খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ভোম্বলের বাড়ি ফেরার খবরটা সঙ্গী-সাথী মহলে মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে। দুপুরে জামতলার ঘাটের পাড়ে কর্মকারদের খালি বাড়ির পিছনে ঘাসে ঢাকা মাঠখানার একধারে মস্ত জামগাছটার ছায়ায় চার পাঁচজনে জড় হয়েছে। ফেকু ও মানুকে আসেনি। বোদেও দূর থেকে একবার দেখা দিয়েই সরে গেছে।
পচা বললে “ওদের বাড়িতে তোর সঙ্গে মিশতে বারণ করেছে।”
ভোম্বলের মনে কথাগুলো কেমন বাজল। সে তো ওদের জানে—তিনটেই মিটমিটে শয়তান। তার সঙ্গে মিশলেই দুরন্ত হবে? —সে যা করে তা প্রকাশ্যে। আর ওরা— তার চিন্তায় বাধা পড়ল। সামনে নদীতে ভাটিতে যাচ্ছিল একখানা মস্ত বজরা। বোধ হয় হিন্দুস্থানীদের। পশ্চিম থেকে পদ্মা বেয়ে এই সময়টায় অনেক বজরা আসে। ওরা যায় দক্ষিণে, বাদায়। সন্ধ্যায় কূলের এদিক-ওদিকে নোঙর করে থাকে। ভোরে নোঙর তুলে আবার চলে যায়। রাতে ওরা খচাখচ শব্দে ঢোল-করতাল বাজিয়ে সমস্বরে গান গায় 'রামা হো-ও-ও'। গানবাজনায় ধমকে ধমকে শূন্য, নিঝুম নদীতীর চমকে ওঠে। যাহোক, বজরাখানার মাস্তুলে উঠে একজন মাল্লা কি যেন করছিল। হঠাৎ মাস্তুল থেকে সে পড়ল জলে। ভোম্বলরা হৈ হৈ করে নদীতে লাফিয়ে পড়ে আর কি। কিন্তু বজরায় মাঝি-মাল্লারা অনুত্তেজিতভাবে বজরার কিনারা থেকে ঝুঁকে দেখতে লাগল। মাল্লাটিও বজরা থেকে হাত কয়েক তফাতে হুস করে ভেসে উঠে মাথা ঝাঁকিয়ে নাক-মুখ-চোখ থেকে জল ঝেড়ে ফেললে।
ভোম্বল বললে, “খুব বেঁচেছে। যদি বজরার চালে কি কানায় পড়ত!”
পচা বললে, “আমার ইচ্ছে করে জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াই।”
মোংলা বললে, “মাল্লা না হয়েই ক্যাপটেন?”
মোংলা ওদের চেয়ে এক ক্লাস ওপরে পড়ে।
দ্বিজেন বললে, “ক্যাপ্টেন ক্যাপ্টেন! মাল্লা মাল্লা!
কোথায় সমুদ্র আর কোথায় দুর্গাপুরের নদী যা আমরা সাঁতরে পার হই। এই ভোমা, বল বল তোর অ্যাডভেঞ্চারের কথা। তোর কাকার সামনে গিয়ে পড়লি কি করে? পিয়াদা পাকড়াল না, তুই—”
—“বলছি—বলছি।” ভোম্বল সংক্ষেপে সব বলে গেল।
তার বন্ধুরা বললে, “তোর সাহস আছে।”
ভোম্বল বললে, “আমি আবার যাব।”
—“হেঁটে?”
–“না রেলে, দিনের বেলায়—”
–“রেলের ভাড়া কোথায় পাবি?”
এ এক মস্ত সমস্যা।
মোংলা বললে, “পরীক্ষার আগেই?”
—‘না’ বলে ভোম্বল পাড় থেকে ঘাটের দিকে নেমে যেতে লাগল। তার সঙ্গীরাও তার পিছু পিছু চলল।
জোলাপাড়ার জিন্দারালির বাবা তুফান আলি তখন তার মস্ত দোয়াড়টা তুলছিল। কি কারণে যেন সকালে তোলে নি। দোয়াড় পাতে রাতে, তোলে সকালে। সারারাত ওর মাঝ দিয়ে স্রোত চলে। তখন ছোট ছোট মাছ, কখন কখন মাছের লোভে সাপও ঢোকে।

তুফান আলি দোয়াড়টা ডাঙায় তুলতেই তার মধ্যে মস্ত একটা সাপ— না, না, বান মাছ কিলবিল করে উঠল। মাছটা কালো ও মোটা, একবার হাঁ করলে। বোধ হয় রাগে। ওর মুখে আঙুল দিলেই কট করে কামড়ে দেবে। তুফান আলি দোয়াড়টা আরও ওপরে নিয়ে গিয়ে দোয়াড়টার মুখ ঘুরিয়ে ঝাঁকি দিতে দিতে মাছটা ধপ করে বালির ওপর পড়ল। তুফান সঙ্গে সঙ্গে তার মাথাটা বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরলে। মাছটাও শরীর আর লেজের কসরৎ দেখাতে লাগল।
ভোম্বল বললে, “চাচা, দোয়াড়টা আমি পেতে দিয়ে আসি!”
তুফান বললে, “কল্লামি রাখ।”
সকলে হো হো করে হাসতে হাসতে পাড়ের একেবারে ওপরে উঠে গেল।
জিন্দার আলি ওদের চেয়ে বড়। ছেলেটার বুকের ছাতি চওড়া, হাতপায়ের গুলি পুষ্ট। এমনভাবে হাঁটে ও তাকায় যে দেখে মনে হয়, এখনই বুঝি একটা ঘুষি বসিয়ে দেবে। ওদের কারো সঙ্গেও কথা বলে না। স্কুলের খেলার মাঠে উঁচু ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গে মাঝে মাঝে ফুটবল খেলে। এমনভাবে ঝুঁকে বল মারে যে সবাই বলে, 'বলদা মার’। মানে বলদের মত ঢুঁ দেওয়া মার। কিন্তু ওর গলায় বেশ সুর আছে। ওর জুড়িরা সবাই মিলে স্বদেশী গান গাইবার সময় ওকে ডাকে। ও যায় না। তাই সবাই বলে, 'ও সায়েবের আরদালি হবে।
মোংলার মাসীর বাড়ি কুলচারা গাঁয়ে, দুর্গাপুর থেকে পাকা সাড়ে চার ক্রোশ দক্ষিণে। ওরা যায় গোরুর গাড়িতে। ওর মেসো ফটিক নাগ, মুহুরিগিরি করেন। প্রতি শনিবার দুপুরে বাড়ি যান, ফেরেন সোমবার। ওঁদের ছেলে-পুলে নেই—জমি-জায়গা আছে অনেক। সব মোংলার মাসীর। মোংলাও মেসোর সঙ্গে ছুটি-ছাটায় বা দু-এক শনিবারে যায়।
আম-কাঁঠালের সময় তো কথাই নেই। মেসো থাকেন পেটমোটা বন্ধু উকীলের বাড়ি, বাজারের কাছাকাছি।
মোংলা বললে, “চ ভোমলা, এই লক্ষ্মীপুজোয় আমার মাসীর বাড়ি। পাড়া গাঁ কাকে বলে দেখে আসবি। মাসীদের পুকুরে ছিপে মাছ ধরবি। মজা করে খই-মুড়কি-নাড়ু-ক্ষীরতক্তি খাবি—”
ভোম্বল বললে, “পাড়া গাঁ থেকেই তো এলাম। ওর চেয়েও পাড়া গাঁ আছে নাকি?”
—“গিয়েই দেখ—”
—“কিন্তু কাকিমা যেতে দেবে না। বলবে, ‘পাড়াগাঁয়ে তো গিয়েছিলি। আবার কেন? পরীক্ষার পড়া তৈরি কর।’
এই পরীক্ষার ঝঞ্ঝাট ঝেড়ে ফেলতেই টাটানগরের পথ ধরেছিলাম। কবে যে পরীক্ষা একেবারে শেষ হবে!”
মোংলা বললে, “কিন্তু ঐ খ্রীস্টান ফিলিপ ছেলেটা, নলিনী, শেলী বিশ্বাস কি রকম পড়ে, টকাটক অঙ্ক কষে—”
‘ধ্যেৎ!’ বলে ভোম্বল কলকে ফুলের গাছটাতে উঠে গেল। একটা দুর্গাটুনটুনি তখন সবে একটা ফুলে তার বাঁকা ঠোঁট জোড়া ডুবিয়েছে। বেচারীর মধু খাওয়া হল না, ফুডুং করে উড়ে গেল। ভোম্বল হাত বাড়িয়ে ঠিক সেই ফুলটাই ছিঁড়ে নিলে দেখলে, ভেতরে কয়েকটা রাঙা পিঁপড়ে ঘুরছে। সেটা ফেলে দিয়ে আর একটা ছিঁড়ে তার মধু চুষতে লাগল। গাছটার ডালে ডালে ফুল ফুটে ছিল। বাতাসে মধুর গন্ধ ভাসছে। দূরে এক জোড়া নারকোল গাছ নদীর খোলা বাতাসে হেলেদুলে শূন্যে এক একবার হাত বাড়াচ্ছিল। কোথা থেকে যেন একটা চিল ডেকে উঠল—চি-ই-ইল!
ভোম্বলের সঙ্গী-সাথীরা ততক্ষণে চলে গেছে। সে একা ডালে বসে দোল খেতে খেতে গান ধরে দিলে।
নদীপারে মেঘ করেছে। মাঝে মাঝে মেঘের গায়ে বিদ্যুৎ দিচ্ছে। মেঘের অস্পষ্ট ডাক কানে ভেসে আসছে। ওপারে বোধহয় বৃষ্টি হচ্ছে। ঐ পিছনে পশ্চিমে দেখা যায়, হরিপুর, চাষীদের গাঁ। গাঁয়ের তিনধারে ক্ষেত—ক্ষেতের পর ক্ষেত। ঐ গোরু চরছে যেন স্থির হয়ে আছে। ক্ষেতের এক জায়গা দিয়ে পদ্মা থেকে একটা খাল এসে এই নদীতে মিশেছে। একখানা ঢাউস নৌকা বড় বড় পাল তুলে উজানে চলেছে। ও ধরনের নৌকো নাকি বরিশাল, না মেঘনায় — কোথায় চলে। এদিকে এসেছিল বোধহয় নারকোল নিয়ে। মালদার আমও আসে নৌকোয়। সেবার একখানা আম বোঝাই নৌকো ঐ ডামসের মুখে স্রোতের ধাক্কায় ডুবে ছিল। মাঝিদের সে কী চিৎকার! — 'ওগো! আমাদের বাঁচাও গো!'—এখনও ভোম্বলের কানে সে আকুল সুর লেগে আছে। সে কি ভোলা যায়! কিন্তু কূল থেকে কোন নৌকো তাদের বাঁচাতে গিয়েছিল কিনা সে ঘটনা তার মনে পড়ে না।
ভোম্বল গাছ থেকে নেমে বাড়ির দিকে যেতে যেতে কর্মকারদের বাড়ির খোলা সদর দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলে, উঠোনটা কাঁটানটে, হাতী-শুঁড়, কুকুরসোঁকা, আকন্দ, কচু আর কুশ ঘাসে ভরে গেছে। বড় ঘরখানার ভাঙা-চোরা মাটির বারান্দায় ছাগলনাদি ও গোবর পড়ে আছে, গোটা দুই ছোট-বড় ছাগল শুয়ে তাড়াতাড়ি জাবর কাটছে। উঠোনের ও-কোণ থেকে টিনের চালে লতিয়ে উঠেছে তেলাকুচো গাছ। ওর ফুলগুলো হয় ধবধবে সাদা, কিন্তু ফলগুলো তেতো হাকুচ। ঐ যে ওধারে কয়েকটা ফুল ফুটে রয়েছে। বাড়িখানা নিয়ে নাকি মামলা-মোকদ্দমা হচ্ছে। তাই পড়ে আছে।
—“এই ভোমলা?”
ভোম্বল চমকে ফিরে দেখে ফেকু দাঁড়িয়ে হাসছে। ভোম্বল বললে, “মামার ভয়ে বুঝি আসিসনি?”
ফেকু বললে, “মামা কারো সঙ্গে মিশতে বারণ করে না। মামা কি বলেছিল জানিস? 'ছেলেরা অমন দুরন্ত হয়ই। ওদের শাসনে রাখতে হবে।’
আতা পাড়তে যাবি?”
–“কোথায়?”
—“নীলু পালের বাড়ির পিছনে। দুটো বড় বড় গাছে আতা হয়ে আছে। কয়েকটাতে রং ধরেছে—গা ফাটো ফাটো।”
—“জায়গাটা জঙ্গলা, জলবিছুটি আর আপাং রয়েছে যে। পায়ে লাগবে।”
—“সেদিকে নয়। ঐ যেদিকে দাঁতঝোলার জঙ্গল, পালটে মাদার আর রাংচিতের বেড়া, সেদিকে।”
—“পালেদের বাড়িতে এখন কে আছে?”
—“বড়রা কেউ নেই। এই বেলা চল। আমি সামনের দিকে বাইরে পাহারা দেব। বড়রা কেউ বাড়িতে এলে ‘কুক্' করব আর তুইও অমনি—”
“তোমাকে আর শেখাতে হবে না—”
দুজনে পালেদের বাড়ির পিছন দিকে যেতেই নীলু পালের বিধবা বোন রঙ্গিণী উঠোন থেকে বলে উঠল, “বাগানে কে রে?”
ভোম্বল বললে, “বাগানে ঢুকছে কে? যা তা বললেই হল?”
—“তবে ওদিকে কেন?”
—“ইচ্ছে।”
ফেকু বললে, “ও চুল শুকোবার আর জায়গা পেলে না।”
ভোম্বল গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখল। ফেকু ঠিকই বলেছে। দুটো গাছে অনেক আতা। বললে, “ফেকা, চ’ ওধারে যাই—”
—“গিয়ে কি হবে?”
—“চ’ তো—”
দুজনে বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে আমড়া গাছটার একটা থোকা লক্ষ্য করে ঢিল মারল। ঢিলটা একটা থোকায় লাগতেই কয়েকটা আমড়া টপ টপ করে মাটিতে পড়ল। আর পালের বোনটা “তবে রে!” বলে এল তেড়ে। ভোম্বল ছুটতে ছুটতে বললে, “ফেকা, কাট।” এবং ছুটতে ছুটতে পিছনে এল। কিন্তু তার কৌশল খাটল না। তখনই ওদের চাকরটা জঙ্গলের ওধার ঠিক থেকে একটা গোরু তাড়িয়ে আনছিল। ভোম্বল ও ফেকু হতাশ হয়ে তাদের বাড়ির দিকে চলল। খানিক পরে সকলে একে একে গিয়ে জমায়েৎ হল খেলার মাঠে।
বোদে বললে, “আর একদিন জলযুদ্ধ করা যাক।”
কিন্তু ভোম্বল রাজী হল না। বললে, “না। কিছু হলে সব দোষ পড়বে আমার ঘাড়ে।”
মানুকে বললে, “সেদিন আমাদেরও খেলা বন্ধ করে অঙ্ক নিয়ে বসতে হয়েছিল।”
ভোম্বল বললে, “ভারী তো! কটা অঙ্ক করেছিলি? আমি থাকলে চোরের মার খেতাম। আর কোনদিন আমায় মারলে একদম কাট। আমার কেউ নেই। যেখানে খুশি চলে যাব।”
কেউ তার কথার জবাব দিলে না। বলটা পাম্প করে সকলে মাঠে নেমে গেল। তারপর যথারীতি খেলে সন্ধ্যার মুখে বাড়ি ফিরে চলল।
শুরুপক্ষের রাত। গাছপালার ফাঁক দিয়ে পথে ছেঁড়া-ছেঁড়া আলো-ছায়া পড়ে লেপটে আছে। এদিক-ওদিকে পিটপিট করে জোনাকি উড়ছে। একটা জোনাকি উড়তে উড়তে পথের পাশে ঝাড়ের একটা বাঁশের একেবারে আগায় উঠে গেল। দু'পাশে খালে নানা সুরে ব্যাঙ ডাকছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে ঝিঁঝি। ভিজে বাতাসে গাছপালার বুনো ও পাঁকের গন্ধ। বিপরীত দিক থেকে কয়েকখানা গোরুর গাড়ি ও কয়েক জন পথিক আসছে। ওরা বোধ হয় স্টেশনের দক্ষিণে হাটে গিয়েছিল। একটা কুবো ‘কুরা কুরা’ করে ডেকে উঠল।
ভোম্বল দল ছেড়ে জোলাপাড়ার ভেতর দিয়ে বাড়ি চলল। পথটা ছোটও গেছে বাঁশঝাড়ের তলায় তলায়। পথে সাপ-থোপেরও ভয় আছে। কিন্তু ভোম্বল বেপরোয়া। জোলারি খটাখট শব্দে তাঁত চালাচ্ছে। কেউ কেউ বাউল সুরে গান গাইছে, দু-একটা ছেলে চেঁচিয়ে পড়ছে।
ভোম্বল বাড়ি এসে, না হাত-পা ধুলো, না পড়তে বসল—এঘর-ওঘর করতে লাগল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন