চরমাদারীপুরের বাজারে

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

বারোয়ারিভলা থেকে বাজার বেশ খানিকটা দূর।

কাঁচা-পাকা পথটি ঘুরে-ফিরে চলে গেছে সেদিকে। পথের দু'পাশে ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড়। তার কোলে কোলে গৃহস্থের ঘর-বাড়ি, ধানের গোলা, বিচালির গাদা, তরি-তরকারির বাগান, বাঁশঝাড়, কলার ঝাড় ও আম-কাঁঠাল-জামের বড় বড় গাছ। কোন কোন বাড়ির ঘরের চালে উঠেছে লাউ-কুমড়ো লতা।

একখানি বাড়ির পিছন দিকে বাগানে বেগুন-ক্ষেতে একটি বউ বেগুন তুলছিল। তাদের দেখেই সে মাথার ঘোমটাটি আরও খানিকটা টেনে দিয়ে পিছন ফিরে দাঁড়াল। তার হাতের কালো বেগুনটি আঁচলের ফাঁকদিয়ে উঁকি দিতে লাগল। পথের ধারে এক জায়গায় একটি লোক বৈঁচিগাছ কেটে ছড়ি তৈরি করছিল। তার পাশেই একজন আঁকষি দিয়ে ডুমুরগাছ থেকে ডুমুর পাড়চে। তারা নায়েবমশাইকে দেখে হাতের কাজ রেখে সালাম দিলে এবং ভোম্বলের দিকে সকৌতূহলে তাকাতে লাগল। ভোম্বলদের বিপরীত দিক থেকে আসছিল একখানি বিচালি-বোঝাই গরুর গাড়ি। বিচালি-পালার ওপর ছাতা মাথায়, চাদর গলায়, পা ছড়িয়ে বসে ছিল একটি লোক। সে বোধহয় ঘুমোচ্ছিল, গাড়োয়ানও বোধহয় ভিনগাঁয়ের, তাই উঁচু-নিচু না দেখেই পথের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আসছিল।

বগা হাঁক দিয়ে উঠল, “এই পাজী, চোখে দেখিস্ নে? পাশ কর্—” পালার ওপর যে লোকটি বসেছিল সে এবার চমকে উঠল। সামনের দিকে তাকিয়েই তাড়াতাড়ি ছাতাটি বন্ধ করে গাড়োয়ানকে বললে, “একধার কর—একধার কর্—”

গাড়োয়ান শশব্যস্ত হয়ে ডানধারের বলদটার তলপেটে লাথি মেরে, লেজ মলে, পিঠে ঘন ঘন বাড়ি দিয়ে বাঁ-ধারের বলদটাকে দু-একটা খোঁচা লাগিয়ে গাড়িখানি একপাশ করলে বটে কিন্তু তার সেদিককার ঢাকাখানি হাত দুই লম্বা একটি খালে পড়ে কাৎ হয়ে গেল, আর গাড়ির সামনের দিকটা গিয়ে ঢুল পাশের বাগানখানির বেড়ার ভেতর।

নায়েমশাই যেমন চলছিলেন তেমনি সোজা চলতে লাগলেন, বগা যেমন ছাতা ধরেছিল, তেমনি ছাতা ধরে রইল। কিন্তু ভোম্বল চঞ্চল হয়ে উঠল। সে চলতে চলতে পিছন ফিরে দেখে আর ভাবে, তারা তিনজনে তো গাড়ির পাশ কাটিয়ে যেতে পারত, গেল না কেন?

সে খানিক গিয়ে আবার ফিরে দেখে, গাড়োয়ান গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। কিন্তু তারা বাঁদিকে মোড় ঘুরতেই গাছপালায় সব ঢাকা পড়ল । সমুখে একটা প্রকাণ্ড পুরনো পুকুর। তার তিন দিকে খড় ও টিনের ঘর-বাড়ি, একদিকে ঝোপ-ঝাড়; একটি আমড়া ও একটি সজনে গাছ। সেদিকেই ঘন শালুকবন। পুকুরের একদিকে কয়েকটি লোক স্নান করছিল। তাদের কাছ থেকে কিছুদূরে একখানি ঘরের পিছনে একটি ছেলে হাত-ছিপ ফেলে বসে ছিল। তার পাশেই বসেছিল একটি ছোট মেয়ে। ভোম্বলরা পুকুরটা ছাড়িয়ে যেতে যেতেই ছেলেটি হঠাৎ একটি মাছ তুলল। মাছটি বোধ হয় পুঁটি; রোদে এক টুকরো রুপালির মতো। ধরধর করে কাঁপতে লাগল।

বাড়িগুলোর পরে একখানি ছোট মাঠ। মাঠে কতকগুলো ভাঙা কানেস্তারা, পোড়া হাঁড়ি, থানকতক পুরনো বাঁশ পড়েছিল। মাঠের শেষদিকে চরছিল কয়েকটি বুনো পায়রা। কি কারণে হঠাৎ তারা উড়ে শূন্যে উঠে একবার ঘুরপাক দিয়ে একদিকে চলে গেল। ভোম্বলরা যাচ্ছিল সেই দিকেই।

আর একটু গিয়েই শুরু হল বাজার। রাস্তার দু'পাশে আলকাতরা মাখানো টিনের ঘরের সারি ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে। তারই মাঝে দু-একখানি দর্জির দোকান। দোকানের সামনে কালো সাইনবোর্ডে লাল অক্ষরে লেখা “বিলাতালি ব্রাস্। হরেক রকম পোশাক পাওয়া যাইবেক।” সাইনবোর্ড খানি হয়তো “বিলাতালি ব্রাসের” স্বহস্তে লেখা। বোর্ডের বানান ও লেখা দেখে ভোম্বলের হাসি পেল। দোকানের সামনে হ্যাঙারে টাঙানো ছিল দু'টি ছিটের কামিজ ও কালো ফিতে বসানো লাল রঙের একটি ছোট ঘাগরা। বাতাসে সেগুলি ঘুরপাক দিচ্ছিল। ভেতরে একধারে আধময়লা গেঞ্জি গায়ে একটি যুবক পা-কল চালাচ্ছিল। আর একধারে কাঁচভাঙা ও ধুলোমাথা একটি আলমারির সামনে একখানি তক্তাপোশে উবু হয়ে বসে একখানি প্রকাণ্ড কাঁচি দিয়ে জামা কাটছিল একটি লোক। লোকটির মাথায় চুলগুলো চৌদ্দ আনা দু'আনা অনুপাতে ছাঁটা—বোধহয় মাথায় বাটি বসিয়ে ছেঁটেছে—মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, গায়ে বুটিদার আদ্দির পাঞ্জাবি, পরনে ডোরাকাটা লাল-কালো লুঙি, ঠোঁটের একপাশে আধ-পোড়া সিগারেট। তার পাশে একটি ছোকরা আঙুলে ঠোস পরে একটি জামায় বোতাম টাঁকছিল।

যে লোকটি জামা কাটছিল সে হঠাৎ রাস্তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েই মুখের সিগারেট, হাতের কাজ ফেলে তাড়াতাড়ি চৌকি থেকে নেমে নায়েবমশাইকে সালাম দিয়ে বললে, “আসেন হুজুর!”

ভোম্বলরা তখন তাদেরই দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সে বুঝতে পারলে না, কে বিলাতালি আর কারা তার ব্রাস।

নায়েমশাই কিন্তু দোকানে ঢুকলেন না; বাইরে থেকেই জিজ্ঞেস করলেন, “তৈরী কামিজ আছে, ওস্তাগর?”

সেই লোকটি একবার তাঁর দিকে, একবার ভোম্বলের দিকে তাকিয়ে বললে, “ঐ খোকার গায়ের? আছে। তবে পছন্দ হবে কি? দোকানে একবার পায়ের ধুলো দিলে দেখাই।”

বগা বললে, “ওনার বসবার মতো জায়গা আছে ভেতরে?”

তার কথায় কারা যেন পিছনে হেসে উঠল। ভোম্বল ফিরে দেখে কয়েকটি লোক যেন দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে।

ওস্তাগর আলমারির মাথা থেকে তাড়াতাড়ি একখানি রেশমের চাদর পেড়ে নিয়ে তাই দিয়ে সতরঞ্জির ধুলো ঝাড়তে লাগল। যে ছেলেটি জামায় বোতাম আটকাচ্ছিল সে জামাটি গুটিয়ে নিয়ে নেমে দাঁড়াল, যে কল চালাচ্ছিল তার হাত-পা যেন আড়ষ্ট হয়ে গেল।

নায়েবমশাই ভেতরে গিয়ে তক্তাপোশের ওপর বসলেন। ভোম্বল বসল তাঁর পিছনে।

ওস্তাগর আলমারি খুলে একটি জামার বাণ্ডিল বার করে তার গেরো খুলতে খুলতে বললে, – “আপনার দোয়ায় তৈরী মাল থাকে না। তবে পুজোর পরব বলে কয়েকটা কামিজ বেশী তৈরি করেছিলাম।”

সে বাণ্ডিল থেকে সাদার ওপর কালো ডোরা কাটা, চুড়িদারহাতা, কেপকলার একটি কামিজ বার করে নায়েবমশাইয়ের সামনে মেলে দিলে।

নায়েমশাই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন,— “এ কি কামিজ? ছিটটা ভালো নয়—”

কিন্তু ভোম্বলের অনেক দিনের ইচ্ছা ঐ রকম ছিটের পাঞ্জাবি-কাট কামিজ পরে। তবুও সে মনের ইচ্ছা প্রকাশ করতে সাহস পেল না।

নায়েমশাই তার দিকে ফিরে বললেন,—“কি রে! এটা পছন্দ হয়?”

ভোম্বল তাড়াতাড়ি ঘাড় নাড়ল।

নায়েবমশাই বললেন,—“তবে পরে দেখ।”

ভোম্বলকে আর দ্বিতীয়বার বলতে হল না। সে গায়ের চাদর খুলে ফেলে কামিজটি গায়ে পরতে লাগল।

ওস্তাগর তাকে সাহায্য করতে করতে বললে,—“হুজুর, হুকুম দিলে, মাপ নিয়ে ওবেলার মধ্যেই একজোড়া বানিয়ে দিতে পারি। ভালো ছিট আছে। হরদেব কাঁইয়াও হরেক রকমের ছিট এনেচে।” বলে সে আগ্রহভরে নায়েমশাইয়ের মুখের দিকে তাকাল।

নায়েমশাই বললেন,—“ঐ রকমের আর একটা থাকে তো দাও, কিন্তু তোমার ঐ পাঞ্জাবি-কামিজে মেলানো নয়। একেবারে খাঁটি কামিজ চাই। ঐ যে তোমার ঘি-রঙের ছিটটা, ওরই দু'টো দিও। কত পড়বে?”

—“দামের জন্যে কি? সে আপনি যা দেবেন।” বলে ওস্তাগর ভোম্বলের গায়ের কামিজটি ভাঁজ করে বগার হাতে দিলে। তারপর তার গায়ের মাপ নিয়ে পেন্‌সিল দিয়ে খাতায় লিখে ফিতেটি গোল করে পাকাতে লাগল। ওস্তাগরের হাতের লেখা ও বানান দেখে ভোম্বল মনে মনে হেসেই সারা।

দোকান থেকে তারা বার হতেই বগা বললে,— “লোকটা পাকা কারিগর! ওর চাচা কলকেতার এক সাহেবের দোকানে দর্জির কাজ করে। শুকেও সেখানে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। ও গেল না।”

নায়েমশাই জিজ্ঞেস করলেন,—“কেন?”

—“ও বললে, পরের গোলামি করবে না।”

—“হুঁ” বলে নায়েমশাই অন্যদিকে মুখ ফেরালেন। হরদেব কাঁইয়ার দোকান সেখান থেকে চার-পাঁচখানা দোকান পরে। বিলাতালি ব্রাসের দোকান থেকে বার হতেই নায়েবমশাইয়ের পিছু নিয়েছিল কয়েকটি লোক। ভোম্বল ফিরে দেখলে, তাদের সবায়ের খালি পা, খালি গা, গলায় ময়লা চাদর, বগলে ভাঙা পুরনো ছাতা, বাঁটে ময়লা গামছা জড়ানো। একজনের ছাতার ওপরে সাদা কাপড় বসানো, কিন্তু তাও কালো হয়ে দু-এক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। লোকটির মুখে পাকা দাড়ি, মাথায় পাকা চুল, ভ্রূজোড়াও পাকা। সে নায়েবমশাইকে বললে,—“হুজুর!”

বগা ধমক দিয়ে উঠল,— “এখানে কি? কাছারিতে যেও।”

বুড়ো কাতরভাবে বললে, —“সেই ময়নাগাড়ি থেকে এয়েচি। কাছারি বোন্দ।”

বগা বললে, —“আজ বাদে কাল কবরে যাবা, এখনও তোমার গেয়ান হল না? জানো না লক্ষ্মীপুজো অবধি কাছারিতে পুজোর বোন্দ? কোন্ রাজ্যে বাস কর? এলে কেন?”

বুড়ো বললে —“বড় ঠেকা একেবারে পথে বসব।”

নায়েবমশাই বললেন, —“আচ্ছা, এখন তো হবে না, খাওয়া-দাওয়া করে দুপুরের দিকে যেও—”

ভোম্বল বুঝতে পারলে না, ওরা কোথায় খাওয়া-দাওয়া করবে? এখানে কি হোটেল আছে? বুড়োর কাতরতায় তার মন বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। অনেক দিন আগের একখানি ছবি তার মনের চোখে ভেসে এল। তখন সে ছোট; মামার বাড়ির বুড়ো দাদুর হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়। তখনকার সব কথা ঠিক ঠিক মনে পড়ে না। দাদু একদিন বিকেলে একটি বাড়িতে তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। মনে পড়েছে, বাড়িখানি কোঠা; তার একখানা ঘরে ফরাসে বসেছিল কয়েকটা কালো, মোটা লোক। তাদের মধ্যে একটা লোক তামাক খাচ্ছিল।

দাদু তারই সঙ্গে কথা বলেছিলেন। একটা কথা তার বেশ মনে পড়ে। দাদু তাকে দেখিয়ে লোকটিকে এমনি কাতরভাবে বলেছিলেন—“এই সব শিশু নিয়ে পথে বসব। আমায় মারবেন না।”

লোকটা কি উত্তর দিয়েছিল তার মনে নেই—কিন্তু তার বিশ্রী, বড়, কালো মুখখানার ছবি এখনও মনে আছে। একদিন অন্ধকার ঘরে খোলা জানলার ধারে একটা পোড়া কালো তোলো হাঁড়ি দেখে সেই লোকটিকে তার মনে পড়েছিল! দাদু তাকে নিয়ে বাড়ি আসতে আসতে পাঞ্জাবির হাতায় চোখ মুছেছিলেন।

বুড়ো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে লোকগুলোর সঙ্গে ফিরে গেল।

দু-একখানা দোকান পার হতেই ডাইনে-বাঁয়ে সালাম ও হুজুর সম্বোধন। একে শরতের কড়া রোদ, তার ওপর পথশ্রম, তারও ওপর এই উত্তেজনা। ভোম্বল ঘেমে নেয়ে উঠল। তার গাঁ থেকে অমন পাতলা মোলায়েম চাদরখানিকে খুলে ফেলতে ইচ্ছা হতে লাগল। কিন্তু তার কাকা তো দিব্যি চলেছেন। সে তাঁর মুখ দেখতে পেল না বটে কিন্তু তাঁর চালচলনে মনে হল, তিনি এদের ভ্রূক্ষেপও করছেন না, যেন পাথরের দেবতা।

এমন সময় পথের বাঁধার থেকে একটি চাঁছাছোলা গলা বলে উঠল, “নায়েবমশাই নাকি? নমস্কার।”

ভোম্বল ফিরে দেখে, একখানি টিনের চালার বারান্দায় দাঁড়িয়ে, গায়ে কালো ছিটের কেপকলার কোট, মাথায় কালো রঙের মস্ত টাক, মুখে খেজুর কাঁটার মতো গোঁফ একটি মোটা লোক হাতজোড় করে হাসচেন। তাঁর মুখের ওপর পাটির সামনের দু’টি দাঁত নেই। আর, চালাটির চেঁচ থেকে একখানি কালো রঙের সাইনবোর্ড ঝুলছে। তাতে ইংরেজীতে লেখা ‘হরকালী ড্রগিস্ট হল।’ আর তার তলায় লেখা 'ডা: হরচন্দ্র চৌধুরী এল এম এস’। অক্ষর তিনটির আগেও একটি অক্ষর কাদার তলা থেকে উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু অক্ষরটি ঠিক কি তা ভোম্বোেল বুঝতে পারলে না। একবার মনে হলো, 'ভি'

নায়েবমশাই ঘরখানার দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতজোড় করে প্রতি নমস্কার করে বললেন,—“কেমন হচ্ছে, ডাক্তারবাবু ?”

ডাক্তারবাবু বললেন,—“আসুন। তামাক খেয়ে যান! ওরে নদের চাঁদ—”

—“না-না —দরকার নেই। বেলা হয়ে গেল। কেনাকাটা আছে। কাজও মেলা৷ ঠাকুর দেখতে যাবেন?”

–“নিশ্চয়! কিন্তু এত কেস্ যে সময়ই পাচ্ছি না। সঙ্গে ওটি কে? আপনার সেই ভাইপোটি?"

–“ওর জামা-কাপড় কিনতেই বেরিয়েচি। আচ্ছা, কাজ সারুন” বলে নায়েবমশাই আবার চলতে লাগলেন।

ভোম্বল অবাক হয়ে গেল। তার কাকা এতক্ষণ ছিলেন পাথর, এখন এঁর কাছে হলেন মোম! নায়েবের চেয়ে কি ডাক্তার বড়? না-হলে তিনি এমন হয়ে যাবেন কেন?

ডাক্তারখানাটির সামনে ভোম্বল যতটুকু সময় ছিল ততটুকুর মধ্যেই তার নাকে এল ওষুধের—অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ-আরকের মিশ্র গন্ধ, চোখে পড়ল একখানি বেঞ্চিতে গায়ে মাথায় মোটা ময়লা, চৌখুপী চাদর ঢাকা কয়েকটি পুরুষ, মেঝেয় শিশু কোলে একটি নারী, বাইরে বাঁশবাঁধা কাঁচা বারান্দার এক কোণে নোলক-পরা হাতে রুপোর খাড়ু একটি বউ এবং তারই পাশে মাথার কাপড় দিয়ে বসে আছে এক বুড়ী।

চালাখানি একটি চাটাইয়ের বেড়া দিয়ে দু'ভাগ করা। ছোট ভাগটির ভেতর থেকে আসছে ঘটর্ ঘটর্ শব্দ একবার টুং টুং শব্দ হল যেন শিশি-বোতলে ঘা লাগল। যেন কে, কি, খলে গুঁড়ো করছে। ভোম্বল ঘরখানার সামনে থেকে সরে রাস্তার মাঝখানে আসতেই তার চোখ পড়ল ডান দিকে। দেখলে, সেদিকে রাস্তার ধারে একটি বড় কাঁঠালগাছতলায় ওলা হয়ে রয়েছে একখানি ছইওয়ালা গোরুর গাড়ি। গাড়োয়ান গাড়িতে পা নিচের দিকে মাথা ওপর দিকে দিয়ে লম্বা হয়ে দিব্যি ঘুমোচ্ছে আর বলদ দু'টি শুয়ে চোখ বুজে জাবর কাটছে। ঐ গাড়িতে দূর গাঁ থেকে ডাক্তারবাবুর কাছে হয়তো কোন রোগী এসেছে। ডাক্তারখানার বারান্দার ঐ বৌটিও হতে পারে।

আর, কাঁঠালগাছটির গুঁড়িতে মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা শিরদাড়াওঠা একটা লাল রঙের ঘোড়া। ঘোড়াটার পেট মোটা, চোখে পিঁচুটি, থেকে থেকে লেজ নাড়চে। বোধহয় ডাক্তারবাবুর ঘোড়া। তার কাছ থেকে হাত কয়েক দূরে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে লালের ওপর সাদা ছাপ ওরই পুরুষ বাচ্ছাটি। বড় হলে ও হয়তো ওর মায়ের মতো ডাক্তারবাবুর ঐ মোটা শরীরটাকে পিঠে নিয়ে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরবে! তখনও কি ডাক্তারবাবু ওর বুড়ী মাকে বসিয়ে বসিয়ে ঘাস-জল খাওয়াবেন, না, ঘোড়াটা শহরে গিয়ে ছ্যাকরা গাড়ি টানবে?

ভোম্বলের মাথায় এক শয়তানী বুদ্ধি খেলে গেল। সে বাচ্ছাটিকে তাড়া দেবার উদ্দেশে রাস্তা থেকে একটি ছোট ঢিল কুড়িয়ে নেবার জন্যে নিচু হতেই নায়েবমশাই ও বগা এক সঙ্গে হঠাৎ পিছন ফিরে তাকালেন। ভোম্বলও তা দেখতে পেয়ে এমন ভান করলে যেন তার ডান পায়ে ঢিলটা ফুটে ছিল।

বগা বললে, “কি হল হুজুর? পায়ে খোয়া বিঁধল?”

মুখে সহিষ্ণুতা ও বীরত্বের ভাব ফুটিয়ে তুলে ভোম্বল বললে, “না—আঃ।” এবং একটু খোঁড়াতে লাগল।

নায়েবমশাই বললেন, “চল, আগে আবদুলের দোকানে গিয়ে তোমার জুতো কিনে দি। তারপর কাঁইয়ার দোকানে যাব।”

রাস্তার সেখান থেকে একটি সরু গলি চলে গেছে ডান দিকে। নায়েবমশাই সেদিকে চললেন। ভোম্বলও চলল তাঁর পিছন পিছন

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%