খগেন্দ্রনাথ মিত্র
মাঝ পথে যেতেই বেলা দুপুর
পুব-পশ্চিম থেকে এসে আরও দুটো পথ সেই পথটার সঙ্গে মিশেছে। পথ তিনটের ধারে ধারে বাবলাগাছ। আর কোন বড় গাছ নেই। পথের ওপর তাদের কাঁটা, ছোট ছোট পাতা সেই সঙ্গে একটু একটু ছায়াও পড়েছে।
সেদিন ছিল হাটবার। পথে যেতে যেতে হাটুরেদের সঙ্গে ভোম্বলের দেখা হলো। তারা বেসাতি নিয়ে চলেছে—কারুর মাথায় পাট, কারুর মাথার গামছা, কেউ নিয়েছে এক ঝাঁকা বেগুন, কেউ বা নিয়ে চলেছে এক ধামা পেঁয়াজ। আবার, কেউ বা দুটো মড়াখেকো পাঁঠাকে দড়ি ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে; খাসি দুটো যায় আর ডাকে—'ম্যা— অ্যা—অ্যা—।’ কারো কারো মাথায় পাঁঠা ধামা ও পাটকরা বস্তা অথবা হাতে খালি বোতল।
ভোম্বল একজনকে জিজ্ঞেস করলে,—“পথটা কোন পায়ে গেছে গো?”
লোকটা তার কথার কোন জবাব না নিয়ে জিজ্ঞেস করলে,—“তুমি যাবা কোথা?”
ভোম্বল বললে, –“রেলরাস্তা”
—“রেলরাস্তায়। তা এ পথ দিয়ে যাওয়া যাবে। ঐ যে ছমিনে কাছিমদয়ের হাট—ওরই ওধারে খান দুই গাঁ পরে রেলের রাস্তা। কোথা থেকে আসছো?”
—“মানিকপুর।”
—“মানিকপুর থেকে ইদিকে কেন?”
—“ঐ রেলরাস্তার ধারে এক গাঁয়ে যাব।”
—“গাঁয়ের নাম কী?”
ভোম্বল কোন জবাব দিলে না; লোকটাকে ছাড়িয়ে গেল। লোকটা আপন মনেই বললে,–“ছোঁড়াটা সেয়ানা।”
পথও ফুরিয়ে আসছে, বেলাও গড়িয়ে গেল। ঐ যে সামনে হাট। চারধারে লোক গিজ গিজ, করছে। এখান থেকে হাটের মহা কোলাহলকে মনে হচ্ছে যেন বন্যার জলস্রোতের শব্দ-কল কল, কল কল।
ভোম্বল হাটের ধারে এলো। পথের পাশেই জমিদার-কাছারি। মস্ত টিনের আটচালা। তার পাকা বারান্দায় পিয়াদা-বরকন্দাজেরা ও জন কয়েক লোক—কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে; কেউ কলকেতে তামাক খাচ্ছে, কেউ গল্প করছে। ঘরের ভেতর চৌকির ওপর ফরাসে কয়েকজন মুহুরী বসে। প্রত্যেকের সামনে একটা করে কাঠের বাক্স। তারা ঘাড় গুজে কী যেন লিখছে। আর ঐ যে খালি গায়ে চশমা চোখে বসে গড়গড়া টানছেন, উনিই বোধহয় কাছারির নায়েবমশাই। নায়েমশাইয়ের ভুঁড়িটা বেশ—যেন জয়ঢাক!
ভোম্বল আস্তে আস্তে বারান্দায় উঠলো। নায়েমশাইয়ের ভুঁড়িটা দেখতে বেশ মজা লাগে। হাসি পায়। সে ভুঁড়িটার দিকে তাকিয়ে নায়েমশাইয়ের মুখের দিকে চোখ তুলতেই ভোম্বলের সঙ্গে তাঁর চোখোচোখি হলো, অমনি মনে হলো, তাঁকে যেন সে কোথায় দেখেছে। কোথায়? কোথায়? নায়েমশাইও এবার যেন ভোম্বলকে চশমার ওপর দিয়ে ভাল করে দেখছেন। মিনিট খানেক লক্ষ্য করেই বলে উঠলেন,—“আরে ঐ তো আমাদের হারাণবাবুর ভাইপো ভূপেন। ওর ডাকনাম ভোম্বল। ছোঁড়াটা বাড়ি থেকে পালিয়েছে। এই ইংরেজের বাপ, এই বিলাতালি, ওরে ফটকে ছোঁড়াটাকে ধর—” বলতে বলতে নায়েবমশাই ভুঁড়ি দুলিয়ে ফরাস থেকে নামলেন।
ভোম্বলও এবার তাঁকে চিনতে পেরেছে। নায়েবমশাই তার কাকার বন্ধু, ব্রজ ভটচার্য। সেবার তাদের বাড়ি দুদিন ছিলেন। যখন হাসেন তখন মনে হয়, একটা হিপোপটেমাস্ হাঁ করে আছে। ওঁর হাসির আওয়াজ সারা পাড়ার লোক শুনতে পায়। নায়েবমশাই ফরাস থেকে নামতে নামতেই ভোম্বল একলাফে নিচে নেমে হাটে মিশে গেল।
সে কারুর বগলের তলা দিয়ে, কারুর পেটের কাছ দিয়ে, কারুকে কনুইয়ের গুঁতো মেরে হাটের মধ্য দিয়ে একরকম ছুটতে লাগলো। নায়েবমশাইয়ের পিয়াদা-বরকন্দাজে হাট ভরা। এখনই তাদের হাতে ধরা পড়তে হবে। ওদিকে ইংরেজের বাপ, বিলাতালি, ফটকে, কমরুদ্দি, রত্না প্রভৃতি পিয়াদা-বরকন্দাজেরা বড় বড় লাঠি নিয়ে হাট ঘিরে ফেললে। ব্যাপারটা যে কী কেউ বুঝতে পারছে না। চারধারে গোলমাল, চঞ্চলতা আরও বাড়লো। ভোম্বল যেতে যেতে শুনলো একজন বগলে,—“নায়েমশায়ের বেটা চুরি হয়েছে—”
ভোম্বলের হাসি এলো। সে সামনের একজনকে ধাক্কা দিয়েই তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, লোকটি ষষ্ঠী খুড়ো। খুড়ো হুমুড়ি দিয়ে মুড়ি কিনছিলেন। ভোম্বলের ধাক্কায় কতকগুলো মুড়ি ছিটিয়ে গেল। তিনি হুংকার দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই দেখেন, সামনে ভোম্বল। ঐ দেখাই সার। ভোম্বল ততক্ষণে দশটা লোক পার হয়ে গেছে। ষষ্ঠী খুড়ো হাঁক দিলেন, “—ধর – ধর— ঐ যায়—”
তাঁর কথা শুনে আশ-পাশের সকলে বলতে লাগলো—‘ধর—ধর— ঐ যায়!’
কিন্তু কে যায়, কোথা যায়, কেউ বুঝতে পারে না। ভোম্বলের বুক ঢিপ ঢিপ করছে। এবার আর রক্ষা নেই। ধরা পড়তেই হবে।
সে যেদিকে যাচ্ছিল সেদিকে একখানা প্রকাগু বাগান দেখা যাচ্ছে। লোকজনও সেদিকে পাতলা৷ খান কয়েক গরুর গাড়ি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। নাকে দড়ি বেঁধা গরুগুলো শুয়ে শুয়ে জাবর কাটছে। ভোম্বল ভিড় ঠেলে বেরিয়ে—বেড়া ডিঙিয়ে একেবারে বাগানের মধ্যে পড়লো । পড়েই আর দাঁড়ালো না – ছুটতে লাগলো—সারাদিনের পথচলায় শরীর ক্লান্ত। তার ওপর সকাল থেকে এক রকম উপবাসী। ছুটতে কষ্ট হচ্ছে। তাহোক
তবু সে ধরা দেবে না।
বাগানখানার ওধারে সড়ক। হাটুরেরা আসা-যাওয়া করছে। ভোম্বল বেড়া গলিয়ে বাগান পার হয়ে সড়কে উঠলো। দম বন্ধ হয়ে আসছে; তবুও বসে জিরতে সাহস হলো না। সে পথ ধরে চললো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন