খগেন্দ্রনাথ মিত্র
অবশেষে স্টেশনের ছাদে কাক ডাকলো, চড়ুই কিচিরমিচির করে উঠলো দোয়েল শিস দিলে, আকাশে তারা মিলিয়ে যেতে লাগলো, পূব দিক ফর্সা হলো। ভোম্বলের সামনে প্ল্যাটফর্মে এসে বসলো এক জোড়া শালিক। তারা বসেই পোকা খুঁজতে লাগলো৷
ভোম্বল দেখলে পুবে-পশ্চিমে রেললাইন চলে গেছে দূরে, চারধারে গ্রাম—আবছা, কুয়াশায় ছেয়ে রয়েছে।তার পাশের লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে বোচকাটা মাথায় তুলতে তুলতে ভোম্বলকে জিজ্ঞেস করলে, ‘যাবে নাকি? ঐ দেখা যায় মাকালে। তুমি ঐ গাঁয়েই যাবে তো?’
ভোম্বল এমন একটু শব্দ করলে, যাতে হাঁ-না দুই-ই বোঝায়। কিন্তু রাতে তার ঘুম হয় নি, পেট ভরে খাওয়াও হয় নি, খোলা জায়গায় ঠাণ্ডায় থেকে শরীরে অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। যদি সে শিউনন্দনের সঙ্গে রেলে চেপে চলে যেতে পারতো! খালি হাতে দীর্ঘ পথ চলতে পারে কেবল সন্ন্যাসী ও ফকির। কিন্তু তার বয়সী কেউ ও দুইয়ের একটাও হতে পারে না, কেউ যে হয়েছে এমন গল্পও সে শোনে নি। শুনে থাকলে মনেও নেই।
লোকটা আর কিছু না বলে স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেল। ভোম্বল আস্তে আস্তে স্টেশনের বাইরে গিয়ে দেখলে সামনেই পথের ধারে খড়ের বাড়িঘর নিয়ে একটি পল্লী। তার মধ্যে একটা পেঁপে ও একটা খেজুর গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার ধারে একটা নিম ও একটা আমগাছ। পল্লীর পেঁপে গাছটির গলায় আট-দশটা পেঁপে, খেজুর গাছটির গলায় রসের হাঁড়ি। পল্লীটার একদিকে একখানা গরুর গাড়ি লেজ তুলে পড়ে আছে। তার পাশেই রাস্তার ধারে একখানা ঝাঁপ আঁটা টিনের ঘর, বোধহয় দোকান। কিসের কে জানে। পল্লীর পিছনেই শস্যশূন্য ক্ষেত একেবারে সেই দূরে গ্রামসীমা পর্যন্ত নানা আকারের আলে আলে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে বিছিয়ে রয়েছে। আকাশ পরিষ্কার এক সার বক সাদা ডানা দোলাতে দোলাতে পূর্ব থেকে পশ্চিমে খুব তাড়াতাড়ি উড়ে চলেছে, যেন দেরী হয়ে গেছে। ঐদিকে বোধহয় কোন বড় জলাশয় —খাল বিল-নদীও থাকতে পারে। পল্লীটি ও স্টেশনের মাঝে পথ —চলে গেছে রেললাইনের ধারে ধারে সেই দূরে গ্রামের দিকে। পথের ধারে মাঝে মাঝে দুটি-একটি গাছ, হয় তাল, নয় খেজুর অথবা বাবলা। দু'দিক থেকেই স্টেশনের দিকে আসছে জন কতক লোক—তাদের কারো হাতে দড়িতে ঝুলছে কলসী, কারো মাথায় ঝুড়ি, ঝাঁকা বা ভরা বস্তা। ওরা হয় যাবে ভাজনায়, নয় ইছামতীর ধারে সেই গঞ্জের বাজারে, যাবে রেলগাড়িতে। কিন্তু ভোম্বল এখন যাবে কোথায়—পশ্চিমের পথে তো বটেই, কিন্তু কোথায়? এদিকে পেটে ক্ষিদে ৷ চুড়া-বাতাসা কতক্ষণ পেঁটে থাকে? – তাও পরিমাণে বেশি হলেও না হয় হতো। সে পশ্চিমের গ্রামের দিকে এগোতে যাবে, এমন সময় সেই পল্লী থেকে বেরিয়ে এলো দুর্গাপুরের 'বাজার পাড়ার' হরনাথ কুণ্ডু। হরনাথ ও ভোম্বল সেখানে পরস্পরকে দেখে এমন অবাক হলো যে প্রথমটা কারো মুখ দিয়ে কথা বার হলো না, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না তারা পরস্পরের খুবই চেনা।
হরনাথ বাজার পাড়ায় এক মুদীর দোকানে চাকরি করতো। তার যে এখানে কেউ আছে তা ভোম্বল জানেই না। সে ভোম্বলের চেয়ে বছর তিনেকের বড় হলেও পড়তো ভোম্বলের সঙ্গে। কিন্তু বছর দুই হলো পড়া ছেড়ে দিয়ে মুদীর দোকানে চাকরি করছিল। ও পাটীগণিতের অঙ্কগুলো টকাটক করতো। বাঙলায়ও বেশী নম্বর পেতো। কিন্তু আর কিচ্ছুতে ভাল ছিল না।
স্কুলে পড়তে পড়তেই ও কখন কখন ঐ দোকানে দোকানদারি করতো। ওরা খুব গরীব। ওর বাবা নেই, মা আর ছোট দুটি ভাইবোন আছে। ওরা এক সময়ে নাকি থাকতো তাদের পাশের বাড়িতে। ভোম্বলের তা মনেও পড়ে না।
ছেলেটি বড় নিরীহ।, তবু ক্লাসের অনেকে ওকে ক্ষ্যাপাতো। বলতো— হরনাথ কুণ্ডু, ভাঙি তোর মুণ্ডু। ভোম্বলের এ ইয়ার্কি ভাল লাগতো না। ও তো কাউকে কিছু বলতো না। এই ব্যাপার নিয়ে তাদের সঙ্গে ভোম্বলের কখন কখন হাতাহাতি হবার উপক্রম হতো। তারা বলতো, “হরাটা দোকান থেকে চুরি করে মৌরী, ডালচিনি, বড় এলাচ, কাবাবচিনি খেতে দেয় বলে ভোমলা ওর ‘বডিগার্ড।’

সেই নিরীহ হরনাথ এখন সপ্রতিভের মতো জিজ্ঞেস করলে, ‘কি রে ভোম্বল, তুই এখানে?’
ভোম্বল পাল্টা প্রশ্ন করলে, ‘তুই এখানে কোথায় এসেছিস?’
হরনাথ পেঁপে গাছওয়ালা বাড়িখানা দেখিয়ে বললে, ‘ওই আমাদের বাড়ি মানে আমার জ্যাঠার বাড়ি। ওই যে ঝাঁপবন্ধ ঘর, ওটা দোকান - মানে জ্যাঠার। জ্যাঠা - মারা গেছে। সব আমাদের দিয়ে গেছে। আমরা এখন এখানে থাকি। আমি ওই পাঁচমিশেলি দোকানখানা চালাই। উই পশ্চিমে গাঁ দেখা যায়? উই যে! হ্যাঁ – হাঁ। ওইখানে রয়েছে চার বিঘে, আর বাড়ির - পিছনে দেড় বিঘে জমি জ্যাঠার। সব আমাদের। কিন্তু তুই এখানে কোথায় এসেছিস? এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস?’
ভোম্বল কি জবাব দেবে বুঝতে পারলে না। সে যেউদ্দেশ্যে ঘর ছেড়েছে তা ওকে বলতে ও বোঝাতে গেলে অনেক সময় লাগবে। ও প্রশ্নের পর প্রশ্ন করবে।
হরনাথ বললে, ‘দাঁড়া, দোকান খুলি। এখনই খদ্দের-পত্তর আসবে সব গাঁয়ের মানুষ—এ গাঁ ও গাঁ করবে, রেলে যাবে আসবে। তুই আমার দোকানে বসবি, চল।’
সেই মুখচোরা হরনাথ আজ মুখফোঁড়! আর, চঞ্চল, চটপটে ভোম্বল হয়েছে স্বল্পবাক দূরের যাত্রী!
হরনাথ বাড়ির দিকে চলে গেল। একটু পরেই ভেতর থেকে একে একে উঠলো দোকানের দুখানি ঝাঁপ। হরনাথ ঝাঁপ দুখানার তলায় দুটো তেলচিটে বাঁশের আগার ঠেকনা দিয়ে ভোম্বলকে বললে, ‘ভেতরে এসে চৌকিতে বোস্।’
এবং দোকানের সামনে হাত পাঁচেক লম্বা, পৌণে হাত খানেক চওড়া খুব পুরনো একখানা মাজাদাবা বেঞ্চি পেতে দিলে।
ভোম্বল ভেতরে গিয়ে চৌকিতে বসলো। দেখলে দোকানখানি দু'ভাগ। একভাগে রয়েছে যেন মুড়ি-বাতাস। মিছরি ইত্যাদির জালা ও টিন; তারই পাশে নুন-তেল-মসলাপাতি। বেড়ার গায়ে তাকে সাজানো রয়েছে কুইনাইন, পাঁচন, সোডা-সাজিমাটি, দাদের মলম, সাবানের গোলা, বই-ধারাপাত, বর্ণপরিচয়, লক্ষ্মীর পাঁচালী ব্রতকথা ইত্যাদি; আর একদিকে পান-বিড়ি-সিগারেট-মোমবাতি-দেশলাই প্রভৃতি। এই দিকটায় এসে বসলো, হরনাথের ছোট ভাই, শ্রীনাথ বা 'ছিনাথ। আর, বড় দিকটায় বসলো হরনাথ নিজে। ভোম্বল দোকানের ঐ সব মাল-পত্রের খবর ক্রমে জানতে পারলো।
একটু পরেই এদিক ওদিক থেকে গাঁয়ের নানা রকমের মানুষ-জন আসতে লাগলো। আসতে লাগলো৷ গরুর গাড়ি, ছুটতে লাগলো বাই সিকল। রেলপথেও ‘মিক্সড', 'পিসেনজার', 'মালগাড়ি’ যাওয়া-আসা করতে লাগলো।
এই আসা-যাওয়ায় ভোম্বলের মন আরও চঞ্চল হয়ে উঠলো। হরনাথ খদ্দের বিদায়ের ফাঁকে ফাঁকে ভোম্বলকে প্রশ্ন করতে লাগলো, ‘তুই ওপারে কার বাড়ি এসেছিস? কবে এসেছিস?’
ভোম্বল সে সব কথার জবাব না দিয়ে বললে, ‘আমি যাচ্ছি কারখানায় কাজ শিখতে।’
—‘পড়া ছেড়ে দিয়েছিস? কোথায় কাজ শিখতে যাচ্ছিস? অঞ্চলে তো কলকারখানা নেই, চারধারে কেবল চাষীদের গাঁ। কলকারখানা আছে কলকেতায় আর হাওড়ায়—’
—‘ওসব ছাড়িয়ে আরও দূরে—সেই টাটায়।’
— ‘অ্যা! তবে এখানে কেন?’
—‘হেটে যাচ্ছি!’
হরনাথ একটু হেসে বললে, ‘ইয়ারকি রাখ। বল্ না, কোথায় এসেছিস। এখানে তোর কে আছে?’
—‘বললাম তো সব।’
— ‘কিছুই বুঝতে পারছি নে। তবে আড়ানিতে নামলি কেন? এই জায়গাটায় নাম আড়ানি, ওপারে ভাজনা।’
ভোম্বল বললে, ‘হেঁটে আসছি, হেটে যাবো৷’
হরনাথ প্রথমে হাঁ করে রইলো। তারপর বললে, ‘হেঁটে যাচ্ছিস কেন?’
— ‘রেলে যাবার টাকা নেই।’
—‘খাওয়া-দাওয়া করছিস রেলে?’
-‘না। সঙ্গে যা আছে, তাতে পেটভরে খেলে একটা দিন চলবে।’ বলে ভোম্বল একটু হাসলে।
হরনাথ আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলে –‘কাল কি খেয়েছিস।’
— ‘কাল?’ বলে ভোম্বল একটু চুপ করে থেকে আবার বললে, ‘সে অনেক ব্যাপার।’
—‘তুই কি এই আসছিস?’
—‘কাল রাতে ঐ স্টেশনে ছিলাম।’
— ‘বলছিস কি?’
— ‘যা সত্যি, তাই বলছি।’
হরনাথ যে বাক্সটার ওপর বসেছিল তার ওপর দাঁড়িয়ে ডাকলে, ‘ছিনাথ! আচ্ছা থাক, আমিই যাচ্ছি। তুই এসে এখানে বোস্। চল ভোম্বল আমাদের বাড়ি।’
ভোম্বল একটু হাসির সঙ্গে বললে, ‘না রে। আচ্ছা হরা, এখানে কোন চাষীর কাজে সাহায্য করলে যে কিছু মজুরি কি খাবার দেয় না?’
হরনাথ নেমে এসে ভোম্বলের হাত ধরে বললে, ‘তোর মাথার ঠিক নেই। তুই চাষের কাজের কি জানিস ? তা ছাড়া—সব বুঝিয়ে বলবো পরে। এখন ওঠ ওঠ । চল আমাদের বাড়ি। ঐখানেই খাবি।’
-‘না রে না।’
–‘কেন? আমাদের বাড়ি যেতে তোর আপত্তি কি? তোর স্বজাতি নেই বলে?’
ভোম্বলের বুকে যেন আচমকা একটা ঘুষি পড়লো। সে আহতের মতো বলে উঠলো, ‘কি বললি – জাত? জাত কি? গাঁয়ে শুনি, বামুনশুদ্দুর। বামুন না হলেই শুদ্দর। কাজেই তুইও যা আমিও তাই—এক।’
—‘তবে আমাদের বাড়ি যাবি না কেন—গরীব বলে?’
ভোম্বল বললে, ‘আমাদেরই কি অনেক টাকা-পয়সা? তোর যা আছে আমার তা নেই ভাই। কারো বাড়িতে আর যেতে ইচ্ছে করে না।’
–‘তুই আর আমি একসঙ্গে পড়তাম না? তবে যাবি না কেন?’
-‘যাব না-আ-’বলে ভোম্বল অন্যদিকে তাকালো।
—আচ্ছা, এখানেই বোস্।’ বলে হরনাথ বাড়ি চলে গেল। আর শ্রীনাথ উঠে এসে তার দাদার জায়গায় বসে খদ্দের বিদায় করতে লাগলো। ভোম্বল বললে, ‘শ্রীনাথ, তোর জায়গায় আমি বসে পান-বিড়ি-সিগারেট দি কি বল?’
শ্রীনাথ হেসে বললে, ‘তাই দাও। ঐ বিড়ি এক পয়সায় তিনটে, সিগরেট এক পয়সায় একটা। পান সাজতে জানো? এক খিলি পান এক পয়সা। ঐ যে ঘটিতে চুন গোলা, খয়ের গোলা, বাটিতে কুচি সুপুরি আর ঐ যে কৌটোয় জরদা। না চাইলে দিও না। জরদা দেওয়া পান ছ পয়সা। খবরদার! পানে যেন চুন বেশি না হয়! চুন খয়ের লাগাবার ঐ যে দুটো কাঠি। হাঁ-হাঁ।’
ভোম্বলের ভারি মজা বোধ হলো। বললে, ‘এ আর এমন কি কঠিন?’
-‘তুই আর পড়িস না? —
-‘না। দাদা কি একা এত বড় দোকান চালাতে পারে? সারা দিনই খদ্দের —সন্ধ্যের পরও। হাটের দিনে বেশি।’
— ‘কোথায় হাট বসে?’
—‘উই মাকালের পূর্বে, মাথাভাঙার ধারে বেগুনখালির মাঠে। পাঁচ-ছ খানা গাঁয়ের মানুষ আসে, বেচাকেনা করতে। গাঙ বেয়েও আসে ব্যাপারীদের নৌকো। আনাজপাতির সঙ্গে হাঁস-মুরগী-ছাগল-মাছ-গামছা-লুঙ্গিও বেচাকেনা হয়। দারোগা সাহেব আসে এত্তেলা নিতে। জমিদারের পেয়াদা-বরকন্দাজ তোলা আদায় করে।’
—‘তুই হাটে গেছিস কখন?’
—“যাই তো। সঙ্গে যায় পাশের বাড়ির কেষ্টখুড়োর বড় ছেলে ধনা। ওখানে দোকান দি পান-সিগারেটের। খদ্দের হয় খুব। একা সামলাতে পারিনে। তবে আসা-যাওয়াতে খরচ বেশি। পরশু হাট, ধনাটা ম্যালেয়ারিতে পড়েছে। যদি ভাল থাকে তবেই যাওয়া হবে। আমি না থাকলে আমার বোন লিচুমণি এই পাটায় বসে খদ্দের ঠেকায়। আমার চেয়েও ভাল পারে। পান সাজতে সাজতে পাকাবুড়ীর মতো খদ্দেরদের বলে, ‘রোস রোস, দেখচো তো দুটো হাত? ক'দিক সামলাবো?’ ওরা কথা শুনে খদ্দেররা হাসে। কেউ বলে, ‘বুড়ী-মা,’ কেউ বলে ‘বুড়ী-দি।’ ঐ যে আসছে—”
ভোম্বল তাকিয়ে দেখলে, সেই লিচুমণি। একটু বদলেছে। সেই গোল-গাল, চ্যাপটা মুখ, ডাগর চোখ, উঁচু কপাল, ছোট কিন্তু খাড়া নাক, ফোলা ঠোঁট কালো মেয়েটা, পরনে হালকা রাঙা শাড়ি, মাথায় ঘন কালো চুল এক রত্তি খোঁপায় টেনে বাঁধা, কানে মাকড়ি, নাকে হরতন নাকছাবি, একটা ঝকঝকে ভুবনেশ্বরী কাঁসার বাটি, দু'হাতে সন্তর্পণে ধরে আনছে ; তার আগে আগে একটা সাদা এনামেলের গেলাস হাতে আসছে হরনাথ। দোকানের সামনে এসে লিচুমণি ঠোঁট কামড়ে একটু আড়চোখে ভোম্বলের দিকে তাকালো।

ভোম্বল বললে, ‘ কি রে লিচু, চিনতে পারিস?’
লিচুমণি ফিক করে হেসে দোকানঘরে ঢুকে বাটিটা চৌকির ওপর রেখে ছুট।
হরনাথ সহাস্যে বললে, ‘ক্ষেতমজুরী থেকে দোকানদারী? উঠে আয়। মুখ ধুয়েছিস তো? ঐ ক্যানেস্তারায় জল, ওর পাশে মগ আছে। কিছু চা-মুড়ি খেয়ে নে। আজ আমাদের খেতে হবে লিচুর রান্না। মায়ের পালা জ্বর। তাগা বেঁধেও আরাম হয় না।’
ভোম্বল চোখ-মুখ ধুয়ে কোঁচ কাপড়ে চোখ-মুখ মুছতে মুছতে এসে দেখে বাটিতে মুড়ি, নারকেল কোরা আর খানিকটা পাটালী, গেলাসে চা, তাতে দুধের ভাগ বেশী।
হরনাথ আবার নিজের জায়গায় বসে কাজে মন দিলে; শ্রীনাথ বসলো পান-সিগারেটের জায়গায়৷
মুড়ি চিবতে চিবতে ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, ‘তুই কলকাতার কারখানা দেখেছিস?’
হরনাথ বললে, ‘আমি কলকাতাই দেখিনি। উদিক পানে যাবার সময় নেই। ঐ মাকালের আশু পোদ্দার, যজ্ঞেশ্বর বারুই, হাসিম মোল্লারা দু’ভাই কলকেতা যায় গস্ত করতে। ওদের মুখে শুনেছি। খড়দা, টিটেগড়, রিষড়ে, হুগলী, হাওড়া কত নাম ওরা বলে। আড়ানির ওপারের কেউ কেউ উদিককার কোন কোন কলে কাজও করে। সাহেবদের সঙ্গে নাকি কথাও বলে। টাটার নাম তো কেউ করে না। টাটা কি একটা জায়গার নাম?’
ভোম্বল মনে মনে বললে, হরনাথ একদম গেঁয়ো; এবং তাকে সবজান্তার মতো ভারিক্কী সুরে বললে, ‘একজনের উপাধি। তার নাম আর উপাধি অনুসারে—জায়গাটার – আচ্ছা পরে তোকে সব বুঝিয়ে দেব। অত বড় কারখানা ভারতে নেই-ই । আমি যাচ্ছি সেখানে কাজ শিখে খুব বড় একটা কিছু তৈরি করতে।’
—‘মানে?’
–‘মানে সেখানে লোহা গলিয়ে ছাঁচে ঢেলে, পুড়িয়ে, পিটিয়ে কেটে-কুটে কত কি যে তৈরি হয়! সে কি সব আমিই জানি? সে চাষ-আবাদী কাজ নয়—বিশ্বকর্মার পুরী। সে কাজে লাগে হিম্মৎ, বুদ্ধির আর কলের কেরামতি।’
হরনাথ বললে, ‘বুঝলাম। সবাই কি পারে? এই ধর না চাষের কাজ—ওতেও চাই হিম্মৎ, উদয়াস্ত খাটুনি— ওটাও তো শিক্ষার দরকার। জলে ভেজা, রোদে পোড়া, ফসলের যত্ন-আত্তি, পালন-পাহারা কত কি। তবেই না মা লক্ষ্মী ঘরে ওঠেন; মানুষ-জন খেয়ে বাঁচে! আগে জান, পরে মান—এই তো কথা।’
বলে হরনাথ বিজ্ঞের মতো গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লে৷
হরনাথের ভাব দেখে ভোম্বলের মজা বোধ হলো, হাসি পেল। একটু পরে জিজ্ঞেস করলে, ‘কলকাতায় যেতে হলে গাঁয়ের পথ সোজা না রেলের পথ সোজা?’
—‘রেলেই তো সবাই যায়; ভাড়াও বেশি নয়, টাকাটেক। হেঁটে পথে গেলে সময় লাগবে। কত কি ঘটতে পারে। কি ফ্যাসাদে পড়তে হবে? ঐ যে যগা বারুই আসছে। ও হপ্তায় দুবার গস্ত করতে যায়।’
এমন সময়ে গলাবন্ধ ছিটের কোটের ওপর ধোসা জড়িয়ে বেঁটে-খাটো, আধা ভদ্রগোছের একটি লোক এসে বললে, 'কাল গস্তে যাব গো কুণ্ডুর পো। ইবার দু'দিন থাকা। পরশু মঙ্গলবার। কালীঘাটে মানৎ। বুঝলে কি না।’
হরনাথ বললে, ‘আমার মায়েরও মানৎ আছে। তোমার সঙ্গ ধরলে ভালই হতো। কিন্তু আজ আবার পালটায় ধরেছে। গেলে শহর দেখা, গঙ্গা নাওয়া, পূজো দেওয়া সারতে পারতাম। কিন্তু তা আর হয় না।’
—‘বলছি, কালাচাঁদ কোবরেজকে দেখাও ওর বড়ি কথা কয়।’
—‘ব্যামো সারাবার মানৎ নয়। তরশু থেকে উপিন ডাক্তারের ওষুধ খাচ্ছে; কিছু নরমও পড়েছে। দেখি যদি ফাগুনে যেতে পারি। তুমি আমার এই বন্ধুকে কলকাতায় নিয়ে যেতে পারবে? নতুন লোক মানে কলকাতায়। আমরা দুগ গোপুরে এক সাথে পড়তাম। কলকাতা থেকে যাবে আরও দূরে। কি বল, সঙ্গ ধরবে?’
একটা পান নিয়ে চিবতে চিবতে যগা বারুই বললে, ‘ঐ শ্যালদা তক। আমি যাবো সেই মশলাপটি। কাল সকাল ছটার গাড়িতেই কিন্তু রওনা।’
হরনাথ বললে, ‘তাই সই। কি রে ভূপে?’
ভোম্বল বললে, ‘ভাড়া কত?’
হরনাথ বললে, ‘সে যা হয় হবে খন।’
ভোম্বল চুপ করে রইলো৷ যগা বারুই বললে, ‘ভাড়া এক টাকা চার পয়সা।’
হরনাথ জিজ্ঞেস করলে, ‘এখন কোন্ দিক পানে যাওয়া হবে?’
যগা বারুই এক বাণ্ডিল বিড়ি কিনে তা থেকে একটা বার করে দাঁতে চেপে বললে, ‘ঐ সাতঘোরীর কানাই পালের দোকানের দিকে। নতুন দোকনে দিয়েছে। দেখি যদি কলকাতার ফরমাজি মাল কিছু থাকে।’
হরনাথ ভোম্বলকে জিজ্ঞেস করলে, 'কি রে ভোম্বল, যাবি নাকি নতুন গাঁ দেখতে? আমার জমিটুকুও দেখে আসবি। এক হপ্তা দিকে যেতে পারি নি।’
—‘তোর জমি চিনবো কি করে?’
-‘ঐ বারুইমশাই চিনিয়ে দেবে।’
যগা বারুই ধোঁয়া ছেড়ে বললে, ‘তা দেব। রাস্তার কোলে বললেই হয়।’
হরনাথ জিজ্ঞেস করলে, ‘ফিরবে কখন?’
—“সাড়ে বারোটার ‘টেন' যেতে যেতেই। চলো গো বাবু নটার টেন তো পার হলো।”
ভোম্বল সানন্দে যগা বারুইয়ের সঙ্গে চললো।
কাঁচা-পাকা রাস্তা, দু'পাশে নাবাল জমি। এখন শুকনো, খটখটে। পরে জায়গায় জায়গায় ধুলোর চাপ, থেকে থেকে বাতাসে ধোয়ার মতো উড়ছে। সেই ধুলোয় গোটা দুই চড়ুই স্নান করছে—মানে ধুলোয় মাথা ডুবিয়ে ডানা নেড়ে পিঠে ধুলো মাখছে। ভোম্বলরা কাছাকাছি পৌঁছতেই তারা উড়ে গিয়ে রেললাইনের ধারে বেড়ার তারে বসলো।
যগা বারুই যেতে যেতে ভোম্বলের পরিচয় নিতে নিতে মন্তব্য করলে, “এইভাবে ঘর ছেড়ে কেউ কেউ কোথাও গিয়ে ব্যবসা করে মস্ত ধনী হয়েছে। ‘ফেকটেরির’ তিন টাকার দিন-মজুরীতে কি হবে?”
তার কথাগুলো ভোম্বলের ভাল লাগলো না। মনে মনে বললে, গাঁয়ের লোক কত আর জানবে? দু-একটা ইংরিজি বলছে বটে তার উচ্চারণ ঠিক হচ্ছে না। ফ্যাকটরিকে বলছে, 'ফেকটেরি’, ট্রেনকে বলছে 'টেন’। ভোম্বল যেতে যেতে দেখে, পথের পাশে আকন্দ, শিয়ালকাটা কালকাশুন্দি, কাঁটানটে ও হাতী শুঁড়ের আধমরা ছোট ছোট ঝোপ৷
যগা বারুই বললে, “পাঁচ বছর হলো 'ডিসটিক বোড' রাস্তাটা তৈরি করে গাঁয়ের লোকের খুব উপকার করে দিয়েছে। এখন এ গাঁ ও গাঁ যাতায়াতের ভারি সুবিধে। তবে বর্ষায় হাঁটুসমান ‘ক্যাদো’ হয়; গরুর গাড়ির ‘চ্যাকা’ বসে যায়। শুনছি এই বছরেই রাস্তাটা পাকা হবে।”
ভোম্বলের এ সব কথা ভাল লাগছে না। পথটার দু'পাশের শূন্যতা, সামনে আকাশ কোলে দূর গাঁয়ের কালো ছবিতে তার মন হু-হু করছে। আকাশে অনেক উঁচুতে পাতার মতো ঘুরপাক দিচ্ছে চিল শকুন; যেন স্রোতে ভাসছে। ঐ যে একটা তীরবেগে নিচে নামছে, যেন একটা কালো উল্কা। ওটা নিশ্চয়ই শিকরে বাজ, কোন শিকারের ঘাড়ে পড়ছে। পড়েই ধারালো বাঁকা ঠোঁট আর নখ দিয়ে তার নলী চিরে তপ্ত তাজা রক্ত খাবে। শীতের টানা বাতাসে মাঠের তালখেজুরের পাতাগুলো উথাল-পাতাল করছে।
যগা বারুই বললে, ‘ঐ দেখা যায় জলা। ওর কোল বরাবর যে জমি সেটা দীন কুণ্ডুর এখন হরা কুণ্ডুদের দু'ভাইয়ের। এক লপ্তে চার বিঘে দু'বিঘেয় কলাই-মটর, দু’বিঘেয় ধান। জমিটা ভালই। আর ঐ যে গাঁ সাতঘোরী। ওর লাগোয়া তালদে; তারপর চৈতনপুর সেই মাথাভাঙার পাড় ভক। এই রাস্তারও শেষ সেখানে।’
নাম শুনে নদীটাকে ভোম্বলের দেখতে ইচ্ছে হলো। গ্রাম, নদী, বিলগুলোর নাম কে রেখেছে, কেন অমন নাম? এক একটা ভারি মজার। মাথাভাঙা। নদীটা কার মাথা ভাঙে – নিজের না পরের? হঠাৎ ধুম করে একটা শব্দ হলো। ভোম্বল চমকে উঠলো। শব্দটা বেশ জোর। সে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। জলার ধারে ঐ যেন একটু নীল ধোঁয়া উড়ে গেল। ঐ কয়েকটা পাখি যেন ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে উড়ে পালাচ্ছে।
যগা বারুই বললে, ‘পাখি মারছে। শীতে ঐ জলার ধারে এদিক-উদিক থেকে অনেক রকমের জলার পাখি আসে।’
ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, ‘বুনো হাঁস, চখাচখী চরে আসে না?’
—‘না৷ ও সব পড়ে বড় বড় বিলে, মস্ত মস্ত নদীর চরে।’
ভোম্বল জলাটার কাছে যত যায়, গ্রামখানা তত স্পষ্ট হয়। তার মনে হচ্ছে, গ্রামখানা যেন উঁচু। ঐ যে গ্রামের বাইরে দুটো পানের বরজ দেখা যাচ্ছে। ভোম্বল শুনেছে, বরজে কখন কখন নাকি বাঘ লুকিয়ে থাকে। কথাটা সত্যি কি না যগা বারুইকে জিজ্ঞেস করে জানতে যাবে, এমন সময় দেখলে একটা কালো রঙের কুকুর গ্রাম থেকে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এলো। আট-দশটা ছেলে হৈ-হৈ করে ছুটে আসতে আসতে তাকে লক্ষ্য করে ঢিল মারছে।
যগা বারুই তাড়াতাড়ি পথের একপাশে সরে যেতে যেতে ভোম্বলকে বললে, ‘সরে এস, সরে এস, ক্ষ্যাপা কুকুর।’
কুকুরটা হঠাৎ পথ থেকে নেমে জলার পাড় নিয়ে ছুটতে ছুটতে ওপারে হরা কুণ্ডুর জমির দিকে চলে গেল। ছেলেগুলো আর এগোলো না, সেখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার ও হাতের ঢিলগুলো যথাসম্ভব দূরে ছুঁড়তে লাগলো। ভোম্বলের বিশ্বাস হলো না যে, কুকুরটা ক্ষ্যাপা। ভোম্বল দেখলে কুকুরটা ছুটতে ছুটতে জলটার কিনারে গিয়ে থামলো এবং একটু পরেই জলে নেমে জল খেতে লাগলো৷ তাই দেখে সে যগা বারুইকে জিজ্ঞেস করলে, ‘ক্ষ্যাপা কুকুরে কি জল খায়?’
যগা বারুই বললে, ‘পাগলারও ক্ষিদে-তেষ্টা আছে—’
ছেলেগুলো হৈ-চৈ করতে করতে ফিরে চললো। সব কটার খালি পা, পরনে ময়লা কাপড়, গায়ে ময়লা গেঞ্জি বা কামিজ। দু'একজনের গলায় মাদুলি। ভোম্বল যগা বারুইয়ের কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারলে না। জলার পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখলে, সাহেবী পোশাক পরা দুটো লোক জলার শুকনো কাদার ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে। তাদের একজনের হাতে বন্দুক, আর একজনের হাতে ঝুলছে কয়েকটা মরা পাখি। মনে হচ্ছে পাখি কটা যেন কাদাখোঁচা, মেটে বক আর ঘুঘু। যেন একটা হরিয়ালও রয়েছে। হাঁ হাঁ হরিয়ালই বটে। ভোম্বল ভাল করে লক্ষ্য করতে করতে চললো।
জলায় ছিল কয়েক বোঝা বাঁশ। কারা যেন ঘুণ ধরবে না বলে জাগাচ্ছে। ভিজে বা কাঁচা বাঁশে ঘুণ ধরে না। ভোম্বল দেখেছে ঘুণ, বাঁশ পোকাগুলো ক্ষুদে ক্ষুদে নরম তুলতুলে। ওরা শুকনো বাঁশ-কাঠ কুস্ কুস করে কুরে তার ভেতরে থাকে। কি খায় কে জানে । ওদের কুটি কুটি দাঁতে এত ধার যে শুকনো, শক্ত বাঁশ-কাঠও ফুটো করে ফেলে।
গ্রামখানা সত্যিই কিছু উঁচু। ভোম্বল যগা বারুইয়ের পিছন পিছনে গাঁয়ে ঢুকলো। তার নাকে লাগলো গোবরমাটি ও বুনোগন্ধ। গ্রামের মুখেই গ্রামের মুখেই ডান ধারে একখানা উঁচুধারী খড়ের মস্ত বাংলা ঘর। ছেঁচের কোণ দুটো ধারী ছোঁয় ছোঁয়। তার সামনে উঠোন। উঠোনের শেষে রাংচিতের বেড়া। তার এক কোণে কাঁঠাল ও একটা রয়না গাছ। বেড়ার মাঝ বরাবর ঢোকবার পথ বাঁশের হুড়কো দিয়ে বন্ধ। বাইরে সামনে কাঁচাপথ –হাত দশেক চওড়া। এপারে বাঁশঝাড়। তার ওধারে কাঁচা বাড়ি-ঘর। একটি আধ বুড়ো রোগা লোক উঠোনে রোদে উবু হয়ে বসে হুঁকো টানছিল।
যগা বারুই চেঁচিয়ে বললে, ‘দাঠাকুর, পেন্নাম।’
লোকটি ঘাড় ফিরিয়ে দেখেই বললে, ‘যজ্ঞেশ্বর? কলকাতা যাওয়া হবে কবে?’
—‘কাল সকালে।’
—“আমার হাঁপানীর ওষুধটার কথা মনে আছে তো –‘কৈলেস কোবরেজের হাঁপিনাশ’ বড় শিশি?”
যগা বারুই হুড়কো খুলে বেড়ার ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ভোম্বলকে বললে, ‘তুমি গাঁখানা দেখে এস৷ আমি কাজ সারি। ঐ মোড়ে কানাই পালের দোকান। আমি ওখানে থাকবো। মনে থাকে যেন টেনের টাইম সাড়ে বারোটা।’
ভোম্বল 'হুঁ' বলে এগিয়ে চললো।
শীতে গ্রামের গাছপালা, ঝোপ-ঝাড় কেমন যেন সিঁটিয়ে আছে; পাতায় পাতায় ধুলোয় স্তর, গাছতলায় শুকনো পাতা। পথের দু'ধারেই খড় ও টিনের ঘর-বাড়ি। দু'একটার উঠোনে দু'একটা গোলাঘর, গোয়াল ঘর। কারো মাচায় বা চালে জালিপড়া লাউ বা চালকুমড়ো গাছ। চালকুমড়ো দেখে তার মনে পড়লো, ‘যদি চালকুমড়োর মতো চালে ধরে পানতুয়া র’ত শত শত৷ আমি পেড়ে যে খেতাম’ গানখানি।
একখানা টিনের বাড়ির সামনে রাস্তায়, উঠোনে, লোকের জটলা৷ তাদের মধ্যে নানা বয়সের কতকগুলো ছেলেও রয়েছে। একজন বয়স্ক লোক আর একজনকে বলছে, ‘গাঁয়ে আগে সিধ কেটে চুরি হতো না। পাকের ঘরে ঢুকে পান্তা খেয়ে হাঁড়িতে অপকর্ম করেছে, কিন্তুক সিধ দিয়ে ঘুমন্ত মানুষের গলার হার কেটে নিয়েছে এমন শুনিনি।’
ঘরে ঢুকে অপর লোকটি বললে, ‘হারটা যখন কাটছিল তখনও হুঁশ হলো না? একটু লড়া-চড়া করলেই তো চোরটা পালাতো। মাটিতে পায়ের ছাপ আছে? - দারোগাবাবু কি বলছেন?’
—‘ভিড় ঠেলে কি কাছে যেতে পারছি যে, কি বলছেন বলবো?’
—‘আমার কি মনে হয় জানো? রসময়ের বউটা টের পেয়েছিল, ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। হাতে ছুরি-কাঁচি দেখলে কে না ডরায়? ও তো মেয়ে-ছেলে।’
এক জায়গায় বাঁশতলায় এক চাষী-বউ ঝাঁট দিয়ে শুকনো বাঁশপাতা জড় করছিল। জায়গাটা ধুলোয় অন্ধকার, যেন ধোঁয়া ঢাকা৷
ভোম্বল তাড়াতাড়ি এগিয়ে চললো। পোয়াটাক গিয়েই দেখলে পথটা সেখানে বাঁক নিয়েছে। বাঁকের মুখে একখানি মুদির দোকান। তারপরই একটা পাড়া-পাড়ার একপাশে মস্ত এক উঁচু পাড় পুকুর। ঐ দোকানখানাই বোধহয় কানাই পালের। আর ঐ যে ট্যারা লোকটা উবু হয়ে বসে দাঁড়ি-পাল্লায় ঠোঙায় কি ওজন করছে, ও-ই বোধ হয় কানাই পাল! দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দু-তিনটি খদ্দের। একজনের হাতে গলায় দড়ি কালো রঙের বোতল। সবারই কাপড় ময়লা। মাথায় চূড়া, মুখে দাড়ি, পায়ে নূপুর, গায়ে আলখাল্লা, বগলে গুপীযন্ত্র এক বাউল তার পাশ দিয়ে ঝুমুর ঝুমুর শব্দ করতে করতে চলে গেল—তার পিছন পিছন দুটো লোক যেতে যেতে বললে ‘পালের দোকান বেশ জমে উঠেছে। আগে নুন-তেল সওদা করতে যেতে হতো সেই আড়ানি, কুণ্ডুর দোকান।’
অপর লোকটা বললে, ‘পাল দামটা একটুক বেশী নেয়।’
তাদের কথা ভোম্বল আর শুনতে পেল না। সে এগিয়ে চললো। পথটা যেন সদ্য তৈরী। দু'পাশে গাছ-গাছালি -বেশী উঁচু নয়। তার পর বাড়ি-ঘর, মাঠ, ক্ষেত, বাঁশঝাড় ক্রমেই সে সব পাতলা হতে হতে এক জায়গায় মিলিয়ে গেছে। ঐ দূরে গ্রাম, যগা বারুই যার নাম বলছিল, ভালদে। ওরপর নাকি চৈতনপুর শেষ হয়েছে সেই মাথাভাঙা তীরে। নদী পারে আবার পথ৷ তারপর কি গাঁ কে জানে। পথটার দিকে তাকিয়ে ভোম্বলের মন হু-হু করে উঠলো।
এদিকে সূর্য মাথার ওপর ওঠে ওঠে। অগত্যা সেখান থেকে সে ফিরে চললো এবং যগা বারুইয়ের সঙ্গে হরনাথের দোকানে যখন পৌঁছলো; সাড়ে বারোটার গাড়িখানা তখন স্টেশন ছেড়ে ভ্যাস্ ভ্যাস্ করতে করতে কলকাতার দিকে চলেছে। জানালায় জানালায় যাত্রীদের দেখা যাচ্ছে। চাকার শব্দ হচ্ছে, ঘ্যাটু ঘ্যাট্ ঘ্যাট্।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন