খগেন্দ্রনাথ মিত্র
গায়ে জামা নেই, কাপড় ময়লা, খালি পা, নিমন্ত্রণ-বাড়ির লোকদের মাঝে যেতে ভোম্বলের বড় লজ্জা করতে লাগলো। সে একবার ভাবলে ‘ফিরে যাই।’
কিন্তু নরহরি ততক্ষণে টানতে টানতে তাকে একেবারে খাবার জায়গায় এনেছে। জায়গাটা বাড়ির ভেতরের মস্ত উঠোন! ওপরে লাল সামিয়ানা; চারধারে বড় বড় টিনের ঘর। ঘরগুলোর দেয়াল মাটির, মেঝে পাকা। ওধারে একখানা দালান। দালানটারই পাশে ভিয়েন হচ্ছে।
খাবারের জায়গায় একদিকে ছেলের আর একদিকে বড়র দল। ছেলেরা মহা হট্টগোল বাধিয়েছে। পাকা ফলার। তখন লুচি দেওয়া হচ্ছিল। সকলেই হাত বাড়িয়ে বলছে, — “আমায় আর একখানা।” যে লোকটি লুচি দিচ্ছে, সে লুচির ঝুড়িটা মাথার ওপর তুলে বলছে, “আগে সব ঠিক হয়ে বোস্। খেতে পারলে একখানার জায়গায় দশখানা পাবি। ভারী তো সব খানেওলা! কেউ খাবি দেড়খানা; কেউ খাবি দু'খানা। কেউবা আঁড়াইখানা খেয়েই কোমরের কষি খুলবি। বোস-বোস।”
একেবারে সকলের শেষে তখনও একটু জায়গা ছিল! সেখানে একজন বসতে পারে। দালানটার বারান্দায় কুশাসন, কলার পাতা ও মাটির গেলাস গাদা করা ছিল। নরহরি সেখান থেকে একখানা কুশাসন, খান দুই পাতা ও একটা গেলাস এনে ভোম্বলের জায়গা করে দিয়ে বললে, —“বোস। তোমার নামটা কী বল তো!”
ভোম্বল বললে, —”ভূপেন্দ্র নাথ চাকী।”
—“বটে ! বোস।”
ছেলেগুলোর পোশাকের দিকে তাকিয়ে নিজের পোশাকের লজ্জা ভোম্বলের মন থেকে চলে গেল! সে দেখলে, অর্ধেক ছেলের গায়েই জামা নেই, কাপড় আধময়লা। তাদের চেহারা দেখলেই মনে হয়, বুনো।
ভোম্বল বসে পড়লো। তার পাশের ছেলেটা ভোম্বলের দিকে একবার তাকিয়ে তার পাশের ছেলেটার কানে কানে কী যেন বললে। তারপর দুজনেই খিল খিল করে হেসে উঠলো। ভোম্বল একবার তার সামনে ও পাশের ছেলে দুটোর দিকে তাকালো। তারপর তাদের দিকে আর মনোযোগ দিলে না। কেননা তখন লুচি, শাকভাঙ্গা, বেগুনভাজা ও কুমড়োর ছোঁকা পাতে পড়ে গেছে;—মুড়িঘণ্ট আসে আসে, তার নাম শোনা যাচ্ছে।
ভোম্বলের তখন খুব ক্ষিদে থাকলেও ঠিক করলে ওসব বাজে খাবার খেয়ে পেট ভরাবে না। একেবারে শেষের দিকে চালাবে। সে মাত্র খান দুই লুচি খেলো, মাছটা বাদ দিলে না। রুই মাছ রান্নাটাও হয়েছে মাংসের মতো। মাছটাও টাটকা। রায়মশাইয়ের শীতলপুর মৌজা থেকে এসেছে। মাছের পরই এলো চাটনি; তারপরই দই। ভোম্বল দই তেমন ভালবাসে না। দই খেতে খেতেই এলো বোঁদে।
ভোম্বলের পাশের ছেলেটা কোমরের কষি খুলে দিলে। তার সামনের সারির একটা ছোট ছেলে উঠে দাঁড়াতেই তার কোমর থেকে কাপড় খুলে গেল। ছেলেটার পেট গণেশের পেটের মতো ফুলে উঠেছে। সে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে হাত চাটতে লাগলো। বোধহয় ওর বাবাকে খুঁজছে; বলবে—“আর খেতে পারছি নে।”
বোকা! একদম বোকা! নিমন্ত্রণ খাওয়ার মজা তো চাটুনির পর থেকেই। ভোম্বলের পাতে এক খাবলা বোঁদে পড়লো। বোঁদেগুলো যেন এক একটা রসেভরা আঙুর। বোঁদেওলার পিছু পিছু আসছে ক্ষীরের হাঁড়ি। এইবার মজা! ছেলেরা হৈ-হৈ করে উঠলো, “ক্ষীর—ক্ষীর।” হাঁড়িটার মাথায় মাথায় ক্ষীর।

ভোম্বল বসেছিল একেবারে একধারে— সেদিক থেকে ফায়সটা। তার পাত থেকেই দেওয়া শুরু হলো। জমাট ক্ষীর, লাল রং, মিষ্টি গন্ধ। লোকটি খুরি দিয়ে ক্ষীরের মাথা ভাঙতে ভাঙতে ভোম্বলের দিকে একবার তাকালো। ভোম্বলকে চেনে না। তবু ভরা খুরিটার সব ক্ষীর ভোম্বলের পাতে ঝাঁকি দিয়ে ঢেলে দিলে। ভোম্বল ক্ষীর-বোঁদে এক সঙ্গে মেখে খেতে লাগলো। দেখতে দেখতে পাত খালি। ক্ষীরের হাঁড়ি আবার এলো, কিন্তু বোঁদের থালা নেই। না থাক, সে লুচি দিয়েই ক্ষীর খেতে লাগলো। ক্ষীরওলা তার খাওয়া দেখে বললে—“বাঃ ভাই! আর দেবো?”
ভোম্বল ঘাড় ঝাঁকিয়ে বললে,—“দিন।”
কিন্তু হাঁড়ি তখন খালি। লোকটা হাঁড়ির গা ও তলা চাঁছলো। তাতে যা উঠলো, সামান্য। তাই ভোম্বলের পাতে দিতে দিতে বললে, “আচ্ছা, এনে দিচ্ছি।” কিন্তু তারপর কাঁচাগোল্লা, রসগোল্লা এসে গেল, সে ফিরে এলো না। যখন এলো, হাতে পান্তুয়ার হাঁড়ি।
ভোম্বল পান্তুয়া খুব ভালবাসে। পান্তুয়াগুলো নাকি এসেছে মোল্লার হাট থেকে। লোকটি একসঙ্গে চারটে পান্তরা ভোম্বলের পাতে দিয়ে বললে, “খাও, ভাই।” পান্তরাগুলো বেশ বড় বড় আর ক্ষীরে ভরা। তার ভেতরে দুটি-একটি এলাচদানা। খাবার সময় দাঁতের মাঝে পড়ে পুট্ করে ভেঙে ক্ষীরের সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে।
এই সময়ে রায়-মশাই তামাক টানতে টানতে সেদিকে এলেন। আসতে আসতে সকলকে জিজ্ঞেস করছেন, —“তোর কী চাই রে? তুই খাচ্ছিস নে কেন? – এই, তোর পেট ভরেছে?” বলতে বলতে তিনি ভোম্বলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ভোম্বল তখন শেষ পান্থুয়াটি মুখে পুরেছে; তার গাল দুটো ফুলে উঠেছে।
রায়মশাই বললেন;—“এই ছেলেটি তো বেশ খায়। এই দ্বিজপদ! ওহে শুনছো? হাঁড়ি নিয়ে এদিকে এস।”
দ্বিজপদ রায়মশাইয়ের পাশে এসে দাঁড়াতেই রায়মশাই ভোম্বলকে দেখিয়ে বললেন—“দাও ঐ পাতে।”
লোকটি হাঁড়ি থেকে একজোড়া পান্তুয়া তুলে ভোম্বলের পাতে দিলে। দেখতে দেখতে সে দুটো উড়ে গেল।
রায়মশাই হাসলেন। দ্বিজপদকে বললেন, “তোমার কম্ম নয়।” বলে নিজেই হাঁড়ি থেকে গোটা ছয়েক পান্তুয়া তুলে ভোম্বালের পাতে দিয়ে বললেন,—“পেট ভরে খা। তোরা, ছেলেরা, খুশী হলে আমার নবদাদুর কল্যাণ হবে।” বলতে বলতে তিনি খড়ম পায়ে খট্ খট্ করে এগিয়ে গেলেন।
ভোম্বল পান্তুয়াগুলো খেয়ে, জলের গেলাসটি এক নিঃশ্বাসে খালি করে দিলে। তারপর বা হাতে পান নিয়ে সকলের সঙ্গে খিড়কির পুকুরে গেল হাত ধুতে।
পুকুরে হাত ধুতে ধুতে শুনলে, সন্ধ্যায় শশী বাগদীর যাত্রা হবে। সকালে তিন গরুর গাড়ি বাক্স-সিন্দুক ভরা সাজ-পোশাক এসেছে। পালা
হবে, ‘কংসবধ।’
দুপুরেই হ'তো; যাত্রা-পার্টির খাওয়া হয় নি, তাই সময় বদলে গেছে।
যাত্রার নাম শুনে ভোম্বলের বড় আনন্দ হলো। কংসবধ পালাটা ভাল; যুদ্ধ আছে। ‘ম্যাড্সিনও’ যেন একটা আছে। সে যুদ্ধের বাজনাটা একবার মনে মনে আউড়ে নিলে,— ‘ঘাজাঘাই—ধপড় ধঁপড়— ঘাজা ঘাঁই।’
পল্লীগ্রামের ভোজ, বসতে দুপুর গড়ায়, উঠতে সন্ধ্যা। যাত্রার আর কতই বা দেরি? সন্ধ্যা তো লাগলো বলে। দিনের আলো নিভে যাচ্ছে; গাছের তলা অন্ধকার হয়ে আসছে। সে পুকুর পাড় ঘুরে ধানের গোলার পাশ দিয়ে, বার বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো। আসবার সময় দেখলো, গোয়ালের ওধারে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা, তার একপাশ জুড়ে একসার ছেলে-বুড়ো বসে খাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ উবু হয়ে বসেছে। ওরাই বোধহয় যাত্রার দলের লোক। অনেকে দাঁড়িয়ে তাদের খাওয়া দেখছে। স্বয়ং রায়মশাই তদারক করছেন।
কিন্তু ভোম্বল বা’র-বাড়িতে এসে দেখে কোথায় কী? যাত্রাগানের কোন লক্ষণই নেই। কেবল সামিয়ানার তলায় খানিকটা জায়গা বাঁশ দিয়ে ঘেরা। হয়তো ঐটেই আসর হবে। সে সামিয়ানার বাইরে এ-দিক ও-দিক ঘুরে বেড়াতে লাগলো। একবার সাজ-ঘরের দিকে গেল। সেখানে খুব ভিড়। ছেলে-বুড়ো দাঁড়িয়ে দেখছে, হট্টগোল করছে। ঐ যে তীর-ধনুক, তলোয়ার, অয়েলক্লথ মোড়া গদা, টিনের বললম দেখা যাচ্ছে।
সেখান থেকে সরে এসে ভোম্বল এ-ধার, ও-ধার ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় দেখলে, কয়েকটা ছেলে কলাপাতার বাঁশি তৈরি করে বাজাচ্ছে —‘ফুঁ’ককু ফুঁককু ফুঁ—’
হঠাৎ তাদের মধ্যে দুটো ছেলের কলার পাতা নিয়ে ঝগড়া বেধে গেল। প্রথমে জোর কথা কাটাকাটি। তাই থেকে হাতাহাতি শুরু হলো। দু'জনে জড়াজড়ি করে মাটিতে পড়ে গেল। পড়েই গড়াগড়ি দিতে লাগলো। গড়াতে গড়াতে দু’জনেই এ ওর বুকের ওপর উঠে বসবার চেষ্টা করতে লাগলো।
অন্য ছেলেরা তাদের দু'জনকে ছাড়িয়ে দেওয়া দূরের কথা চারধারে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে! কেউ কেউ আবার বলছে,—“নারদ-নারদ খ্যাংরাকাঠি, লেগে যা নারদ ঝটাপাটি!”
ভোম্বল ছুটে গিয়ে দু'জনকে ছাড়িয়ে দিলে, আর, অমনি ও-দিক থেকে ঢোলক বেজে উঠলো,—‘গদা ঘাই—ধপড় – খপড় – গদা ঘাঁই।’
সকলে দুড়-দুড় করে সেদিকে ছুটলো। যাত্রা বুঝি শুরু হয়ে গেছে।
ভোম্বল গিয়ে দেখলে, যাত্রা তখনও শুরু হয়নি, কেবল আসর বসেছে। চারধারে গোলমাল, হুড়োহুড়ি। সকলেই আগে বসতে চায়। ঘেরা জায়গাটার বাইরে ছেলেরা কেউ কেউ বসে গেছে।
একজন ফরসাগোছের বাবু গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবী, মাথায় লম্বা ঢেঁড়ি, মুখে সিগরেট, আঙুলে আংটি, হাতে ছড়ি, বড়দের বলছেন,— “এই ছেলেদের আগে বসতে দাও।”
ভোম্বল তাদের মাঝ দিয়ে গিয়ে ছেলেদের সঙ্গে বসলো। তারপর একটু একটু করে এগোতে এগোতে একেবারে বেড়ার ধারে হাজির। যাত্রার বাজিয়েরা তখন হারমোনিয়াম, বেহালা, ঢোলক, বায়া-তবলা নিয়ে টুং টুং, পোঁ পোঁ, ঠক্ ঠক্ করছে। কেউ কেউ তামাক খাচ্ছে, বিড়ি ফুঁকছে। বাজিয়েদের তোড়জোড়ের আর শেষ নেই। কখন শুরু হবে রে? বেজায় গরম লাগছে যে!
হঠাৎ কন্সার্ট বেজে উঠলো। ঢোলকের বোলগুলো যেন বুকের মধ্যে গিয়ে ঘা মারতে লাগলো—‘ধুদ ধাক, ধুদ ধাক্, ধপড়, ধঁপড়,।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন