খগেন্দ্রনাথ মিত্র
গাঁয়ের পথে রোদ পড়ে না, কেবল ছায়া।
ভোম্বল একটা নতুন পথে ছায়ায় ছায়ায় যেতে লাগলো। গাঁ যেখানে শেষ, সেখান থেকে আবার ক্ষেত-খামার শুরু। তার শেষে যে গাঁ তা একেবারে আকাশে মিশে আছে। মানিকপুর থেকে কতদূর হবে, কে জানে? পথটা যেন একখানা বিশাল ধনুক! ভোম্বল একবার সেদিক পানে তাকালো। উঃ! কী রোদ। চোখ মেলে তাকানো যায় না!
যে একটা গাছতলায় বসে কাপড়ের এক মুড়ো ছায়ার বাইরে রোদে মেলে দিলে। চারধারে তাকিয়ে দেখলে, কেউ কোথাও নেই—কেবল কিছু তফাতে একখানা প্রকাণ্ড টিনের আটচালা দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে শব্দ আসছে—”একের পিঠে এক–এ—গা—রো-ও” ভোম্বল বুঝলো, ওটা একটা পাঠশালা। ছেলেগুলো গাঁ মাথায় করে শতকে পড়ছে।
ভোম্বল পাঠশালাটার দিকে মুখ করে লেবুটা ছাড়িয়ে খেতে লাগলো। ভারি মিষ্টি লেবু। এই জন্যেই মতে কুমোর কাউকে খেতে দেয় না। এর সঙ্গে যদি একটু নুন হতো!, তাহলে কেয়া মজা!
লেবু খেতে খেতে রোদে কাপড়ের মুড়োটা শুকিয়ে এলো। ভোম্বল সে মুড়ো পরে আর এক মুড়ো তেমনি করে রোদে দিলে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেটাও শুকিয়ে গেল। এবার আর কোমর না বেঁধে মুড়োটা সে গায়ে দিলে। ক্ষিধেয় পেট তখনও জ্বলছে। একটা বাতাবী লেবুতে অমন ষণ্ডা ছেলের কী হবে? সে চারধারে তাকিয়ে দেখলো, কোথাও কোন ফলের গাছ আছে কিনা? বছরের এ সময়ে বাতাবী ছাড়া আর কোন ফল পাওয়া যায়? তবে কয়েকটা ভাল ফল, এ সময়ে ফলে–কলা, নারকোল, পেয়ারা, আতা। ঐ যে পাঠশালার ওধারে কয়েকটা নারকোলগাছ ও কলার ঝাড় দেখা যাচ্ছে। এক কাঁদি কলাও পড়েছে যেন!
ভোম্বল আস্তে আস্তে সেদিকে এগিয়ে গেল। বেশ বড় বড় কলা। সে আরও কাছে গিয়ে দেখলে—কাঁদিটা পাকা কলার নয়, কাঁচকলার। আর, নারকোলগাছে নারকোল আছে বটে কিন্তু পাড়বে কে? সে নারকোলগাছে চড়তে পারে না।
যাক। কলা-নারকোল খেয়ে দরকার নেই। একবেলা না খেলে কী, হয়? ছেলেরা তখন নাস্তা পড়ছে— “সাতনম্ তেষটী—ই—ই।”
তার ইচ্ছে হলো, একবার পাঠশালাটা দেখে যায়। সে বড় ইস্কুলের ছাত্র। পড়ে ফোর্থ ক্লাসে (ক্লাস সেভেনে)। ফোর্থ ক্লাসের ছেলের সঙ্গে চালাকি নয়! তাদের অনেক বই। অ্যালজেব্রা আর সংস্কৃত ঋজুপাঠের নাম শুনলেই পাঠশালার পোড়োদের চক্ষু রসগোল্লা। ওরা ইংরেজীরও কিছুই জানে না। কেবল জানে বাঙলা আর শুভঙ্করী। বাঙলা আবার কেউ পড়ে নাকি? তবে হাঁ, শুভঙ্করীটা—কথাটা ভাবতে ভাবতেই সে পাঠশালার সামনে এসে পড়লো।
তাকিয়ে দেখলে একঘর ছেলে। ছেলেগুলো ধাড়ী ধাড়ী, কারো কারো গোঁফ বেরিয়েছে। তাদের মাঝে পণ্ডিতমশাই একটা পুরনো টেবিলের সামনে, একখানা হাতলভাঙা চেয়ারে আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে আছেন। তাঁর নাকের ডগায় কালো ফ্রেমের স্টীলের বাঁকা ডাল ভাঙা চশমা, মাথার চুল কাঁচা-পাকা। গায়ে আধময়লা পাঞ্জাবীর ওপর একখানি আধময়লা উড়ুনি আলোয়ানের মতো করে জড়ানো। টেবিলের নিচে তার বহুদিনের পুরনো মাথা বাঁকা চটি জোড়া দেখা যাচ্ছে। তাদের গোড়ালি অনেকখানি ক্ষয়ে গেছে।
ছেলেদের নামতা পড়া শেষ হলো। কিন্তু বেজায় হট্টগোল হচ্ছে। পণ্ডিতমশাই শ্লেটের একখানা ফ্রেমভাঙা হাতে নিয়ে টেবিলের ওপর খটাখট্ করে ঠুকলেন। অমনি গোলমাল কিছু থামলো, যেন এক ঝাঁক মৌমাছি গুনগুন, করতে করতে দূরে উড়ে গেল।
আরে ঐ যে! ভোম্বল এতক্ষণ দেখে নি, একটা ছেলে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে। ওর দু’হাতে দুখানা ইট। ছোঁড়াটা কী শয়তান! অমনি করে দাঁড়িয়ে ও কাকে যেন জিভ ভ্যাংচাচ্ছে।
ঐ কোণে ওটা আবার কে? হাঃ- হাঃ হাঃ! নাড়ুগোপাল। ছেলেটা মাটিতে তিন হাত-পায়ের ওপর ভর দিয়ে নাড়ু-গোপাল হয়ে আছে। হাতে নাড়ুর বদলে আধখানা ইট।
ভোম্বল আরও মজা দেখতে পাঠশালার বারান্দায় খুঁটি ধরে দাঁড়ালো। ঘরের মধ্যে সেই কোণ থেকে একটা ছেলে নালিশ করলে, “পোনশাই, গোপলা আমার বগলে কাতুকুতু দিচ্ছে—এ—এ—!”
আবার পণ্ডিতমশাই খটাখট্ টেবিল ঠুকতে ঠুকতে বলে উঠলেন,— ‘এই! সব চুপ!’
সেই ছেলেটা এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললে,—“পোনশাই আমার বগলে -এ-এ—”
পণ্ডিতমশাই হাঁক দিলেন,“—নিয়ে আয় গোপলার কান চেপে।”
অমনি চার-পাঁচটা ধাড়ী ছেলে চারধার থেকে ছুটে গেল গোপলার কান ধরতে। যে ছেলেটা দু'হাতে কান ঢাকলো, ওরই নাম গোপলো? হাঃহাঃ-হাঃ! ছেলেগুলো গোপালের হাত সরিয়ে দিয়ে তার দুকান চেপে ধরে টানতে টানতে পণ্ডিত মশাইয়ের কাছে নিয়ে এলো। পণ্ডিতমশাই গোপালের ঘাড় ধরে ধমক দিলেন,—“বাঁদরটা! কেবল খুনশুড়ি!” বলেই পিঠে থপ করে মারলেন এক চড়।
এদিক থেকে একটা ছেলে বললে, —“পোন্শাইয়ের থাবা! এই! কাঁদ কাঁদ। না কাঁদলে আরও থাবাবেন।”
গোপালও অমনি “ওঁরে বাবারে” বলে কাঁদতে কাঁদতে পিঠ বেঁকিয়ে ছুটে পালালো৷
ঠিক তখনই ভোম্বলের মনে হলো পিছনে একটা প্রকাণ্ড শুয়োর চেঁচাচ্ছে। কিন্তু ফিরে দেখে, শুয়োর নয়, একটা ছেলে! চার-পাঁচটা ধাড়ী ছেলে ছেলেটাকে চ্যাংদোল৷ করে নিয়ে আসছে। আর, ছেলেটা হাত-পা ছাড়াবার চেষ্টা করতে করতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। সে কিছুতেই আসবে না। ঐ ছেলেটাকে আনতে চার-পাঁচ জনেও পারছে না? হোঃ—হোঃ! ভোম্বল তো একাই পারে। যুযুৎসুর একটি প্যাচে বাছাধন কাঁচপোকার মুখে উইচিংড়ির মতো হয়ে সুড়, সুড় করে চলে আসবে।
ছেলেরা তাকে এনে পাঠশালার বারান্দায় তুললো। ছেলেটা এবার এমন চিৎকার ও কান্না আরম্ভ করলে যেন তার ভয়ানক পেট ব্যথা করছে, কান কট্ কট করছে, দাঁতগুলোর গোড়ায় আট-দশটা পোকা কামড়াচ্ছে কী যন্ত্রণা রে বাপ। সে কেবলই বলছে,—‘আমায় ছেড়ে দেরে! ওরে বাবারে! আমি পাঠশালায় যাবো নারে–ওরে আমায় মেরে ফেললে রে—ও মা — আ —আ-হা-হা।
পণ্ডিতমশাই বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। ছেলেরাও তাঁর পিছু পিছু সুড়, সুড় করে বেরিয়ে এলো।
পণ্ডিতমশাই বললেন,—“নিয়ে আয় এদিকে। শুয়োরটা রোজ পালাবে—গাছে চড়ে থাকবে—”
ছেলেটা পণ্ডিতমশাইকে দেখেই কান্না গিলে ফেললে—এখন ফোঁপাচ্ছে।
পণ্ডিতমশাই তার হাত চেপে ধরে বললেন,—“চল্ ভেতরে। তোর পড়ার এত ভয় কিসের? এরা পড়ছে কী করে?—চল—”
ছেলেটা ফোঁপাতে ফোঁপাতে তাঁর সঙ্গে চললো। তার দুটি গাল চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে; কয়েক ফোঁটা বুকেও পড়েছে। তার অবস্থা দেখে অন্য ছেলেগুলোর কী স্ফূর্তি।
ভোম্বলও হাসি চাপতে পারলে না—হাসতে হাসতে পরের গাঁয়ের দিকে চললো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন