খগেন্দ্রনাথ মিত্র
পানসী চলেছে। জল কাটার শব্দ হচ্ছে , সর্-সর্।
ভোম্বল আবার ডাঙার দিকে তাকাল। কিন্তু নিচু জানালা, জলস্রোত ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। কতক্ষণ কেবল জলের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়? সে একটু সামনের দিকে এগিয়ে বসবার উপক্রম করতেই মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী বললেন, “হাঁ বাবা, তুমি বাড়ি থেকে চলে এসেছিলে; তোমার মন কেমন করে নি?”
ভোম্বল প্রথমে ঘাড় নেড়ে উত্তর দিতে গেল, 'না'; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল কথাটি ঠিক নয়। সে চুপ করে রইল।
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মায়ের কথা মনে আছে?”
ভোম্বল বড় বড় চোখ দু'টি তাঁর মুখের দিকে তুলেই মাথা নিচু করে ঘাড় নেড়ে জানালে, “হাঁ।”
মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী একটি নিশ্বাস ফেলে একটু চুপ করে থেকে আবার বললেন, “তোমার মায়ের পেটের আর ভাইবোন নেই?”
—“না”
—“তোমার কাকিমা তোমায় ভালোবাসেন?”
—“তিনি আমায় বকেন না। কাউকেই বকেন না।”
মুহুরিমশাই বলে উঠলেন, “ঐ দেখ, লতী, কুমীর—ওই, জল কেটে সাঁতরে চলেছে।”
লতী হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে মায়ের কাঁধে একখানি হাত রেখে সামনের দিকে একাগ্র দৃষ্টিতে তাকাল। ভোম্বল তাড়াতাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে সামনে গিয়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে লক্ষ্য করতে লাগল, ওটা কুমীর, বেঁশেল, না ঘড়েল? ঘড়েল হলে, নাকের ডগায় ঘট থাকবে, মুখ হবে সরু। আর কুমীর হলে—কিন্তু সে চিনবার আগেই জন্তুটা ডুব দিলে!
সামনের গলুইয়ের কাছে যে দাঁড়িটি বসে ছিল, সে নির্বিকারভাবে বললে, “কুমীর।—শিকার খুঁজছে।”
মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী বলে উঠলেন, “ওমা! ভয় কিসের?”
তাঁর কথায় ভোম্বল পিছন ফিরে দেখে, মালতী তাঁকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মুহুরিমশাই হাসতে হাসতে বললেন, “নৌকোয় থাকলে কুমীর কাছে আসে না রে! কি ভোম্বল, তাই নয়?”
ভোম্বল বীরের মতো বললে, “সাঁতার দিলেও কুমীরে কিছুই করতে পারে না। আমি কত কুমীর দেখেছি। একবার তো কুমীরে আমাকে তাড়া-ই করেছিল।”
তার কথা শুনে মালতী বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রীও কৌতূহলী হলেন কিন্তু সেই সঙ্গে প্রকাশ পেতে লাগল তাচ্ছিল্য ও কৌতুক। কিন্তু ভোম্বল মালতীর দিকে তাকিয়ে বললে, “আমাদের দুর্গাপুরের নদীতে যখন নতুন জল আসে, তখন কুমীরও আসে। জলের রঙ হয়ে ওঠে রাঙা। রোজ একহাত করে জল বাড়ে। এপারে-ওপারে ঘর, ঝাউবন ডুবে যায়। আমাদের বাড়ির কাছে কাঁঠালতলা অবধি জল আসে। সেখানেই রাস্তাটাও শেষ হয়েচে। কোন কোন বার রাস্তাটা ভেঙে জলে পড়ে। জল সরে গেলে সেখান থেকে একটু একটু করে চর পড়তে পড়তে অনেক দূর যায়। আবার নতুন জল এলে সেটা একটু একটু করে ডোবে, কিন্তু সবটা ডোবে না। জায়গায় জায়গায় ডোবে, কোন কোন জায়গা কাছিমের পিঠের মতো জেগে থাকে।
—“সেবারও নতুন জল এসেছে। তখন বেলা এগারোটা। আমরা সবাই দল বেঁধে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ছি, সাঁতার কাটছি, হুড়োহুড়ি করছি। একবার সবাই জল থেকে চরে উঠেছি আবার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ব বলে। আমি ছিলাম সকলের পিছনে। হঠাৎ তীর থেকে কয়েকজন লোক চিৎকার করে উঠল, ‘কুমীর—কুমীর —নিলে—নিলে।’
আমিও ততক্ষণে পায়ের পাতাডোবা জলে উঠে পড়েছি। কিন্তু বুঝতেই পারছি না, কুমীর কাকে ধরবে। ফিরে দেখি আমারই পিছনে হাত চারেক দূরে একটা প্রকাণ্ড কুমীর, একটু হাঁ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। কী বিশ্রী তার দাঁতগুলো। তাই দেখে প্রাণপণে ছুটে একেবারে কাঁঠালতলায়। সবাই তখন ডাঙ্গায়। কুমীরটার সামনের বাঁকা পা দুখানা, কাঁটাভরা পিঠটা জলের ওপর দেখা যাচ্ছে। শিকার পালাল দেখে সে পিছু হটে জলে ডুব দিলে। আমরা সেদিন আর নদীতে নামলাম না।”
মালতী ডাগর চোখ দুটি আরও ডাগর করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী বললেন, “তোমার মা শুনেছিলেন?”
ভোম্বল বললে, “মা তো তখন ছিল না।”
—“বাছারে!” বলে মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী নিশ্বাস ফেললেন।
মুহুরিমশাই নদীর দিকে মুখ ফিরিয়ে চুপ করে বসে রইলেন। বেলা দুপুর হতে চলল। সামনে বাঁ-ধারে মহেশপুরের ঠোঁটা। ভোম্বল দেখলে, একটা কাক নদীর এপার থেকে ওপারের দিকে খুব তাড়াতাড়ি উড়ে যাচ্ছে। ডাঙ্গায় একটা গাছ থেকে হঠাৎ একটা চিল ডেকে উঠল। ভোম্বল বুঝতেই পারলে না কখন তারা মহেশপুরের বাঁকের মাথায় ঠোঁটা ছাড়িয়ে গেল। সে নিচু হয়ে জানালা দিয়ে পাড়ের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল, কয়েকটা শকুন একটা মরা গোরুর হাড়মাংস নিয়ে টানাটানি করছে। তার কিছুদূর দিয়ে দুটি পুরুষ ও পোঁটলা বগলে একটি স্ত্রীলোক সার বেঁধে হেঁটে চলেছে আর নিজেদের মধ্যে কথা কইছে। তাদের পিছু পিছু চলেছে, সাদার ওপর বাদামী ছোপ দেওয়া একটা কুকুর। কুকুরটা চলেছে আর এদিক-ওদিক মাটি শুঁকছে। সে একবার শকুনদের ভোজের দিকে তাকাল।
ভোম্বলের অনেক দিনের ইচ্ছা, একটি কুকুর পোষে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সে একটি বিলাতীকুকুরের ছানা যোগাড় করতে পারে নি। দেশীকুকুরের ছানা যদি ছানাই থাকে তো বেশ হয়। তখন ওগুলো কি সুন্দর দেখতে!
ভোম্বল মালতীকে জিজ্ঞেস করলে, “তুমি কুকুর ভালোবাস?”
মালতী ঘাড় নেড়ে বললে, “হুঁ। আমার মামা আমায় একটা কুকুরছানা দেবে বলেছে। এবার কলকাতায় গেলে আমার জন্যে একটা সাদা রঙের কুকুরছানা আনবে।”
কলকাতার নাম শুনে ভোম্বল কেমন হয়ে গেল। ঐখানেই তো সে যাচ্ছিল। কিন্তু ভুল করে উল্টো দিকের রেলে চড়ে তার সব গোলমাল হয়ে গেছে। তার এক একবার ইচ্ছা হতে লাগল, বাইরে গিয়ে ছইয়ের ওপর উঠে পালের ছায়ায় বসে।
সামনে আবার একটি বাঁক। ঐ তার ঠোঁটা দেখা যায়। ভোম্বল আর ভেতরে বসে থাকতে পারছে না। সে বেশ চঞ্চল হয়ে উঠল।
মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী বলে উঠলেন, “বসে থাকতে ভালো লাগছে না না? আমার কোলের কাছটায় শোও! লতী, একটু সরে বোস্ তো।”
কিন্তু লতী তায় মায়ের কোলের আরও কাছে সরে এসে পাশের দিকে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে তাকাল যে, ভোম্বলের মনে হল, মেয়েটা বলছে, ‘ঐ তো পাশে জায়গা রয়েছে। শুক না।’
ভোম্বল বললে, “আমি শোব না। দুপুরে আমার ঘুম আসে না।” -বলেই সে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে গিয়ে উঠে দাঁড়াল।
অমনি মুহুরিমশাই বলে উঠলেন, “বসো বসে৷, পড়ে যাবে।”
“পড়ব না” বলে ভোম্বল পাশ দিয়ে ছইয়ের ওপর উঠে গেল।

মাঝি বললে, “ছট্ফট্ করবেন না। একখেন গামছা মাথায় দিয়ে এসেন—”
ভোম্বল বীরত্বের সঙ্গে বললে, “এমনিই বসব। গামছার দরকার নেই।”
একজন দাঁড়ি একটু হেসে বললে, “বাবু আমাদের চাষার ছওয়ালরাই ‘লোদ’ সইতে পারে।”
ভোম্বল বললে, “তোমরা তো চাষী নও, নেয়ে।”
মাঝি বললে, “আমরা ‘লা' বই। আমাদের ঘর-বাড়ি, দু-একখেন খেত-খোলা আছে—”
—“তবে তোমরা বাড়িতে থাক না কেন!”
মাঝি হালে ছোট একটা ঠেলা দিয়ে বললে, “প্যাট চলে না।”
ভোম্বল মাঝির কথা ভালো করে বুঝতে পারলে না। দুর্গাপুরেও এক গোরুর গাড়ির গাড়োয়ানকে সে একবার বলতে শুনেছিল, “যা ফসল পাই তাতে কুলোয় না। গাড়িখেন আছে তাই যা হোক করে বছর কাটে—”
ভোম্বল আস্তে আস্তে মাঝির কাছে গিয়ে হাল ধরতেই মাঝি একটু রুক্ষভাবে তার হাতখানি সরিয়ে দিলে। ভোম্বল কিন্তু তাতে ক্ষুণ্ন হল না, বললে, “আমিও হাল ধরতে জানি।”
কিন্তু পালে-টানা পানসীর হালে হাত দিয়েই সে বুঝতে পেরেছিল, সে তাকিয়ে দেখলে, মাঝির হাল ধরতে গেলে পাকা হাতের দরকার, হাতের হাড় মোটা, আঙুলগুলোও মোটা, সে যে কখন হালে ঠেলা ও মোচড় দিচ্ছে, ভোম্বল কিছুক্ষণ লক্ষ্য করেও তা বুঝতে পারলে না। অথচ নৌকোখানি হাঁসের মতো জল কেটে স্বচ্ছন্দগতিতে উজিয়ে চলেছে।
ভোম্বল ওপারের দিকে তাকিয়ে দেখলে, কূল অনেক দূর। সেদিকে ডাঙায় এখানে-সেখানে সাদা ছাপ স্থির হয়ে আছে। সে বুঝতে পারলে, ছাপগুলো সাদা রঙের গোরু। গোরুগুলো ঘাস খাচ্ছে। বাঁয়ে কূলে খানতিনেক জেলেডিঙি বাঁধা; দু-একখানি খড়ের ও টিনের ঘর দেখা যাচ্ছে।
এপারে উঁচু-নিচু ভাঙা পাড়। পাড়ে একটা প্রকাণ্ড আমগাছ কাৎ হয়ে জলে পড়ে ছিল। পাড়ের নিচ দিয়ে একটা পায়ে-চলা পথ বরাবর চলে গেছে। পথটা গড়ে উঠেচে নৌকোর গুণীদের পায়ে পায়ে। ডাঙায় একখানি খড়ের ঘরের সামনে একটি আমগাছের তলায় খেলা করছিল কয়েকটি উলঙ্গ ছেলেমেয়ে। তাদের কোমরে ঘুনসি। সব ক'টিরই পেট মোটা, হাত-পা সরু, ধুলোমাথা গা, রঙ ঘোর কালো। আরও খানিক দূরে গিয়ে দেখলে, ওপরের মাঠ থেকে একটি সরু, পায়ে চলা পথ জল অবধি নেমে এসেছে। মাঠে একটি লাল রঙের পা-ছাঁদা ঘোড়া লাফিয়ে লাফিয়ে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে আর লেজ নেড়ে গায়ের ডাঁশ তাড়াচ্ছে। একখানি সবজিবাগানের বাইরে থেকে একটি ছাগল বেড়ার ভেতর গলা ঢোকাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার গলায় তেকাঠা বাঁধা। আরও খানিক গিয়ে দেখলে, কূলের কাছে এক জায়গায় হাত কয়েক লম্বা একটি বাঁশ পোতা। বাঁশের মাথা থেকে ঝুলছে একখানি ছেঁড়া ময়লা কাপড়। বাঁশটির পাশে কাৎ হয়ে পড়ে আছে একটি কলসী। তারই কাছে রয়েছে কতকগুলো কাঠকয়লা। ভোম্বল জানে ওটা শ্মশান। সে সেদিক থেকে তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নিলে।
খানিক দূর যেতেই শুরু হল জঙ্গল। জঙ্গলটা চলে গেছে একেবারে সেই দূরে বাঁক অবধি। একজন দাঁড়ি মাঝিকে বললে, “চাচা, গত সন এই জাগাতেই ডাকাতি হয়েছিল, লয়?”
মাঝি উদাসীনের মতো বললে, “আর একটু আগে ঐ পাকুড়তলায়—”
ভোম্বল বললে, “ডাকাতের মানুষ খুন করেছিল?”
মাঝি বললে, “হেঁ।”
ভোম্বল বললে, “তোমরা দেখেছিলে?”
মাঝি বললে, “সে কথা ছাড়ান দেন। বজ্জাতের একটা দলই ছিল এখানে। একবার আমাদের ওপরই হামলা করেছিল। সুবিধে করতে পারে নি।”
—“তোমরা ডাকাতদের সঙ্গে লড়েছিলে?”
একজন দাড়ি হেসে ফেললে; বললে “বাবু, তোরাব চাচার দাপটে এ অঞ্চল কাঁপত। উনি তো ছিল আন্দোমানে।”
মাঝি শুকনো গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে বললে, “আল্লাহ্। বাবু, তুমি নিচে যাও। খামাখা লোদ ভোগ করে ক্যান?”
ভোম্বল অবাক হয়ে মাঝির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলে। মোটা নাক, চওড়া কপালে গভীর রেখা, কানে কাঁচা-পাকা চুল, মুখে কাঁচা-পাকা গোঁফ-দাড়ি, মাথায়ও কাঁচা-পাকা চুল ছোট করে ছাঁটা, চোখ দুটো শিকরে বাজের চোখের মতো চক্চক্ করছে।
ভোম্বল আস্তে আস্তে বললে, “রোদ্দুর লাগছে না।”
মাঝি আপন মনে বললে, “ভদ্দরনোকের ছাওয়ালেরা আমাদের চাষার ছাওয়ালের চায়েও বেয়াড়া। আল্লাহ্!”
ভোম্বল তবুও সেখানে বসে রইল। সে ভাবতে লাগল, মাঝিও কি ডাকাতি করে বেড়াত? না হলে ও আন্দামানে ছিল কেন? ভোম্বলের কৌতূহল তাকে ঠেলা দিতে লাগল। সে মাঝিকে সব কথা জিজ্ঞেস করতে উদ্গ্রীব হয়ে উঠল। কিন্তু মাঝি এমন গম্ভীর হয়ে বসেছিল যে, ভোম্বল দমে গেল।
বেলা কমে আসছে। সূর্য গাছের মাথায় ঢলে পড়েছে। নদীর পাড়ের ও গাছের ছায়া পড়েছে জলে। বাতাস শিরশিরে হয়ে উঠেছে। একটি সাদা রঙের বাছুর লেজ তুলে মাঠে খুব লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। ছুটতে ছুটতে সে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল। একটি ছেলে কিছুদূরে দাঁড়িয়ে একখানি বাঁশের লাঠি চাঁচছিল। সে বাছুরটিকে ধরে তুলবার জন্যে এগিয়ে আসতেই বাছুরটির মা শিঙ নিচু করে তাকে তেড়ে এল। ছেলেটি দিলে ছুট।
ভোম্বল হেসে বললে, “এই না হলে গোরু?”
দূরে সামনে একখানি যাত্রীবোঝাই খেয়া ওপারে পাড়ি জমাচ্ছিল। যাত্রীগুলো যেন সাদা-কালো পাখি—চুপ করে বসে আছে!
মাঝি চেঁচিয়ে বলে উঠল, “মুহুরিমাশা, ছামনে নোড়ে! রাতখেন নোড়ের বাজারের ঘাটেই লা বাঁধব, না, আর এক বাঁক যাব? ইদিকে বাদাম তো খালি। হাওয়া পড়ে এল—”
মুহুরিমশাই উত্তর দিলেন, “নোড়ের ঘাটেই লাগাও!”
মাঝি বললে, “ফজর, দাঁড় মার্। বাদামে টান নেই।” তিনজন দাঁড়িই দাঁড়ে বসল।
ভোম্বল তাড়াতাড়ি ছই থেকে নেমে গিয়ে বললে, “ফজর, আমাকে একটা দাঁড় দাও৷”
ফজর বললে, “বাবু, এ কি আপনার কাম? পারবেন না—”
—“পারব—পারব” বলে ভোম্বল ফজরকে সরিয়ে দাঁড়ে বসে আর দুজনের সঙ্গে তাল রেখে সমানে টানতে লাগল। কিন্তু তার হাতের ব্যথা তখনও সম্পূর্ণ সারে নি।
ফজর বললে, “বাবু আপনি আমাদের চাষার ছাওয়ালের মতো দাঁড় টানেন।”
ভোম্বল কোন উত্তর দিলে না। তার উৎসাহ আরও বেড়ে গেল।
নৌকো বাঁক ঘুরতেই সূর্য ডুবে গেল, মেঘের কোলে ছড়িয়ে গেল উজ্জ্বল সোনালী রঙ? মাথার ওপর দিয়ে বকের সারি ডাঙার দিকে উড়ে চলেছে। কাকগুলো উড়ছে ডানা দোলাতে দোলাতে। মাঠ গোরুর পাল তাড়িয়ে রাখাল চলেছিল গাঁয়ের দিকে। ভোম্বলদের পাশ দিয়ে একখানি ছোট পানসী তাড়াতাড়ি চলে গেল ভাটির দিকে। নৌকোর থেকে মধ্যে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান হচ্ছে। পাশে একটা শুশুক হুস্ উঠেই ডুবে গেল। অন্ধকার হয়ে এসেছে। কূলে, নৌকোয়, ডাঙায়,
গ্রামে দু-একটি আলো করে দেখা যাচ্ছে। দূরে যেন কে কাকে ডেকে উঠল—“ও—হুই!”
ফজর ভোম্বলকে বললে, “বাবু, এবার ছাড়েন।”
ভোম্বলও তখন দাঁড় ছাড়তে পারলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সে তবুও এমন ভাব দেখাতে লাগল যেন দাঁড় ছাড়বার ইচ্ছে তার একটুও নেই। ফজর তাকে একরকম টেনে তুলে নিজে দাঁড়ে বসল।
সামনেই নোড়ের বাজার। ঘাটে আলো দেখা যাচ্ছে।”
মুহুরিমশাই ভোম্বলকে বললেন, “বসো-বসো। বসে জিরোও। ভোম্বল ছই ধরে তেমনি দাঁড়িয়ে হাঁফাতে লাগল। তার গা ঘামে ভিজে গেছে। নদীর ভিজে ঠাণ্ডা বাতাস তপ্ত কপালে লাগছে; বড় আরাম বোধ হচ্ছে । নৌকো আস্তে আস্তে এগিয়ে ঘাটে একখানি নৌকোর পাশে লাগল। অমনি নৌকোখানির ওপর থেকে কে যেন জিজ্ঞেস করলে, “কোথা যাবে ”
মাঝি বললে, “দুগগোপুর —”
—“সওয়ারি আছে?”
—“হেঁ। মাদারিপুরের তোরাব মাঝির-”
উত্তরে আর সাড়া পাওয়া গেল না।
মাঝি চেঁচিয়ে বললে, “মুহুরিমাশা, খাওয়া-দাওয়া কি করবেন, করেন।”
মুহুরিমশাই বললেন, “সঙ্গে কিছু খাবার আছে। দেখি যদি বাজারে আর কিছু পাওয়া যায়—”
“হেঁ যান। লক্ষ্মীময়রা ভালো মেটাই বানায়। বাজারের দক্ষিণে দোকান—”
মুহুরিমশাই সুচিকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে চললেন। সুচি লণ্ঠন ও লাঠি নিয়ে তাঁর পিছন পিছন ঘাটের ওপর উঠে গেল। কিন্তু সঙ্গে আলোর দরকার ছিল না। চমৎকার জ্যোৎস্না উঠেচে। তাতে নদীর জল ঝলমল করছে। দূরে নদীর বুকে একটা গাংচিল “কেরে কেরে” করে উঠল।
মাঝিরা ডাঙায় নেমে রান্নার যোগাড় করতে লাগল। ভোম্বল নিচু হয়ে ছইয়ের মধ্যে তাকিয়ে দেখে, মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী হারিকেনের আলোয় বসে একটি পোঁটলা খুলে তার ভেতর থেকে মুড়ি, নাড়ু ও আরও যেন কি বার করছেন।
ভোম্বলের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন, “এস বাবা। আজ তো ভাতের যোগাড় হয়ে উঠবে না—”
ভোম্বলেরও ক্ষিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছিল। সে ভেতরে গিয়ে বসতেই তিনি বললেন, “বাসন-পত্তরও তো কিছু নেই। এখানে কলাপাতাই বা পাব কোথায়? কোঁচড় পাতো—”
ভোম্বল কোঁচড় পাততেই তিনি মুড়ি, কয়েকটি নারকোল নাড়ু ও খানকয়েক ক্ষীরের তক্তি ঢেলে দিলেন। মালতীকেও বললেন, “আঁচল পাত”।
তারপর দুজনে পাশাপাশি বসে মস্মস্ করে মুড়ি চিবুতে লাগল। খাওয়া হয়ে গেলে ভোম্বল ঘটি থেকে ঢক্-ঢক্ করে জল খেয়ে কোঁচায় মুখ মুছে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর সে যে কখন নেমে গেল কেউই বুঝতে পারলে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন