে যা। কুটুমবাড়ি এয়েও কল্লামী? যা”
ভোম্বল দেখলে গতিক ভাল নয়। না গেলে হয়তো চাষার মার খেতে হবে। সে গাঁয়ে ফিরে গেল। তারপর গায়ের ওধারে গিয়ে দেখে, একটা পাকা সড়ক দক্ষিণ-পশ্চিমমুখো চলে গেছে, যেন একটি উচু বাঁধ। ওর সে-ই শেষে একখানা গাঁ দেখা যায় নীল ধোঁয়ার মতো। ওরই নাম বোধ হয় কান্তিনগর। সড়ক ধরে তখন সার বেঁধে খান চারেক গরুর গাড়ি চলেছিল। গাড়িগুলো পাট বোঝাই।
একখানা গাড়ির গাঠের ওপর জন দুই লোক বসে আছে। তাদের একজন কানে হাত দিয়ে গলা ছেড়ে গান ধরেছে—“সু—উখের কথা— আ—আর বোলো—না—আ-আ—”
ভোম্বল গাড়িগুলোর পিছন পিছন চললো। সেও যদি একখানা গাড়ির গাঠের মাথায় চড়ে বসতে পারতো! কিন্তু গাড়িগুলো আধক্রোশটাক পথ ভেঙেই পুবের সড়ক ধরলো। ওদিকে কোন গাঁ কে জানে।
ভোম্বল সেই আগের সড়ক ধরে চলতে লাগলো। ক্রোশ দেড়েক পরেই আবার এক খাল। খালটা গভীর ও কিছু চওড়া। তার ওপারে গাঁ বেশি দূর নয়।
খালের কোলে কোলে কাশ ফুল ফুটেছে; বাতাসে নুয়ে পড়ছে। তারপর বিশাল ধানক্ষেত। তিনটে মোষ খালের জলে গা ডুবিয়ে কেবল মাথা বার করে চোখ বুজে যেন মহা আরামে নিঃশ্বাস ছাড়ছে—ফোঁস—ফোঁস। তার এধারে রাখাল ছেলেরা হৈ চৈ করতে করতে স্নান করছে, সাঁতার কাটছে। কেউ কেউ পরণের কাপড়খানা খুলে তাই দিয়ে মাছ ধরছে। তার একটু এধারে বাঁশের সাঁকো। সাঁকোর নিচে জল কম। চাষী-বউরা জলে গা ডুবিয়ে বসে গা রগড়াচ্ছে, কেউ কেউ চোখ বুজে সাজিমাটি দিয়ে মাথা ঘষছে। কেউ বা এক রাশ ছেড়া ময়লা কাঁথা ও কাপড় নিয়ে কুলে বসে কাচছে, আর উঁচু গলায় ঘর-সংসারের গল্প করছে। সাঁকোর বাঁশের মাথায় একটা মাছরাঙা পাখি বসে আছে। তার কোনদিকে চোখ নেই; ভয়ানক গম্ভীর! বোধহয় মনে মনে একটা কঠিন প্রশ্নের উত্তর ঠিক করছে। হঠাৎ সে সোজা ঝপ করে খালের জলে পড়েই একটা ছোট মাছকে ঠোঁটে চেপে ধরে আবার উড়ে এসে বাঁশের মাথায় বসলো। তারপর মাছটাকে গিলে ফেলে আগের মতোই চিন্তিত হয়ে জলের দিকে তাকিয়ে রইলো।
ভোম্বোল সাঁকোয় উঠে মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো। লম্বা খাল পূর্ব-পশ্চিমে বেঁকে বেছে। জ্বলে স্রোত আছে। দুধারে ক্ষেত। এক জায়গায় বেশ বড় গোছের একটা দোয়াড় পাতা। তার বেড়া ঠেলে কুল কুলু করে জল বেরিয়ে আসছে। ঐ ধরা জাল দেখা যায়। জালখানা উঠলো;—ওর গায়ে কতকগুলো ছোট ছোট মাছ ধড়ফড় করছে যেন রুপোর টুকরো। মাছগুলো বোধহয় খয়রা।
গাঁয়ের দিক থেকে একটা লোক ছুটতে ছুটতে আসছে। তার ছোটার তালে তালে শব্দ হচ্ছে— ঝুমুর ঝুমুর ঝুমুর-মুর। কাছাকাছি এলে ভোম্বল দেখলে, লোকটা ‘রানার’। পিঠে তার ডাকের থলি, কোমরে চাপরাশ, চাপরাশের মাঝখানে পেতলের তক্তিকে বড় বড় ইংরেজি অক্ষরে কী লেখা। হাতে সে ধরে আছে ভোঁতা বল্লম। বল্লমের গলায় একজোড়া ঘুন্টি বাঁধা, পিছনে ডাকের থলি। ‘গভরনমেন্টের, ডাক যাচ্ছে। ওকে পথ ছেড়ে দিতেই হবে। ওরা নাকি গণ্ডারের মতো সোজা চলে। পথ না ছাড়লে পেটে সোজা বল্লম ঢুকিয়ে দেয়। ভোম্বল তাড়াতাড়ি সাঁকো পার হয়ে নেমে দাঁড়ালো।
লোকটা একেবারে কাছে আসতেই তার সঙ্গে ভোম্বলের কথা বলতে ইচ্ছে হলো। ভোম্বল দেখাতে চায়, সে রানারদের বিষয় সব জানে। তাদের দেখে একটুও ভয় পায় না। সে রানারকে জিজ্ঞেস করলে—“এ গাঁয়ের নাম কী গো? কান্তিনগর?”
লোকটির বুকের ছাতিখানা বেশ চওড়া। সারা গা ঘামে ভিজে। সে বুকখানা আর একটু চিতিয়ে সাঁকোয় উঠতে উঠতে গম্ভীর মুখে বললে—“চিটেঝুড়ি।”
—“চিটেঝুড়ি? সে কী? তবে কান্তিনগর কদ্দুর? কান্তিনগর কোথায়?”
লোকটি তখন এগিয়ে গেছে। তবু জবাব দিলে,—‘ইয়ের পর।’ বলেই তর তর করে সাঁকো পার হতে লাগলো। ওপারে গিয়ে সড়ক ধরে আবার ছুট দিলে—ঝুমুর ঝুমুর, ঝুমুর ঝুমুর শব্দটা ধানক্ষেতে ছড়িয়ে ক্রমে মিলিয়ে গেল। ভোম্বল গাঁয়ে ঢুকতে ঢুকতে একবার পিছন ফিরে দেখলো। লোকটি সড়ক ধরে অনেক দূরে চলে গেছে। আর তাকে দেখা যায় না।
গাঁয়ে ঢোকবার মুখেই আমতলায় এক গৃহস্থ বাড়ি। তার বার দিককার ঘরের ছোঁচ থেকে একখানা পুরনো সাইনবোর্ড ঝুলছে। তাতে বাঙলায় লেখা—'চিটেঝুড়ি পোস্ট আফিস।’ না-লোকটি ঠিকই বলেছে।
হঠাৎ ভোম্বলের মনে হলো, নামটা যেন চেনা। কিন্তু চিটেঝুড়ি কী? ভোম্বল ঠিক মনে করতে পারছে না। তবু মনে হচ্ছে নামটা সে শুনেছে। রোদে হেঁটে এসে তার গলা শুকিয়ে গেছে। কোথাও যদি এক গেলাস ঠাণ্ডা জল—
ভোম্বল পোস্ট অফিসের উঁচু পাকা বারান্দায় উঠে ছোট জানলাটার ভেতর উঁকি দিয়ে দেখলে। ঘরে কেউ নেই। খাতাপত্র, ময়দার কাই ও তামাকের গন্ধ একসঙ্গে মিশে জানলা দিয়ে এসে ভক্ করে তার নাকে লাগলো। সেখান থেকে সরে এসে সে একটু এদিক-ওদিক করে পথে নেমে আবার এগিয়ে চললো। খান পাঁচ-ছয় বাড়ি ছাড়িয়েই দেখলে বাঁ ধারে একট। পুকুরের এক কোণা। পুকুরটা একখানা বাড়ির পিছন দিকে। রাস্তা থেকে একটা সরু পায়ে চলা পথ গেছে সেদিকে। পথটা বোধহয় পাড়ার বউ-ঝিদের পায়ে পায়ে তৈরী হয়েছে। ভোম্বল জল খাবার জন্যে সে পথে পুকুরের দিকে চললো।
ঝোপ-জঙ্গল ও কচুবনের মাঝ দিয়ে পুকুর ধারে গিয়ে দেখে, ডানদিকে পরিষ্কার বাঁধানো ঘাট। পুকুরের চারধারে হেলেপড়া বা সিধে নারকোল গাছ! একটি বউ তখন ঘাটের পৈঠা দিয়ে নিচে নামছে। ভোম্বল, গিয়ে ঘাটের ওপর দাঁড়ালো।

বউটির মাথায় ঘোমটা; পরণে টক-টকে লাল পাড় শাড়ি, কাঁধে একখানা লাল রঙের গামছা। জলে নামবার আগে মাথার ঘোমটা খুলে সে একবার পিছনে ঘাটের ওপর তাকাতেই ভোম্বল চমকে উঠলো— পদ্মদিদি! বউটিও অবাক। ডাগর চোখ দুটো কপালে তুলে বললে, “ভোম্বল তুই এই বেশে এখানে?”
পদ্মদিদি নিধু চক্রবর্তী মশাইয়ের বড় মেয়ে; তার রানীদিদির বন্ধু। দুটিতে ভারী ভাব, চিটেঝুড়ি গায়ে পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি। এতক্ষণে ভোম্বল গাঁখানা চিনতে পারলো। বললে, —“আমি চলে যাচ্ছি।”
“কোথায় যাচ্ছিস?” বলতে বলতে পদ্ম পৈঠা বেয়ে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে এলো। তারপর বললে, — “গাঁয়ে জামা নেই, পরণে ময়লা কাপড়, খালি পা, মাথায় চুল রুক্ষ। একী চেহারা? এই বেশে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? বাড়ি থেকে পালিয়েছিল বুঝি?”
ভোম্বল চুপ করে রইলো। পদ্মদিদি তার হাত চেপে ধরে বললে “চল ভেতরে চল।”
ভোম্বল তেমনি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
পদ্মদিদি বললে, —“লক্ষ্মী ভাইটি। চল্ ভেতরে।”
ভোম্বলের চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। সে কান্নাটা গিলে ফেলে বললে,—“আমি কিন্তু আর বাড়ি ফিরে যাব না।”
—“কোথায় যাবি?”
—“টাটানগর।”
—“টাটানগর? সেখানে কী—বেশ, তাই-ই যাস। আজকের দিনটা দিদির বাড়ি থেকে যা”—বলে পদ্মদিদি ভোম্বলকে টেনে নিয়ে চললো। ভোম্বল চলতে লাগলো খুব অনিচ্ছায়।
ভেতরের উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতেই ওধার থেকে কে এক বুড়ী জিজ্ঞেস করলেন,—“ও বউমা, কাকে টানতে টানতে আনছো?”
পদ্মদিদি উত্তর দিলে,—“হারাণকাকাকে জানেন তো?”
–“তা আর জানবো না?”
—“এ তাঁর বড় ভাইয়ের ছেলে।”
—“ও! সেই রানীর ভাই?”
“—হ্যাঁ।”
—“তা’, অমন বেশে কেনো—”
পদ্মদিদি ভোম্বলের হাত ছেড়ে দিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে চোখ টিপলে। ভোম্বল বুঝতে পারলে, উনি পদ্মদিদির শাশুড়ী। বুড়ী পদ্মদিদির মুখের দিকে তাকিয়েই যেন অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। বললেন, —“তা বেশ—তা বেশ। ভাত তো হয়ে গেছে। পুকুরে একটা ডুব দিয়ে এসে দুটো খেয়ে নিক” —বলে বুড়ী একখানা ছোট খড়ের ঘরের বারান্দায় উঠে ভেতরে ঢুকে গেলেন। ওখানা বোধ হয় হবিষ্যির ঘর।
ভোম্বল নেয়ে এসে কাপড় বদলে পেট ভরে খেলো। দুপুরে মাদুর পেতে পা ছড়িয়ে বসে, রোদে চুল এলিয়ে পদ্মদিদি ভোম্বলের কাছ থেকে চক্রবর্তীবাড়ির অনেক খবর নিতে লাগলো। তারপর এক সময়ে জিজ্ঞেস করলে,—“তুই কী করে টাটানগর যাবি?”
—“হেঁটে।”
—“পারবি?”
–“হুঁ।”
—“খুব বাহাদুর তো।” বলে দিদি মুখখানা অন্যদিকে ফেরালে।
ভোম্বলের মনে হলো পদ্মদিদির সাদা কান দুটো রাঙা হয়ে গেছে, দিদি খিল খিল করে হাসছে। কিন্তু তার দিকে আবার মুখ ফেরাতেই দেখলে, তাতে হাসির কোন চিহ্ন নেই, সহজ মানুষ।
বিকেলে ভোম্বল বললে,—“আমি আজই চলে যাবো।”
—“এই রাতে? পরশু পুজো। থেকে যা—পুজোর কটা দিন দিদির বাড়ি।”
-“না।”
—“তবে কাল সকালেই যাস।”
পদ্মদিদির বর বাড়ি ছিলেন না; সন্ধ্যায় ফিরলেন। ভোম্বল সেই বিয়ের সময় তাঁকে দেখেছে। তখন ছিলেন রোগা, এখন মোটা-সোটা পালোয়ান গোছের চেহারা হয়েছে।
ভোম্বলের পরিচয় পেয়ে ও পথচলার বৃত্তান্ত শুনে বললেন—“বটে! বাড়িতে সুবিধে হলো না, টাটানগরের পথে বেরিয়ে পড়েছো?”
—“হুঁ”
—“আচ্ছা। তার ভাবনা কী? আমিও কাল কোলকাতার পথ ধরবো। তোমাকে কিছুদূর এগিয়ে দেবো।” লোকটির চোখ দুটো যেন হাসছে। চাউনিটা ভোম্বলের ভালো লাগলো না; কথাগুলো কাঠ কাঠ।
রাতে তিনি ভোম্বলকে পাশে নিয়ে খেতে খেতে বললেন,“মাছখানা খেয়ে ফেল। টাটানগরের খাটুনি বড় কঠিন; গায়ে জোরের দরকার।”
পদ্মদিদিও ঘোমটার ভেতর থেকে একটু চাপা গলায় বললে, “এই, খা!”
শাশুড়ী তখন বারান্দায় বসে মালা জপছেন।
ভোম্বলের লজ্জা করতে লাগলো। সে কিছু কমই খেলো।
রাতে তার শোবার জায়গা হলো, পদ্মদিদির শাশুড়ীর ঘরে। তার বিছানা হলো একটা প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুকের ওপর। সিন্ধুকটা সেকালের -একখানা চৌকি বললেই চলে। কিন্তু শুয়ে কিছুতেই তার চোখে ঘুম এলো না। কেবলই পদ্মদিদির বরের চোখ দুটো ও কথাবার্তা মনে পড়তে লাগলো। ভোরের দিকে মনে এলোমেলো ছবির সঙ্গে একটু ঘুম এলো বটে, কিন্তু বুড়ীর কাশির শব্দে ঘুম ছুটে গেল।
শুনতে পেল বাইরে কোথায় কাক ডাকছে। সে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে খুব সন্তর্পণে দরজার খিল খুললো। তখন খুট্ করে শব্দ হলো। বুড়ীর ঘুম ভারী পাতলা। বুড়ী অমনি জিজ্ঞেস করলেন,—“কে?”
—“আমি।”
—“বাইরে যাবে?
—“হু” বলে ভোম্বল উঠোনে নামলো। তখনও আবছা অন্ধকার আছে। তারপর তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে রাস্তায় গিয়ে উঠলো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন