খগেন্দ্রনাথ মিত্র
তারপর -
প্রতিবছর পুজো যেমন করে আসে, যেমন করে যায়, শরৎ-হেমন্ত শিশির-কুহেলী নিয়ে যেমন আসে, যেমন যায়, তেমনি এল চলে গেল। বাতাসে, গাছে, ধান ও ফসল ভরা মাঠে, নদী-খাল বিলে লাগল শীতের ছোঁয়াচ।
ভোম্বলের কাকা চরমাদারিপুরের সেই নায়েবমশাই হারানবাবু, কয়েকবার বাড়ি আসা-যাওয়া করলেন। ভোম্বলের পরীক্ষাও এল গেল - হাতে হাতে ফল দিয়ে।
কাকা ভোম্বলকে ডেকে বললেন, “সামনের তিনটে বছর খুব মন দিয়ে পড়াশুনা করতে হবে। আমাদের সময়ে ছিল এনট্রান্স পরীক্ষা। ভারি কঠিন পরীক্ষা। ওপরে উঠে ছ-সাত বছর লাগত পাশ করতে। পাশ করলেই চাকরি। তোমাদের সময় হয়েছে, মাতৃকুলেশন পাশ করা ভারি সহজ। ইংরেজি-টিংরেজি পড়তেই হয় না। ওটা তোমায় পাশ করতেই হবে। পাশ করা থাকলে আমি ধরাধরি করে একটা চাকরি জোগাড় করে দেব।”
ভোম্বল মনে মনে বললে, “আমার টাটা নগরে যাবার কী হল? চরমাদারিপুরে সে রাতে তো একথা হয়নি।”
হারানবাবু আবার বললেন, “শুনছি, পড়াশুনো ছেড়ে তুমি না কী স্বদেশিদের দলে ঘুরে বেড়াও? ওতে পেট ভরবে? সময় থাকতে থাকতে নিজের দিন কিনে নাও। শেষে কী জেল-জরিমানা হাঙ্গামা পোয়াতে হবে? তোমার ও সবে কী দরকার? একবার পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। সাবালক হতে আর ক'বছর-? নিজের ভালটা কী তুমি বুঝবেই না?” বলে নায়েবমশাই তামাক টানতে লাগলেন।
স্বাদেশির দলে মিশে ভোম্বলের আনন্দ হয়। দলের অনেকে ওকে ভালোবাসে; বলে, ‘ছেলেটি খাঁটি।’
কিন্তু ভোম্বল নিজে কোনটা ভেজাল ও কোনটা খাঁটি চিনতে পারে না। তবে সে মেশামিশিতে একটু ঢিলে দিয়েছে। সে নিরবে সেখান থেকে সরে গেল। তার মনে কিসের যেন একটা আশঙ্কা জাগল। সে উঁচু ক্লাসে উঠে দেখছে যেন একটা দায়ে বাধা পড়ল। একটা কিছু যেন হতে যাচ্ছে।
রাতে অনেকক্ষণ তার চোখে ঘুম এল না। নির্জন নদী কিনারায় বালুচর থেকে আসতে লাগল দুটি ভুতুমের ভারী ডাক- ‘তুই থুলি, মুই থুলি।’ ‘
তুই থুলি’ - ‘তুই থুলি।’
সে কোন এক কালে যেন ওরা নদীকিনারায় বালুচরে ওদের কী এক অমুল্য ধন রেখেছিল যা আজও খুঁজে পেল না কোনওদিন পাবেও না। আর এমনি জ্যোৎস্নারাতে এমন করেই পরস্পরকে দোষ দেবে। ওদের ডাক শুনলে ভোম্বলের মন কেমন করে। পাখি দুটোকেও কোনদিনই দেখেনি। এক এক রাতে দেখবার ইচ্ছে হলেও সুযোগ হয় না। কারণ রাত গভীর, নির্জন নদীতীর, ভয়ও করে। ভোম্বল ভূত-প্রেত মানে না। তবু ওর ভয় করে।
নদীবুকে বিশাল চর জেগে উঠেছে। জল রোজই কমছে। আর কয়েকদিন পরে হেঁটে পারাপার করা যাবে। ওপারের ওই ধোঁয়াটে গ্রামগুলোর মাঝ দিয়ে নদীটি এসে পুব-দক্ষিণে চলে গেছে। চলে গেছে সুন্দরবনে; সুন্দরবনের মাঝ দিয়ে সমুদ্রে। ও একদিন যাবে সমুদ্র দেখতে - না, না, সমুদ্রের ওপর দিয়ে দূর বিদেশে। সেখানে থেকে আর ফিরবে না।
ওর কাকা বলেছেন, স্বদেশীর দলে না মিশতে। ওরা খারাপ কীসের? স্বাধীনতা, জাতীয়টা, স্বদেশি এসব কথার অর্থ সে ভালো বুঝতেও পারে না। তবু ভালো লাগে। ওই রুশ-জাপানের যুদ্ধটার চলচ্চিত্র তাকে দেশ-ছাড়া করেছিল। সে দেখেছে, বড়োরা জাপানের জয় চেয়েছিল। কেন? সে রুশ ও জাপানি কাউকেই
সে দ্যাখেনি। বড়োরাও কেউ তাদের দেখেছে বলে তার ধারণা হয় না। তবে তারা রুশদের বিপক্ষে, জাপানিদের পক্ষে যায় কেন? ও সাহেব দেখেছে বটে পুলিশ সাহেব, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব, গার্ড সাহেব, ইঞ্জিনড্রাইভার সাহেব। এদের, মানে ওই সাদা সাহেবদের না কী দেশ থেকে তাড়ানো দরকার। তাহলে দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। তারপর? লোকের যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে? সুখে থাকবে? এই ধরনের অনেক প্রশ্ন এই ক'মাসে তার মনে জাগছে।
তার বন্ধুরাও যেন কিছু বেড়েছে, যেন অনেক নতুন কথা শিখেছে। ওই কাঠগোলার মজুরেরা আজও দিনের কাজ সেরে নদীপথে নৌকা বেয়ে ঘরে ফিরে যায়। আজও তারা সারি গায়, তাদের বৈঠা পরে তালে তালে। কিন্তু সেই বুড়ি আজও বেঁচে আছে কিনা, আজও সেই মালতী ফুল কুড়োতে যায় কিনা, সেই বুড়ো রাখাল আজও জমিটুকুর জন্যে, তার ছেলের জন্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে কিনা, স্বরূপের সেই দুঃখভরা গান - এই সব সামান্য ঘটনার জন্যে তার মনে বেদনামাখা কৌতূহল জাগে।
নায়েবমশাই একদিন বাড়ি এলেন। তারপর দিনই এল ভোম্বলের এক মামা - মানে কাকিমার এক ভাই। তিনি না কী এখনকার বাজারে কীসের একটা দোকান করবেন আর ভোম্বলদের বাড়িতে থাকবেন। এই পরিবর্তনটা ভোম্বলের ভালো লাগল না। তার মানে কেমন একটা ভয় হতে লাগল। মামাটির নাম বিপ্রদাস। শরীর রোগা, বেঁটে, রং ঘোর কালো, বয়স আন্দাজ পঁচিশ বছর অথচ মুখে গোঁফ-দাড়ি নেই। লোকটা চোখ পিটপিট করতে করতে কথা বলেন। ডাক নাম - বিপু। তিনি এসেই ভোম্বলের ঘরের একটা অংশ দখল করলেন।
নায়েবমশাই পরদিনই ভোম্বলকে বললেন, “চরমাদারিপুরের ইস্কুলটা ভালো। ওর হেডমাস্টারমশাইকে তোমার মনে নেই।”
সেই নারকোলমুখো লোকটাকে ভোম্বলের মনে নেই? তবু সে এমন ভান করতে লাগল, যেন ভুলে গেছে।
নায়েবমশাই আবার বললেন, “তোমার পড়াশুনোর বিষয়ে ওঁর সঙ্গে পরামর্শ করেছি। এই থার্ডক্লাস থেকেই খুব মন দিয়ে পড়লে মাতৃকুলেশন হাসতে হাসতে পাশ করে যাবে। তুমি বেড়াতে খুব ভালোবাসো। চেষ্টা চরিত করে, তোমাকে রেলে ঢোকাতে পারলে পাহাড়-পর্বত-সমুদ্র-হিল্লি-দিল্লি-বোম্বাই করে বেড়াবে। তিনটে বছর দেখতে দেখতে কাটবে।” ভোম্বল কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনতে লাগল।
নায়েবমশাই তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আবার বললেন, “চরমাদারিপুরের ইস্কুলে খেলাধুলোর খুব ভালো ব্যবস্থা। মস্ত মাঠ। ইস্কুলটা বারোয়ারিতলার পুবে কুরশো যাবার পথে। টানা টিনের ঘর; পাকা মেঝে। সামনেও মাঠ। ছাত্র পড়ে সাড়ে তিনশো। এত বড়ো ইস্কুল ও তল্লাটে আর নেই। আমাদের কাছারি থেকে বছরে চারশো টাকা সাহায্য দিতে হয়। সরস্বতী পুজোয় খুব ধুমধাম হয়। গেলেই দেখতে পাবে। ছেলেরা হয়তো, তোমাকেই পুজো কমিটির সেক্রেটারি করে বসবে। ওরা সব গাঁয়ের ছেলে। ওদের কাছে শহরের ছেলের, তার ওপর নায়েবমশাইয়ের ভাইপোর খাতির না হয়ে যায়?” বলে নায়েবমশাই একমনে তামাক টানতে লাগলেন।
এবার ভোম্বলের চোখের সামনে নায়েবমশাইয়ের এত কথার মানে পরিষ্কার হয়ে গেল। সে বুঝতে পারলে, তাকে চরমাদারিপুরের ইস্কুলে পড়তে হবে। সেই গ্রামে কী আছে? এখানকার পরিবেশ, সঙ্গী-সাথীদের ছেড়ে সেই গাঁয়ে সে যাবে? সে ওখানে গিয়ে সর্দারি করবে? এখানেও তো সে সর্দার। তার দলই আশেপাশে আম-জাম-পেয়ারা লুঠ করে। আমড়া-কুল ফলসা কোনটা বাদ রাখে? এমন নদী, এমন চর, এমন নৌকা সেখানে কোথায়? সবার ওপর তার কল্পনার, স্বপ্নের টাটানগর। দুদিন আগে সে শুনেছিল, পাশ করলে টাটানগর যাবে। সেখানে পাশ করতে গিয়ে গড়ার কাজ শিখবে। এখন শুনছে, ‘রেলের বাবু’ হবে। উর্দিপরা রেলের বাবুদের সে দেখেছে। চেকার, গার্ড সাহেব, টরেটক্কাবাবু, মালবাবু, সবই তার দেখা আছে। ও সবের কোনওটাই সে হতে চায় না, সে যাবে টাটানগরেই। বেশি জবরদস্তি করলে সে যে পথে গিয়েছিল তার উলটো পথ ধরবে। তবে শীতকাল। এবার গাঁয়ের পথ ধরবে না, রেলের পথ ধরে হাঁটবে। স্টেশনে রাত কাটাবে। সে তখন এর বেশি কিছু ভাবলে না, ভাবতে পারলে না।
তখন বড়োদিনের ছুটি চলছে। তার কাকা ফিরে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, “জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই তোমার ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নেব।”
ভোম্বল মনে মনে বললে, “তার আগেই কাট।” কিন্তু ভোম্বলের এমন কোনও সঙ্গী-সাথী ছিল না যার সঙ্গে সে মনের কথা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু সর্দার তো তার মনের কথার আলোচনা সঙ্গীদের সঙ্গে করে না। ভোম্বল যে সর্দার।
এদিকে আমনের খেত শূন্য হয়েছে। চৈতালির খেত ভরা। ফুলে-ফলে-রঙে-রূপে তা উপছে পড়ছে। চাষির উদয়াস্তের মেহনত সফল। কিন্তু তার সংগ্রহ-সঞ্চয়, নিজের ভোগে লাগে কতখানি? ভোম্বল বা তার সঙ্গী-সাথীরা এসব বোঝে না, কেউ তাদের বুঝিয়েও দেয় না।
তার এক-একবার মনে হচ্ছে, চরমাদারিপুরে গেলে তার কেন ভালো লাগবে না? এই দুর্গাপুরে সে থাকবে কীসের টানে? যার কোথাও কেউ নেই তার সব জায়গাই তো সমান। তার একবারও মনে হয় না, তার ভালোর জন্যই শাসন ও এই ব্যবস্থা। যারা ভালো ছেলে বলে লোকের কাছে আদর পায়, তাদের কাউকে তার ভালো লাগে না। ওরা কেবল লেখা পড়াতেই ভালো। ওদের কাউকে সে কারো উপকার করতে দেখেনি। সবাই স্বার্থপর ও ভীরু - মিটমিটে শয়তান। না গানবাজনায়, না - খেলাধুলোয়, না দুষ্টুমিতে ওদের দেখা যায়।
ভোম্বলকে আজকাল ওই বিপুমামা শাসন করতে আরম্ভ করেছে। লোকটা বুঝতে পারছে না, বোলতার চাকে হাত দিচ্ছে। গত বছর মাছ ধরার জন্যে ওই কুলগাছটায় একটা বোলতার চাক ভাঙতে গিয়ে ভোম্বলের যে দশা হয়েছিল সে চিহ্ন তার পিঠে ও পায়ে স্থায়ী হয়ে আছে। লালুটা ছিল সঙ্গে। বোকার মতো ঢিল মেরে চাকটার খানিকটা ভাঙতেই হলদে পতঙ্গগুলো এসেছিল ভোঁ ভোঁ করে। ছুটেও কী বাঁচতে পেরেছিল? তার পিঠ ও পা, লালুর নাক ও ভ্রূ উঠেছিল ফুলে। জ্বলুনি কমাতে সাজা তামাক, কসটিক, আরও যেন কী দিয়েছিল। তবু কী জ্বলুনি যায়? জায়গাগুলো যেন আগুনে পুড়ছিল। মামাকেও এমন জ্বলুনিতে জ্বলতে হবে। ওর নাম ভোম্বল। ওর নিজের মামা হলেও কথা ছিল।
ধল-গাঙের ধারে আবদুলপুরে এই সময়টায় মেলা বসে। ওখানে আছে এক পিরের খুব পুরোনো দরগা। পিরসাহেব না কী এসেছিলেন, ইরান, তুরান, না কোরাসান, কোথা থেকে। জায়গাটা খুব সুন্দর দেখে ওইখানেই থেকে যান এবং ওইখানেই তার এন্তেকাল হয়। তখন দিল্লির তক্তে আকবর বাদশা না কী বসবার ফিকির করছেন। ওই জায়গাটা ও পিরসাহেব সমন্ধে আরও কত কথা আছে। মোটা কাগজে বাংলা হরফে তেলকালিতে ছাপা, একখানা ছড়ার বইও যেন ভোম্বল দেখেছে। বইখানার দাম ছিল চার পয়সা মাত্র। তার মনে পড়ে ছড়ার কয়েকটি চরণ ও শব্দের বানান-
‘শুন শুন সবে এই থানের মাহাত্য
যাহা কই সব কিচু অত্যান্ত যতাথ্য।
ভারি মিঠা ছিল এই দরিয়ার পানি
পাখ-পাখালি ফুলফল ভরা গাঁওখানি।
এক রোজ বিহানেতে আসে পীর চাঁদ,
রূপ দেখে কয় একী ছুরতের ফাঁদ…’
তারপর ভোম্বলের আর মনে নেই। কিন্তু মেলার ধারে মাথায় টুপি, গায়ে জোব্বা, পরনে পাজামা সেই বই বিক্রেতা দুজনের মিলিত কণ্ঠস্বর আজও তার কানে বাজে। অনেকটা সত্যপিরের পাঁচালির সুরের মতো।
ওদের বাড়ি থেকে মেলাটা দুক্রোশ। নদী বা খাল যা-ই বলো প্রায় অর্ধেক পথ তার ধারে ধারে! বাকি অর্ধেক খেত-খামার ও গাঁয়ের মাঝ দিয়ে। কিন্তু গাঁটে বা পকেটে পয়সা না থাকলে মেলা দেখায় মজা নেই। রানিদিদি শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাবার সময় ভোম্বলকে একটা চাঁদির আধুলি দিয়ে গেছে। কারণ, ভোম্বল চারদিন খোকনকে কোলে নিয়ে বাজারের মুখে সতীশ জোয়ারদারের ডাক্তারখানায় গিয়েছিল এবং ওষুধ এনেছিল। এক আধুলির শক্তি কী কম? তারই জোরে ব্যাং হাতিকে লেঙ্গি মেরেছিল। হাতি অবশ্য তার টের পায়নি।
ভোম্বল সেদিন সকালে এক পেট ফ্যানে-ভাত নুন-কাঁচা লংকা ও ঘি দিয়ে খেয়ে, ট্যাংকে আধুলিটি ও বগলে সেই তলতা বাঁশের আগাটুকু নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললে, “কাকিমা মেলায় যাচ্ছি। কিছু আনতে হয় তো পয়সা দাও।”
ভোম্বলের কথা শুনে কাকিমা প্রথমে ব্যাপারটা ধারণায় আনতে পারলেন না। পাল-পার্বণ কিছু নেই অথচ মেলা। জিজ্ঞেস করলেন, “কীসের মেলা?”
ভোম্বল বললে, “আবদুলপুরে পিরের মেলা।”
“সে কোথায়।”
“ওই ধল-গাঙের ধারে -এখান থেকে কোশ দুই হবে!
“বলিস কি? সেখানে কী করতে যাবি?”
“মেলা দেখতে। এখন তো ক্লাসে পড়াশুনা হচ্ছে না। নতুন বইও কেনা হয়নি। বাড়ি বসে কী করব?”
কাকিমা কাকার কথার পুনরাবৃত্তি করলেন, “অঙ্ক কষগে! ইংরেজি পড়গে। আমার হয়েছে জ্বালা! এ ছেলেকে সামলানোর সাধ্যি আমার? কবে যে নিয়ে যাবে।”
ভোম্বল এবার নিঃসন্দেহ হল যে তাকে চরমাদারিপুরে নিয়ে যাওয়া হবেই। বেশ! সেও নিশ্চিত জানিয়ে দেবে, সে কী চায়। ওখানে যাওয়া মানে মার খাওয়া —পেয়াদারাও হয়তো ঠ্যাঙাবে! আর নয়। টাটানগর সে অনেক দূর। যদি সেখানে যেতে নাই পারে, তবে আর কোথাও —কিন্তু যেতে পারবে নাই বা কেন? ম্যাপখানা ভালো করে দেখতে হবে। নিরঞ্জনের বাড়ি গিয়ে দেখতে হবে, টাইমটেবল। ওর দাদা চক্রধরপুর না চাইবাসায় কোথায় যেন ইঞ্জিনিয়ার। উনি বাড়ি এসেছেন। ওঁর কাছে শুনতে হবে ওদিককার গল্প।
ভোম্বল আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।
চৌমাথার বাঁয়ে ছাপ্পড়ের তলায় ভীমে কর্মকারের কামারশালা। ভীমে খুব বুড়ো হয়ে গেছে। ওর ছেলে কেষ্টকামার এখন কাজ করে। তবে ওর মতো পাকা নয়। ভীমের হাতে লোহা যেন মোম —পুড়িয়ে,
পিটিয়ে যা খুশি তাই করতে পারে। ভোম্বল গিয়ে কেষ্টকে বললে, “কেষ্টদা, এই তলতা বাঁশের আগাটা দিয়ে একটা আড় বাঁশি তৈরি করে দিতে পারো?”

কেষ্ট তখন কী একটা করতে যাচ্ছিল। আগাটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে মুচকি হেসে বললে, “বাজাবা? - পারি। পয়সা লাগবে দু-আনা।”
ভোম্বল বললে, “লোহার শিক পুড়িয়ে ভারি তো কটা ছেঁদা করবে। তার জন্যে দু-আনা?”
“মাপ-জোক নাই?”
“থাকলোই বা। ছোটো ভাইয়ের কাছ থেকে তোমার কিছু নেওয়াই উচিত নয়।”
কেষ্ট, নেহাইয়ের ওপর একখানা লোহার পাত রেখে হাতুড়িটা হাতে তুলে নিয়ে ভোম্বলের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললে, “আচ্ছা। কাল বৈকালে আসিস। আগাটুকু রাখে যা।”
ভোম্বল বাঁশের আগাটা কামারশালায় রেখে মেলার পথ ধরল। যেতে যেতে শুনল, কেষ্ট কর্মকার হাতুড়ি পিটছে - ঠং ঠং ঠং-।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন