চলার পথে

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

গাঁয়ের পথ। চলেছে দুজনে, প্রেমানন্দ বাবাজি আগে, ভোম্বল পিছনে। গাছগুলোর পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদ এসে গাছের গুঁড়িতে, মাটিতে ছিটে-ফোঁটার মতো এদিকে সেদিকে লেগে আছে৷ মনে হচ্ছে তখনও যেন গ্রামখানা ঘুমোচ্ছে। বাবাজি যেতে যেতে মাঝে মাঝে বেহালায় ছড় টানে আর সুর ওঠে - হুঁ-উ-উ।

এমনিতেই শীতে ঝোপঝাড় কিছু কম। তার ওপর পথের ডানধারে গাছপালা যেন ফাঁকা ফাঁকা। সেদিকে একখানা উঁচুধারী কাঁচাঘরের ধারী নিকোচ্ছিল ময়লা কাপড় পরা একটি বউ। তার গলায় শাড়ির আঁচলের খুঁট জড়ানো। তার পাশে মাটিতে গোবর গোলা কাদা জলের মেটে হাঁড়ি। গোবর-কাদার সোঁদা সোঁদা গন্ধ নাকে লাগছে৷

বেহালার সুরে সে হঠাৎ পিছন ফিরে তাকালো। তার কাছ থেকে খানিক তফাতে উঠোনের একধারে আগুন পোহাচ্ছে দু'তিনটি ছেলেমেয়ে ও একটি বুড়ী। তারা আগুনকে ঘিরে বসে আছে।

ভোম্বলরা এগিয়ে চলতে চলতে এসে পড়লো একটা পুকুরের ধারে। একটি ভদ্রগোছের লোক হাতে গাড়ু, পায়ে খড়ম, মুখে দাঁতন কাঠি, গায়ে কোচ কাপড় জড়ানো, পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে প্রেমানন্দ বাবাজীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোত্থেকে আসা হচ্ছে?’

প্রেমানন্দ জবাব দিলে, ‘আড়ানি থেকে।’

— ‘কদ্দূর যাওয়া হবে?’

—‘ভিক্ষেয় বেরিয়েছি বাবা।’

—‘সঙ্গে ওটি কে? চ্যালা?’

- ‘সঙ্গী।’

—‘শিক্ষানবিশী করছে নাকি?’

প্রেমানন্দ জবাব না দিয়ে এগিয়ে চললো।

লোকটি বললেন, ‘কত রকমের ভেকধারী যে আছে। ছোকরাটার পোশাক তো দেখি ভদ্রলোকের। কি জানি কি মতলবে ঘুরছে? পথটা সেখান থেকে সোজা ঢুকেছিল একটা বাঁশঝাড়ের তলায়। ঝাড়টা পার হতেই ডানধারে পড়লো একসার নিশিন্দে গাছ। গাছগুলো একখানি খোড়োবাড়ির বেড়ার কাজ করছে। নিশিন্দে পাতা নিমপাতার চেয়েও তেতো। ভোম্বল একখানি পাতা ছিড়ে গন্ধ শুঁকে পাতাখানি জিভে ঠেকিয়েই নাক-মুখ সিটকে আপন মনে বললে, ‘এ দিয়ে নাকি কবিরাজী ওষুদ তৈরি হয়!’

বাড়িটিতে একখানি মাত্র বাংলা ঘর, সামনের দিকে একটু যেন হেলে আছে। বোধহয় সেজন্যে এক জোড়া মোটা বাঁশের প্যালা দেওয়া। চালে এখানে সেখানে নতুন খড়ের কুঁচি।

পথ দিয়ে কাটারি হাতে একটি লোক সে ঘরখানার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকলে, ‘ও শোভান! আরে বেলা যে এক পহর হয়। হুঁশ নেই? মোল্লাপুর কি এখেনে?’

হাঁক শুনে গায়ে-মাথায় আধ ময়লা চাদর জড়িয়ে একটি লোক ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললে, ‘রেতে জ্বরে বেহুশ মতো হয়েছিলাম যে। এখনো মাথা ঘোরায়, গায়ে জ্বর তুমি যদি কাজে যাও, আমার রোজের বাকি বারো আনা চেয়ে এনো। কাল শরীরটা ভাল থাকলে যাবো।

কাটারি হাতে লোকটা উত্তরে কি বললে, ভোম্বল শুনতে পেল না৷ কিন্তু সে অনুমান করলে, ওরা দুজনে ঘরামির কাজ করে। কিন্তু এ গ্রামখানার নাম কি? যে লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, সে কি একা থাকে? ওর বউ, ছেলেমেয়ে, তারা সব গেল কোথায়?

বাড়িখানার পরে একটা ঝোপ-জঙ্গলে ঘেরা শুকনো ডোবা। সামনে একখানা ছোট আমবাগান৷ তার পাশে একখানি বাড়ি। তাতে চার-পাঁচখানা খড় ও টিনের ঘর, সামনে বেড়া দেওয়া উঠোন। বেড়ায় চার পাঁচটা ছোট-বড় সজনে গাছ। বাড়িখানার ভেতর দিকে দেখা যাচ্ছে, একটা ধানের মরাইয়ের একটি পাশ ও একটা চারা তালগাছ। তার ওধারে এক জোড়া নারকোল গাছ। ঘরগুলোর চাল ছাড়িয়ে দেখা যাচ্ছে সূর্যের কপাল। তাই উঠানের সামনে সবে একটু রোদ এসে পড়েছে। সেই রোদটুকুতে দাঁড়িয়ে গায়ে বালাপোষ জড়িয়ে পায়ে খড়ম একজন হুঁকো টানছেন৷

বাবাজী বেহালায় আবার ছড় টানলে। আবার শব্দ হলো— হু—উ উ—উউ। লোকটি হুকো টানতে টানতে ফিরে তাকালেন।

বাবাজী উঠোনে গিয়ে বেহালা বাজিয়ে গান ধরলেন, 'ও নিমাই দাঁড়া রে—এ, দাঁড়া রে নিমাই-ই একবার দেখিব—ও–তোমারে–এ–এ–’

গান শুনে বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে এলো, আট-নয় বছরের ছুটি ছেলেমেয়ে। তাদের রঙ ফরসা, মুখ-চোখ সুশ্রী। লোকটি হুঁকো হাতে করে এক মনে গানখানি শুনতে লাগলেন। তাঁর দু'চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগলো৷ গান থামলে চোখের জল মুছে বললেন, ‘আর একখানি গাও।’

বাবাজী এবার ধরলেন,

‘ও মন লইয়া পলাইয়া গেল, সোনার ময়না পাখি রে—সোনার ময়না পাখি—’

আবার লোকটির দু'গাল বেয়ে জল ঝরতে লাগলো। গান থামলে চোখ মুছে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আখড়া কোথায়?’

বাবাজী বললে, ‘আখড়া নেই বাবা। আমি গৃহী।’

—‘সঙ্গে ও ছেলেটি কে?’

—‘কেউ নয়। আমি যাব দূরে। প্রায় একই দিকে, পথ-ঘাট চেনে না। খানিকটা এগিয়ে দেব - এই মাত্র৷’

—‘বললে গৃহী। গৃহে কাকে রেখে পথে বেরিয়েছ?’

—‘শূন্যগৃহ আর একজনের জিম্মায় ছেড়ে দিয়ে এসেছি।’

লোকটি আর কিছু না বলে ভেতরে চলে গেলেন এবং একটু পরে ফিরে এলেন। হাতে এক কুনকে চালের ওপর একটি আধুলি। ভরা কুনকেটা বাবাজির ঝুলিতে ঢেলে দিয়ে বললেন, ‘এদিকে এলে আবার এসো।’

বাবাজি বললে, ‘শ্রীহরির ইচ্ছা।’

ভোম্বল যেতে যেতে বাবাজিকে জিজ্ঞেস করলে, ‘গান শুনতে শুনতে লোকটি কাঁদছিলেন কেন?’

বাবাজি বললে, ‘কার মনে কি আছে, বাইরে থেকে কি বলা যায়? হয়তো কোনও দুঃখ আছে৷ গান দুখানা আর সুরের ছোঁয়ায় দুঃখটা আরও বেশি হয়েছে। তাই চোখে জল এসে থাকবে।’

গান শুনে বড়োদের চোখেই জল আসতে ভোম্বল দেখেছে। ছোটোরা তো গান শূনে হাসে নাচে, হাততালি দেয়। ভোম্বলের কোনও কোনও গানের সুরে কেমন একটু দুঃখ হলেও চোখে জল আসে না। কান্নাটা মানায় মেয়েদের, ছেলেরা কেন কাঁদবে? ধ্যেৎ। কান্না আবার কি? তবে বাবাজির গান দুখানি শুনতে বেশ।

এদিকে যত রোদ ওঠে তত মানুষ-জন, ছেলেমেয়ে দেখা যায়। দেখা যায় গোরু-বাছুর-ছাগল। শোনা যায় পাখির ডাক। গাছ-গাছালি সবই চেনা, তবুও সবই অচেনা। তার মাঝ দিয়ে পথ। বাবাজি যায় আর বেহালার তারে ছড় টানে, সুর তোলে - হুঁ-হুঁ-হুঁ-উ-। - দুজনে এ বাড়ি, ও বাড়ির সামনে বা বার-উঠোনে গিয়ে দাঁড়ায়। কেউ বলে, ‘অসুখ’, কেউ বলে, ‘দিতে নাই।’ আবার কেউ কেউ মন দিয়ে গান শোনে, চাল দেয় এক বাটি, কি এক কুনকে। কিন্তু পয়সা কেউ বড়ো একটা দেয় না। একজন তো জোর গলায় উপদেশ দিলে, ‘জয়ান মরদ-খেটে খাও গে।’ এক জায়গায় তিন-চারটি তরুণ হাতে খবরের কাগজ, দাঁড়িয়ে কি একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিল। বাবাজিরা তাদের পাশ দিয়ে একখানা বাড়ির বার-উঠোনে গিয়ে গান ধরলে - ‘গাড়ি চলছে আজব কলে-এ। কে যে চালায় কোথা নে যায়-ও হদিস না তার মেলে।’ গানটির সঙ্গে সঙ্গে বাবাজি একটু নাচতে লাগল। গান শুনে এপাশ ওপাশ থেকে এল রোগা, আধ ময়লা জামা-কাপড় পরা চার-পাঁচটি ছেলেমেয়ে। তারা সহাস্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বাবাজির নাচ একদৃষ্টিতে দেখতে দেখতে গান শুনতে লাগল। গান শেষ হলে ভোম্বলের দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে কি আলোচলা করতে লাগল। সে বাড়িতে ভিক্ষে দিলে এক বাটি চাল ও একটি বেগুন।

তারপর বাবাজিরা আগের পথেই ফিরে চলল। সেই তরুণেরা তখন নিজেদের মধ্যে আলোচলনা করছে। একজন বললে, ‘দেখছিস না ওই ছেলেটাকে? ওরা নিশ্চয় কোনও আশ্রমের জন্যে ভিক্ষায় বেরিয়েছে! ওই ছেলেটা হচ্ছে বিদ্যার্থী।’ এবং বাবাজিরা তার পাশে যেতেই সে পকেট থেকে একটা সিকি বার করে বাবাজির ঝোলায় ফেলে দিলে।

বাবাজি বললে, ‘করুণাময় মঙ্গল করুক।’ তরুণটি মাথা নুইয়ে কপালে হাত ঠেকালে।

বাবাজি জিজ্ঞেস করলে, ‘এ গাঁয়ের নাম কী বাবা?’

—‘মধুডাঙা। এর পাশে ওই খেতের বাঁয় দেখা যায়, ভাজনালা। আপনারা যাবেন কোথায়?’

—‘যাত্রা শেষ হবে সেই শ্রীক্ষেত্রে। এরপর কোন গাঁ? পথ তো দেখি না।’

তরুণটি বলল, ‘এরপর চড়ইখোলা। এ অঞ্চলে টানা পথ নাই। আপনাদের যেতে হবে, কোথাও খেতের আল-পথে, কোথাও মাটি ফেলা পথ ধরে, কোথাও বাগান ঘুরে পায়ে চলা মেঠো পথে, বাঁশঝাড়ের কোলে কোলে বা গাঁয়ের মাঝ দিয়ে। তবে এখন শীতকাল, সব শুকনো। যেতে পারবেন।’

—‘চড়ইখোলা এখান থেকে কদ্দুর?’

—‘তা হল দু-ক্রোশ কি একটু বেশি। ওরপর রুইমারি। সেও কোনও না ক্রোশ দুই। সেখানে আছে সিঙ্গিবাবুদের তারা-মায়ের মন্দির। পাশেই অতিথিশালা, সেবার ব্যবস্থা ভালো। সেখান থেকে ডাঙা পথে রেলবাজার-বল্লভপুর পাকা আড়াই ক্রোশ -মাঝে একটা খাল, এখন প্রায় শুকনো বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে পথ।

বাবাজি জিজ্ঞেস করলেন - ‘রেলবাজার-বল্লভপুর কি ইস্টিশান?’

—‘স্টেশন, গঞ্জ, বাজার, থানা, ইস্কুল - অনেক লোকের বাস৷’

—‘ওই রেল কদ্দুর যায়?’

—‘পশ্চিমে শ্যালদা, পুবে গোয়ালন্দ ঘাট।’

বাবাজি বললেন, ‘রেলবাজারে পৌঁছতে এক পহর রাত গড়িয়ে যাবে।’

—‘তার বেশি। আড়ানি থেকে ট্রেন ধরলেন না কেন?’

বাবাজি জবাব দিলে না, ভোম্বলকে বললেন, ‘চলো এগোই।’

দুজনে এগিয়ে চলল। যেতে যেতে পথের এদিকে ওদিকে কোনো বাড়ির আমতলায়, কোনও বাড়ির সদর দরজায়, কোনও বাড়ির বার-উঠোনে দাঁড়িয়ে গান গায়। কেউ দেয় চাল, কেউ দেয় একটা পয়সা, কেউ দেয় চাল-বেগুন, কেউ গান শোনবার আগেই দেয় বিদায় করে। এদিকে বেলা দু-প্রহর হল, ভিক্ষের চালে বাবাজির ঝোলাটা কিছু ভারী হয়ে উঠেছে। মধুডাঙার সীমাও প্রায় শেষ। সামনে দেখা যায় ধান-খেত, খেতের পর খেত। দূরে গাঁয়ের ধোঁয়াটে রেখা। মধুডাঙার শেষে দেখা যাচ্ছে একটা বুড়ো বটডাল। সেখানে কয়েকটা লোক বসে ছিল। বাবাজি বললে, আজিই যা সংগ্রহ হল। কালকের আগে আর কিছু হবে না। ওই গাঁয়ে পৌঁছতে পৌঁছতেই বেলা প্রায় কাবার। তারপরে আরও কোশদুই গেলে তবে বিশ্রাম। তার আগে ওই সামনের গাঁয়ে যদি রাতখানা কাটানো যেত। ওর নাম যেন কি বললে, বাবুটি?’

ভোম্বল বললে, ‘চড়ইখোলা।’

বাবাজি বললে, ‘এ গাঁয়ের মানুষজন অতিথি বোষ্টমকে ফেরায় না। ও গাঁয়ে কি মেলাবেন শ্রীহরিই জানেন। তুমি বালক, কত আর মেহনত করবে। পা ব্যথা করছে?’

—‘না। এখনও চার-পাঁচ ক্রোশ হাঁটতে পারবে। কয়েক মাস আগে লক্ষ্মীপুজোর সময় সাড়ে চার ক্রোশ হেঁটেছিলাম। একটুও ব্যথা করেনি।’

—‘সাবাশ! চলো, ওই বটতলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে কুণ্ডু বাবাজির দেওয়া চিঁড়ে পাটালিতে ক্ষুধা শান্ত করা যাক। সেজন্যে জলের দরকার; দুখানি কলাপাতাও চাই। ওই যেন একখানি গৃহস্থ বাড়ি দেখা যায়। ওই যেন কারা আসছে।

সেদিকে গাছপালার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল এক অন্ধ ভিখারিনি। তার লাঠি ধরে আনছে একটা ছোটো মেয়ে। দুজনেরই পরনে ছেঁড়া ময়লা কাপড় মেয়েটির চুল রুক্ষ, চেহারাও রুক্ষ, রং আধময়লা, শরীর রোগা।

ভোম্বলদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে ভিখারিনি বললে, ‘আজ যা মিলল, তা দিয়ে দুজনেরই পেট ভরবে না মণি। ইদিকে রোদ চড়েছে। কখন বা চাল ফোটাবে তোর মা?’

বাবাজি বলে উঠল, ‘ওগো মা, একটু দাঁড়াও।’
ভিখারিনি থমকে দাঁড়াল।

বাবাজি তার ঝোলা থেকে কয়েক মুঠো চাল তুলে তার ঝোলায় দিতে দিতে বললে, ‘আমার ঝোলাটারে একটু হালকা করলাম গো। ওই মেয়েটি তোমার নাতনি?’

ভিখারিণী বললো, ‘পড়শীর মেয়ে।’

ভোম্বল বাবাজীর কাণ্ড দেখে অবাক। ভিখারী যে ভিখারীকে ভিক্ষার চালের ভাগ দেয়, এমন কথা সে কোনদিন শোনেনি। এমন ঘটনা দেখেও নি। কিছু সে ভেবে দেখলেই জানতে পারতো সাধুর আশ্রমে ভিক্ষান্নই বিতরণ করা হয় দুঃখীকাঙালকে। ভিখারিণী নীরবে আস্তে আস্তে চলে গেল।

বাবাজী বললে, ‘বুঝলাম, ভিখারিণীর পড়শীও গরীব। সে তাই ঐ মেয়েটাকে দিয়েছে বুড়ীকে লাঠি ধরে নিয়ে বেড়াতে, বিনিময়ে চাল দেবে।’ বাবাজী ঝোলা হাতড়ে বার করলে একটা পাতলা পেতলের ঘটি। তারপর দুজনে গিয়ে দাঁড়ালো সেই গৃহস্থের বাড়ির সামনে। বাবাজী ঘটিটা ভোম্বলের হাতে দিয়ে বেহালা বাজিয়ে গান ধরলে।

ভেতর থেকে গায়ে তেল মাখতে মাখতে বেরিয়ে এলেন গামছা-পরা একটি লোক। তিনি দাঁড়িয়ে এক মনে গানখানি শুনতে লাগলেন। গান শেষ হলে বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন। তাঁর কথা শেষ হতে হতেই একখানি ফুলকাটা পেতলের রেকাবিতে কিছু চাল, একটি বেগুন ও একটি কাঁচকলা হাতে এলেন গিন্নীগোছের এক মাঝবয়সী স্ত্রীলোক।

সেগুলো বাবাজীর ঝোলায় ঢেলে দিতেই বাবাজী বললে, ‘মাগো, কিছু তৃষ্ণার জল, আর দুখানি কলাপাতা দরকার, রান্না তো হবে না। ঐ বটতলায় বসে সঙ্গের শুকনো খাবার যা আছে তা সেবা করে পরের গাঁয়ের পথ ধরবো। বেলাও দুপুর হয়।’

লোকটি বললে, ‘ওখানে যাবার দরকার কি? আমার এই ঘরের বারান্দায় বসে সেবা হোক। স্নান করবে কি?’

—‘না বাবা ৷ প্রাতেই তা সেরে পথে বেরিয়েছি।’

—‘সঙ্গে কি খাদ্য আছে ? সঙ্গের ছেলেটি কে?

—‘ছেলেটি সঙ্গী। যাব একই পথে। সঙ্গে আছে চিঁড়ে-পাটালী। যেখান থেকে যাত্রা করেছি তারাই বেঁধে দিয়েছে।’

বার কয়েক ভোম্বলের মুখের দিকে তাকালেন।

স্ত্রীলোকটি তারপর সেই ঘরের বারান্দায় কলাপাতায় চিঁড়ে-পাটালী, সেই সঙ্গে সেই বাড়িতেই পাওয়া দুটি কলা ও একটু দুধ দিয়ে দুজনের 'সেবা' হলো। এবং খানিক বিশ্রাম করে তারা সন্তুষ্ট মনে গৃহস্থের কাছে বিদায় নিয়ে চড়ইখোলার পথ ধরলে। কিন্তু ভোম্বলের মনে পাকা ধানের সেই সুবিশাল ক্ষেত, তার শেষে ধোঁয়াটে গ্রাম, ক্ষেতের ডানধারে ঘন বাঁশঝাড়, তার কোলে মাটির মস্ত লম্বা ঢিবি, তার ওপর দিয়ে পায়ে চলা পথের রেখা-চিহ্ন একা হেঁটে পার হবার ইচ্ছা জাগালো। বাবাজীকে মনে হতে লাগলো তার ইচ্ছামত চলার পথে বাধা। লোকে বাবাজীর গান শোনে, ভিক্ষা দেয় আর তার দিকে কৌতূহলে তাকায়। বাবাজী ভিখারী, কিন্তু সে তো কারোর ভিক্ষা চায় না। লোকের কাছে কেন ভিক্ষা চাইবে? ভিক্ষা দেওয়া-নেওয়৷ ব্যাপারটাই যেন কেমন। কেন লোককে ভিক্ষা তার কেমন বিরক্তি ও অপমান করে বেড়াতে হবে—বেঁচে থাকতে হবে? বোধ হতে লাগলো।

বটতলা দিয়ে যাবার সময় সে দেখলে, যারা বসে বিশ্রাম করছিল তারা যাবার উদ্যোগ করছে। তাদের কেউ মাথায় তুলছে আখের বোঝা, কেউ কাঁধে তুলছে জ্বালানি কাঠ বোঝাই বাঁক, কেউ তুলছে মোটা বোম্বাই মুলো, বা সয়লা বেগুনভরা ঝুড়ি। লোকগুলো আসছে চড়ইখোলা থেকে, যাবে ভাজনার বাজারে বা আড়ানি থেকে আরও দূরে রেলে।

বটগাছটা ছড়িয়ে ঝুরি নামিয়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে ডালপালা দাঁড়িয়ে আছে। তার ডালে ডালে পাখির বাসা বোধহয় কাকের। না হলে অমন অগোছালো আর অত বড় হয়? গাছটার গোড়ায় দু-তিনটে খেদিল। হয়তো সাপের বাসা।

যেতে যেতে বাবাজি ভোম্বলকে বললে, ‘বেলাবেলি চড়ইখোলা পৌঁছাতে পারলে রুইমারির পথপাড়ি দেব গো বাবা। পারবা।’

ভোম্বল বললে, ‘সাত মাইল তো! কেন পারব না। আমি গত মাসে একটানা দশ মাইল হেঁটেছিলাম।’

—‘বলো কি? তারপর?’

-‘তাতে আমার জুতোর গোড়ালি ছিঁড়ে গিয়েছিল। জুতো হাতে করেই হেঁটেছিলাম।’

-‘কোথায় গিয়েছিলে?’

—‘আমার এক বন্ধুর দাদার বিয়েতে। গ্রামের নাম আমহাটি - অজ পাড়াগাঁ। দিনের বেলায় বাঁশবনে শিয়াল ডাকে!’

বাবাজি হাসতে হাসতে বললে, ‘দিন-রাত এক?’

এদিককার ধান তখনও কাটা হয়নি। একদিকে হাঁটুর ওপর কাপড়-পরা, মাথাল মাথায় কয়েকটি চাষি একখানা খেতের ধান কাস্তে দিয়ে হাস হাস করে কাটছে; কাটা ধানের গোছা মাটিতে শুইয়ে রাখছে। চড়াই ও বুনো পায়রার ঝাঁক খেতের এদিকে ওদিকে বসছে, ঝরা ধান খুঁটে খাচ্ছে, আবার ঝাঁক বেঁধে ভুরুর হুস হুস শব্দে উড়ছে। ভোম্বলরা চলেছে, আলে-আলে ঘুরে-ফিরে। আলের মাথায় পায়ে পায়ে পথ জেগে উঠেছে কোথাও কোথাও কাঁচা আবস্থায় পায়ের চাপে দেবে গিয়ে চড়া রোদে শুকিয়ে গেছে। ভোম্বলদের বিপরীত দিক থেকে আল-পথে আসছে জামা গায়ে, চাদর গলায়, লাঠি হাতে চার-পাঁচটি লোক। ধান বনে তাদের কোমর অবধি দেখা যাচ্ছে। ভোম্বল একটা পাকা ধানের শীষ ছিঁড়ে একটা ধানের খোসা ছাড়িয়ে মুখে দিয়ে সামনের দাঁতে কটকট করে কাটতে লাগল। ধানবন থেকে কেমন একটা গন্ধ উঠছে।

সূর্য তখন মাথার ওপর পশ্চিমে যেন একটু হেলেছে। দুজনে পৌঁছলো টানা বাঁশঝাড়টার কোলে সেই মাটিফেলা উঁচু পথটার ওপর। তার পাশেই খেত। সেখানে একখানা মস্ত এনামেলের গামলায় তিনদিক ঘিরে বসে মোটা রাঙা চালের ভাত মাখা মাখা তরকারির ডেলার রস দিয়ে খাচ্ছে, সাদা দাড়ি-গোঁফ মুখে এক বুড়ো চাষি ও দুটি জোয়ান মরদ - বোধহয় বুড়োর দুই ছেলে। তাদের পাশে রয়েছে তিনটি মাথাল ও তিনখানি ধারাল কাস্তে। আর তাদের সামনে ছোটো এক বালতি টলটলে জল হাতে দাঁড়িয়ে দশ-বারো বছরের একটি কালো মেয়ে। তার কোমর থেকে হাঁটুর খানিকটা নীচে অবধি একখানি ময়লা, মোটা ন্যাকড়া জড়ানো, গায়েও ওই রকম একখানি ন্যাকড়া। সে একমনে তিনজনের খাওয়া দেখছে। তরকারিটা বোধহয় লংকা-হলুদ-পেঁয়াজ রশুন দিয়ে তিতপুঁতির। তারা তরকারির ডেলা সরিয়ে সরিয়ে রাখছে; আর তার রসে মাখা সেই জায়গার হলদে ভাতগুলো বেশ তৃপ্তির সঙ্গে খেতে খেতে মুখ ঝাল টানছে। সেখান থেকে হাত কয়েক তফাতে একটা আধমরা কালকাশুন্দি ঝোপের গোড়ায় কাত হয়ে আছে কলকে মাথায় একটা ডাবা হুঁকো। তার পাশে একটা নুড়ো থেকে বার হচ্ছে একটু ধোঁয়া। তিন বাপ-বেটার ভাত খাওয়া হয়ে গেলে, এক-এক পেট জল গিলে জলশূন্য ওই হুঁকোয় ফস ফস করে দা-কাটা কড়া তামাক টেনে একমুখ ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আবার কাজে লাগবে। আর মেয়েটি শূন্য গামলাখানা গামছায় বেঁধে নুড়োটা নিবিয়ে শূন্য বালতিতে হুঁকো-কলকেটার পাশে রেখে নিয়ে যাবে গাঁয়ের একদিকে। ওদের বাড়িতে হয়তো একখানা মাত্র বাংলাঘর। ও রোজ বাপ-ভাইদের জন্যে ভাত-জল বয়ে আনে। ওই একরত্তি মেয়েটার পথ চেয়ে থাকে পেটভরা ক্ষুধা নিয়ে ওর বাপ-ভাইয়েরা। হয়তো ওরা খেতমজুর, নয়তো বর্গাদার কিংবা ছোটো চাষি।

ভোম্বলেরা দুজনে যেন বেলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটছে। বেলা থাকতে পৌঁছতে পারলে তবেই রুইমারির নাগাল পাবে সেই এক প্রহর রাতে।

সূর্য রাঙা হয়ে গাছপালার মাথা ছোঁয় ছোঁয়। খেতের ধারে ফাঁকা মাঠে গোরু চরছে; এদিক-ওদিক থেকে রাখাল গোরু মোষগুলোকে তাড়িয়ে এক জায়গায় জড়ো করছে। তাদের ‘রাখালি’ ডাক থেকে থেকে শোনা যাচ্ছে। বাতাস হঠাৎ থমকে দাঁড়াল ও ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

বাবাজি বললে, ‘আর আধ ক্রোশটাক হবে। ওই ডাইনে পথ দেখা যায়। কি গো বাবা, পা ব্যাতায় নাকি?’

ভোম্বল বললে, ‘না৷’

—‘চলো, গাঁয়ে ঢুকে রুইমারির পথের হদিস নেব।’

গাঁয়ের মুখে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা ডুবল। ছায়া বেশ ঘন হয়েছে। গোরুর পাল ফিরে আসছে। সকলের শেষে একটা মোষের পিঠে চড়ে আসতে

গান গাইছে একটা রাখাল। মোষটা নির্বিকার। সে আসছে আর মাথা তুলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। গ্রামের মুখেই একটা মাঝারি শেওড়াগাছের মাথায় স্বর্ণলতার জটা। সিঁটিয়ে, শুকিয়ে সুতোর মতো হয়েছে। বর্ষায় ওর রং হয় সোনালি, তখন রসে ফুলে উঠে পুটপুটে হয়। দুমড়ে ভাঙলেই শব্দ হয়, পুট। রাতে ওদের তলায় ও ফাঁকে ফাঁকে পিট পিট করে জ্বলে জোনাকি। তখন ভারি বাহার হয়, যেন খুদে খুদে বনপরীদের মেলা বসে।

কথা কইতে কইতে সামনের দিকে তাড়াতাড়ি আসছিল দুটি লোক। বাবাজি তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলে, ‘রুইমারির পথটা কোনদিকে?’

—‘এই সিদে গিয়ে বাঁ হাতি।’

—‘কতটা হবে?’

—‘তা কোশ দেড়েক। সামনের মাঠ পার হলেই কেলোর জঙ্গল। তারপর আর আধকোশটাক।’

বাবাজি একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘কেলোর জঙ্গল? ভাবনার কিছু আছে নাকি?’

—‘এক সময়ে ছিল। কেলোটা মরেছে; ওর সাগরেদরাও নিপাত্তা। এখন নিভভয়।’

কথাটা শুনে ভোম্বলের বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। লোক দুটো তেমনি কথা বলতে বলতে চলে গেল। বাবাজি বললে, ‘আমাদের ঠেঙে কেড়ে নেবার মতো কি আছে? ভিক্ষের চাল? আর কয়েকটা টাকা-পয়সা।’

ভোম্বল কিন্তু তার সম্বলটুকু ছাড়তে নারাজ। সে ঠিক করলে, বেগতিক দেখলে একদিকে দেবে ছুট। অন্ধকার রাত। হোক না ডাকাত। ওদের চোখ তো বাঘের মতো জ্বলে না।

দুজনে এগিয়ে চলল। গাঁখানা নেহাত ছোটো নয়। তার ওপর জায়গায় জায়গায় ঝুপসি। ঝিঁঝিঁ ডাকছে, জোনাকি উড়ছে। এদিকে ওদিকে দু-একটা আলো দেখা গেল। কোথায় যেন শাঁখ বেজে উঠল। দূরে কোথা থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। গোয়াল থেকে সাঁজালের গন্ধ এসে নাকে লাগছে। মাথার ওপর একটা মস্ত গাছের ডালে ডানা ঝটপট করলে কি একটা পাখি।

কিছুক্ষণ হাঁটবার পর মনে হল সামনে যেন ফাঁকা মাঠ। মাঠের শেষে দেখা হাচ্ছে সাঁঝের তারাটি। দেখাচ্ছে সবগুলো পাপড়ি ফোটা সোনার পদ্মের মতো। আর খানিক এগোতেই গাঁ শেষ হল; ভোম্বল বললে, ‘বাঁয়ে যে একটা পথ দেখা যায়।’

বাবাজি বললে, ‘ঠাওর হয় যেন তাই। চলো তো গোবিন্দ স্মরণ করে এগোই। এ গাঁয়ে একটু ঠাঁই পেলে রাতখানা যাহোক করে কাটিয়ে দিতেম কিন্তু।’

দুজনে সেটি ধরেই এগোতে সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে মাঠ গ্রাম সব ঢেকে ফেললে। আলো বলতে আকাশভরা তারা, মিটমিটে জ্বলজ্বলে, আর শীতের বাতাসে দু-একটি উড়ন্ত জোনাকি।

তারা চুপচাপ চলছে। ভোম্বল চলতে চলতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে যদি কোথাও আলো দেখা যায়! আলো দেখলে মনে সাহস হবে, ভরসা হবে যে, দূরে বা কাছে যেখানেই হোক মানুষ আছে। মানুষ মানুষকে ভয়ও করে, আবার সাহস, ভরসা দেয়। কিন্তু আলোর বদলে শুনতে পেল অনেক দূরের মানুষের গলার আওয়াজ। ‘হুই-ই।’ লোকটা কারুকে সাড়া দিচ্ছে কি সাড়া নিচ্ছে। তার অস্পষ্ট জবাবও শোনা গেল।

বাবাজি বললে, ‘মনে হচ্ছে যেন জঙ্গলে এসে পড়েছি। দুপাশে ঘন গাছপালা। ওই যেন একটা আলো এগিয়ে আসছে।’

ভোম্বল বললে, ‘হুঁ হুঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে।’

তার কথা শেষ হতে হতেই আট-দশটা লোক যেন শোরগোল করতে করতে এসে পড়ল। তাদের সামনের লোকটার হাতে লন্ঠন।

তারা আরও কাছে আসতেই ভোম্বলরা দেখলে, একখানা পালকি আসছে। তারা দুজনে সরে দাঁড়াতেই লোকগুলো তাদের পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল।

সামনে থেকে লন্ঠন হাতে আসছিল একটি লোক। সে কাছে আসতেই বাবাজি লোকটাকে জিজ্ঞেস করলে, ‘দাদু, রুইমারি -’

—‘ছামনে-সিদে।’ বলতে বলতে এগিয়ে গেল।

তারপরে শোরগোল করতে করতে আসছিল এক দল লোক। বাবাজি তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলে, ‘রুইমারি কদ্দুর?'

‘জঙ্গল পারেই।’

তারা তেমনি শোরগোল করতে করতে এগিয়ে যেতে লাগল। পিছনে গাছপালার গায়ে নাচতে নাচতে মিলিয়ে যেতে লাগল তাদের মস্ত মস্ত ছায়া।

আবার সব অন্ধকার ও নিঝুম। সেই ঝিঁঝির ডাক, জোনাকির মেলা। সামনে দিয়ে একটি শিয়াল ছুটে পালাতে পালাতে তাদের দিকে জ্বলজ্বলে চোখে একবার ফিরে তাকাল। দুজনেই পা চালিয়ে চলছে। হঠাৎ তাদের কানে এল অস্পষ্ট ঢাকের আওয়াজ।

বাবাজি বললে, ‘মনে হয় যেন তারা মায়ের আরতি হচ্ছে। জঙ্গলটা বেশি বড়ো নয়। হয়তো আগে বড়ো ছিল। সাফ-সুফ করে আবাদ হয়েছে।’

ভোম্বল জবাব দিলে না, তার কান ঢাকের আওয়াজের দিকে। শব্দ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সে বলে উঠল, ‘ওই আলো দেখা যায় - একটা, দুটো, তিনটে।’

তার বুকের ভার নেমে গেল। সে জোরে হাঁটতে লাগল। এক-একবার তার মনে হয়, শব্দ লক্ষ্য করে সে ছুট দেয়। কিন্তু সামনে পাথরের মতো জমাট অন্ধকার। একবার কোথায় যেন দু-একটা শিয়াল ডেকে উঠল। এবার মনে হচ্ছে তারা একটা ভালো পথে এসে পড়েছে। কিন্তু দুপাশে যেন মস্ত মস্ত গাছপালা, বাঁশঝাড়, মানুষের গলাও শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ একধার থেকে কে যেন হেঁকে উঠল -

—‘কে যায়?’

বাবাজি সাড়া দিলে, ‘আমরা-আ।’

অন্ধকার থেকে আবার প্রশ্ন হল - ‘আমরা-কারা?’

বাবাজিও জবাব দিলে, ‘অতিথি -’

জবাব হল, ‘সিধে যাও। মন্দিরের বাঁয়ে অতিথিশালা।'

ভোম্বলের মনে পড়ল চর-মাদারিপুরে সেই পাগলাপাড়ার কথা।

বাবাজি বললে, ‘রাত-বিরেতে গাঁয়ের পথে গাঁয়ের মানুষ এমন সাড়া দেয়।'

যাহোক, খানিক চলার পর দুজনে এসে পড়ল তারা মায়ের মন্দিরের সামনে। জায়গাটি বেশ ফাঁকা ও পরিষ্কার। সামনে একটা মস্ত পুকুর। মন্দিরের সামনে ও আশপাশে লোকজন ও আলো ছিল। আরতি তখন থেমে গেছে। মন্দিরের দরজা বন্ধ।

তাদের দেখেই একজন এগিয়ে এসে বাবাজিকে জিজ্ঞেস করলে, ‘বৈষ্ণব?’

বাবাজি জবাব দিলে, ‘হাঁ বাবা, ফকির।’

‘তা হোক, অতিথিশালা সবার তরে। আগে অন্য ব্যবস্থা ছিল। মন্দিরের পিছনে, ওই যে আলো দেখা যায়? ওখানে যান, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’

দুজনে তখন যাহোক একটু আশ্রয় পেলে বাঁচে। তারা সকাল থেকে বলতে গেলে অবিরাম হাঁটছে। আলো লক্ষ্য করে সেখানে গিয়ে দ্যাখে মস্ত টিনের ঘর, মেঝে পাকা। সামনে বারান্দা, নীচে চত্বর। এর বেশি আর কিছু তখন চোখে পড়ল না এবং দেখবার কৌতূহলও হল না। ঘরের আড়া থেকে একটা ঝুলনবাতি ঝুলছে। ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই এল একটি লোক।

ভোম্বল ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে যেন ভেঙে পড়েছে। ঘরে ঢুকেই সে খালি মেঝেতেই বেড়ায় ঠেসান দিয়ে বসে পড়ল। বাবাজি তার দিকে তাকিয়ে লোকটিকে বললে, ‘এখানে সেবার, শোবার ব্যবস্থা কী?’

—‘রাতে সেবা স্বপাক। তার ব্যবস্থা করা হয়। দুপুরে খেচরান্ন প্রসাদ। শয়নের ব্যবস্থা অতিথিদের নিজের।’

—‘আমাদের শয্যা বলতে কিছুই নেই। এখন স্বপাক ও সম্ভব নয়। ওই বালকটির আপাতত কিছু খাদ্য পানীয়ের দরকার।’

লোকটি ‘আপনার শিষ্য?’ বলে ভোম্বলের দিকে বার কয়েক তাকাল। তারপর ‘দেখছি’, বলে বেরিয়ে গেল।

ভোম্বল বললে, ‘সঙ্গে তো কিছু চিঁড়ে-পাটালি আছে।’

বাবাজি বললে, ‘ওটুকু সকালের সঞ্চয়। কাল এখানে কিছু পাথেয় সংগ্রহের পর দুপুরের প্রাসাদসেবা। তারপর রেলবাজারের পথে পাড়ি। বুঝছি তুমি খুব ক্লান্ত। কিন্তু তুমি স্বেচ্ছায় এ কষ্ট ভোগ করছো।

ভোম্বল বললে, ‘কিছু খেয়ে এক ঘুম দিলেই সব সেরে যাবে।’

একটু পরেই লোকটি আর একটি লোক সঙ্গে নিয়ে এল। দ্বিতীয় লোকটির কাঁধে খান কয়েক দেশিকম্বল, আর, প্রথম লোকটি হাতে কলাপাতার চৌকো ঠোঙায় চিঁড়ে, আখের গুড় ও দুটি শাঁখ আলু। সে জিনিসগুলো মেঝেয় রেখে বললে, ‘এই অন্ধকারে আর পুকুরে যাবেন না। বারান্দায় জালায় গুড় জল আর ভাঁড় আছে। হাত-মুখ ধুয়ে আসুন। ওই চারখানি কম্বল পাতার, গায়ে দেবার। খাবার জল আনছি। কম্বল চারখানির ভাড়া, চার আনা। আশ্রমের নয় কিনা।’

বাবাজি গেল হাত-পা ধুতে। ভোম্বল গেল না। সে নিজের আর বাবাজির জন্যে কম্বল বিছিয়ে বিছানা পাততে লাগল।

তারপর খেয়েই কম্বল আলোয়ান মুড়ি দিয়ে কুকুরকুণ্ডলী করে শুয়ে পড়ল। তার বালিশের ও দরকার হল না। এবং সেই যে শুলে, সারা রাতের মধ্যে একবারও তার ঘুম ভাঙল না৷

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%