অন্ধকারে

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

বিচার-সভা ভাঙবার পর প্রায় ঘণ্টা তিনেক কেটে গেছে। সেদিন ফুটবল ম্যাচ আর হয়নি।

সন্ধ্যাও ঘোর হয়ে এসেছে। গোপীনাথ-বাড়িতে আরতির কাঁসরঘণ্টা ঢঙা-ঢঙ বেজে উঠলো। শব্দটা অনেক দূর ভেসে যায়। নদী-পারে গাঁয়ের লোকেরা ও সে শব্দ শোনে। আরতির পর বাতাসা দেবার পালা। সেজন্যে পাড়ার ছেলেদের কেউ কেউ পড়া কামাই করে সেখানে আসে। পূজারী-ঠাকুরের সঙ্গে ভাব থাকলে দু-একখানা বাতাসা বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু ঠাকুর ভারি চালাক; সকলের সঙ্গে ভাব করে না।

দত্তদের বাড়ির-মানকে বাতাসার লোভে পড়া কামাই করে তখন মন্দিরে এলো। সে মন্দিরে দর-দালানে উঠে দেখে, অনেক লোক বসে। মন্দিরের ভিতরে একটা মস্ত পিতলের পিলসুজের মাথায় রেড়ীর তেলের একটা বড় প্রদীপ জ্বলছে। কিন্তু দর-দালানটায় আবছায়া অন্ধকার। অন্ধকারে সকলকে ঠিক চেনা যায় না। তবে চেনা মানুষকে চিনতে ভুল হয় না।

মানকে দালানের এদিক-ওদিক ঘুরে দেখলে, ডানদিকের মোটা থামটার পাশে সাদা-মতো একটা যেন কী। জিনিষটা সে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করলো। তবুও বুঝতে পারলো না কী সেটা। সে আস্তে আস্তে তার কাছে গিয়ে ঝুঁকে দেখে, একটা মানুষ কাপড় মুড়ি দিয়ে বসে আছে। মানুষটাও যেন তাকে দেখেই জড়সড় হয়ে বসলো।

এবার মানকে হঠাৎ খিল খিল করে হেসে উঠলো ; বললে;—“কী রে ভোমলা, এখানে পালিয়েছিস?”

উত্তর হলো,—“চুপ।”

—“কেন? কেউ নেই এখানে। তুই সারাদিন কোথায় ছিলি রে? আমরা কত খুঁজেছি—”

—“নীলকুঠীতে।”

নীলকুঠীটা একেবারে শহরের শেষে নদীর ধারে। অনেক-অনেক কাল আগে সেখানে নীলের কারখানা ছিল। এখন কেবল প্রকাণ্ড একটা ভাঙা পাকাবাড়ি। নীল পচানো মস্ত মস্ত চৌবাচ্ছা ও একখানা ভাঙা ইঞ্জিন সারা গায়ে মরচে ও ধুলো-মাটি নিয়ে পড়ে আছে।

জায়গাটা খুব নির্জন। তার ওপর গোটা দুই বড় বড় কয়েতবেল ও একটা ঝাঁকড়া অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় মনে হয় সেটা ভূতের রাজ্য। ঠিক দুপুরেও সেখান দিয়ে গেলে গা ছমছম করে। লোকে বলে, নীলকুঠীটার বড়কর্তা বুল সাহেব নাকি জায়গাটার মায়া ছাড়তে না পেরে রাতের বেলা কবর থেকে উঠে সেই ভাঙা দালানের ফাটা ছাদের আলসেয় লম্বা লম্বা পা ঝুলিয়ে বসে খুব মোটা গলায় ইংরেজী গান গায়। আবার, কোন কোন রাতে সাদা প্যান্টলুম পরে চৌবাচ্ছাগুলোর ধারের শিয়ালকাঁটা, কালকাশুন্দী ও ভাঁটজঙ্গলে লাঠি হাতে ঘুরে বেড়ায়!

মানকে বললে, –“তোর ভয় করে নি?”

—“ভয় আবার কী?”

তখন আরতি শেষ করে, শাঁখ বাজিয়ে ঠাকুর মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দিলে। ভেতরে বাতাসা-ভোগ হচ্ছে।

মানকে জিজ্ঞেস করলে,—“বাড়ি যাবি নে?”

—“না। কিন্তু তোরা আমায় খুঁজেছিলি কেন?”

—“নিধু চক্রবর্তী মশাই আর তোর কাকা আমাদের পাঠিয়েছিলেন।”

ভোম্বল তার কাকাকে খুব ভয় করে। তিনি সা-বাবুদের চরমাদারিপুরের নায়েব। কিছুদিন হলো ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছেন! কালই আবার চলে যাবেন। পুজোর সময়ে এবার মাদারিপুরে না থাকলে চলবে না। ভোম্বলকে সেদিন কাঁচা কঞ্চিপেটা করে বার বাড়িতে আমতলায় শুইয়ে ফেলেছিলেন। অনেক লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে মার দেখেছিল। ভোম্বলের গাঁয়ে সে মারের ব্যথা আর নেই; কিন্তু তার লজ্জা আজও সে ভুলতে পারলো না। আবার সেই বাঘের মুখে!

সে বললে, —“মানকে, তুই সরে যা আমার কাছ থেকে। এক্ষুনি সকলে টের পাবে আমি এখানে।”

—“কেউ টের পাবে না।”

ভোম্বল রুক্ষ স্বরে বললে, — “পাবে! সরে যা—”

মানকে ভয়ে ভয়ে সরে গেল। ভোম্বলের কথার অবাধ্য হলে হয়তো এখনি পেটে একটা ঘুসি খেতে হবে।

ভোম্বল আবার কাপড় মুড়ি দিয়ে বসলো।

ঠাকুরও মন্দিরের দরজা খুলে ধামা হাতে দালানে বেরিয়ে এলো। ধামায় বাতাসা। ঠাকুর ধামা থেকে বাতাসা তুলে সকলের হাতে হাতে দিতে লাগলো। ঘুরতে ঘুরতে সে এলো ভোম্বলের কাছে। তাকে সেই অবস্থায় দেখে মনে করলো, কোন ভক্ত একমনে গোপীনাথের নাম জপ করছে। একসঙ্গে খানছয়েক বাতাসা তুলে বললে,—“নিঅ।”

ঠাকুরের বাড়ি ওড়িশার পুরী জেলায়।

ভোম্বল হাত বাড়িয়ে বাতাসাগুলো নিয়ে আনন্দে নড়ে চড়ে বসলো। একসঙ্গে এতগুলো বাতাসা সে কোনদিনও পায় নি।

ঠাকুর সেখান থেকে সরে যেতেই মানকে এসে জিজ্ঞেস করলো, “এই, ক'খানা বাতাসা পেলিরে?’

—“এক মুঠো।”

—“কৈ দেখি।”

—“আর দেখে না।”

মানকে চট করে সরে গিয়ে বললে,—“আমি বাড়ি যাচ্ছি।”

—“খবরদার! আমার কথা কাউকে বলিস নে।”

মানকে একখানা বাতাসা মুখে পুরে বললে— ‘বলবো?’ বলেই সিঁড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি নেমে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

ভোম্বলও আর সেখানে থাকলো না।

গোপীনাথ মন্দিরের উত্তরে খালি দোলমঞ্চ। মন্দিরের দালান থেকে নেমে ফুল-বাগানের পাশ দিয়ে দোলমঞ্চের বেদীর আড়ালে গিয়ে বসে ভোম্বল নিশ্চিন্ত মনে বাতাসা খেতে লাগলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ভক্তরা সকলে বাতাসা নিয়ে যে যার বাড়ি চলে গেছে। চারধার অন্ধকার। ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে, জোনাকী উড়ছে, দত্তদের ডোবা-বোঝাই ব্যাঙগুলো পাল্লা দিয়ে ডাকছে —ক্যাঁ—কোঁ—রুটি—রুটি—রুটি-রুটি।

ভোম্বল অন্ধকারে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে দেখলো, মানকেদের বাড়ির দিক থেকে একটা আলো আসছে। ওদের বাড়ির খান তিনেক বাড়ি পরেই ভোম্বলদের বাড়ি।

ভোম্বল আলোটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার কাকা কী? ভোম্বল ভাবলো, মানকেটা নিশ্চয়ই বাড়ি গিয়ে বলে দিয়েছে। ‘ভূত— উল্লুক—ভোঁদড়—!’

ঐ তো আলোটা ক্রমে মন্দিরের দিকেই আসছে। তার কাকার গলাও শোনা গেল। তিনিই ডাক দিলেন,—“ভোম্বো—ও—ও-ল!ভোমল—আ—”

তাঁরা তাকে খুঁজতে বেরিয়েছেন।

ভোম্বল তাড়াতাড়ি উঠে কোমর বাঁধলো। তারপর মঞ্চটার নিচে নেমে রেল লাইনের দিকে দিলে চোঁচা দৌড়।

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%