খগেন্দ্রনাথ মিত্র
লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন—
ভোম্বল বললে, “কাকিমা যাচ্ছি—”
কাকিমা বললেন, “কোথায়? যেখানেই যাও সকাল সকাল ফিরো।”
ভোম্বল বললে, “যাচ্ছি মোংলার মাসীর বাড়ি, কুলচারায়, ফিরব পরশু, লক্ষ্মীপুজোর ভাসানের দিন।”
—“সেখানে কেন?”
—“যাচ্ছি বেড়াতে।”
—“এত বেড়িয়েও আশ মিটল না?”
—“বেড়ালাম আর কোথায়? সে তো পালিয়েছিলাম।”
—“তোমার যা খুশি কর। আমি পড়েছি জ্বালায়। কিছু হলে লোকে আমারই দোষ দেবে। বলবে, নিজের ছেলে নয় কি না?”
—“কি আবার হবে? গোরুর গাড়িতে যাব-আসব।”
কাকিমা মুখভার করে চলে গেলেন।
ভোম্বলও জামা-জুতো পরে, একখানা বাড়তি ধুতি বগলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল মোংলাদের বাড়ির দিকে। সেখানে গিয়ে দেখে, একখানা ছইওলা গোরুর গাড়ি বাড়ির সামনে লেজ তুলে দাবান্ হয়ে পড়ে আছে, আর এক জোড়া নাকে দড়ি দেওয়া শিঙেল গোরু আমতলায় শুয়ে জাবর কাটছে।
তাকে দেখেই মোংলা বললে, “এসে গেছিস? গাড়িতে যাব আমরা তিন জন। পলানো মাসী আমি আর তুই—”
খবরটা শুনে ভোম্বল খুশি হল না। বললে, “হেঁটে গেলে গাড়ির আগেই পৌঁছে যাব। তুই আর তোর ‘পলানে’ মাসী গাড়িতে বসে আরামে যাবি। আমি যাব তোদের আগে আগে।”
ততক্ষণে গাড়িতে বিচালী বিছিয়ে চট পেতে গাড়োয়ান একটা বড় বোচকা এনে গাড়ির পিছনদিকে রাখল। তারপর এল রংচটা একটা ছোট টিনের বাক্স ও একটা বড় পোঁটলা। তারপর পুঁটলি হাতে এলেন, মোংলার ‘পলানো মাসী’, থান পরা, মাথার আধ ঘোমটা, গলায় কণ্ঠ, রোগা-পটকা, ছোটখাটো মানুষটি। মেসো কবে মরে গেছেন! মোংলা তাঁকে দেখেই নি।
মাসী গাড়িতে উঠে বসলেন। মোংলায় মা এসে বললেন, “দুগ্গা দুর্গা। শিগগির শিগগির ফিরে এস। এবারে গঙ্গা-সাগরে যাব। বুঝলে!”
মাসী একমুখ পান নিয়ে যতটা সম্ভব হাসিমুখ করে বললেন, “ইহ।”
মোংলা উঠল না, ভোম্বলের সঙ্গে হেঁটে চলল। গাড়ি চলল, ধোয়া ওঠা এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা দিয়ে পাড়া ছাড়িয়ে। তারপর হাজারীময়রার দোকান বাঁয়ে রেখে, মহেশ পণ্ডিতের ‘সর্বরোগহর বড়ি ও ম্যালেরিয়ার যম’, পঞ্চতিক্ত বজ্র মার্কা পাঁচনের ঔষধধালয়ের পাশ দিয়ে, রেলগুমটি পার হয়ে, মড়া কাটা ঘরের ডাইনে দিয়ে, মোল্লাপাড়ার পাশে পাশে। পথের ডাইনে ক্ষেত, ক্ষেতের পর ক্ষেত। তার ওপারে খাল। পথটা গিয়ে মিশেছে মাটি-কাটী খালের ধারে—ঐ যে সড়কটী দেখা যায়, চলে গেছে উত্তর-দক্ষিণে বারোখাদা আর পাঁচুখালির দিকে—তার সঙ্গে। ক্ষেতগুলোর কতক আমুনে ধানের, কতক চৈতালী ফসলের। সড়কটার ধারে ধারে আম, ঝাউ, বট, অশ্বথ, মহানিম, শিশু প্রভৃতি বড় বড় গাছ। কে কবে পুঁতেছিল কে জানে!
আকাশে জলহারা সাদা-কালো মেঘ যেতে যেতে নিচে ছায়া বুলিয়ে আরাম দিচ্ছে। একটা হাঁড়িচাচা ডাকতে ডাকতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল।
এক জায়গায় কয়েকটা শালিক ঝগড়া করছে। একটা পাতা শূন্য গাছে অনেকগুলো শকুন বসে ছিল। নিচেও একজায়গায় শকুনের মেলা। ঐ যে একটা আর একটাকে ঠুকরে দিলে। তার কাছাকাছি রয়েছে কয়েকটা নেড়ী কুকুর —বোধ হয় ওখানে কিছু খাবার আছে।
ভোম্বল পথের ধার থেকে একটা ঢিল কুড়িয়ে শকুনগুলোকে মারবার উদ্যোগ করতেই মোংলা বললে, “এই! এখুনি রেগে ছুটে এসে আমাদের ঘিরে ধরবে। চিল-শকুন মারতে নেই। দেখছিস নে আমাদের দিকে কেমন করে তাকাচ্চে আর ট্যা ট্যা করে ডাকছে। কি বিশ্রী চাউনি! ডাক শুনে আমার গা শিউরে উঠেচে-”
—“আর আমার গা ঘিন ঘিন করছে। উঃ! কী পচা গন্ধ!”

মোল্লাপাড়ার পর দুই সড়কের মিলন মুখে একখানা গাঁ। মোংলা গাড়োয়ানকে উদ্দেশ করে বললে, “রহমৎ চাচা! এই গাঁয়ের নাম সাধনপুর নয়?”
রহমত চাচা বাঁয়ের গোরুটার পেটে লাথি মেরে, ডাইনের গোরুটার পিঠে ঘন ঘন লকড়ি পিটতে পিতে বললে — “হেঁ—হেঁ।”
গাড়িখানা বড় সড়কে উঠে বাঁয়ে বারোখাদার দিকে চলতে লাগল।
সড়কটার দু'ধারে খাল, বর্ষার জলে ভরা। জলে কলমী-হেলঞ্চ আর কুলে শুষনি-থানকুনির চাবড়া বন। জায়গায় জায়গায় কাশফুলের ঝাড় নুয়ে পড়েছে। আর রয়েছে শোলা গাছ। গাছগুলোর পাতা দেখতে সজনে পাতার মতো। দূরে এক ধারে ছিল শাপলাবন। কূলে বসে মেটে বক, জলে ডুব দিচ্ছে পানকৌড়ি। দুটি লোক লম্বা ছিপ ফেলে গামছা মাথায়, একজোড়া চারা খেজুর গাছের পাশে চুপচাপ বসে আছে।
পথের ডান দিকে সাধনপুর। গ্রামখানায় ছোট-বড় বাংলা খড়ের ঘরের ঘেঁষাঘেঁষি। ঘরগুলোর এধারে-ওধারে তাল-খেজুর, আম গাছ। কোথাও সজনে বা কাঁঠাল গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে। এক জায়গায় শিমুলের ডালে বসে একটা ঘুঘু ডাকছে—ভারী উদাস সুর। বহুদূর থেকে আর একটা ঘুঘু সাড়া দিচ্ছে। অথচ কেউ কারো কাছে আসতে পারছে না। মাঝে কিন্তু শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নেই।
কোন কোন বাড়ির উঠোনে স্ত্রী-পুরুষ বেতের ধামা, কাঠা, ওজন-দাঁড়ির পাল্লা বুনছে, বাঁশের চটায় কুলোর ধার বাঁধছে। উলঙ্গ, আধ-উলঙ্গ ছেলেমেয়েরা খেলা করছে, কোন কোনটা দাঁড়িয়ে কাঁদছে। একটা ছেলে ভাঁট জঙ্গলের ওধার থেকে জিভ বার করে ভোম্বলদের ভ্যাংচাতে লাগল। ভোম্বলও পথ থেকে একটা শুকনো ডাল কুড়িয়ে তাকে ছুঁড়ে মারবার উদ্যোগ করতেই সে ছুটে পালাল।
এমনি করে দুজনে ক্রোশ খানেক পার হল। গাড়ি পলানে মাসীকে নিয়ে হেলে-দুলে আসতে আসতে অনেক পিছিয়ে পড়ল!
ভোম্বল বললে, “চ মোংলা, ফিরে গিয়ে গাড়িতে উঠি। রহমৎ চাচাকে সরিয়ে ওর জায়গায় আমি বসে চালাব। নুরুমিয়ার আট বছরের ছেলে করিমটা যদি গাড়ি হাঁকাতে পারে তো আমি চোদ্দে-পনেরো বছরের ধাড়ী পারব না কেন?”
মোংলা বললে, “ও চাষীর ছেলে—”
—“তাতে কি? ও শিখেছে। আমি শিখিনি। এই যা তফাৎ। তুমি আমি ব্রজদাসের কাছে লক্ড়ি খেলা শিখেছি। কোন চাষীর ছেলে না শিখেই -আমাদের সঙ্গে খেলায় পারবে?”
মোংলা বললে “আমার তো গাড়ি হাঁকাতে ভয় হয়।”
—“আমার হয় না, মজা লাগে।”
কিন্তু ভোম্বলের সাধ পূর্ণ হল না। দুর্গাপুরের ফিরতি পথে নৌকোয় তোরাব মাঝি হালের মুঠিতে হাত দিতেই তার হাত যেমন করে সরিয়ে দিয়েছিল রহমৎখুড়োও তেমনি রুক্ষভাবে বললে, “কল্লামি ছাড়ান দে—হৈ টক্ টক্। ছইয়ের নিচে নক্ করে বোস। চাষার ছাওয়াল এমন বেয়াড়া লয়—”
ভোম্বলের একটুও রাগ হল না, বললে, “মোংলা, তুই বোস্। এই তো রাস্তা—সোজা চলে গেছে কুলচারা গাঁয়ে—”
মোংলা বললে, “না। এখান থেকে আড়াই ক্রোশের মাথায় ফুলবেড়ের হাটের পাশ দিয়ে যে কাঁচা রাস্তাটা ডাইনে গেছে সেটা ধরে সিকি ক্রোশ গেলেই মাদারতলায় নূর আলির মসজিদ চোখে পড়বে। তার দু'ধারে খুব উঁচু মিনার। যেন আকাশ পানে দু'হাত তুলে আছে। পায়রার ঝাঁক বসে থাকে মাথায়! তুইও উঠে আয়।”
ভোম্বল বললে, “চারজনে গোরু দুটোর কাঁধে চেপে যাব। গোরু বলে কি ওদের কষ্ট হয় না?”
মোংলা বললে, “কাঁধে কোথায় চাপছি!”
—“কাঁধে নয় তো কি? জোয়াল আছে কিসের ওপর? তুই পলানে মাসীর কোলে মাথা দিয়ে খোকার মতো ঘুমো। বেশ দুলতে দুলতে যাবি। স্বপ্ন দেখবি, দোলায় চেপে যাচ্ছিস।”
মাসীও অমনি মুখ বাড়িয়ে ‘পিক’ করে পানের পিক ফেলে ফিক করে হাসলেন; বললেন, “যা বলেছিস বাবা। দোলাই বটে। দোলানি ঝাঁকুনিতে বুকে-পিঠে খিল ধরে গেল।”
ভোম্বল হাসতে হাসতে এগিয়ে চলল। খানিক দূর যেতেই পিছনে শব্দ শুনলে টিং টিং। ফিরে দেখে বাইসাইকেল আসছে। আরোহীর বয়স বেশী নয়। তার হাঁটু অবধি কাপড়তোলা কালো লম্বা পা প্যাডেলের সঙ্গে উঠছে-নামছে। সে কাছে আসতেই ভোম্বল বললে, “ও বড়দা! পিছনে সওয়ার হব?”
আরোহী বললে, “টিউবে লিক। বেশী ভার নেওয়া যাবে যাবেনা। কদ্দুর?”
—“কুলচারা।”
আরোহী দূর থেকে উত্তরে যা বললে বাতাসে তা উড়ে গেল। যেতে যেতে যেতে রোদে ও শ্রমে ভোম্বল ঘেমে একেবারে যেন নেয়ে উঠল। ঘামে ভেজা জামাটার বোতাম খুলে কাপড়খানা হাঁটুর কাছাকাছি গুটিয়ে নিলে। জুতো জোড়া পা থেকে খুলতে পারলে বেশ হত। গ্রীষ্মকালে ভদ্রলোক সাজা মানে কষ্ট ভোগ করা। চাষিরা কী আরামে থাকে।
সামনের দিক থেকে চার-পাঁচখানা গোরুর গাড়ি বিচালি নিয়ে আসছিল। বোধহয় যাবে শহরে। পথের মাঝখানটা উঁচু-দুপাশে গাড়ির চাকায় চাকায় খাল হয়েছে। তারপর দুধার আবার উঁচু। ধারে ধারে গাছ-গাছড়ার জঙ্গল-শেওড়া, ভেরাণ্ডা, আকন্দ, ভাঁট, হাতিশুঁড় ও চারা খেজুর। তার গায়ে বন কাঁকরোল, ঢোল-কলমি ও ঝুমকোলতার জট। মেঠো বাতাসে লতা গুলোর আগা দুলছে। লতায় ছাতারে-চড়ুইয়ের ঝগড়া ও কিচির মিচির। সড়কের পর খোলা খেতের কোথাও কোথাও দু-একজন চাষি কী যেন করছে। ভোম্বল হঠাৎ দেখলে, ময়লা কাপড় পরা দশ-বারো বছরের একটা মেয়ে একখানা চাড়িতে চড়ে খেত ও সড়কের মাঝের খাল দিয়ে লগি ঠেলে আসছে। দেখে ভোম্বলের ভারি আমোদ বোধ হল। এ রকম দৃশ্য ওর চোখে এই প্রথম। ও দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। মেয়েটাও যেন ওকে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে দেখছে দেখেই আরও জোরে লগি ঠেলে এগিয়ে চলল। ভোম্বল হাসতে হাসতে পিছনে সড়কটার দিকে তাকিয়ে দেখলে, তাদের গাড়িখানা কতদূর? কিন্তু সড়কটার কয়েকটা বাঁকের দারুন দেখতেই পেল না। সে আবার চলতে লাগল।
ততক্ষণে সূর্য অনেক ওপরে উঠেছে। মেঘগুলোও সরে গেছে। রোদে ভোম্বলের মাথা পুড়ে যাচ্ছে, তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ। সামনে তাকিয়ে দেখলে, ওই যেন ফুলবেড়ের হাট! ওই যে খানকয়েক বাড়ি। ওই যে একটা সড়ক – ডাইনে গেছে – না না, আরও একটা সড়ক গেছে বাঁ দিকে। আসল সড়কটাই বাঁক নিয়েছে ডাইনে। ওটা তবে কোন গাঁ? যা গাঁ হোক ওখানে গিয়ে জল খেতেই হবে।
ভোম্বল যখন গাঁয়ে পৌঁছাল তখন তার জামা-কাপড় ঘামে ভিজে সপ্ সপ্ করছে, দুটি রগ দিয়ে ঘাম ঝরছে। সে জামা খুলে ফেলতেই খোলা বাতাসে ভারি আরাম বোধ করতে লাগল। জুতো জোড়াও পা থেকে খুলে হাতে নিয়ে গ্রামের মুখেই পথের ধারে যে মস্ত অশ্বত্থ গাছটা ছিল তার ছায়ায় গিয়ে বশে পড়ল। একটু তফাতে কতকগুলো অর্ধউলঙ্গ ছেলে মেয়ে হইচই করছিল। ভোম্বল তাদের একজনকে হাতছানি দিয়ে ডাকল। কিন্তু ছেলেটা এল না।
ভোম্বল উঠে গিয়ে তাকে বললে, “জল খাওয়াতে পারো?”
ছেলেটি বললে, “কি? পানি?”
ভোম্বল বললে, “হ্যাঁ।”
ছেলেটা ছুটে গিয়ে তাদের দলের একজনকে কানে কানে কী যেন বললে, তারপর দুজনেই তার দিকে তাকাতে তাকাতে একখানা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। বাকি সকলে কি নিয়ে যেন তেমনি হৈচৈ করতে লাগল।
ভোম্বল ফিরে দেখে ধারালো কাস্তে হাতে, মাথায় মাথাল, হাঁটুর ওপর ময়লা কাপড় বা ন্যাকড়া পরা, একমুখ দাড়ি-গোঁফ নিয়ে এক জোয়ান পুরুষ দাঁড়িয়ে।
হঠাৎ ভোম্বলের পিছন থেকে কে বলে উঠল, “কি চান?”
ভোম্বল বললে, “খাবার জল!”
—“পানি?”
—“হ্যাঁ।”
—“এ মোছলমানের গাঁ।”
—“এ গাঁয়ে কেউ জল খায় না?”
লোকটি একটু বিরক্তির সঙ্গে জবাব দিলে, “পানি বিনে জান বাঁচে?”
ভোম্বল বললে, “পিপাসায় আমার জান যায়। জল দাও।”
—“আপনে তো হিঁদুর ছাওয়াল। মোছলমানের পানি খাবা?”
—“কেন খাব না? খাবার জন্যেই তো চাইছি। দেখছ না পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ?”
—“পিপেসা কি ঠাওর হয়? ও কলজের কারসাজি। জহর! জহর রে! শয়তানটা খেলায় বেহুঁশ। হেই শুওরডা। ইদিক আয়। এক বদনা পানি আনে অরে দে।”
ছেলেমেয়েদের মধ্য থেকে একটা ঢ্যাঙা, কালো, রোগা ছেলে ছুটে চলে গেল।
ভোম্বল সেই অবসরে দেখলে, ছেলেমেয়েদের মধ্যে বছর ছয়েক বয়সের উলঙ্গ একটা ছেলের হাতে একটা শালিক-ছানা। সে ছানাটাকে দু’হাতে সন্তর্পণে ধরে আছে। ছেলেটার মুখখানা ও চোখ দুটো বেশ। একটা ছোট মেয়ে ছানাটাকে কি যেন খাওয়াবার চেষ্টা করছে। বোধ হয় ফড়িং।
এমন সময় জহর এক বদনা 'পানি' আনতেই ভোম্বল আজলা পাতলে। জহর হাসিমুখে তার আজলায় জল ঢালতে লাগল। ভোম্বল জল খেয়ে খানিক চোখে-মুখে-ঘাড়ে দিয়ে সুস্থ হয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলে, “এ গাঁয়ের নাম কি?”
—“রহিমপুর। আপনি যাবা কোথায়?”
—“কুলচারা! কুলচারা চেন?”
—“চেনবো না ক্যান? ইখান থিকে সওয়া কোশের মাথায়। কার বাড়ি?”
—“নাগেদের বাড়ি।”
—“চিনি। দুগ্গোপুরের মুহুরী। ওনার কয়েক বিঘে ক্ষেত এ গাঁয়ের পুবে আছে। তিনি আপনার কুটুম?”
ভোম্বল অম্লান বদনে ‘মেসো’ বলেই রাস্তায় উঠে চোখের ওপর হাত রেখে দেখতে লাগল গাড়ি কতদূরে? দেখতে দেখতে মনে হল অন্ততঃ আধমাইল দূরে আছে। সে ফিরে এসে দেখে সেই লোকটি খানিক তফাতে একখানা ক্ষেত নিড়চ্ছে আর ছেলেমেয়েগুলো তফাতে গিয়ে আরও হৈ-হল্লা করতে করতে ঠেলাঠেলি লাগিয়ে দিলে। যার হাতে শালিক-ছানাটি সে হঠাৎ ‘হি হি’ করে কাঁদতে লাগল। এক রক্তি ন্যাকড়া পরা, মাথায় রুক্ষচুল, গোলমুখ, রোগা একটি মেয়ে ছেলেটির গলা ধরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, —“কাঁদিস্ নে, ভাইজান! কাঁদিস নে। বাওজান আসুক। অরে মার না খাইয়াই তো আমার নাম ফুলজানি লয়—।”
মেয়েটির বয়স হবে বড় জোর বছর দশেক।
ভাইজান ছানাটাকে তেমনি হাতে ধরে তেমনি কাঁদতে লাগল। ভোম্বলের ভারী কৌতূহল হল। সে তাদের কাছে যেতেই সকলে সেখান থেকে সরে যাবার উদ্যোগ করলে।

ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, “এই ফুলজানি, তোর ভাইজান কাঁদে কেন?”
ফুলজানি তার কটাসে চুলগুলো মুখের ওপর থেকে সরিয়ে কাজল কালো চোখ দুটো ভোম্বলের মুখের দিকে তুলে টর্ টর্ করে বললে, “ঐ রজবটা অর পাখির বাসা ভাঙচে। ভাইজান, অর ছানাটার জন্যে নি হাতে খ্যাড় দিয়ে বাসা বানায়ে ঐ আমগাছের খোঁদলে থুইছিল—”
ভোম্বল ঘাড় ফিরিয়ে দেখে, ষণ্ডাগোছের একটা ছোট উলঙ্গ ছেলে ছুটে পালাচ্ছে।
ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, “তোর ভাই পাখিটা পেল কোথায়?”
—“ছানাটা পরশু ঐ কাঁঠালের ডালের বাসার পর থিকে ঝড়ে মাটিতে পড়ছিল।”
ভোম্বল রজবকে ধরতে ছুটল। কিন্তু রজব ততক্ষণে দুখানা বাড়ির ফাঁকে সরু গলিটার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
ভোম্বল ফিরে আসতে আসতেই ছেলেমেয়েগুলো সরে গেল আর একদিকে। সে এসে অশ্বত্থগাছটার গোড়ায় বসল। সামনে দিয়ে চলেছে, দু-একটি পথিক, চলেছে পেটমোটা, লালরঙের একটা মাদী ঘোড়ার পিঠে এক আধবুড়ো মৌলবী—ভোম্বলের তো তাই মনে হল। ঘোড়াটার পিছু পিছু চলেছে ওর বাচ্চাটা। জন দুই বেদেনী কাঁধে ঝোলা, গ্রামের সমুখ দিয়ে যেতে যেতে খ্যানখ্যান গলায় হেঁকে উঠল, “বা—ত ভালো—ও কোরি—, দাঁতের পোকা—আ বা—র কোরি।”
তৎক্ষণাৎ তাদের রোগীও জুটে গেল—গাঁয়ের একটি মোটাসোটা ঘোর কালো মাঝ বয়সী স্ত্রীলোক। কিন্তু তার বাত কি দাঁত কোনটার চিকিৎসা করতে বসল বেদেনীরা ঝোলাঝুলি নামিয়ে, ভোম্বল তা দেখবার আগেই রহমৎ চাচার গাড়ি এসে পড়ল। এবার ভোম্বল উঠল গাড়িতে। সে জামা-জুতো ছইয়ের এক জায়গায় রেখে গাড়ির পিছন দিকে সরে যেতেই রহমৎ চাচা ধমকে উঠল—“গাড়ি ওলা হল। মাঝে সরে বসো… ”
ভোম্বল বললে, “আমি এত ভারী?” এবং গাড়ির মাঝে না বসে রহমতের ঠিক পিছনে গিয়ে বসে বললে, “চাচা গো, তুমি আমাকে চালাতে দেও না।”
চাচা বিরক্তির সঙ্গে বললে, “তোর ডাইনে-বাঁয়ে গেয়ান আছে? নক করে বোসে থাক। তোর হাতে গাড়ি সড়কে না চলে পাগারে লামে যাবে —হে হে—টক্—টক্।”
মোংলা হেসে উঠল; বললে, “চাচা, আর একবার বলদ দুটোকে দৌড় করাও না—”
পলানে মাসী বললেন, “রক্ষে কর বাবা আর ছুটিও না। হাড়-গোড় সব গুড়িয়ে যাবার যো—”
মোংলা বললে, “রহমত চাচা ঐ বাঁকের ওধারে গোরুর গাড়ির রেস দেখিয়েছিল।”
ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, “রেস দিয়েছিল? কার সঙ্গে?”
মোংলা বললে —“একা একা” —বলে হাসতে লাগল।
গাড়ি তেমনি ঢিলে তালে চলতে চলতে এল ফুলবেড়ের হাটে। কিন্তু সেখানে না আছে হাট, না আছে হাটের চিহ্ন। রাস্তার ধারে কতকগুলো টিন ও খড়ের দো-চালা, চার-চালা ঘর। তার পিছনে জলা ও নানা রকমের গাছ-গাছালি, বাঁশ ও কলার ঝাড়, এধারে-সেধারে তাল খেজুরের গাছ। বাড়িগুলোর এ-পাশে-ওপাশে মানুষজন, গোরু-বাছুর, ছাগল-কুকুর। দেখে ভোম্বলের কেমন অদ্ভুত ঠেকল। জিজ্ঞেস করলে, “চাচা, এখানে হাট লাগে কোথায়?”
চাচা বললে, “আমরা তখন ছোট, এখানে হাট লাগত। একবার বাওজানের সাথে হাটে এয়েছি। ঐ ধারে ছিল আমার ফুফুর ঘর। জমিদারে জমিদারে হাটের দখল নিয়ে কাইজে বাধে। একপক্ষ হাটে আগুন দেয়। আগুনে হাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তারপর আর হাট বসেনি। তবে নামটা আছে।”
ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, “সে জমিদাররা এখনো আছে?”
ডাইনের গোরুটার লেজ মলতে মলতে চাচা বললে, “কে জানে! তারা হয়তো নাই, তাদের ছাওয়াল আছে। কি জমিদারী বেহাৎ। গরীবের কি দরকার?”
মোংলা বললে, “ঐ সামনে মাদারতলার নূর আলির মসজিদ। ঐ দেখ মিনারে, গম্বুজে গোলা পায়রার ঝাঁক। ঐ উড়ল! চক্কর দিচ্ছে—!”
ভোম্বল একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ঝাঁকটা মসজিদের আকাশে চক্কর দিতে লাগল। চক্কর দিতে দিতে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। গাড়ি মাদারতলা ছাড়িয়ে কুলচারার কাছে।
ভোম্বলের মনে হল গাঁথানা মস্ত। ঐপাশে একটা যেন খাল দেখা যাচ্ছে। হাঁ হাঁ খালই তো। সে অস্থির হল। এদিকে ক্ষিদেও কম পায় নি। দুপুর গড়িয়ে গেছে। পথে মাসী একবার মুড়ি-খাগড়াই খাবার কথা বলেছিল। কিন্তু মোংলাদের বাড়িতে ঘি, কাঁচা লংকা ও আলু সেদ্ধ দিয়ে ফেনে-ভাত খেয়ে মনে করেছিল, এ বেলা আর খেতে হবে না। কিন্তু সাড়ে চার ক্রোশ রাস্তা হেঁটে ও গোরুর গাড়িতে পার হতে হতে সে সব পেটের মধ্যে গলে মিলিয়ে গেছে। এখন চাই আরও কিছু।
গাড়ি গাঁয়ে ঢুকে গাঢ় ছায়া ঢাকা ঠাণ্ডা পথ দিয়ে চলতে লাগল।
মোংলা বলে উঠল, “বাঁয়ে ঐ বাঁশতলার পথ ধরে যাও। ঐ—ঐ যে মুখে দাড়ি, প্রভাপকাকা, মেসোর পিসতুতো ভাই। আমাদের দেখতে পেয়েছে। ভোমলা চল্ চল্” বলতে বলতে সে তড়াক করে নেমে ছুটতে ভোম্বল নামল না। তার সংকোচ বোধ হতে লাগল। মোংলার মাসীর বাড়ি, তার তো কারোর নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন