অদ্ভুত কীর্তি

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

দূরে—পিছনে—ষ্টেশন; সামনে ঐ যে গাঁ।

গাঁখানি বেশ বড়। ভোম্বল গাঁয়ে ঢুকতেই দেখলো, বাঁ-দিকে কুমোর বাড়ি। দুর্গাপুজোর আর দেরী নেই। কুমোরের পো একখানা দুর্গাঠাকুর গড়ছে।

ভোম্বলের ক্ষিধেও পেয়েছে খুব। সে কাপড়ের খুঁট থেকে নাসপাতিটা খুলে কামড়ে কচ কচ, করে খেতে লাগলো। খেতে খেতে দেখলো কুমোর-বাড়ির পিছন দিকে বেড়ার ধারে একটা মস্ত বাতাবী লেবুর গাছ।

গাছটা লেবুতে ভরা। লেবুগুলো পেকে সোনার তালের মতো দেখাচ্ছে। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলো, কেউ নেই। সে কাপড়খানা গুছিয়ে পরে কাঠ-বেড়ালীর মতো তর্ তর্ করে গাছে উঠে গেল। গাছটা ঘন ঘন দুলছে। ডাল-পালার সর্ সর্ শব্দ হচ্ছে। ভোম্বল পট করে একটা লেবু ছিঁড়তেই বাড়ির ভেতর থেকে একটা মেয়েলী গলা চেঁচিয়ে উঠলো “গাছে কে রে”

ভোম্বল সাড়া দিলে না। লেবুটা এক হাতের বগলে চেপে ধরে সে সড় সড় করে গাছ থেকে নামতে লাগলো। কুমোরের বউ রান্না চড়িয়ে ছিল। সে বাড়ির ভেতরের উঠোনে দাঁড়িয়ে ভোম্বলকে লেবু বগলে গাছ থেকে নামতে দেখে গরম খুন্তি হাতে ছুটে এসে চিৎকার করতে লাগলো, —“চোর—চোর—, লেবু চুরি করে পালাচ্ছে।”

তার চিৎকার শুনে কুমোর ওদিক থেকে কোঁৎকা হাতে ছুটে এসে একেবারে গাছের গোড়ায় দাঁড়ালো। ভোম্বল তখনও গাছে। আর হাত দুই নামলেই উঁচু বেড়ার মাথায় পা রাখতে পারে।

কুমোরের বউ গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে কোৎকা ও খুন্তি উচিয়ে বলতে লাগলো,—“আয় নেমে। নাম শিগগির—”

ভোম্বল দেখলো, নামলে আর রক্ষা নেই! না নামলেও ওরা লোকজন জড় করে তাকে গাছ থেকে টেনে নামাবে। তখন পালাবার পথ বন্ধ! সে বললে, —“নামছি বাপু। ক্ষিদের সময় একটা লেবু নিয়েছি।”

কুমোর বললে,—“ক্ষিদে পেয়েছে তো আমার গাছে চড়েছিস কেন? বাড়ি গিয়ে ভাত খাঁ। কার ছেলে তুই?”

ভোম্বল বললে, –“চাকী মশাইয়ের।”

“কোথাকার চাকী? তোকে তো কোনদিন দেখিনি।”

কুমোরের বউ বললে,—“ও সব মিছে কথা। ছোঁড়া চোর—”

এ কথায় ভোম্বলের খুব রাগ আর অপমান বোধ হলো। ভাবলো, লেবুটা ছুঁড়ে ফেলে লাফ দিয়ে বেড়ার বাইরে পড়ে চলে যায়।

কুমোর হুমকি দিয়ে বললে, “কৈ নামলি নে? উঠবো গাছে?”

ভোম্বল বললে,—“উঠেই এস না।”

‘তবে রে!’ বলেই কুমোর গাছে উঠতে লাগলো। গাছটার দক্ষিণে কুমোরের রান্নাঘর। গাছের কয়েকটা ডাল একেবারে চালের সঙ্গে লেগে আছে।

কুমোরকে গাছে চড়তে দেখে, সে আবার ওপরে উঠতে লাগলো। দুজনেই গাছে চড়তে ওস্তাদ। তবে ভোম্বলের এক সুবিধা, সে ছোট, শরীর হালকা। কুমোরের চেয়ে কিছু তাড়াতাড়িই উঠছে। কুমোর-গিন্নী তলা থেকে খুন্তি দুলিয়ে বলছে, –“ধর – ধর। ছোঁড়ার ঠ্যাং চেপে ধর।”

গোলমাল শুনে পাড়ার কয়েকটা ছেলে সেখানে ছুটে এলো। তারা ওপর দিকে তাকিয়ে দেখলে যে লেবুগাছটার উঁচু ডালে কুমোর-পো আর একটা অচেনা ছেলে। গাছটা খুব দুলছে। তারা চিৎকার করে উঠলো।

ভোম্বল দেখলে, সর্বনাশ! আর বোধহয় পালানো যাবে না। কুমোর তাকে ধরে ধরে। তবুও পালাবার চেষ্টা করা যাক। দেখলে, সামনেই রান্নাঘরের চাল। সে সর্ সর্ করে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে চালে লাফিয়ে পড়ে, সেখানে থেকে লাফ দিয়ে বেড়ার বাইরে মাটিতে নেমেই দিলে ছুট। বগলে বাতাবী লেবুটা তেমনি রয়েছে।

কুমোর-পো-ও ‘ধর্ ধর্' বলতে বলতে বলতে চালে নেমে, সেখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে হাত-কয়েক ছুটেই গোবরে পা হড়কে হুড়মুড় করে পড়ে গেল।

ছেলেগুলো চিৎকার করতে করতে হাততালি দিতে লাগলো। তারা ভারি খুশী। লোকটা তাদেরও লেবু খেতে দেয় না!

সামনে বাঁশ-ঝাড়। তারপর ডোবা। ডোবার ধারে ঘন ঝোপঝাড়। তার ওধারে ঐ যে সড়ক দেখা যায়। ভোম্বল বাঁশ-তলা দিয়ে সেদিকে ছুটতে লাগলো।

ছুটতে ছুটতে একবার পিছন ফিরে দেখলে—কেউ নেই! কেবল কুমোর-গিন্নীর খ্যান্-খেনে গলা শোনা যাচ্ছে—“ডাকাত—পাজীছুঁচো!”

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%