যাত্রা শেষ

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

পথে যান-বাহনের স্রোত এধারে-ওধারে চলেছে। ভোম্বলের সব চেয়ে দেখতে আশ্চর্য লাগছে মোটর ও ট্রামগাড়িগুলো। মোটরগাড়িই তো সে তৈরি করতে চায়; গড়তে চায় এরোপ্লেন। আসল মোটগাড়ি জীবনে সে দেখলে এই প্রথম। যদি খুব কাছে গিয়ে হাত দিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখতে পারত! আর এরোপ্লেন? সে তো আকাশে ওড়ে। কিন্তু তৈরি হয়, মাটিতে কারখানায়। তৈরি করে মানুষে। আর ডুবোজাহাজ? তাও গড়া হয় কারখানায়। সে যেখানে চলেছে, সেখানেই তৈরি হয় তো? কেউ তেকে বুঝিয়ে দেয়নি - ও সব তৈরি হয় কারখানাতেই কিন্তু একই কারখানায় নয়। কথাগুলো তার মনে উঠে পথের দৃশ্যে ও নানান শব্দে কোলাহলে চাপা পড়ল। সে বাবাজির পিছন পিছন চলতে লাগল। চলতে চলতে এসে পৌঁছলো একটা চৌমাথায়। জায়গাটায় যেমন মানুষ, তেমনি যান বাহনের বদ্ধ ভিড়। সব স্থির হয়ে আছে। হঠাৎ তার কানে এল বহু কণ্ঠের মিলিত শব্দ ‘বন্দে-এ-মাতরম্।’ ভোম্বল চমকে উঠল, উত্তেজিত ও উৎফুল্ল হল। শব্দটি কথা কয়টি যে তার বহু পরিচিত, বহু উচ্চারিত। তার মনে হল ওই যারা উদাত্ত স্বরে শব্দটি উচ্চারণ করতে করতে চলেছে, তারা তার আপনজন, তার বহু চেনা। ওদের সুরে সুর মিলিয়ে পায়ে পা মিলিয়ে সে এগিয়ে যাবে— সে—

বাবাজি হঠাৎ তার হাত চেপে ধরে বলে উঠল, “ও এই ভিড়ে কোথা যাও? ওরা সব স্বদেশি। এখনই পুলিশের লাঠি—”

বাবাজির কথা শেষ হল না, ধপাধপ পড়তে লাগল পুলিশের লাঠি। মিছিল, জনতা সব ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেদিকে পারলে ছুটতে লাগল।

হট্টগোল, চিৎকার, আর্তনাদ। ভোম্বলের পাশের লোকটির হাতে নিশান। মাথায় পড়ল লাঠি। সঙ্গে সঙ্গে বার হল রক্ত। বাবাজি ভোম্বলের হাত ধরে টান না দিলে, সেও অক্ষত থাকত না। বাবাজি তাকে এক রকম জোর করে টানতে টানতে নিয়ে চলল।

ভোম্বল যেতে যেতে বলতে লাগল, ‘ছেড়ে দাও -ছেড়ে দাও। দেখে আসি।’

বাবাজি বললে, ‘কি দেখবে? কাকে দেখবে? সবাই পালিয়েছে। ওই আবার সব চলছে। চলো-চলো। আর হেঁটে যাব না, সামনের মোড়ে পৌঁছে টেরাম গাড়িতে পোলের ধারে গিয়ে নামব। স্বদেশির যুগ। আবার কোথায় কি ফ্যাসাদ বাধে ঠিক কি?’

দুজনে খুব তাড়াতাড়ি হাঁটতে হাঁটতে আর একটা মোড়ে এসে স্ট্র্যাণ্ডগামী একখানি ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠে বসল।

ভোম্বলের মনে উত্তেজনা। তার চোখে ভাসছে পুলিশের লাঠির আঘাতে যা ঘটেছে, সেই রক্তমাখা দৃশ্য। এমন দৃশ্য সে দেখেনি। সেও তো তাদের আধা শহরের পথে স্বদেশির মিছিলে পায়ে পা মিলিয়ে সুরে সুর মিলিয়ে হাতে নিশান নিয়ে ‘বন্দে-এ-মাতরম' বলতে বলতে এগিয়েছে। কিন্তু সেখানে তো, —তৎক্ষণাৎ তার পাশের আসনের লোকটি তার পাশের লোকটিকে হিন্দিতে বললে, ‘ইয়ে শহর কলকাত্তা।’

ভোম্বল তারপর থেকে গম্ভীর হয়ে গেল। সে উদাসীর মতো পথের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। ট্রাম অবশেষে এসে পৌছালো বড়োবাজারের পশ্চিমে স্ট্যাণ্ডে।

বাবাজি ভোম্বলকে বললে, ‘এইখানে আমাদের নামতে হবে। ওই হাওড়ার পোল। ওই মা গঙ্গা। ওই ওপারে হাওড়ার ইস্টিশান। চলো নামি।’

ভোম্বল বাবাজির পিছন পিছন নেমে পোলের দিকে যেতে যেতে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। তার মন আবার কৌতূহলী হয়ে উঠল।

এই সেই গঙ্গা। যাকে ভগীরথ হিমালয় থেকে শাঁখ বাজিয়ে এনেছিলেন? এই গঙ্গা গেছে কি পাতালে? —সে বাবাজির পিছন পিছন গিয়ে পোলে উঠল।

পুবে-পশ্চিমে মানুষজন ও যানবাহন স্রোতের মতো চলাচল করছে। গঙ্গা চলেছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। কত লোক রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখছে! কত রকমের নৌকা, স্টিমার, লঞ্চ মস্ত মস্ত জাহাজ, বয়া, জেটি, ফ্ল্যাট। গঙ্গার দুটি তীরে মস্ত মস্ত কোঠা বাড়ি৷ চিমনি —ওই চলে গেছে দূরে, বহুদূরে কোথায় যেন। যেমন স্থলপথে, তেমনি জলপথে কি ব্যস্ততা। পথ স্থির কিন্তু স্রোত অস্থির, ঢেউ চঞ্চল! এমন দৃশ্য ভোম্বল জীবনে দেখেনি, কোনোদিন কল্পনায়ও আনতে পারেনি তার মনে প্রশ্ন জাগল, ডুবোজাহাজ কি ওই ভাসা জাহাজের মতো? হঠাৎ তার মাথার ওপর ভোঁ ভোঁ শব্দ শুনে তাকিয়ে দ্যাখে একখানা এরোপ্লেন উত্তর থেকে দক্ষিণে চলেছে। সবাই হাঁ করে ওপর দিকে তাকিয়ে আছে। এরোপ্লেনখানা সুবিশাল একটা পাখির মতো ডানা মেলে সোজা চলেছে। ওই ওর নাকে আটকানো একখানা চাকার মতো কি ঘুরছে। প্লেনখানা ক্রমে ছোটো হয়ে একেবারে মিলিয়ে গেল। ‘শহর কলকাতায়’ একটা দিনের চলার পথে জলে, স্থলে আকাশে কত আশ্চর্য জিনিস ও ঘটনা দেখলে, যা তৈরি করছে মানুষে। কিন্তু বারবার তার চোখে ভেসে উঠছে, সেই রক্তাক্ত মানুষটি। কেন পুলিশ ওকে মারলে? দেশকে ভালোবাসা, স্বাধীন হতে চাওয়া কি দোষের?

‘দাঁড়িয়ে কি ভাবছ?’ বলে বাবাজি ভোম্বলের হাত ধরে টানলে। তারপর খানিক দূর গিয়ে বললে, ‘এই পোলটা জলে ভাসছে। এই দ্যাখো, এখানটায় কীরকম। ওদিকেও এ রকম আছে। চলো দেখাব বড়ো বড়ো জাহাজ যখন এদিক ওদিক যায় তখন এই জায়গাটা খুলে পাশে সরিয়ে রাখে। আর মস্ত ফাঁকা দিয়ে জাহাজ যাতায়াত করে।’

ভোম্বল অবাক হয়ে গেল।

বাবাজি আবার বললে, ‘ইনজিরিতে পোলটাকে যেন কি বলে।’ তাদের পাশ দিয়ে সাহেবি পোশাক পরা একজন যেতে যেতে বললেন, ‘পনটুন ব্রিজ।’

বাবাজি বলে উঠল, ‘হাঁ-হাঁ ফনটু বিজ!’

অবশেষে দুজনে হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছল। বেলা তখন গড়িয়েছে।

স্টেশন দেখে ভোম্বল কেমন দিশেহারা হয়ে পড়ল। এত বড়ো স্টেশন। এত লোকজন, পুলিশ-পাহারা, গোলমাল, চলাফেরা, ইঞ্জিন, বগি, যাত্রী, ফেরিওয়ালা, মুটে। এর কোথা টিকিট কাটা হয়? কোন পথে লোকে গিয়ে গাড়ি চড়ে?

বাবাজি বললে, ‘তুমি এইখানে থাকো। কোথাও যেয়ো না, কারোকে কিছু জিজ্ঞেস কোরো না, কারো সাথে কথা কোয়ো না। আমি এই আফিস থেকে সবের হদিশ নিয়ে আসি।’

বাবাজি চলে যেতে ভোম্বল একা দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগল, শুনতে লাগল গাড়ির যাওয়া-আসা, ঘণ্টা বাজা, গার্ডসাহেবের বাঁশি, ইঞ্জিনের সিটি ও কোঁ কোঁ। এর সঙ্গে তার দেখা স্টেশনগুলোর তুলনাই হয় না। কি উঁচু ছাঁদ! কিছুক্ষণ কেটে গেল।

একটি পুরুষ যাত্রী সঙ্গে দুটি স্ত্রীলোক, এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, “কাশীর টিকিট কাটে কোন ঘরে?” ভোম্বল জবাব না দিয়ে বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইল।

লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলে, ‘তুমি কোন দিককার গাড়িতে চড়বে?’

ভোম্বল যেন তার কথা শোনেনি না বোঝেনি এমন ভাবে এবার অন্য দিকে মুখ ফেরাল।

লোকটি ‘বস’ বলে সঙ্গিনী দুটিকে নিয়ে তাড়াতাড়ি একদিকে সরে গেল। এমন সময়ে বাবাজি এসে বললে, “তোমার গাড়ির এক ঘণ্টা পর আমার গাড়ি সেই রাতে। ওই দিকে ‘প্লাটফর্মে' চড়তে হবে। টিকিট ঘর ওই দেখা যায়। অফিসবাবু লোকটা ভালো। সব বলেছে - ভাড়া, কখন পৌঁছবে, টিকিটের দাম কত? আমার টিকিটের দাম তো আমি জানিই ৷ চলো ওই দিকে গিয়ে বসি।’

স্টেশনের ভেতরে বাইরে আলো জ্বলে উঠল। লোকজনের ভিড়, চলাফেরা, কথাবার্তা, ডাকাডাকি বিরাম নেই।

কখন সন্ধ্যা হল, সন্ধ্যা শেষে রাত এল, ভোম্বল বুঝতে পারলে না। বাবাজি একসময়ে বললে, 'চলো ওই দোকান থেকে কিছু খেয়ে নেবে।’ ভোম্বলকে বাবাজি খানকয়েক পুরি-তরকারি খাইয়ে এনে বললে, ‘তুমি বোসো, আমি টিকিট কেটে আনি। তোমায় কিছু দিতে হবে না। তোমার কাছে যা আছে থাক। ছিক্ষেত্তেয় আমার লোক আছে।’

বাবাজি চলে যেতে ভোম্বলের মনে ভেসে উঠল, তার গন্তব্যস্থলের একটি কল্পিত ছবি। সেই সঙ্গে ভয়, আশা আনন্দে বুকের মধ্যে একটা দোলা লাগল। সে গালে হাত দিয়ে বসে ভাবতে লাগল তার ছেড়ে আসা জীবন ও ছবিগুলোকে। আর সেই সঙ্গে কল্পনা করতে লাগল সামনের অজানা দিনগুলিকে। তার কাজটা ভালো কি মন্দ হচ্ছে, একবারও মনে হল না। বরং লক্ষ্যে পৌঁছবার উৎসাহে মন ভরে গেল। এগিয়ে চলতে কিছু উত্তেজিত হল। এমন সময়ে দুজনেরই টিকিট হাতে বাবাজি এসে বললে, ‘চলো।’

ফটকে টিকিট দেখিয়ে দুজনে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।

প্ল্যাটফরমের দুপাশে গাড়ি। মাঝখানে সামনে ঘড়ি৷ ভোম্বল দেখলে, নটা বাজে। বহু যাত্রী গাড়িতে উঠে বসেছে, মোট মাথায় মুটে ও যাত্রী গাড়িতে উঠছে।

বাবাজি তাকে সঙ্গে নিয়ে একখানা কামরায় উঠে একজনের পাশে একটু জায়গা দেখে সেখানে বসিয়ে দিয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলে, ‘কদ্দুর যাওয়া হবে?’

লোকটি বললে, ‘কালীমাট্টি।’

—‘টাটানগরের আগে!’

সে জবাব দিলে, ‘একই টিশানকা দোনো নাম৷’

বাবাজি ও ভোম্বল দুজনেই অবাক। যার নাম কালীমাটি, তারই নাম টাটানগর!

তাদের পিছন থেকে একজন বললে, ‘কালীমাটিরই নাম টাটানগর। আপনারা যাবেন কদ্দুর?’

বাবাজি বললে, ‘আমি যাব না। যাবে এই ছেলেটি -ইস্পাত নগর বা টাটানগর। আপনি?’

—‘আরও দূর।’

—‘তাহলে একে নামিয়ে দেবেন।

—‘আচ্ছা। পৌঁছতে ভোর।’

বাবাজি ভোম্বলকে বললে, ‘শ্রীহরি তোমার সহায় হোন। চললাম৷’

বাবাজি নেমে গেল। ভোম্বল যেন একেবারে নিঃসঙ্গ। ভোম্বলের মনে হতে লাগল, যেন তার এক হিতৈষী বন্ধু তাকে পথের মাঝ থেকে ছেড়ে চলে গেল। হয়তো ওর সঙ্গে আর কোনও দিনই দেখা হবে না। কিন্তু সে তো একাই বেরিয়েছিল। তবে ভয় ভাবনার কি?

ভোম্বল বুঝতেই পারলে না, কখন গাড়ির ছাড়ার ঘণ্টা পড়ল, গার্ড-সাহেব বাঁশি বাজালে, বাতি নাড়লে, ইঞ্জিন সিটি দিলে। কেবল দেখলে, প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো লোকগুলো জানালার বাইরে দিয়ে পিছনে সরে যাচ্ছে এবং এক সময়ে গাড়ি ঘটাঘট শব্দে অন্ধকারে ছুটতে লাগল। শীতকাল; সব জানালা বন্ধ। কেবল শোনা যায় গাড়ির চাকার শব্দ। গায়ে লাগে দোলা ঝাঁকুনি, নাকে লাগে বিড়ি-সিগারেটের গন্ধ। দ্যাখা যায় জানালার বাইরে দিয়ে দু-একটি আলো পিছন দিকে ছুটে গেল।

গাড়ি ছুটছে। স্টেশন পার হচ্ছে; মাঝে মাঝে থামছে; আবার ছুটছে; রাত বাড়ছে; চোখে আসছে ঘুম বসে বসে যতটা ঘুমোনো যায়, ভোম্বল ঘুমোচ্ছে। তার মতো অনেকেই ঢুলছে; কেউ মেঝেয় শুয়েছে। কারো নাক ডাকছে; কারো কারো চোখে ঘুম আসছে না। তারা হিন্দিতে ‘বাতচিত’ করতে করতে রাত কাবারের মতলব করেছে।

অবশেষে তখনও একটু অন্ধকার আছে, গাড়ি এসে থামল একটি স্টেশনে। সেই হিন্দুস্থানিটি তাড়াতাড়ি উঠে তার সামান্য মোট নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে প্ল্যাটফর্মে কে হেঁকে উঠল - ‘টাটানগর-টাটানগর।’ লোকটা হাঁকতে হাঁকতে চলেছে।

হাঁকটা ভোম্বলের কানে যেতেই সে চমকে লাফিয়ে উঠল। এই তার পথের শেষ - তার স্বপ্নরাজ্য। অবশেষে সেই রাজ্যে সে এসে পৌঁছেছে। সেই বাঙালি যাত্রীটিও বলে উঠল, ‘ওহে ছোকরা! এইটা টাটানগর।’

ভোম্বলকে আর দ্বিতীয় বার বলতে হল না। সে হিন্দুস্থানিটির পিছন পিছন গিয়ে কামরা থেকে বেরিয়েই কনকনে ঠাণ্ডায় ঢাকা প্ল্যাটফরমে নামল! নেমেই পকেটে হাত নিয়ে দেখলে টিকিটখানা আছে কিনা। হাঁ, এই যে ঠিকই রয়েছে। কিন্তু কোন পথে, কোন দিকে কারখানা? স্টেশনে যাত্রী নামছে, উঠছে, হাঁক-ডাক, চলাফেরা করছে। আলো-অন্ধকারের মেলামেশা, কথাবার্তা তার চিরপরিচিত বাংলায় নয়, হিন্দিতে। অমনি তার মনে হল, সে যেন নিজের ঘর ছেড়ে বিদেশে এসে পড়েছে।

কোন পথে সে স্টেশন থেকে বার হয়ে কারখানার পথ ধরবে? এদিকে সেদিকে তাকাতেই সে দেখলে, একটি ফটক দিয়ে যাত্রীরা আস্তে আস্তে বার হতে যাচ্ছে। সেও গিয়ে তাদের পিছনে দাঁড়াল এবং এগোতে এগোতে টিকিট কালেক্টারের হাতে টিকিট দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু বাইরে গেল না, শেডের তলায় দাঁড়িয়ে দেখলে, আবছা অন্ধকার। সবে ভোর হচ্ছে; আকাশে তারা জ্বলজ্বল করছে; নীচে বড়ো বড়ো গাছ। এক জায়গায় কতকগুলো অদ্ভুত ধরনের ঘোড়ার গাড়ি। গাড়োয়ানেরা কেউ হাঁকছে ‘জামশেদপুর’, কেউ হাঁকছে, ‘সাচকি’, কেউ হাঁকছে, ‘কদমা’, কেউ হাঁকছে, আরও কি নাম। ভোম্বল মহা ফাঁপরে পড়ল। সে যাবে কারখানায়-গাড়ি-ঘোড়ায় নয়, পায়ে হেঁটে।

সে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। যাত্রীদের কেউ কেউ গিয়ে এক ঘোড়ায় টানা বা দু’ঘোড়ায় টানা গাড়িতে উঠছে। গাড়িগুলো একজন বা দু-তিনজন যাত্রী ও মোট নিয়ে স্টেশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

ক্রমে ফর্সা হল। পরিচিত কাক ডাকতে লাগল। স্টেশন ও পথের আলোগুলো নিবে গেল। ভোম্বল দেখলে, তার সামনে চওড়া রাজপথ, চলে গেছে মস্ত মস্ত অচেনা গাছের সারির মাঝ দিয়ে দূরে কোথায়। পথে চলেছে পথিক, চলেছে এক্কা ও টাঙা, ধীরে চলেছে উটে-টানা অদ্ভুত ধরনের গাড়ি। কিন্তু কোথায় সেই কারখানা? সেই - বিশ্বকর্মার পুরী, যেখানে দিন-রাত কেবল গড়ার কাজ? কার কাছে সে সন্ধান পাবে?

মনে পড়ল, সহপাঠী জিতেনকে, মনে পড়ল, সে চিঠিতে লিখেছিল, বাঁশি বাজাতে বাজাতে রাঙাপথে চলে বাবরি চুল তরুণেরা, তাদের সঙ্গে চলে রাঙা পাড় শাড়ি পরা, বাঁকা-এলোখোঁপায় বুনো ফুল গুঁজে মেয়েরা। এ পথে তো তাদের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না; পথটাও রাঙা নয়; এ যে দুপাশে মাঠ, মাঠের শেষে ওই যে কালো মেঘের মতো উঠেছে, ওটা কী? সে আন্দাজেই বুঝলে, পাহাড়? পাহাড় জীবনে সে সেই প্রথম দেখলে। ওই ওর ওধার থেকে রাঙিয়ে উঠছে সূর্য। সে থমকে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখতে লাগল। তেমন দৃশ্যও সে জীবনে দেখলে এই প্রথম। আড়ানি স্টেশনে শিউনন্দন যে পাহাড়-জঙ্গলের কথা বলেছে, ওটাও বোধ হয় এই রকম। সে তো এখানে থাকবেই। একদিন কাছে ছুটে গিয়ে পাহাড়টা দেখে আসবে। তারপর কারখানার ছুটিতে দেশে গিয়ে রানিদিদিকে, খোকনকে আর পদ্মদিদিকে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তাকে বলবে, পাহাড়-জঙ্গল আর কারখানার গল্প। কিন্তু কারখানাটা কোথায়?

ঠিক তখনই তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল একটি লোক। সে সাহস করে তাকে জিজ্ঞেস করলে, ‘কারখানাটা কোথায়?’

লোকটা থমকে দাঁড়াল; ভোম্বলের আপাদ-মস্তক লক্ষ করে বললে, ‘সিধা।’

ভোম্বল এবার জোরে হাঁটতে লাগল - সিধা।

পথের দুপাশে শাল, পিয়াশাল, পলাশ, মহুয়, ঝাউ, সেগুন প্রভৃতি মস্ত মস্ত গাছ। তারপর মাঝে মাঝে দু-একখানি কোঠাবাড়ি, অসমতল মাঠ, ছোটো- বড়ো পাথর, নিশিন্দে বা ফণীমনসার গাছ। কোথাও দু-একটি মাটির দেয়াল, জানলাহীন মাটির দেওয়াল খোলার বস্তি। ভোম্বলের পাশ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে যাতায়াত করে এক্কা-টাঙা, মোষের গাড়ি, উটের গাড়ি। ছোটো বাইসিকল। চলতে চলতে সোনার রোদ ছড়িয়ে গেল মাঠে, গাছে গাছে, পথে পথে৷ লেগেছে বাড়িগুলোর গায়ে-মাথায়। হঠাৎ তার চোখে পড়ল, দূরে অনেকখানি জায়গা জুড়ে প্রাচীর, সাদা রঙের নানা আকারের ছোটো-বড়ো কোঠা, যেন গায়ে লাগানো। সেগুলোর মাঝ থেকে আকাশপানে উঠেছে চার-পাঁচটি চিমনি। চিমনিগুলো কালো ধোঁয়া উগরে দিচ্ছে। সে ধোঁয়া উত্তরে বাতাসে লম্বা জয়কেতনের মতো চলেছে দক্ষিণে। ওই-ওই সেই যন্ত্রপুরী? ভোম্বলের মনে উৎসাহ, দেহে বল এল। সে জোরে হাঁটতে লাগল। তার পাশ দিয়ে কারা আসা যাওয়া করছে, কি চলাচল করছে, সেদিকে তার খেয়াল নেই। এই স্বপ্নপুরীর কথা সে কতদিন থেকে শুনে এসেছে। সেই জামসেদজি টাটা, যিনি প্রাণহীন রুক্ষ প্রান্তরে কর্মের আলোড়ন জাগিয়েছিলেন, ঘুমন্ত দেশে এনেছিলেন ঘুম ভাঙার গান। ভোম্বল টাটা কারখানার যত কাছে যায়, তত বিরামহীন অদ্ভুত একটা শব্দ কানে আসে। যেন অতিবিশাল একটা জলধারা কোনও এক দিকে বয়ে চলেছে। আর কারখানার বিস্তার ক্রমে বাড়তে বাড়তে সুবিশাল হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। অবশেষে সে এসে পৌঁছল, তার স্বপ্নপুরী টাটা-কারখানার বাইরে। তার সমুখে বিশাল সিংহদ্বার - কিন্তু রুদ্ধ দুপাশে প্রহরা।

হঠাৎ সিটি বাজল। অমনি দুটি পথ খুলে গেল। একটি দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল, কর্মক্লান্ত কর্মীস্রোত, অপরটি দিয়ে ঢুকতে লাগল, দলে দলে কর্মীদল।

পথের ধারে পড়েছিল একখানি মস্ত পাথর। ভোম্বল গিয়ে তার ওপর বসে সোৎসুক চোখে কর্মীদলের আসা-যাওয়া দেখতে লাগল। আর, ভাবতে লাগল, কোন্ মন্ত্রে ওই সিংহদ্বার দিয়ে তার যাওয়া-আসা হবে অবাধ? সেই কর্মমন্ত্র টি কে তাকে শেখাবে?

অধ্যায় ৫০ / ৫০
সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%