খগেন্দ্রনাথ মিত্র
গলিতে ঢুকতেই তামাকপাতা ও চিটেগুড়ের গন্ধ লাগল ভোম্বলের নাকে। বাঁ-ধারে একখানি প্রকান্ড কালো টিনের ঘরের দরজায় ও তার টিনের বেড়ার ধারে পড়ে ছিল চিটেগুড়ের কতকগুলো খালি ঝুড়ি। ঘরখানার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটি বলিষ্ঠ কালো লোক। তাদের পায়ে ও হাতে চিটেগুড় মাথা, ঘামে সারা গা ভিজে। ঘরখানা চিটেগুড়ের গোদাম।
লোকগুলোর একজন গলিতে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলে, “ওগো সাজিমাশা! কোথা গেলে? এ ভালো তামাশা। মাল গুদামজাত হল আর দেখা নেই।”
নায়েবমশাই বগাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা নিতাই সা’র আড়ত না?”
বগা বললে, “হাঁ হুজুর। সাজিমশাই তামাকপাতাও আমদানি করছেন। এখন লাখপতি।”
নায়েবমশাই উত্তর দিলেন না, বিপরীত দিকে মুখ ফিরিয়ে চলতে লাগলেন। সেদিকে ছিল টিনের কয়েক সারি ছোট ছোট চালা। তারপর কয়েকটা ফাঁকা জায়গা, আবার টিনের চালার সারি; তারপর বাড়ি-ঘর, বাগান ও একটি প্রকাণ্ড অশ্বত্থগাছ। ভোম্বল অনুমান করলে ওখানে হাট বসে। এখন চার-পাঁচটি কুকুর বৃথা ঘুরে বেড়াচ্ছে; পরস্পরের গা শুকচে। একটি কালো রঙের ছাগল তার ছানা দু'টিকে নিয়ে অশ্বত্থ গাছের তলায় ঘাস খাচ্ছে। তার ওধারে একখানি বাড়ির পিছনে দু'টো মোরগ হঠাৎ লড়াই শুরু করে দিলে। হাট ছাড়িয়ে খানিক দূর গিয়ে ভোম্বল দেখলে, দু'টো ছুতোরমিস্ত্রি গোরুর গাড়ির চাকা তৈরি করছে, খান কয়েক তৈরী চাকা বেড়ার গায়ে হেলান দিয়ে রাখা আছে।
বগা বললে, “হুজুর, আজ আপনাকে ভারী মেহনৎ করতে হল। পালকিতে এলে এতক্ষণ কাজ সেরে ফিরে যেতে পারতেন।”
নায়েমশাই বললেন, “চলাফেরা করাও তো দরকার। ঐটে আবদুলের দোকান নয়?”
—“আজ্ঞে” বলে বগা একবার পিছন ফিরে তাকাল। ভোম্বল দেখলে, সেটি দোকান নয়, জুতোর কারখানা। জন চার-পাঁচ হিন্দুস্থানী মুচি সেলাই করছে, চামড়া কাটছে, পিটচে। একজন মাটির গামলার ময়লা জলে নেতি ভিজিয়ে নতুন জুতোর সুকতলায় ঘষচে। তাদের সবাইয়েরই পরনে ময়লা কাপড়। একজনের চোখে স্টীলের চশমা। লোকটি বুড়ো। ভেতরে যন্ত্রপাতি, চামড়া, লাস, সুতোর গুলি, মোম ইত্যাদি ছড়ানো। আড়া থেকে ঝুলছে কয়েক জোড়া বার্নিশের জুতো। ভেতর থেকে আসছে চামড়া, কাই, সিরিশ, মোম ও ঘামের মিশ্র ভ্যাপসা গন্ধ!
বাইরে রোদে রয়েছে লাস ভরা কয়েক জোড়া জুতো।
ভোম্বল নিজের মনেই নিজেকে প্রশ্ন করলে, “যারা জুতো তৈরি করে তারা সকলেই হিন্দুস্থানী কেন?” দুর্গাপুরেও সে একজনও বাঙালী মুচিকে দেগেনি। তবে ঢাকী-ঢুলীরা সব বাঙালী মুচি বটে। কেন এমন হয়? কিন্তু তার আরও অনেক প্রশ্নের মতো এটিরও জবাব সে পেলে না।
আবদুল দোকানেই ছিল। লোকটি যেমন মোটা, তেমনি লম্বা, মুখখানা বড় ও গোল, নাকটি ভোঁতা। মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, মাথায় কাঁচা-পাকা চুলের মাঝখান দিয়ে পরিষ্কার টেরি। তার গায়ে গেঞ্জি, পরনে নীল লুঙ্গি। যে লোকটি পা-কলে জুতোর সাজ সেলাই করছিল সে তার পাশে দাঁড়িয়ে পান চিবোতে চিবোতে একটি সাজ পরীক্ষা করছিল। তার নিচের ঠোঁটের এক কোণে একটু চুন লেগে আছে।
বগা রাস্তা থেকে হাঁক দিলে, “ওগো মিয়া—”
আবদুল চোখ তুলে তাকিয়েই হাতের সাজটি তাড়াতাড়ি কলের টেবিলে রেখে নায়েবমশাইকে বললে, “সালাম হুজুর। কি হুকুম”
নায়েবমশাই বললেন, “এর পায়ের এক জোড়া শু দিতে পার?”
আবদুল ঝোলানো জুতোগুলোর দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে হাঁক দিলে, “এই ফকা! ফকা—আ!” এবং একখানি টুল বাইরে পেতে তার ওপরটা হাত দিয়ে মুছে নায়েবমশাইকে বললে, “বসেন হুজুর।”
কারখানার পিছন দিকে বোধহয় আবদুলের বাড়ি। সেদিক থেকে এল এক যুবক। তার মুখখানা চৌকো, মাথাটি সামনে-পিছনে লম্বা খড়ে-ছাওয়া বাংলা ঘরের চালের মতো, কিন্তু রং কটা, মুখের গোঁফ কটা, চোখ কটা। তার পোশাক সাহেবের মতো—গায়ে কালো আলপাকার কোট, গলায় ছিটে কোকিলের গায়ের মতো টাই, তলায় ডবল ব্রেস্টশার্ট, পায়ে কালো বুট, কেবল পরনে কালাপেড়ে ধুতি মালকোঁচা দিয়ে পরা।
সে আসতেই আবদুল বললে, “ভেতর থেকে দু'জোড়া পাঁচ নম্বর পেটেন্ট লিয়ে আ। ঐ পা—” বলে সে ফকাকে ভোম্বলের পা দেখিয়ে দিলে।
নাম শুনে ও চেহারা দেখে যুবকটির আরও খবর জানতে ভোম্বলের বড় কৌতূহল হল। নায়েবমশাই না থাকলে তা জানা যেত বটে তবে বগার দুটি-চারটি কথা থেকে ভোম্বল আন্দাজে বুঝে নিলে, যুবকটির নাম ফকর উদ্দিন। সে চরমাদারীপুর হাই স্কুলের ফার্স্ট ক্লাসে কয়েক বছর ধরে পড়ছে। আবদুলের ভাইপো সে। যার ছেলে সে মরে গেছে, আবদুলেরও ছেলেমেয়ে নেই।
ফকা জুতো আনল। কিন্তু যে পায়ে সচরাচর জুতো ওঠে না, যে পা দু'খানি জল-কাদা ভেঙে, মাঠের পর মাঠ, পথের পর পথ পার হয়ে চলে এতদূর এসেছে, সে পায়ে নরম পেটেন্ট চামড়ার জুতোও কি সহজে লাগে? সে পা যেমন শ্রীহীন, তেমনি তার যেন কোন মাপও নেই।
আবদুল ঝোলানো জুতোগুলোর মধ্য থেকে এক জোড়া পেড়ে নিজের পাছায় একবায় ঘষে জুতোয় জুতোয় চটাৎ করে ঘা দিয়ে বললে, “বেয়াড়া পা!”
ভোম্বলের বড় হাসি পেল। লোকটা বলে কি? ছেলেরাই বেয়াড়া হয়, পাও যে বেয়াড়া হয়ে থাকে তা তো সে কোনদিন শোনে নি! পায়ের কি মানুষের মতো মন আছে? সে মনে মনে হাসল।
অবশেষে আব্দুলের চেষ্টায় ডার্বিকাট ব্রাউন জোড়াটির চামড়ার বাঁধনে ভোম্বলের বেয়াড়া পা দু'খানি বাঁধা পড়ল। অমনি তার মনে জুতো জোড়াটির জন্যে জেগে উঠল মায়া। সে বগার হাতে না দিয়ে জুতো জোড়াটি নিজেই বগলদাবা করে নিয়ে চলল! আর, জামার দামের মতো জুতোর দামও হয়ে রইল, “হুজুর যা দেবেন।”
যে পথে তারা এসেছিল সে পথেই চলল ফিরে। কারখানার ধার দিয়ে, হাটের পাশ দিয়ে, চিটেগুড়ের আড়তের সমুখ দিয়ে, সেই কাঠের টিনের ঘরগুলোর কোলে ছেঁচের সংকীর্ণ শীতল ছায়ায় ছায়ায়। গলির মোড় ছাড়িয়ে ডান দিকে পথের পাশে ছিল একটি ঝাঁকড়া আমগাছ। তার তলায় ছিল একখানি খালি ডুলি। বেহারারা বসে কার যেন প্রতীক্ষা করছিল। ভোম্বলের মনে পড়ল, তাদের দুর্গাপুরের ওপারের, চর ভেঙে এমনি ডুলি আসে। তার মধ্যে বউ থাকে। তার পরনে রাঙা ডুরে ডুরেখানি দিয়ে সে এমনভাবে জড়ানো থাকে যে, তার মুখ দেখা যায় না। একবার যে একটি বউ দেখেছিল, কালো, ছোট্ট, রোগা আট-ন' বছরের একটি মেয়ে। তার মাথায় সিঁদুর কপাল থেকে সেই ব্রহ্মতালু অবধি রাঙা রেখার মতো উঠে গেছে । মেয়েটির মুখখানি লম্বা, চোখ দুটি বড়, নাকটি টিকলো, নাকে নোলক দু'কানে মাকড়ি। মেয়েটি খুব কাঁদছিল। তাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল দুটো ষণ্ডালোক, আর ডুলির পিছন পিছন আসছিল গলায় চাদর, হাতে লাঠি একজন। তারও চেহারা লম্বা-চওড়া। কিন্তু বউগুলো কাঁদে কেন? ঘর-বাড়ি ছেড়ে যেতে কষ্ট হয় বলে? কিন্তু ভোম্বলের তো কষ্ট হয় না, বরং নতুন জায়গায় যেতে তার বড় আনন্দই হয়। তাই তো সে ঘর ছেড়ে বেরিয়েচে, চলেছে দূর দেশে।
অমনি ভোম্বলের মনে হল, সে কি আর যেতে পারবে না? তাকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে? সে কারিগর হতে পারবে না কি? টাটানগরের কারখানা, সেই যন্ত্রের স্বপ্নপুরী, যেখানে বিশ্বকর্মা দিন-রাত বিরাট চুল্লী জ্বেলে কালো ধোঁয়ার নিশান আকাশে উড়িয়ে দিয়ে গড়ার কাজে ব্যস্ত, সেখানে সে পারবে না যেতে?
ভোম্বল চোখ খুলে হেঁটে চলেছিল বটে কিন্তু তার মন ছিল অনেক দূরে। তাই সে কাছের কিছু দেখেও দেখছিল না। মন তখন চলে গিয়েছিল মাঠ ছাড়িয়ে, গ্রাম ছাড়িয়ে, শহর ছাড়িয়ে পাহাড়ের কোলে, শালবনের ধারে। সেখান থেকে তার এক বন্ধু চিঠিতে জানিয়েছিল, সেখানে রাঙা পথের ধারে আছে ছোট ছোট নিঝুম গ্রাম। সে পথে চলে কালো মানুষেরা। তাদের মাথায় বাবরি, পরনে কটিবাস, হাতে বাঁশের বাঁশি। তারা চলে আর বাঁশি বাজায়। তাদের সঙ্গে হাসতে হাসতে চলে কালো মেয়েরা। তাদের পরনে রাঙাপেড়ে মোটা শাড়ি, কানে গোঁজা রাঙা বা হলুদ রঙের ফুল, মাথায় বাঁকা এলো খোঁপা, দেহে স্বাস্থ্য ধরে না। মানুষগুলো কিন্তু তীর-ধনুক চালাতে ওস্তাদ।
হঠাৎ “আসেন—আসেন” ডাকে ভোম্বলের চমক ভাঙল। দেখলে, তারা তিনজনে এক কাঁইয়ার একেবারে দোকানের সামনে এসে পড়েছে।
দোকানখানি একতলা দালানের একটি ঘরে। ভিতরে কাঠের র্যাকে থাকে থাকে নতুন কাপড় ও ছিট সাজানো। একধারে বসে ছিল একটি ভদ্রলোক আর একধারে চার-পাঁচটি চাষী। তাদের মাঝখানে মাথায় পাগড়ি, কানে ছোট মাকড়ি শেঠজী মহারাজ শিবাজীর মতো হাঁটুমুড়ে বসে। এই দোকানখানির পর আরও পাঁচ-ছয়খানি কাপড়ের দোকান। সবই কাঁইয়াদের। জায়গাটি নতুন কাপড়ের মিঠে গন্ধে ভরপুর।
ভোম্বলদের দুর্গাপুরের বাজারেও কাঁইয়াদের অনেক দোকান আছে। ওরা হল মারোয়াড়ি। কিন্তু সবাই পরিষ্কার বাঙলা বলতে পারে।
নায়েবমশাই একটু এগিয়ে যেতেই কাঁইয়া হাতজোড় করে হেসে আবার বললে, “আসেন—আসেন, হুজুর। কি দিবো? বোসেন—”
এই লোকটাই বোধহয় হরদেব কাঁইয়া।
নায়েবমশাই দোকানে উঠে ভিতরে গিয়ে বসতে বসতে সেই ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “হেডমাস্টার মশাই কী কিনচেন? শাড়ি?”
মুখে কালো দাড়ি, মাথায় ছোট করে ছাঁটা কাঁচাপাকা চুল, গায়ে সাদা কামিজ, গলায় পাটকরা চাদর, হেডমাস্টার মশাই সবিনয়ে বললেন, “নমস্কার। কাল বাড়ি যাব। তাই খান কয়েক ধুতি-শাড়ি-থান দেখচি। এ ছোকরা কে ?”
-“ভাইপো। —শেঠজী, একজোড়া ন-হাত ধোয়া সুতোর ফুলপাড় ধুতি দাও—”
শেঠজী বললেন, “ইনার জন্যই?”
চাষীরা তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে চলে গেল।
শেঠজী তাদের ব্যাকুলভাবে বললেন, “বোসেন—বোসেন। শোস্তার ধুতি দিচ্ছি।”
চাষীদের একজন বললে, “আমরা বাইরে আছি।” শেঠজী ধুতি বার করতে লাগলেন।
হেডমাস্টার মশাই আবার বললেন, “এই ছোকরাই বাড়ি থেকে পালিয়েছে, নয়?”
নায়েমশাই বললেন, “ধরাও পড়েছে।”
—“কি রকম? পিয়াদারা ধরেচে বুঝি?”
-“না। ওর পড়াশুনো সম্বন্ধে আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চাই। আপনি বাড়ি থেকে ফিরে আসুন। - ওকেও আপাততঃ বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কৈ শেঠজী, বেল৷ হ' –”
—“এই যে দেখেন” বলে শেঠজী তাঁর সামনে একজোড়া ধুতি মেলে দিলেন।
কিন্তু ভোম্বলের আর কিছু ভালো লাগছিল না। তার চোখ কিছুই দেখছিল না, কানও কিছু শুনছিল না, নাকও যেন গন্ধ নিতে ভুলে গেছে। কেবল মন উত্তেজিত, চঞ্চল ও সতর্ক হয়ে উঠেছে। তার কাকা তাকে এখানে নিজের কাছে রেখে পড়াতে চান? সে কিছুতেই এখানে থাকবে না, কিছুতেই না। ঐ নারকোলমুখো লোকটা এখানকার স্কুলের হেডমাস্টার? কি রুক্ষ ওর কথা! কি শুকনো ওর গলার স্বর? যখন কথা বললে, মনে হল লোকটা যেন তার সামনে ফস্ করে একমুঠো ধুলো ছড়িয়ে দিলে। কাপড়, জামা, জুতো সে কিছুই চায় না। সে বুঝতে পেরেচে, তার কাকা তাকে ভুলিয়ে রাখতে চান। তার মনের কথা কেউ বুঝতে পারে না, কেউ না। তার মা-বাবা থাকলে হয়তো তাঁরা বুঝতে পারতেন। ভোম্বল একটা দীর্ঘনিশ্বাস চেপে রাখল।
ভোম্বলের গলার কাছে কি যেন পুঁটলি পাকিয়ে ঠেলে উঠতে লাগল। মন তেজী বাচ্ছা যে মতো ছুটে বেড়াবার জন্যে ছট্ফট্ করতে লাগল। সে চলে যাবে। এবার তার কাকার ভয়ে নয়, কেউ নেই বলেই। ভয় তার কেটে গেছে। তাই সে কাপড় কিনে নায়েবমশাইদের সঙ্গে যে পথে বাড়ি ফিরে এল সে পথটিকে ভালো করে দেখল না, দেখতে ইচ্ছাও হল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন