খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ভরা পৌষ। শীতের বাতাস হু হু করে বইছে। দিনে-রাতে পাতা ঝরার বিরাম নেই। আকাশপথে সার বেঁধে মালার আকারে উড়ে আসছে হিমালয়ের ওপারে মানস সরোবরের তীর থেকে বা চীন ছাড়িয়ে, তিব্বত ছাড়িয়ে, সুদূর সাইবেরিয়ার তুষার রাজ্য থেকে বুনো হাঁস, চখাচখি ঝাঁকে ঝাঁকে। বসেছে গ্রামের ধারে, বিলে, পদ্মার বুকে চলে ও আরও কত গ্রামাঞ্চলে ধান-খেতের জলে ও জলায়। এই আকাশিদের আকাশ পথচলার শুরু শীতে, গ্রীষ্মে।
ওরা আকাশের নীল পাথার সাঁতরায় রাতের অন্ধকারে বা জ্যোৎস্নায়। তখন বাজপাখিরা, ব্যাধ ও শিকারিরা ঘুমোয় যে। রাত শেষ হবার আগেই এক-একদিন ভোম্বলের ঘুম ভেঙে যায়। সে শুয়ে শুয়ে শোনে ওদের আকাশ-পাথার সাঁতরানোর সোঁ-সোঁ-সোঁ। শব্দটা দূর থেকে এসে দূরে মিলিয়ে যায়। আবার আসে আবার যায়। ঝাঁকের পর ঝাঁক আসে-যায়। ওরা নগরের পথ এড়িয়ে চলে। এড়িয়ে চলে কলকাখানার ওগরানো ধোঁয়ার ম্লান আকাশ।
আর দুদিন পরেই ভোম্বলের ইস্কুল খুলবে। কিন্তু পড়া শুরু হতে সেই সরস্বতী পুজোর পর। এর মধ্যে তার বই চাই, খাতা চাই, কলম চাই, উড্-পেনসিল চাই - ফাউন্টেন পেন ও কপিং পেনসিল ভালো হয়। ড্রইং খাতা, হার্ড পেনসিল, ইরেজারও দরকার। এত সব চাইতে তার ভালো লাগে না। তার সহপাঠীদের সে কোনোদিনও জিজ্ঞেস করেনি, তারা না চাইতেই পায়, অথচ যারা দেয় তারাই কাছ থেকে জেনে নেয় তাদের কী চাই? সে মাতৃপিতৃহীন। তাই শৈশব থেকেই আবদারের, চাওয়ার অভ্যাস স্বভাবে গড়ে ওঠেনি। কার কাছে সে চাইবে? তাকে দিতে, তার মুখে হাসি ফুটিয়ে কার আপনাকে তৃপ্ত করতে ইচ্ছা হবে? অভাবই তার জীবনের স্বাভাবিক ও সহজ হয়ে গেছে। তবে এত কথা সে ভাবেও না, বুঝতে পারে না।
মেলাতে সে অনেক দরবেশ দেখেছে, এখানেও মাঝে মাঝে সাধু-সন্ন্যাসীদের গাছতলায় বা পথ দিয়ে যেতে দ্যাখে। তার এক-এক সময় মনে হয়, দরবেশ বা সন্ন্যাসী হলে কেমন হয়? টাটানগর যেন ক্রমেই দূরে, বহুদূর সরে যাচ্ছে।
ইস্কুল-খোলার আগের দিন এলেন মুহুরিমশাই আর সেই সুচি। ওঁরা গতরাতে কলকাতা থেকে এসেছেন, ছিলেন বাজারের ধারে হোটেলে। ফিরবেন, দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর। ঘাটে নৌকো ঠিক করেছেন? রেলগাড়িতেই যেতেন। কিন্তু জোড়বটতোলে নেমে মালতীদের নিতে হবে তাই এই পথ ধরেছেন। ভাটির পথ। বেশ সহজেই যাওয়া যাবে ইত্যাদি অনেক কথা বললেন ভোম্বলের কাকিমাকে। তারপর ভোম্বলকে সহাস্যে বললেন, - ‘সব গুছিয়ে নাও।’
কিন্তু ভোম্বলের মুখে হাসি নেই।
তাকে নিরুৎসাহ, ম্লানমুখ দেখে কাকিমা বললেন, “সেখানেও অনেক খেলার সাথী পাবে। গরমের ছুটি, পুজোর ছুটিতে বাড়ি আসবে। বইপত্তর, জামা-কাপড় লেপ বিছানা সব গুছিয়ে বেঁধে-ছেঁদে নাও। ওই চাকরটাকে ডাকো -”
ভোম্বল এবার সোজাসুজি বললে, “-আমি যাব না।”
কাকিমা প্রথমে অবাক হলেন। তারপর কঠোর ভাবে বললেন, “-তার ফল কী হবে জানো?”
—“জানি। আর মারও খাব না, আর এ বাড়িতেও থাকব না।”
—“-কোথায় যাবে? কে তোমায় থাকতে খেতে দেবে?”
—“যেখানে দুচোখ যায়। লোকের বাড়িতে, কোনও দোকানে চাকরি করব।”
কাকিমা আরও অবাক হলেন। ভোম্বলের মুখে এমন কথা শুনবেন এ আশা তিনি করেননি। তিনি যে কী করবেন বুঝতে পারলেন না। ছেলেটা দুরন্ত; আজ দেখছেন -বেয়াড়া, বিদ্রোহী। ওর নিজের একটা মত বলে যে কিছু থাকতে পারে এমন ধারণা তাঁর মনেই হয়নি। ছেলেটার কী বা বয়স? কিন্তু তাঁরা এমন কী ব্যবহার করেছেন, যা ওর অপছন্দ, যার বিরুদ্ধে ও বিদ্রোহ করছে?
বললেন, “-বেশ। সেখানে না থাকতে চাও তোমার কাকার কাছে গিয়ে বলে এসো।”
ভোম্বল বললে, “- যাব না।”
—“জানো তো তিনি রাগী মানুষ?”
ভোম্বল কী একটা বলতে গিয়েই থেমে গেল।
কাকিমা বললেন, “-আমরা তোমার ভালোর জন্যেই যা কিছু করি, বলি, একথা কেন বোঝো না? তোমার আপনজন আর কে আছে?”
ভোম্বল মনে মনে বললে, – কেউ নেই – কেউ নেই। তার জীবনে এমন অভিজ্ঞতা হয়নি যে বলে, ‘মারা শিক্ষা দেওয়া নয়।’ কিন্তু সে বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলার কথা পড়েছে। এটা যেন বুঝতে পারে, তাঁর প্রতি অনাবশ্যক প্রচণ্ড শাসন হত যা তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর' হতে আদৌ সাহায্য করেনি। এমন করে ভালো করতে যাওয়ার চেষ্টা না করলেও ঈশ্বর ঈশ্বরই হতেন। ভোম্বল ঠিক এমন করে ভাবতে না পারলেও মনে মনে তা বোঝে? প্রচণ্ড লাঞ্ছনায় তার নিজ দেহ-মনের যে অবস্থা হয়, তা থেকে সেই মহাজনের শৈশবটাও সে কল্পনা করতে পারে। বোধ হয় সেই জন্যেই তাঁর মধ্যে একটা অনমনীয় জিদ গড়ে উঠেছিল যা ক্রমে তার মধ্যেও দানা বাঁধছে। কিন্তু দুয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত। তিনি যে অতি মহৎ! অতুলনীয়!
সে বেরিয়ে গিয়ে নির্জন নদীতীরে সেই জামগাছটির তলায় বসল। ক্রমে বেলা বাড়তে লাগল। তবু তার বাড়িতে যেতে ইছে হল না। চারধারে এই সব ছেড়ে, বহু চেনা সব কিছুকে ফেলে রেখে, এমন মুক্ত জীবনকে হারিয়ে অচেনার বাঁধনের ধরার মধ্যে সে কিছুতেই থাকতে পারবে না। মনে পড়ল তিন চারমাস আগে সে টাটানগর পথ ধরেছিল আজও সে পথ খোলা। এবার যাবে রেল লাইন ধরে। রেলপথই তাকে নিয়ে যাবে সেখানে। কিন্তু এই জীবনে অনভিজ্ঞ কিশোরটি ধারনাই করতে পারলে না, চলার পথে ও পথের শেষে কত রকমের দুঃখ রয়েছে। কিন্তু কে তাকে ঘরমুখী করতে বা সংসারে লোকে জীবনের যে পথ ধরে চলে সে পথে চালাতে পারবে? তার মতো ছেলেদের জীবনে এ এক মহা সমস্যা।
দুপুরের কাছাকাছি মুহুরিমশাই সুচিকে সঙ্গে নিয়ে আবার এলেন। কিন্তু ভোম্বল তখনও বাড়ি ফেরেনি। তার কাকিমা বললেন, “-ভোমলা সেই সকালে বেরিয়েছে। কী জানি যাবার ভয়ে আবার পালালো কিনা। আমি যে কী করি!”
মুহুরিমশাই বললেন, “-আমিও তো আর থাকতে পারব না। বুঝতে পারছি আপনাদের অবস্থাতা। পরের ঝক্কি—”
এমন সময় ভোম্বল এল, রুক্ষ চেহারা, শুকনো মুখ। তার কাকিমা বললেন, “কোথায় ছিলে এতক্ষণ? যেতে হবে না?”
মুহুরিমশাই বললেন, “আমি না হয় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করি। তুমি নেয়ে-খেয়ে নাও। কাপড়-চোপড় লেপ-বিছানা যা যা দরকার সব এখনকার মতো নিয়ে চলো। আজকের রাত জোড়াবটতোলে থেকে কাল যাবে। নৌকো আছে বাজারের ঘাটে—”
ভোম্বল বললে, “আমি যাব না।”
কথা কয়টি ভোম্বল এমনভাবে বললে যে, সকলে অবাক ও কিছু ক্ষুণ্ণ হলেন। এতটা অবাধ্যতা তাঁরা কেউ আশা করেননি।
কাকিমা বললেন, “তোমার যা খুশি করো” এবং মুহুরিমশাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, “যা শুনলেন গিয়ে বলবেন। তিনি এসে যা হয় ব্যবস্থা করবেন।”
ভোম্বল বুঝলে, তার অবাধ্যতার ফল কী সাংঘাতিক হবে। বাড়ি থাকলে দারুন অপমান ও কঠোর লাঞ্ছনা, বাড়ি ছাড়লে কষ্টের সীমা থাকবে না —পথে পথে তাকে ঘুরতে হবে, যে অবস্থার সঙ্গে তার পরিচয় কিছুদিন আগেই ঘটেছে তা আবার ভোগ করতে হবে। তবু সে শেষেরটিই বেছে নিলে।
মুহুরিমশাই বারান্দায় চৌকিতে চিন্তিত মুখে বসে রইলেন এবং স্নেহমাখা সুরে বললেন, “—তুমি ছেলেমানুষ। নিজের ভালো-মন্দ বোঝবার বয়স তোমার হয়নি। অভিভাবকেরা তোমাকে যা বলেন, তা তোমার ভালোর জন্যেই বলেন। তাঁদের কথা শুনেই চলতে হয়। এখন ভালো করে লেখাপড়া শিখলে বড়ো হয়ে সুখে থাকবে। আমাদের গাঁ দেখেছ তো? ওখানে ইস্কুল-পাঠশালা ছিল না। শুধু ওখানে কেন, ওর পাঁচ-ছ ক্রোশের মধ্যে লেখাপড়ার শিক্ষার কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। সেজন্যে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আমার এক মাসির বাড়ি ক্রোশ পনেরো দূরে একগঞ্জে। জায়গাটার নাম ট্যাপাখালি। তখন আমার বয়র মোটে সাত বছর। নৌকোয় যেতে যেতে গল্পটা বলব - ভারি মজার গল্প।”
কাকিমা এসে বললেন, “নেয়ে-খেয়ে আমায় উদ্ধার করো। হাঁড়ি কোলে সারাদিন বসে থাকব? আমাদেরও খেতে হবে।”
ভোম্বলের এমন আচরণে কারই বা মেজাজ ঠিক থাকে? কিন্তু নিজের ত্রুটি বয়স্করাই দ্যাখে না তো এক কিশোর। কাকিমার কথায় সত্য থাকলেও বলার ভঙ্গি ও রূপে রুক্ষতা ভোম্বলকে উত্তেজিত করলে। সে বললে, “আমি খাব না। খেতেও চাই না”, বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল পেটে খিদে নিয়ে। কাকিমা মুহুরিমশাইকে বললেন, “— যা দেখলেন গিয়ে বলবেন। এসে যা হয় করুন। পরের ছেলের ঝক্কি কী কম?”
মুহুরিমশাই তাঁকে নমস্কার করে চলে গেছেন। ছেলেটির আচরণে তার প্রতি বিরক্ত, আবার তার কমনীয় শুষ্ক মুখখানি দেখে তার প্রতি তাঁর মায়া হল।
কাকিমা তখন রান্নাঘরে। ভোম্বল প্রায় নিঃশব্দে এসে ঘরে ঢুকে তার জামাকাপড় আলোয়ান পোঁটলা বেঁধে, সেই আধুলিটি, কাকিমার ফাই-ফরমাজ খাটার পারিশ্রমিক বা স্নেহের দান একটি টাকা ট্যাঁকে গুঁজে বেরিয়ে পড়ল তার স্বপ্ন টাটানগরের উদ্দেশ্যে। কেষ্ট কামারের তৈরি বাঁশিটি তেমনি বেড়ার গায়ে গোঁজা রইল। যে যন্ত্রে বাঁশিটি তৈরি হয়েছিল সে চলল সেই যন্ত্র তৈরি করা ও চালনা শিখতে।
সেবার গিয়েছিল ভুল করে পুবে, রাতের অন্ধকারে। এবারে চলল দিনের আলোয় চোখ মেলে রেলপথ ধরে পশ্চিমে। পথের দুধারে স্বল্প জলভরা খাল, খেতখামার, কাছে বা দূরে গ্রাম, জলধারা বা খালের সেতু পার হয়ে, সুদীর্ঘ রেলপথের পাশে পাশে বা ওপর দিয়ে।
ভোম্বলের এই যাত্রা তো অনেক দিন আগের ঘটনা। তখন রাজপথে না ছিল মোটর, ট্রাক বা লরির এমন স্রোত। গোরুর গাড়ি দূরের যাত্রী বা মালপত্র নিয়ে একা বা সারবন্দি হয়ে নির্জন পথে ঠ্যাঙাড়ে বা লুঠেরার ভয়ে দিনের বেলায় যাতায়াত করত; যাতায়াত করত সওয়ারি পিঠে ঘোড়া, সওয়ারি নিয়ে ডুলি-পালকি, পাশে পাশে যেত পাইক-পেয়াদা; ছুটত বাইসিকল।
এবার সে আর ফিরবে না, কেউ তাকে ফেরাতে পারবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন