খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ছোট কামরা—যাত্রীও বেশি নেই। যারা ছিল, তাদের জন কয়েক বেঞ্চি দখল করে শুয়ে আছে। একজন এক কোণে জানলার ধারে বসে বিড়ি ফুঁকছে। যারা শুয়েছিল, তাদের একজন জিজ্ঞেস করলো, “ছামনে কোন ইষ্টেশন গো?”
যে লোকটা বিড়ি ফুঁকছিল, সে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললে, “সাতকোদালে।”
—“ও চাচা–চাচা–ওঠো গো”—বলতে বলতে লোকটা উঠে বসলো।
ভোম্বল এতক্ষণ ষ্টেশনের দিকে মুখ বাড়িয়ে ছিল। গাড়ি প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে মাঠে এসে পড়লো। অমনি হুহু করে ঠাণ্ডা বাতাস ছুটে এলো। একি! চারধার ফর্সা। রাত দুটোর গাড়িখানা চলে গেছে? সে এত ঘুমিয়েছিল?
এ গাড়িখানা তো কোলকাতায় যায় না, কোলকাতা থেকে আসে। সে তাহলে গোয়ালন্দর দিকে চলেছে? যাঃ! সব গোলমাল হয়ে গেল।
এই গাড়ির শব্দে এক-একদিন তার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। সে শুয়ে শুয়ে চোখ মেলে দেখেছে। চালের আড়ার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো দেখা যাচ্ছে। তাদের চাপা গাছের ডালে বসে কাক ডাকছে। লেবুতলায় দোয়েল শিষ দিয়ে উঠলো; আর, পাশের বাড়িতে নীলমণি উকিলের মহুরী সুরেন ঢালী কাছারি ঘরের ফরাসে শুয়ে শুয়েই হাই তুলতে তুলতে বলছে,–দুর্গা। দুর্গা।
ভোম্বল জানলা থেকে সরে এসে বেঞ্চিতে বসলো। একটু শীত শীত করছে। সে কোঁচার কাপড়টা কোমর থেকে খুলে গায়ে দিলে। খুঁটে বাঁধা নাসপাতিটা তার পিঠের একপাশে রইলো যেন একটা আম।
যে লোকটা এতক্ষণ বিড়ি ফুঁকছিল, সে বার দুই ভোম্বলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, —“তুমি কোথা যাবা গো?”
ভোম্বল বললে,—“টাটানগর।”
লোকটা টাটানগরের নামই শোনেনি; চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করলে,—“সে কুন দিক?”
দিকটা ভোম্বলেরই ভুল হয়ে গেছে! সে বললে। —“ঐদিক।”
—“ত’লি ইদিক যাচ্ছো যে?”
ভোম্বল উত্তর দিলে না।
লোকটা জিজ্ঞেস করলে,—“তুমি ইস্কুলির ছাত্তর?”
ভোম্বল ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে বললে—“হ্যাঁ”
লোকটা এবার বেশ ভাল করে ভোম্বলের পা থেকে মাথা অবধি দেখলো; তারপর বললে, —“বাড়ি থেকে পালিয়ে এয়েছো বুঝি?”
ভোম্বল চুপ করে রইলো। গাড়ি তখন ‘ধর না কেন—ধর না কেন?’ করতে করতে বেশ জোরে ছুটছে। দেখতে দেখতে সকাল হয়ে গেল। পুর্বদিক লাল রোদ ওঠে ওঠে। সাতকোদালে পিছনে অনেক দূরে পড়ে আছে। সেখানে গাড়ি দাঁড়ায় না। সামনে ট্যাংরামারি। ঐ তার বিল দেখা যায়। বিলের ওপর দিয়ে বক উড়ে যাচ্ছে; গাংচিলেরা ঘুরপাক দিচ্ছে; লম্বা, সরু পা ফেলে পদ্ম পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে, ডাহুক। এখন বর্ষার শেষ; এসেছে শরৎ। বিলে জল থৈ থৈ করছে। দেখাচ্ছে, যেন একটা সমুদ্র। বিলটার নাম ‘মকর’। মকর বিল মাছে ভরা। এ সময়টা জেলেরা দক্ষিণ কোণের খাল দিয়ে মাছ ধরতে আসে। ঐ যে তাদের ডিঙিগুলো দেখা যায়; সার বেঁধে আসছে।
সেবার ভোম্বলরা সাত-আটজন মিলে ওখানে হেঁটে এসেছিল। সাতকোদালে থেকে মকর বিল তিন-ক্রোশ। রতনপুরের মাঝ দিয়ে আসা-যাওয়ার পথ। পথের দুধারে বড় বড় ক্ষেত-ধানে ভরা। পাকা ধান গুলোর ওপর যখন হাওয়া বয়ে যায়, শব্দ ওঠে ঝম্ ঝম্ ঝুমুর ঝুমুর, যেন মা-লক্ষ্মী নুপুর পায়ে চলে-ফিরে বেড়াচ্ছেন। বিলের কোলে পদ্ম ও শালুক বন। লতাগুলোর রাঙা ও সাদা ফুলে, মস্ত মস্ত সবুজ পাতায় জল দেখা যায় না। গন্ধে বাতাস ভারি। ফোটা পদ্মবনে মৌমাছি ও সাপের ভয়। তার বন্ধু জগা, পদ্ম তুলতে গিয়ে আর একটু হলেই সাপের কামড়ে মরতো। সাপটা পদ্ম-মৃণালের গা জড়িয়ে ফোটা পদ্মটার ওপর মাথা রেখে চুপ করে ছিল। জগা যেই পদ্মটা ছিঁড়বার জন্যে হাত বাড়িয়েছে, অমনি—‘ফোঁ-ও-স্।’ সাপটার কত বড় ফণা! ভোম্বলরা সেবার মাছ ধরেছিল অনেক। কিন্তু বাড়ি ফিরে সে তার খুড়োর মার খেয়েছিল, অনেক বেশি। ভোম্বলের ইচ্ছে হলো, ঐ বিলের পাড়ে ভোরের হাওয়ার দোদুল কাশবনে গিয়ে ছুটোছুটি করে।
লোকটা ভোম্বলকে বললে—“শুনছো গো খোকাবাবু এখনই বাড়ি ফিয়ে যাও। তোমার কাছে ‘টিকিস’ আছে?”
ভোম্বল জবাব দিলে- “না।”
—“তবে তো মুশকিল। তিন ইসটিশেন পরে টিকিস-সাহেব আসবে–”
ভোম্বল দেখেছে, চেকারে টিকিট চেক করে। লোকগুলো বেজার কড়া। সে ঠিক করলো, তার আগেই কোথাও নেমে পড়বে। সেখান থেকে গাঁয়ের মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে —সেই টাটানগর।
এমন সময়ে গাড়িখানা ট্যাংরামারী এসে হুস করে থামলো। যাত্রীদের কয়েকজন নেমে গেল। এরপর আলমপুর। ভোম্বল আলমপুরও চেনে।
মিনিট দুই থেমেই গাড়ি একটা হেঁচকা টান দিয়ে আবার চলতে লাগলো। ধানভরা ক্ষেতে ক্ষেতে সোনালি রোদ লুটিয়ে পড়েছে। রাখাল গরু চরাচ্ছে, কৃষাণ ক্ষেতে কাজ করছে। দেখতে দেখতে গাড়ি আলমপুর ও ছাড়িয়ে গেল। কামরাটা এখন একদম খালি। যে লোকটা বিড়ি ফুঁকছিল সেও আলমপুর নেমে গেছে।
খালি কামরায় ভোম্বলের বড় আনন্দ হলো। সে গাড়ির চাকার শব্দের তালে তালে গান ধরে দিলে। গানের মাঝে জানলা দিয়ে একবার মুখ বাড়িয়ে দেখলো। দেখেই তার বুক কেঁপে উঠলো—পাশে কামরায় চেকার! লোকটা ফিরিঙ্গী, কী পাঞ্জাবী বোঝা গেল না কিন্তু চাউনি বড় বিশ্রী। এবার তার দিকেও কটমট করে তাকিয়ে দরজা খুলে ও-পাশের কামরায় ঢুকলো। এখনই হয়তো তার কামরায় এসে পড়বে। সে একবার ভাবলো, গাড়ি থেকে লাফ দেবে; কিন্তু তাতে বিপদ যথেষ্ট। সে মরেও যেতে পারে; না মরলে হয়তো হাত-পা জখম হবে। তার ওপর পুলিশে ধরবে। তার চেয়ে বরং—কিন্তু এ কামরাটায় তো তাও নেই। তবে কী বেঞ্চীর নিচে লুকোবে? তাতেও কী রক্ষা আছে? চেকারের চোখ সব জায়গায় যায়। বিনা টিকিটে রেলে চড়া সত্যিই ভারি অন্যায়। এবারটা যদি কোন রকমে সে রক্ষা পায়! সে জানালা দিয়ে দেখলো, পরের ষ্টেশন কতদুর? কিন্তু সামনে কিছুই তো দেখা যায় না। দু'পাশে তারের বেড়া মাঝে রেল-লাইন চলে গেছে সোজা। ইঞ্জিনের কালো ধোঁয়ায় সামনেটা অন্ধকার। ভোম্বল ভাবলো, লাফই দেবে। বেশ শক্ত কোরে কোমর বাঁধলো; হাঁটুর নিচের কাপড় তুলে তার ওপর দিকের খানিকটা কোমরে গুঁজলো।

সে দরজা খুলবার জন্যে মুখ বাড়াতেই দেখলো, সামনে ঐ যে সিগন্যাল দেখা যায়। সিগন্যালটা যেন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে। আর, ষ্টেশন আসবারও দেরি নেই। কিন্তু গাড়িখানা তো তেমন জোরে চলছে না। ইঞ্জিন-ড্রাইভারের ওপর তার খুব রাগ হলো! লোকটা অ-কর্মা। জানে না, কিছুই জানে না। খুব সম্ভব ড্রাইভার পাঁউরুটি খাচ্ছে; আর, ফায়ারম্যান গাড়ি চাবাচ্ছে। এ সব লোকের শাস্তি হওয়া উচিত।
ভোম্বল আবার জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখতে গেল। সর্বনাশ! চেকারটাও যে বাঘের মতো মুখ বাড়িয়ে আছে। তবে কী হবে? যদি এখনই তার কামরাটায় আসে! ইঞ্জিন-ড্রাইভারকে ধরে তার মারতে ইচ্ছে হলো! জোর চালাও-জোরে- আঃ! এ কী? গাড়ি ক্রমে থেমে যাচ্ছে যে! ভোম্বল এবার বিপরীত দিকের জানালার কাছে ছুটে এসে মুখ বাড়িয়ে দেখলো – ঐ যে ষ্টেশন এগিয়ে আসছে। সে চট করে দরজা খুলে ফেললো। তারপর গাড়ি থামতে না থামতেই তড়াক করে লাফ দিয়ে, প্ল্যাটফর্মে নেমে, ছুটে তারের বেড়া গলিয়ে একেবারে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো।
আর তাকে ধরে কে? গাড়িখানাও মিনিটখানেক পরেই হুইসল দিয়ে ব্যাশ ব্যাশ শব্দে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ষ্টেশন ছেড়ে চলে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন