খগেন্দ্রনাথ মিত্র
নদীতে নৌকো চলেছে, ডাঙায় চলেছে রাখাল-কৃষাণ ও গোরু-বাছুর-ছাগল। আকাশে উড়ছে পাখি। এদিকে গ্রামের ঘর-বাড়ি নদীর পাড় অবধি এগিয়ে এসেছে। একখানি বাড়ির বাইরের উঠোনের খানিকটা ভেঙে পড়েছে নদীতে; পাড়ের নিচে বেরিয়ে আছে একটি বটগাছের শিকড়। শিকড়ে বসে আছে একটি মাছরাঙা। পাড় দিয়ে বাঁক ঘাড়ে চলেছে একটি লোক। বোধ হয় গোয়ালা। গ্রামে ঘি-দই বেচতে চলেছে। পাড়ের এক জায়গায় গর্তে ঢুকে গেল একটি প্রকাণ্ড সাপ, কালো কুচকুচে তার রঙ। সাপটা বোধ হয় মেঠো ইঁদুর আর পাড়ের ছোট পাখি ধরে খায়।
তখন রোদের বেশ তেজ; মাঝি চেঁচিয়ে বললে, “মুহুরিমাশা, বেলা একপহর হল। ছামনে কিষ্টপুর। এখানে লামে পাক-সাক করে লেন। আপনার জোড়াবটতোল পৌঁছতি যার নাম সেই তিন পহর বেলা, —এদিকে জলের যা টান! লা এগোয় না।”
মুহুরিমশাই বললেন, “তাই লাগাও।”
কৃষ্ণপুরের ঘাটে নৌকো ভিড়ল। গাঁখানি তোরাব মাঝির চেনা। সেখানে তার চাচার বাড়ি। তোরাবের চাচা-চাচী নেই, আছে তার চাচাতো ভাই। সেও তখন বাড়ি ছিল না। তিন ক্রোশ দূরে হাটে গিয়েছিল সওদা করতে। বাড়িতে পুরুষ-মানুষ বলতে ছিল, চাচাতো ভাইয়ের দশ বছরের ছেলে আবু। মাঝি গেল চাচার বাড়ি। আবু তাকে খাতির করলে; দা-কাটা তামাক সেজে দিলে। মাঝির তামাক খাওয়া হয়ে গেলে নিজেও হুঁকোটি নিয়ে কয়েকটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চলে গেল।
মাঝি চেঁচিয়ে বললে, “এক বোঝা খড়ি আনিস রে।”
ভোম্বল গিয়েছিল মাঝির সঙ্গে। সে বললে, “মাঝি, অতটুকু ছেলে
তামাক খেল?”
মাঝি বললে, “খাক বাবু। ছেলেমানুষ।”
ভোম্বল অবাক হয়ে গেল।
একটু পরেই আবু এক বোঝা কাঠ এনে দিল। মাঝি তার কাছ থেকে একখানি কাস্তে চেয়ে নিয়ে বাড়ির পিছন দিকে কলার ঝাড়ে খানকয়েক কলাপাতা কাটতে গেল।
ভোম্বল দেখলে, বাড়িতে দেড়খানি খড়ের ঘর, চারধারে পাটকাঠির বেড়া। সামনে আমগাছতলায় একটি মুরগী তার ছানা-ক'টিকে নিয়ে চরে বেড়াচ্ছে। বড় ঘরখানির চালে উঠেচে একটি লাউগাছ; কোণের দিকে বেড়ার ধারে ছিল কয়েকটি ঘৃতকুমারী ও পাথরকুচির গাছ। কলাপাতা কেটে মাঝি ফিরে এল এবং আবুর মাথায় কাঠের বোঝাটি চাপিয়ে দিয়ে বললে, “চল, গাঙের পাড়ে ঐ কাঁঠালতলায় নিয়ে চল।”
ভোম্বল ফিরে এসে দেখে, মুহুরিমশাই সের দুই ওজনের একটি আড়মাছ কিনেচেন একখানি চলতি জেলেডিঙি থেকে। মাছটির লম্বা গোঁফ দেখে ভোম্বলের মনে পড়ল, তাদের দুর্গাপুরের কুমুদ উকিলের পাকানো সরু গোঁফ জোড়া। সে মাছটির গোঁফ চুমুরে দেবার চেষ্টা করতে করতে নিজের মনেই হাসতে লাগল।
সঙ্গে যে ছোট তোলা উনুনটি ছিল তাই জ্বেলে কাঁঠালতলায় মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী রান্না চাপিয়ে দিলেন।
ভোম্বল বললে, “মাছটা কাটব আমি। বঁটি কই? মাঝি, বঁটি দাও—”
মাঝি বললে, “আমাদের বঁটি নেই বাবু। এই বড় চাকু দিয়ে কাটাকুটি করি—” বলে মাঝি একখানি বড় ছুরি দিলে। ছুরিখানির মাঝখানটা কাটাকুটিতে ক্ষয়ে গেছে।
মুহুরিমশাই বললেন, “তুমি কেন মাছ কুটবে? দাও ঐ সুচিকে!”
সুচি এগিয়ে গিয়ে মাঝির হাত থেকে ছুরিখানা নিয়ে এমনভাবে মাছটার দিকে যেতে লাগল যে, দেখে মনে হল, তার ছুরি ধরার অভ্যাস নেই, সে ধরে খাঁড়া। সে মাছটাকে মোটা মোটা আঙুলে চেপে ধরতেই মুহুরিমশাই মালকোঁচা মারতে মারতে বললেন, “সর্ সর্। ও তোর কর্ম নয়। একি ছোলা পিষে ছাতু তৈরি করচিস্?”
বুড়ো মাঝি হাসতে হাসতে বললে, “বাবু, আপনি ছাড়ান দেন। আপনারা ভদ্দরনোক। ফজর রে—”
ফজর এগিয়ে গিয়ে একখানি কলাপাতায় মাছটিকে রেখে হালকা হাতে ছুরি ধরে কাটতে লাগল। ভোম্বল অবাক হয়ে তার ছুরি চালনা দেখতে লাগল।
কয়েকটা কাক উড়ে এসে গাছে বসে ছটফট করতে করতে ডাকতে লাগল। একটা সাহস করে নিচেও নেমে এল। কোথা থেকে গোটা দুই কুকুর এসে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে মাছ-কাটা দেখছিল। মাথার ওপর ঘুরতে লাগল কয়েকটা চিল। একটা চিল পাশের আমগাছের মাথার বসে ডেকে উঠল, “চি-ই-ই-ই-ল।”
সেই গাছটির তলায় মাঝিরাও কালিমাখা মাটির হাঁড়িতে রান্না চড়িয়েছিল।
সামনেই ঘাট। গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো, স্ত্রী-পুরুষ, ঘাটে যাচ্ছে-আসচে আর ভোম্বলের দিকে কৌতূহলভরে তাকাচ্ছে। একটি থানপরা স্ত্রীলোক ঘাটে যাবার পথে মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রীর কাছে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কোথা থেকে আসচেন?”
তাঁর কাঁধে গামছা, হাতে একটি বড় ঘটি, দাঁতে ও তর্জনীতে মিশি, মাথার কাঁচাপাকা চুল ছোট করে ছাঁটা।
মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী খিচুড়ির হাঁড়িতে হাতা ডুবিয়ে বললেন, “চরমাদারীপুর থেকে।”
—“যাবেন কোথায়।”
—“জোড়াবটতোল।”
–“সাতগেছে জোড়াবটতোলে?”
-“হু”
–“কার বাড়ি।”
—“বোসেদের।”
—“ওখানে বুঝি বাপের বাড়ি।”
—“না। শ্বশুরবাড়ি।”
—“ঐ মেয়েটি বুঝি আপনার? বেশ মিষ্টি মুখখানি। ঐ ছেলেটি?”
—“চরমাদারীপুর কাছারির নায়েবমশাইয়ের ভাই-পো।”
—“বেশ ছেলেটি। তা, এখানে কেন রান্না চড়িয়েছ মা? রাস্তাঘাট —ছত্রিশ জাতের পা পড়ছে। ছোঁয়া-ন্যাপা যাবে।” বলে মাঝিদের দিকে অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর আবার বললেন, “গাঁয়ে কারো বাড়ি গেলেই তো পারতে।”
—“কাউকে তো চিনি নে।”
–“চেনবার কি দরকার? আমার বাড়িতেও যেতে পারতে। ওই যে ঢেউ খেলানো টিনের ঘর দেখা যায়, ওই আমার বাড়ি। 'যতীন দত্তর বাড়ি যাব' বললে ওপারের লোকও এসে তোমাকে আমার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাবে। যতীন হল আমার ছেলের নাম। সে রেল-অফিসের বড়বাবু। তারা কেউ এখানে থাকে না। আমি ভিটে আগলে পড়ে আছি।
রাখাল-কিষাণের হাতে ক্ষেতি-খোলা, গোরু-বাছুর ছেড়ে দিয়ে কি বিশ্বেস আছে? কর্তার আমলের সব। না থাকলে চলে? তোমরা আমার বাড়িতে চল। আমি ঝপ্ করে একটা ডুব দিয়ে আসি—” বলে তিনি ঘাটের দিকে চলে গেলেন।
ততক্ষণে মাছ কোটা হয়ে গিয়েছিল। মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী বললেন, “লতী, খান আষ্টেক মাছ মাঝিদের দিয়ে আয়।”
লতী এক টুকরো কলাপাতা ছিঁড়ে তাতে আটখানি মাছ তুলে মাঝিদের দিতে গেল৷
খানিক পরে যতীন দত্তের মা স্নান করে বাড়ি ফিরে যাবার পথে মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রীকে বললেন, “তোমার রান্না হল?” বলেই তিনি ঠোঁট নাড়তে ও আঙুলের গাঁট গুণতে লাগলেন।
মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী খিচুড়ির হাঁড়িটা নামিয়ে বললেন, “প্রায়। কেবল মাছের ঝাল বাকী।”
যতীন দত্তর মা চলে যেতেই ভোম্বলও নাইতে গেল।
সে ঘাটে গিয়ে দেখলে, তার বয়সী দুটো ছেলে সাঁতার কাটছে, ডুব দিয়ে খানিক দূর গিয়ে আবার ভেসে উঠচে। কূলের কাছে কয়েক জন বয়স্ক লোক স্নান করছিল; একটি চাষী-বউ মাথা ঘষছিল, একজন কাঁথা কাচছিল। কয়েকটি ছেলেমেয়ে গামছা দিয়ে মাছ ধরছিল। তারা এক একবার চিৎকার করছে, সাঁতার দিতে দিতে জলে পা ছুঁড়ছে।
ভোম্বল তাদের ভেতর দিয়ে জলে নেমেই ডুব-সাঁতার দিয়ে অনেক দূর চলে গেল তারপর ভেসে উঠে উপুড় সাঁতার দিয়ে আরও খানিক গিয়ে ডাঙার দিকে ফিরে দেখে, কূলে যারা ছিল তাদের সকলকে ছোট দেখাচ্ছে, ঘাট ঠিক চেনা যাচ্ছে না। অচেনা জায়গা, জলের টানও বেশ, কুমীর থাকাও অসম্ভব নয়। তার কেমন ভয় করতে লাগল।
সে তাড়াতাড়ি কূলের দিকে ফিরতে লাগল। কিন্তু স্রোতের টানে সোজা গিয়ে ঘাটে উঠতে পারলে না, অঘাটে গিয়ে একটা ডুব দিয়ে ডাঙ্গায় উঠে পাড় দিয়ে ঘাটের দিকে আসতে আসতে দেখলে, সবাই জল থেকে উঠে খুব উত্তেজিতভাবে নদীর দিকে তাকাচ্ছে আর আঙুল দিয়ে কি দেখাচ্ছে। ভোম্বলও তাকিয়ে দেখে, মাঝনদীতে একখানি কালো কাঠের মতো কি ভাসছে আর একটু একটু করে ওপারের দিকে সোজা এগিয়ে যাচ্ছে। তারপর সেটা আস্তে আস্তে ডুবে গেল। ভোম্বোেল বুঝতে পারলে, ওটা কাঠ নয়, কুমীর।
তাকে দেখতে পেয়েই মুহুরিমশাই চেঁচিয়ে উঠলেন, “কি ছেলে বাবা তুমি?– প্রাণের মায়া নেই? যদি কুমীরে ধরত?”
মালতী তার চোখ দুটো আরও বড় করে ভোম্বলের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তাদের কাছে যেতেই ঠোঁট দুখানি একটু বেঁকিয়ে বলে উঠল “ভারী বাহাদুর! কুমীরে ধরলে কি করতে?”
ভোম্বলের মুখে অপ্রস্তুতের হাসি ফুটে উঠল।
মুহুরিমশাই কাঁঠালতলার দিকে যেতে যেতে বললেন, “তুমি তো আমার ভাবনায় ফেললে! নায়েবমশাই আমার হাতে তোমার ভার দিয়েছেন। কিন্তু তোমার মতো ছেলেকে সামলানোই দায়। হয়তো কোন সময় কুমীরের পিঠে সওয়ার হয়ে তোমার নদী পার হওয়ার খেয়াল মাথায় চাপবে, তখন—”
রান্না হয়ে গিয়েছিল খিচুড়ি আর আড়মাছের ঝাল। কিন্তু কুমীরের ভয়ে কেউ আর জলে নামলে না, ডাঙাতেই ঘটি করে জল তুলে কোন রকমে স্নান সারলে।

যতীন দত্তর মা একটা বড় ভাঁড়ে এক ভাঁড় জ্বাল দেওয়া দুধ, একখানি কচি কলাপাতায় কতকগুলো নারকোলের নাড়ু হাতে করে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর পিছনে, বোধ হয় তাঁর রাখাল; তার হাতে এক ছড়া পাকা ও পুষ্ট মর্তমান কলা।
যতীন দত্তর মা জিনিসগুলো মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রীর হাতে দিতে দিতে বললেন, “ধর মা। আমার বাড়িতে গেলে তোমাদের কোন কষ্ট হতো না। ওরে কেষ্ট, কলাছড়াটা এদিকে দে—”
কেষ্টর যেমন নাম—তেমনি রূপ, যেন কষ্টিপাথর কেটে তার যত কালো ছিল সব বেরিয়ে পড়েছে।
মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী বললেন, “আমাদের জন্যে এত কষ্ট কেন করলেন মাসীমা?”
“তোমরা যে আমাদের গাঁয়ের অতিথি। এ তো সবাই করে! আমি আর দাঁড়াব না। তোমরা খাওয়া-দাওয়া কর—” বলে তিনি কেষ্টকে নিয়ে চলে গেলেন।
খাওয়া দাওয়ার পরে ভোম্বলদের নৌকো যখন ছাড়ল তখন বেলা দুপুর। ভোম্বল ছইয়ের মুখে বসে দেখতে লাগল নদীর দুটি তীরে সেই ভাঙাপাড়, সবুজ গ্রাম, ঘাট থেকে পথ উঠে গেছে গ্রামের দিকে, ঘাটে চাষী-বউরা স্নান করছে, কাঁথা-কাপড় কাচছে, ছেলেরা স্নান করতে করতে জল তোলপাড় করছে। নদীতে সেই দু-একখানি নৌকোর আনাগোনা, সেই রৌদ্র-জলের ঝলমলানি আকাশে সেই মেঘ-সূর্য ও দু-একটি পাথি। কোথাও তাড়া নেই। সবাই অলস। বাতাসও ধীর। গাছতলায় বসে একটি রাখাল বাঁশি বাজাচ্ছিল; একটি গোরু হাম্বা হাম্বা করে ডেকে উঠল। সে সুর'ও অলস।
দাঁড়িরাও যেন ঘুমের ঘোরে দাঁড় টানচে। বসে থাকতে থাকতে ভোম্বলেরও চোখ দুটি তন্দ্রায় জড়িয়ে এল। কিন্তু তার মনে হল সে তেমনি বসে বসে সব দেখছে। কেবল যখন মুহুরিমশাই ডাকলেন, “ভূপেন, ওঠো। ঘাটে পৌঁছেচি”—তখনই তার তন্দ্রা ভেঙে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন