খগেন্দ্রনাথ মিত্র
শালুকভাঙা থেকে মানিকপুর পাকা দু'ক্রোশ। রাস্তার দু'ধারে কেবল ধান ও পাট-ক্ষেত। ভোম্বল দেখতে দেখতে চলেছে। পাটগাছের মাথায় এক ঝাঁক গঙ্গাফড়িং উড়ছে। একটা টুনটুনি উড়ে এসে একটা পাটগাছের আগায় বসলো। কচি-ভগা অমনি নুয়ে পড়ল; কিন্তু টুনটুনিটা উড়লো না, বসে বসে দোল খেতে লাগলে। ভোম্বল রাস্তা থেকে একটা ঢিল কুড়িয়ে নিয়ে টুনটুনিটাকে ছুঁড়ে মারলো। টুনটুনিটা ফুড়ুৎ করে উড়ে পালিয়ে গেল।
সকাল থেকেই ভোম্বলের মনটা খারাপ। সত্যিই বুড়ী বড় ভাল। তার সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছে, দুধের সরের কথা ভেবে। বেশ পুরু সর! এখনও যেন মুখে লেগে আছে। থাকলে বুড়ী রোজ খাওয়াতো! কিন্তু সব খাবার লোভে সেকি টাটানগর যাবে না? আচ্ছা, কাজ-কর্ম শিখে আবার সে বুড়ীর বাড়ি ফিরে আসবে।
এদিকে বেশ বেলা উঠেছে। রোদে গা-মাথা পুড়ে যাচ্ছে। তবে মানিকপুর আর বেশি দূর নয়। ঐ যে গাছপালার কোলে ঘরবাড়িগুলো দেখা যায়। গাঁয়ের বাইরে গরু-বাছুর লেজ দুলিয়ে চরে বেড়াচ্ছে৷ একটা রাখাল লকড়ি হাতে একটা গরুর পিছনে ছুটছে আর মুখে শব্দ করছে—‘দুপুর্ হৈ:'
ভোম্বল হন্ হন্ করে হাঁটতে হাঁটতে গাঁয়ে গিয়ে ঢুকলো। গাঁয়ের মুখেই এক গৃহস্থ-বাড়ি। এক ভিখারী তার বার-উঠোনে লাউ-মাচার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদ-কাঁদ গলায় গান ধরেছে—
“কবে যাবে হে গিরিরাজ,
আনিতে মোর উমাধনে?
না হেরিয়া সে মুখ-শশী—
আমি যে গো প্রাণে বাঁচি নে।”
সেই সঙ্গে তার একতারাটি বাজছে—বঙ বঙা বঙ – বঙ বঙ; বঙ বঙা বঙ—বঙ বঙ।
এ গান ভোম্বলও জানে। সে বগলের বাতাবী লেবুটাতে টোকা দিতে গুনগুন করে গাইতে গাইতে চলতে লাগলো, —“কবে যাবে হে গিরিরাজ—আ আ-আ-নিতে মোর উ—মা ধনে—এ—এ—”
পারতে এ গানের সুরে সুরে ভোরের আকাশ ছেয়ে যায়।
ভোম্বল গাঁয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে দেখলে, এক জায়গায় একটা প্রকাণ্ড বটগাছ। তার গোড়াটা কোনকালে বাঁধানো হয়েছিল। এখন সান ফেটে-ফুটে ইটগুলো দাঁত বার করে আছে। গাছটার মোটা মোটা ডাল থেকে চারধারে সাপের মতো অসংখ্য ঝুরি ঝুলছে।
ওধারে একটা মস্ত পুকুর। তার এককোণে শালুক-বন। পুকুরটাও খুব পুরনো। তার সান বাঁধানো ঘাটও ফেটে চৌচির। একপাল ছেলে পুকুরে স্নান করছে। কী তাদের আনন্দ! তারা বটের ঝুরি ধরে দুলতে দুলতে জলে-ঝপ, করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে; আবার সাঁতরে এসে ঝুরি ধরে দোল খাচ্ছে; কেউ কেউ গাছের ডালে উঠে যাচ্ছে! চিৎকারে, ডাকাডাকিতে, জল-শব্দে জম-জমাট।
ভোম্বলের ইচ্ছে হলো, সেও একটা ডুব দিয়ে নেয়। গরমে গা-মাথা জ্বলছে; ঘাম ঝরছে। কিন্তু আর তো কাপড় নেই। নেয়ে উঠে সে এরই এক মুড়ো পরে থাকবে, আর এক মুড়ো শুকোবে। কত মজুরকে সে তাই করতে দেখেছে।

সে কঞ্চিখানা ও লেবুটা বটগাছটার খোঁদলে লুকিয়ে রাখলো। তারপর কাপড়খানা গুছিয়ে নিয়ে বটগাছের ওপরে উঠে গেল। ছেলেরা তার দিকে তাকিয়ে অবাক। এ আবার কে রে? ভোম্বল কিন্তু তাদের দিকে সোজাসুজি তাকালো না। সে ডাল দিয়ে একেবারে পুকুরের ওপর চলে গেল। তারপর একটা লম্বা ঝুরি বেয়ে নিচে নেমে, ঘন ঘন দোল খেতে খেতে দিলে এক লাফ। অমনি গিয়ে পড়লো একেবারে মাঝপুকুরে। পড়েই তলিয়ে গেল—জলে বুড়বুড়ি ছাড়ছে, কিন্তু সে উঠলো না।
ছেলেরা দেখলো, সে ডুবে গেছে। তারা ভয়ে চিৎকার করে উঠলো কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হাত দশেক তফাতে ভোম্বলের মাথা দেখা গেল। সে হুস্ করে ভেসে উঠলো। আবার ডুব দিলে, আবার উঠলো। তারপর কিছুক্ষণ চীৎ হয়ে, কাৎ হয়ে. উপুড় হয়ে সাঁতার কাটলো।
ছেলের দল সাঁতার ভুলে, কেউ ঘাটে, কেউ কোমর জলে, কেউ বা গাছের ঝুরি ধরে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
ভোম্বলের মনে খুব গর্ব হলো। ছেলেগুলো তাকে দেখছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেউ সাঁতার কাটতে সাহস করছে না। সে তাদের কারুর সঙ্গে কোন কথা না বলে, গম্ভীর ভাবে ডাঙায় উঠলো। তারপর কাপড়ের মুড়োয় গা-মাথা মুছে এ-মুড়ো ও-মুড়ো নিঙড়ে নিলে। ক্ষিদেয় তার পেটে যেন এক ঝাঁক চড়ুই কিচির-মিচির করছে। এ সময়ে একথালা গরম ভাত-তরকারি না পেলেও চলে। কেবল একটু নুন, কিন্তু গরম ভাত এক থালা চাই-ই। কিন্তু কে তাকে ভাত দেবে? বাতাবীটা খেয়েই কাটানো যাক।
সে খোঁদলটার কাছে এগিয়ে গেল। নিশ্চিন্ত আছে যে, ওর মধ্যে লেবুটা আছেই। কিন্তু খোঁদলটার মধ্যে হাত দিয়ে দেখে, লেবুটা নেই কঞ্চিখানা আছে! কে নিলে? সে তাড়াতাড়ি আবার হাত ঢুকিয়ে দিলে। না— নেই তো! বাঃ! বেশ মজা।
ভোম্বল এ-দিক, ও-দিক তাকাতেই দেখে, একটা ছেলে লেবুটা নিয়ে ছুটে পাল্লাচ্ছে। ‘আমার জিনিস চুরি? ধর— ধর—ধর।’ ভোম্বল চোরের পিছনে ছুটলো। অন্য ছেলেরা এতক্ষণ ব্যাপারটা কী ঠিক করতে পারে নি। হাঁ করে দাঁড়িয়ে। এবার দেখলো, তাদের নেলো পুকুর পাড় দিয়ে পাই পাই করে ছুটছে—তার বগলে একটা পাকা বাতাবী লেবু— আর নেলোর পিছনে ছুটছে অচেনা ছেলেটা। তারাও হৈ-হৈ করতে করতে ছুটলো।
ছুটতে ছুটতে সকলে পুকুর পার হয়ে গেল। সামনে লাহিড়ীদের লক্ষ্মী-নারায়ণের পুরনো মন্দির। তার পাশ দিয়ে পায়ে-চলা পথ। পথের ওধারে ঝোপ-জঙ্গল-কচুবন। সকলে ছুটতে ছুটতে মন্দিরের চত্বর পার হয়ে গেল।
এবার ভোম্বল ছেলেটাকে ধরে ধরে। ছেলেটাও একবার পিছন ফিরে দেখলো। দেখেই বুঝলো, আর রক্ষা নেই। সে বগলের লেবুটা হাতে নিয়ে ঝোপের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলতে গেল। অমনি ভোম্বল ছুটে এসে খপ করে তার হাত চেপে ধরলো। দুজনেই হাঁফাচ্ছে। ছেলেটা হাঁফাতে হাঁফাতে বললে,—“হাত ছাড়ো!”
ভোম্বল তার হাত থেকে লেবুটা কেড়ে নিয়ে নড়া ধবে জোর এক ঝাঁকানি দিয়ে বললে “চোর! আমার লেবু চুরি করে পালাচ্ছিস।” তারও দম আটকে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে আর কথা বার হলো না। কিন্তু রাগে বড় বড় চোখ দুটো আরও বড় হয়ে কোটর থেকে যেন বেরিয়ে আসছে।
পিছনের ছেলেগুলোও ইতিমধ্যে সেখানে এসে পড়েছে। তারা ভোম্বলদের দু'জনকে ঘিরে দাঁড়ালো। সকলেই হাফাচ্ছে। একজন জিজ্ঞেস করলে,—“কী হয়েছে? কে তুমি?”
ভোম্বল তার কথার কোন জবাব না দিয়ে সেই ছেলেটার নড়া ধরে আবার এক ঝাঁকানি দিয়ে বললে,—“কেন আমার লেবু চুরি করেছিলি?”
ছেলেগুলো এক সঙ্গে বলে উঠলো –“তোমার লেবু? তোমার নাম লেখা আছে ওতে? ছেড়ে দাও ওকে—”
ভোম্বল বললে,—“যা—যা। তোদের আর সর্দারি করতে হবে না! এক চ–ড়ে—”
একটা ছেলে অমনি কাঁদ কাঁদ হয়ে ভোম্বলের মুখের কাছে মুখ এনে বলতে লাগলো, ‘—ওঁরে বাবারে কোঁথা যাব—ওঁ-ওঁ-ওঁ? একটা পিঁপড়ের গ–অ-র্ত–উঁ–হুঁ:হুঁঃ।’ তারপরই ধমক দিয়ে বললে,—“এখনই ছাড় বলছি। না ছাড়লে —” বলেই সে ভোম্বলকে এক ঠেলা মারলো।
ভোম্বলও ঠাস করে তার গালে এক চড় কষে দিলে। সঙ্গে সঙ্গে গালটা লাল হয়ে উঠলো।
ছেলের দল তখন রাগে, অপমানে পাগলের মতো হয়ে গেল। তারা চারধার থেকে ভোম্বলকে আক্রমণ করলো। কেউ কিল মারে, কেউ চড় মারে, কেউ খামচি দেয়, কেউ কাপড় ধরে টানে, কেউ লেংগি মারে।
ছেলেদের মার খেয়ে ভোম্বলের চেহারা হয়ে উঠলো ভয়ংকর। তার কাকা আর স্কুলের মাস্টার মশাই ছাড়া আর কেউ আজ অবধি তাকে মারতে সাহস করে নি। এ গাঁয়ের ছোঁড়াদের মার সে হজম করবে? সে একহাতে বেপরোয়া ঘুষি ও লাথি চালাতে লাগলো। কারো পেটে লাগে, সে কোঁক করে ওঠে; কারো পিঠে লাগে— ধম করে শব্দ হয়; কেউ নাক ধরে বসে পড়ে।
বেগতিক দেখে একজন বলে উঠলো—“এই হেবো, যা তো; বাড়ি থেকে সড়কিখান নিয়ে আয়।... জানিস শুয়োর! এ গাঁয়ের নাম মানিকপুর?”
পথের পাশে হাত দুই লম্বা একখানা বাঁশের আগা পড়েছিল। ভোম্বল চট করে সেটা তুলে নিয়ে মাথার ওপর ঘোরাতে ঘোরাতে বলতে লাগলো —“তার আগে তোদের মাথা ফাটাবো। চলে আয় সব মানিকপুরী।”
বাঁশ দেখে ছেলেগুলো আর দাঁড়ালো না; দেখতে দেখতে চারধারের ঝোপ-জঙ্গল-গাছপালার মধ্যে মিলিয়ে গেল। ভোম্বল দেখলে, আর থাকা ঠিক নয়। যুদ্ধে তো তারই জিত হয়েছে। সে বাঁশের আগাখানা কাঁধে নিয়ে যে-পথে এসেছিল সে-পথে তাড়াতাড়ি ফিরে চললো। তার বুক-পিঠ জ্বালা করছে। একটা ছেলে খামচে একেবারে রক্ত বার করে দিয়েছে। ইঃ!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন