খগেন্দ্রনাথ মিত্র
গাছ-গাছালি চলাফেরা করে না, কিন্তু তাদের ছায়া আলোর সঙ্গে এপাশ, ওপাশ ঘোরে। তাই সূর্য পশ্চিমে হেলতেই তাদের ছায়াও হেলেছে পুবে।
গাড়ি গিয়ে থামল বার-বাড়ির আঙিনায়। রহমৎ চাচা লাফ দিয়ে নেমে জোয়াল খুলে গাড়ি দাবান করতেই পুঁটুলী হাতে নামলেন পলানে মাসী, তাঁর পিছনে জুতো হাতে ভোম্বল।
মোংলার মাসী দাঁতে মিশি, গলায় কণ্ঠী, ফর্সা, গোলগাল, পরনে লাল পেড়ে শাড়ি, হাতে শাঁখা ও লোহা, সহাস্যে বেরিয়ে এসে পলানে মাসীর, পায়ের ধুলো নিলেন। পলানে মাসী তাঁর থুৎনি ছুঁয়ে চুমো খেলেন।
তাই দেখে ভোম্বলের ভারী মজা লাগল। ভোম্বলও মাসীর পায়ের ধুলো নিতেই তিনিও ভোম্বলের থুৎনি ছুয়ে চুমো খেয়ে বললেন, “বেঁচে থাকো।”
মোংলা বললে, “মাসী, ও আমার বন্ধু। পুজো দেখতে এসেছে।”
মাসী বললেন, “তা বেশ। আসবেই তো। পলানেদি চল, চল। ভেতরে গিয়ে মুখ-হাত-পা ধোও, কাপড় বদলাও—সকাল থেকে মুখে কিছু তোল নি। দুধ-মুড়ি-গুড়-কলায় এ বেলা ভিজেন কর।”
পলানে মাসী বললেন, “এ বেলা কিছু না ভাই। জানই তো আমার অম্বোল হয়।”
মাসী বললেন, “ওমা, শুকনো মুখে থাকবে কি গো? দুধে কিছু হয় না। ও পাঁচু, গাড়ি থেকে সব নামিয়ে আনা বাবা। মঙ্গল, তোমরা দুজনে জামা-জুতো ছাড়, মুখ-হাত-পা ধোও। মুখ শুকিয়ে গেছে। চল চল–”
মেসো, বড় ঘরের মেঝেয় শীতলপাটি বিছিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। কথাবার্তায়, হাঁক-ডাকে উঠে পড়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখেন, রোদের তেজ কম, বারান্দায়, উঠোনে লোকজনের চলাফেরা। বুঝলেন, তাঁর অতিথি-কুটুমরা এসে গেছেন।
একদিকে ভোম্বলকে নিয়ে মোংলা এল খিড়কির পুকুরে। পুকুরটায় জল থৈ থৈ করছে। তিন ধারে কলার ঝাড় ও নারকোল গাছ। জলে এদিক-ওদিক বড় বড় মাছ ঘাই দিচ্ছে। কে একজন ঐ কোণে ছিপ ফেলে মানকচু ও লম্বা শ্যামা ঘাসের বনে বসেছিল। মোংলা তাকে ডাকবার উদ্যোগ করতেই শব্দ হল কড়র্। লোকটা অমনি বাঁ হাতে ছিপ ধরে উঠে দাঁড়াল। মোংলা ও ভোম্বল ছুটল তার কাছে। ছুটতে ছুটতে ভোম্বল বললে, “হয় রুই, নয় কাৎলা। আরে বাপ! কি টান?”
লোকটি কৌশলে মাছটা খেলাতে লাগল।
কিন্তু বেশিক্ষণও গেল না, মাছটা হঠাৎ খুলে বুড়বুড়ি কেটে বেরিয়ে গেল! শিকারী ও দর্শক দুজন দুঃখ, হতাশা ও ব্যর্থতায় ম্লান হাসি-মাথা মুখে ফেনায়িত জলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
শিকারী আস্তে আস্তে বললে, “আর একটু টানের ওপর রাখলে খুলত না। কাল সকালে দেখব। আজ আর নয়।” বলে হুইল গোটাতে লাগল।
পুকুরটা মোংলার মেসোর; লোকটি সম্পর্কে মোংলার মামা।
ভোম্বলরা পুকুর-ঘাটে মুখ-হাত-পা ধুয়ে ভেতরে গিয়ে পেট ভরে ফলার করে গাঁয়ের পথে বার হল। তখন সূর্য পার্টে বসতে বেশী দেরি নেই।
কাঁচা পথ। গেছে ঝোপ-জঙ্গলের মাঝ দিয়ে ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরে, মোটা মোটা আম-কাঁঠালের গাছের পাশে পাশে, বাঁশঝাড়ের তলায় তলায়, পানাভরা ডোবা ঘুরে, গোয়ালের কানাচ দিয়ে, ধানের গোলা বাঁয়ে রেখে খানিকটা ফাঁকায়। ভোম্বলরা পথটা দিয়ে সেখানে আসতেই দেখলে, একটা ছেলে সামনের মস্ত আমগাছটা থেকে নামছে। তার কাঁধে একটা যেন ঝোলা ঝুলছে।
মোংলা এগিয়ে গিয়ে বললে, “এই গণা, থলেয় কি?”
গণা মাটিতে নেমে, ঘাড় ও বুক থেকে দুটো লাল পিঁপড়ে ঝেঁড়ে ফেলতে ফেলতে বললে, “পিঁপড়ের ডিম। তুই কখন আলি? ও কেডা?”
—“এসেছি দুপুরে। ও আমার বন্ধু। ওদের বাড়ি দুর্গাপুর।”
—“ক’দিন থাকবি?”
—“পরশু চলে যাব। কোথায় মাছ ধরতে যাবি?”
—“ভৈরবতলার ওধারে মজা দীঘিতে। বিশ-ত্রিশ সের ওজনের কাৎলা-মিরগেল আছে। মহেশ বসাককে চিনিস তো? ঐ যে তাঁতীপাড়ার মুখেই বাড়ি। ওর ছাওয়াল গুপেটা গতকাল একটা আধমণী রুই আর সের তিনেক ওজনের কালবোস ধরেছিল। অত মাছ কি করবে? আসবার পথে ঐ কদমতলার হাটে রুইটা ত্রিশ টাকায় বেচে কালবোসটা এনেছিল। চ, যাবি?”
মোংলা বললে, “না।”
ভোম্বলের যাবার ইচ্ছে হতে লাগল। কিন্তু সে ল্যাটা-পুঁটি-শোল ছাড়া বড় কিছু কোন দিন ধরে নি। দু-একটা বড় মাছ গাঁথলেও রাখতে পারেনি। তাছাড়া, ও ছেলেটা অচেনা। তার নিজের তো ছিপ-টিপ কিছু নেই।
দুজনে আরও খানিক এগিয়ে একখানি ছোট মাঠে পড়ল। মাঠখানা কেন যে পতিত রয়েছে বুঝতে পারলে না। সেখানে কয়েকটা দশ-বারো বছরের আধ-উলঙ্গ ছেলে খবরের কাগজে তৈরী, অন্ততঃ সাত হাত লম্বা লেজ-আঁটা একখানা ঘুড়ি ওড়াবার চেষ্টা করছিল। একজন ধরতাই দিতেই যার হাতে বাঁশের লাটাই অর্থাৎ সরু সরু বাঁশের আগায় মাঝে মাঝে গিট বাঁধা মাঞ্জাহীন সূতো জড়ানো ছিল সে ঘুড়ির দিকে পিছন ফিরে দিলে ছুট। তাতে ঘুড়িখানা লেজ সমেত মাটি থেকে হাত কয়েক ওপরে উঠল। ছেলেরা মহানন্দে চিৎকার করতে করতে হাততালি দিতে ও নাচতে আরম্ভ করল। কিন্তু ঘুড়িখানা বেশী উঁচুতে উঠল না। হঠাৎ গোঁত্তা খেয়ে ঠক করে মাঠে পড়ল। অমনি সকলে কলরব করতে করতে ছুটল সেখানে।
মাঠের শেষে ক্ষেতের ওধার দিয়ে গেছে একটা খাল। ঐ খালটাকেই আসবার সময় ভোম্বল দেখেছিল। এখনও খালে বেশ জল ও স্রোত। মোংলা বললে, “ঐ দেখ, লগি ঠেলে একখানা ডিঙি স্রোতের বিপরীতে ছোট পীরখালির দিকে এগোচ্ছে। ঐ দেখা যায় লগির আগা, ছইয়ের মাথা, হালের মুঠি। ঐ যে একজোড়া সাদা বক উড়ে এল। বেশ সুন্দর না?”
ভোম্বল সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
মোংলা আবার বললে, “খালটার নাম কালীগঙ্গা—এসেছে মামুদপুরের ওধারে মাথাভাঙা নদী থেকে। খালটায় অনেক মাছ।”
—“তুই দেখেছিস?”
—“কয়েকবার গিয়েছিলাম। কোন কোন বর্ষায় কুমীর আসে। চ, ঐ তাঁতীপাড়া ঘুরে বাড়ি যাই। সন্ধ্যে হয়ে আসছে—”
ভোম্বল বললে, “ভয় কি? সূর্য ডুবতে ডুবতেই চাঁদ উঠবে। জ্যোৎস্নায় পথ চিনে বাড়ি যাব।”
খানিক গিয়ে তারা এল তাঁতীপাড়ায়। সেখানে মাত্র সাত-আট ঘর তাঁতীর বাস। তাঁত চালানোর ঠকাস্ ঠকাস শব্দ হচ্ছিল। পাড়াটা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ছায়াময়। ঘরগুলো খড়ের, বেড়া চাটাইয়ের, ধারি মাটির।
মোংলা বললে, “চ, কাপড় বোনা দেখি গে—”
ভোম্বল বললে, “সন্ধ্যে লাগবে বলে বাড়ি যেতে চাইছিস। আবার কাপড়
বোনা দেখতে গেলে রাত হবে না? তাঁত চালানো কখনও দেখিসনি? আমার ইচ্ছে করে কলের তাঁত দেখতে। আমি সেখানে যাবই–”
—“কোথায়?”
—“যেখানে আছে কলকারখানা। গাঁ যেন ঘুমোচ্ছে, শহরের চোখে ঘুম নেই৷ খালি কাজ, কাজ, কত রকমের —!"
—“তবে গ্রামে পালিয়েছিলি কেন?”
—“ধ্যেৎ! শহরে যেতে গিয়ে গ্রামে আটকা পড়েছিলাম।”
—“গ্রাম ভালো লাগে না তোর?”
—“খুব ভালো লাগে। কিন্তু বেশী দিন থাকতে ভালো লাগে না। কি জানি কেন? তোর?”
—“আমার থাকতেও ভালো লাগে। বড় হয়ে আমি গ্রামে থাকব, চাষ-আবাদ করব। মাসী বলে, 'মংলু ছুটি-ছাটা হলেই আসিস। গাছের ফল ফুলুরি, ক্ষেতের আনাজ-পাতি, ধান-কলাই কে দেখে? না দেখলেই ফাঁকি৷’ দেখলি না, মেসোর বাড়ির বার উঠোনে ধানের মরাইটা? তোর মাসীর বাড়ি নেই?”
—“আমার মামা-মাসী কেউ কোথাও নেই”—বলে ভোম্বল একটা নিঃশ্বাস ফেললে। এবং এদিকে-ওদিকে তাকাতে তাকাতে আসতে আসতে হঠাৎ বললে, “আরে! “ঐ গাছটাতে কত বাতাবি লেবু! পাক ধরেছে। গাছটা কাদের? পাড়লে বকে?”
মোংলা বললে, “সরকারদের। পাড়িনি তো কখনো।"
—“চ’ যাই।”
—“পরের গাছে হাত দেব? আমাদের বাড়ির পুবেও একটা বাতাবি, একটা কাশীর পেয়ারা গাছ আছে। পিছন দিকে ক্ষেতে আছে শশা। কাল সকালে পাড়ব তুলব।”
দুজনে যখন অন্য পথে বাড়ি ফিরে এল তখন সন্ধ্যা—পশ্চিমে নীল আকাশে সাঁঝের তারা ফুটেছে যেন নীল সায়রে সোনার পদ্মটি, পুবে ঘন গাছ-পালার সবজে পাথারে ভাসছে রুপোলী চাঁদ। পাখিরা বাসা নিয়ে গাছে গাছে মহা হট্টগোল বাধিয়েছে। এধারে-ওধারে বেজে উঠছে শাঁখ।
মেসো বার-বাড়ির ঘরের বারান্দায় হারিকেন জ্বেলে মাদুরে বসে
মোংলার প্রতাপকাকাকে বলছেন, “ভোরে উঠেই রওনা দিলে দশটার মধ্যেই ফিরে আসতি পারবা। এই ধর ফর্দ আর টাকা। রসকেটাকে সাথে নিও।”
প্রতাপকাকা বললে, “মংলু, যাবা?”
—“কোথায়?”
–“সুলতানপুর। ঐ খালপার—সওদা করতে?"
মেসো বললেন, “ওদের সাথে নিলে ঝামেলা হবে। ওরা থাক।”
মোংলা বললে, “নাঃ। আপনিই যান।”
ভোম্বল বললে, “চ’না। দেখে আসি।”
—“কি দেখবি? একটা বাজার বই তো নয়। কাকা যাচ্ছে লক্ষ্মী পুজোর সওদা করতে। আনবে বাতাসা, কদমা, মুড়কি, ফুটকড়াই, বাটাচিনি, আটা—এই সব। চিঁড়ে মুড়ি-খই তো বাড়িতেই কোটে-ভাঙ্গে। কাল আমরা দুজনে লেবু-শশা ছিঁড়ব, ঐ দিকের কাঁঠালির ঝাড়ে কাঁদি পড়েছে। দেখিস নি? খাটের তলায়ও আছে মস্ত একটা পাকা কাঁদি। কাল মাছ ধরব। দেখিস কত ছোকরা আসবে।”
ভোম্বল বললে, “ঐ ঢোল বাজছে কোথায়?”
মোংলার মেসো সহাস্যে বললেন, “ঢোল নয় বাবা, খোল-খোলে চাঁটি পড়ছে। ঐ ধারে গাঁয়ের একেবারে শেষে অনেক বছর থেকে এক বাবজীর আখড়া বসেছে। সন্ধ্যে হলেই খোলে চাঁটি পড়ে। বহু রাত অবধি কেত্তন হয়। পাল-পাব্বনে দূরে-কাছে এদিক-ওদিক থেকে সব এসে জোটে। আমরাও যাই। অনেক কাল আগে, সে আমরাও দেখিনি, এক বাবাজী নাকি নবদ্বীপ যাবার পথে ঐখানে দেহ রাখেন। তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে ঐখানে সমাহিত করে চলে যান। তারপর অনেক বছর কেটে যায়।
—“এখন যে বাবাজী আছেন, খুব বুড়ো হয়ে পড়েছেন, কোথা থেকে যেন একদিন এসে ওখানকার বন-জঙ্গল কেটে আখড়া বসান। গাঁয়ের একদল লোকের তা সহ্য হয় না। মানুষটাকে উৎখাত করতে উঠে-পড়ে লাগে। এই গাঁয়ের জমিদাররা গোঁসাই। খবর পেয়ে বজ্জাতগুলোকে ঢিট করে দেয়। তারপর থেকে সব ঠাণ্ডা। গাঁয়ে দলাদলি, রেষারেষি লেগেই আছে অসুখ-বিসুখের মতো। সব গাঁয়েই কিছু কিছু বজ্জাত আছে রে বাবা! কেউ কারো ভালো সইতে পারে না। তোমরা। বাচ্চা, শহরে থাক। এ সব বুঝবা না। গাঁয়ের বাইরের আর ভেতরের চেহারায় মিল নেই বাবা।”
ভোম্বল কিন্তু এ সব বুঝতে পারে না। যার বাইরেটা সুন্দর তার ভেতরটা কি মন্দ হতে পারে? তবু কথাগুলো তার মনে বসে গেল।
একটা কুবো কোথা থেকে যেন ডেকে উঠল—কুব কুব কুব, জ্যোৎস্না যত ছড়িয়ে পড়তে লাগল, রাত যত এগিয়ে চলল, দূরে, বোধহয় নির্জন জলার ধার থেকে একটা রাতের পাখির মনততই কাঁদানো ডাক থেকে থেকে ভেসে আসতে লাগল।
ভোম্বল মোংলাকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলে, “পলানে মাসির অমন নাম কেন রে?”
মোংলা বললে, “মাসির কেউ কোথাও নেই। মাসি এর-ওর বাড়ি কিছুদিন করে থাকেন। খুব কাজের। তাই সবাই ওকে ভালোবাসেন। মাসিও কোনো বাড়ির উপর মায়া পড়তে পড়তেই পালালো। তাই কেউ ওকে বলে ‘পলানে’ দিদি, ‘পলানে' মাসি, কেউ ‘পলানে’ পিসি’। তোকেও সবাই বলবে – “পলানে ভোম্বল।’ ”
—“কেন?”
—“কোথাও বেশিক্ষণ থাকতে পারিস না।”
ভোম্বল জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে, “এখানে ইস্কুল আছে?”
মোংলা বললে, “পাঠশালা নেই তো ইস্কুল। দুক্রোশের মধ্যে ও সব কিছু নেই। খালপাড়ে সুলতানপুরে ইস্কুল, ডাক্তারখানা সব আছে। এদিককার কেউ লেখাপড়া জানে না।”
—“লোকের অসুখ করলে কে চিকিৎসা করে?”
—“লোকে বলে কমফটরবাবু।”
ভোম্বল হো হো করে হেসে উঠল। বলল, “মানে কমপাউন্ডার? কার কমপাউন্ডার?”
—“কোনো এক ডাক্তারের কমপাউন্ডারি করত। ছেড়ে দিয়ে বাড়ি এসে ডাক্তার হয়ে বসেছে, ওই বাবাজির আখড়ার ধারে। কাল তোকে দেখাব। ওর বারবাড়ির ঘরের ছেঁচ থেকে সাইনবোর্ড ঝুলছে। তাতে লেখা ‘ডা. ঘেঁটুকৃপা দাস, সি. এম. পি. ডি. আর।”
—“সি. এম. পি. ডি. আর, মানে?”
—“কমপাউন্ডার।”
ভোম্বল হেসে গড়িয়ে পড়ল। মোংলা বললে, “লোকটা বেশ বুড়ো। কিন্তু খুব চালাক। একবার পুলিশ ওকে ধরেছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনার ডাক্তারি সার্টিফিকেট আছে?’
বুড়ো বলেছিল, ‘না।’
পুলিশ বলে তবে নামের আগে ‘ডাক্তার’, পিছনে ‘ডিগ্রি’ লিখেছেন কেন?”
ঘেঁটুকৃপা জবাব দেন, “ডাক্তার লিখিনি, লিখেছি, ‘ডা.’ -মানে ডায়মন্ডহারবারের ডাক্তারের কম্পাউন্ডার ঘেঁটুকৃপা দাস। এতে বেআইনি কী হল?” শুনে পুলিশও হেসেছিল। মেসোর মুখে এসব শুনেছি! কিন্তু লোকটার খুব পসার। গাঁয়ে গাঁয়ে ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করে। কাল ওর ঘোড়াটা দেখাব।”
—“কী হবে দেখে? সব গেঁয়ো ডাক্তারেরই ঘোড়া এক রকম - লাল রং, পেট-মোটা, বেঁটে, কেশর ঝাঁকড়া, -চোখে পিচুটি। আমি ঢের দেখেছি।”
তখন দুরের মাঠের ধার থেকে একপাল শিয়াল ডেকে উঠল। বাবাজিদের আখরা থেকে খোল-করতালের আওয়াজের সঙ্গে কীর্তনের সুর ভেসে আসছে। প্রতাপকাকাও কী একটা গান মেঠো সুরে খাটো গলায় গাইছেন। আর, মেসো হ্যারিকেনের আলোয় বসে কাগজ পত্র দেখতে দেখতে দুজন প্রজার সঙ্গে কথা কইছেন। বাইরে শিশির ভেজা গাছপালা, ঝোপঝাড়, খেত-খামার ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ঝিকমিক করছে। শিশির ভেজা শিউলি, বনতুলসী, নিম ও বেলপাতার মিশ্র গন্ধ আসছে। আর, দূরে জলার ধারে সেই পাখিটা মন কাঁদানো ডাক ডাকছে। তান ধরেছে ঝিঁঝি ও ব্যাং। তবু মনে হচ্ছে, এ এক ঘুমের দেশ, মস্ত নিঝুমপুরী।
রুইমাছ-দুধ-আমসত্ত্ব-কলায় রাতে খাওয়া হল খাসা - মশারির মধ্যে ঘুমও হল মন্দ নয়। তবু ভোম্বলের মন স্থির হল না। সে সকালে উঠেই মোংলাকে বললে, “চললুম”
মোংলা যেন আকাশ থেকে পড়ল; জিজ্ঞেস করলে, “মানে?”
—“মানে চললাম।”
—“কোথায়? ইয়ার্কি হচ্ছে? মেসো-মাসি আজকের দিনে তোকে বাড়ি থেকে যেতে দেবে? বলবে কার্ত্তিক মাস, লক্ষ্মীপুজো। ওই দ্যাখ্ প্রতাপকাকা আর রসিক রওনা হল। আমরাও জলখাবার খেয়ে বাতাবি-পেয়ারা-শসা এনে দিয়ে মাছ ধরিগে চ', নগা মামা হয়তো এতক্ষণে চার ফেলে বসে গেছে। ওর কাছ থেকে চার আর টোপ নেব।”
এবার ভোম্বল উৎসাহিত হয়ে উঠল। বললে, “ছিপ?”
—“ওর হাতছিপ দুখানা চেয়ে নিয়ে উত্তর কোণে মাদার গাছটার তলায় থলে বিছিয়ে বসে পড়ব।”

তারপর মোংলার কথামতো সবই হল, কেবল বড়ো মাছ তাদের দুজনের কারো ছিপেই উঠল না, উঠল কতকগুলো পুঁটি আর চারা ট্যাংরা। কিন্তু নগামামা তুলল বেশ বড়ো-বড়ো দুটো মৃগেল...
তারপর শুয়ে-বসে-ঘুরে-ফিরে তাদের কাটল দিন। এর মধ্যে ঘেঁটুকৃপার বাড়ির সামনে দিয়ে, চাষি-পাড়ার মাঝ দিয়ে, গগন ফকিরের পোড়া ভিটে বাঁয়ে রেখে, তাঁতিপাড়া, মনসাতালার পাশে পাশে, পায়ে চলা পথে দুজনে গাঁ ঘুরে এল। যেতে যেতে দেখলে সব বাড়িতেই কম বেশি আলপনা। তাদের বাড়িতে ও ‘পলানে’ মাসি সকাল থেকে আলপনায় আলপনায় উঠোন ঘর-দোর-বারান্দায় ফুল ফুটিয়ে দিলেন।
সন্ধ্যা লাগতে লাগতেই উঠল কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ নীলসাগরে রুপোর থালা। ভোম্বলের ভারি আনন্দ হতে লাগল। ওদের বাড়ি পুজো হয়, কালীপুজোর কাল রাতে তুবড়ি-ফুলঝুরির জ্বলন্ত ফুলের আলোয়।
সে এক, এ আর। আকাশের এ আলোয় সব ভাসছে, হাসছে।
পুজোর পর কোথা থেকে যেন এল একপাল ছেলে গাইতে গাইতে -
লক্ষ্মীপুজোর চারটি ভুজো দে মা -
যে দেবে আড়ি আড়ি, ধান হবে কাঁড়ি কাঁড়ি
যে দেবে কাঠা কাঠা, তার হবে পাঁচ ব্যাটা
যে দেবে মুঠো মুঠো, তার হবে হাত ঠুঁটো।
ছেলেগুলো কোথায় ছিল মোংলাও জানে না - ওরা তারও অচেনা। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরতে ঘুরতে এপাড়া ওপাড়া করে বেড়াতে লাগল। খই-চিঁরে-বাতাসাদিতে তাদের কোঁচড় উঠল ভরে। তাদের স্বর ক্রমে মিলিয়ে আসতে লাগল।
এদিকে রাত যত বেশি হতে লাগল, চাঁদও তত ওপরে উঠতে। জ্যোৎস্নায় বাইরের সব কিছুকে ডুবিয়ে, ভাসিয়ে, গলিয়ে ফেলতে লাগল।
গাছপালার ছায়া ছোটো হতে হতে পায়ের কাছে গেল মিলিয়ে। শিউলি বনতুলসীর গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মনকে মাতিয়ে দিয়েছে। পাখিদের চোখের ঘুম গেল ছুটে। তারা দিন ভেবে চমকে উঠে, কি, স্বপ্নের ঘরে এক-একবার ডেকে উঠতে লাগল। ভোম্বলেরও চোখের ঘুম গেল ভেসে।
পরদিন ভোরে উঠেই সে মোংলাকে বললে, “আমি চললাম।”
মোংলা বললে, “আমিও যাব খেয়ে-দেয়ে দুপুরে একসঙ্গে। মাসিমা এখন যেতেই দেবে না।”
হলও তাই। অগত্যা ভোম্বল গাঁয়ের এধার-সেধার ঘুরে, বাঁশি তৈরি করবে বলে তলতা বাঁশের আগা কেটে নিলে। দুপুরে যাবার সময় মাসি তাদের দুজনকে দুটো পোঁটলায় ভুজো ও ক্ষীরতক্তি বেঁধে দিলেন।
মেসো উপদেশ দিলেন। “কালীশঙ্করপুরের জঙ্গলের সীমানা তাড়াতাড়ি পার হয়ে যেয়ো। শুনেছি, কাল থেকে ওখানটায় ভারি বুনো শুয়োরের ভয় হয়েছে। ওরা যখন তখন বার হচ্ছে। আমি কাল যাব। আজকের দিনটা থেকে কাল আমার সাথে গেলেই ভালো করতে।”
কিন্তু মোংলা তর সয় তো ভোম্বলের সয় না। দুই বন্ধু গুরুজনদের পায়ের ধুলো, আশীর্বাদ ও সাবধান বাণী মাথায় নিয়ে হেঁটে রওনা হল। রহমত চাচা গতকালই ফিরে গেছে সওয়ারি নিয়ে। দুজনের কাপড় মালকোঁচা মারা, গাঁয়ে কামিজ, পায়ে জুতো, বাঁহাতে পোঁটলা, ডান হাতে কঞ্চি। ভোম্বলের পোঁটলা থেকে আবার তলতা বাঁশের আগাটুকু মুখ বার করে আছে যেন বাঁশি হয়ে বাজবার অপেক্ষায়।
কার্তিকের রোদ ঝাঁ ঝাঁ ভরা দুপুর। দুজনে শূন্যপথ দিয়ে ফিরে চলল। চলল যে পথে এসেছিল সেই পথ ধরে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন