খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

তখন কোনও যাত্রী-গাড়ি ছিল না, মালগাড়িও না। তাই গুমটি ছিল খোলা। ভোম্বল গুমটিতে ঢুকে রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে পর্বদিকে তাকিয়ে দেখলে, ওই অনেক দূরে সিগন্যাল পোস্ট, মাথায় সিগন্যাল -আড় হয়ে আছে। ওই যে বাজারের গুমটি দিয়ে লোকে লাইন পারাপার করছে। লোকগুলোকে দেখাচ্ছে, ছোটো ছোটো পুতুলের মতো। আর, পশ্চিমে সোজা চলে গেলে রেলপথ -দুপাশে তারের বেড়া, ছোটো ছোটো কাশের বন। রেলপথটা দক্ষিণে ঘুরে মিলিয়ে গাছে। একটা ছাগল তারের বেড়া গলিয়ে লাইনে ঢুকে ঘাস খাচ্ছিল। বাইরে একটা ফিঙে বসে এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছে। গোরুটির সেদিকে খেয়াল নেই। সে দিব্যি খালের ধারে চড়ছে। বেলা তখন অনেক। ভোম্বল সকালে যা খেয়েছিল তা কখন হজম হয়ে গেছে। তবে ট্যাঁকে পয়সা থাকলেও কাছে-কিনারে কোনও রকমের খাবারের দোকান নেই৷

ভোম্বল দেখলে গুমটির ওপারে গ্রামের দিক থেকে কাজলা ও নাটা আখ-বোঝই-খান দুই গোরুর গাড়ি আসছে। গাড়োয়ানেরা বোধ হয় বাজারের ওধারে সতু মণ্ডলের আখমাড়াইয়ের কলে যাবে। এদিকটায় খানা-ডোবা, বাঁশঝাড়, আমবাগান মুচিপাড়া থাকায়, যাবার পথ নেই, তাই ঘুরপথ ধরেছে। ভোম্বল ভাবলে পিছনের গাড়ি থেকে একখানা আখ টেনে নিয়ে ছুট দিলে কেমন হয়? আবার ভাবলে একখানা আখের দামই বা কি? বড়োজোর দুপয়সা। একখানা আখের রসে তার পেট কিছু ভরবে। সে কেন চুরি-ডাকাতি করতে যাবে? সঙ্গে খুচরো থাকলে সে পয়সা দিয়েই কিনত। ভাবলে চেয়েই দেখা যাক। গাড়ি দুখানা কাছে আসতেই সে প্রথম গাড়ির গাড়োয়ানকে বললে, “চাচা একখেন ‘কুসোর’ দেবে? ভারি খিদে লিগেছে।”

গাড়োয়ান বললেন, “বাড়ি যা -”

“–চাচা, বাড়িতেই যাচ্ছি। কিন্ত এখন তো গাড়ি নেই। হেঁটেই যাব।”

—“বাড়ি কনে?”

ভোম্বল অম্লান বদনে বললে, “খোলসাপুরে —ওই পশ্চিমে।”

গাড়োয়ান বললে, “এই সব ‘কুসোরের' মালিক আমরা লয় -”

ভোম্বল বললে, “–চাচা, একখেন দিলে খোদা তোমার ওপর খুশি হবে।”

গাড়োয়ান কী মনে করে বললে, “-পাতলা দেখে একখান টানে নে।”

ভোম্বল গাড়ির পিছনে গিয়ে একখানা কাজলা আখ ধরে টানতেই পিছনের গাড়ির গাড়োয়ান, ‘হেই ছ্যামড়া’ ধমক দিলে।

ভোম্বল বললে, “চাচা, চুরি করছি না, বলেই নিচ্ছি। তুমি জিজ্ঞেস করো।”

সে আখখানা নিয়ে হাঁটুতে লাগিয়ে মট করে ভেঙে আগার দিকটা বগলে চেপে ধরে গোড়ার দিকটা ছাড়িয়ে চিবতে লাগল। পেটে খিদের আগুনে ঠাণ্ডামিঠে রস পড়তেই শরীরে শক্তি, মনে উৎসাহ জাগাল। সে আবার রেললাইনের ওপর উঠে এসে আখ চিবতে চিবতে চলতে লাগল। খানিক দূরে যাবার পর পিছনে খররর খট খট, খররর খট খট শব্দ শুনে ভোম্বল ফিরে দ্যাখে একখানা ঠেলা ট্রলি আসছে। তাতে সাহেব পোশাক-পরা মাথায় শোলার টুপি একটি লোক কাঠের চেয়ারে ও দুটি লোক তার পায়ের কাছে বসে; আর দুটি লোক ট্রলি ঠেলছে। ট্রলিতে উড়ছে লাল নিশানা। শোলার টুপি মাথায় বসে ওভারসিয়ার কী ইঞ্জিনিয়ার কে জানে!

ভোম্বল লাইন থেকে নীচে নেমে তেমনি আখ চিবতে চিবতে চলল, ট্রলিখানাও তেমনি খররর খট খট খররর খট খট শব্দ করতে করতে তাকে ছাড়িয়ে চলে গেল এবং যে দুটো লোক ট্রলি ঠেলছিল তারা লাফ দিয়ে ট্রলিতে উঠে বসল৷

ট্রলি ছুটছে, ভোম্বল আবার লাইনে উঠে চলেছে, রোদের রং একটু যেন লালচে হয়েছে। খানিক পরেই ট্রলিখানা লাইনের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল। ওই বাঁকটা ঘুরলেই দূরে স্টেশন দেখা যায় -পাশেই খোলসাপুর। তার আগে একটা প্রায় শুকনো নদী বা জলস্রোত। তার ওপর ফুট চল্লিশের লম্বা ব্রিজ। ব্রিজটার দুপাশে খোলা, কাঠগুলো এক হাত অন্তর পাতা। তলায় এ সময় জল একরকম থাকেই না। ছোট-বড়ো পাথরগুলো বেরিয়ে থাকে। ভোম্বল অনেকদিন আগে একবার এসেছিল। স্টেশনটার দুপাশে গাঁ। গাঁয়ের পর খেত। জমিটা নাবাল। তাই খুব আমন ফলে। এখানে থেকেই শহরে যায় নানা রকমের আনাজ-পাতি। এইখান থেকেই ভোম্বলের দুই সহপাঠী তারিণী ও জব্বর আলি পড়তে যায় দুর্গাপুরে। ইস্কুলে ওরা হেঁটেই যাওয়া আসা করে। গাঁয়ের ওধার দিয়ে বড়ো রাস্তা চলে গেছে সেই আড়ঘাটা, গড়ানে, সতুডাঙা গ্রাম অবধি –যার নাম টানা আট ক্রোশ। সতুডাঙার পর পাকুড়খালির বিল। তার এপার-ওপার না কী দেখা যায় না। বিলের ধারে ধারে নলখাগড়া, পটপটি হোগলা, শ্যামাঘাস ও শোলাগাছের সবুজ পাড় বসানো। জব্বরের মামু ওই বিলে মাছ ধরতে যায়। জব্বর তার কাছে বিলটার গল্প শুনেছে। ওর চারধারে বসে কত রকমের মেছো পাখি, বুনো হাঁস।

মামু বলে “বিলটার পুবে মাঠের মধ্যে এখনও আছে একটা মস্ত বটগাছ। ওর তলা দিয়ে গেলে দেড় ক্রোশের মাথায় যাতায়াতের পথ গেছে সেই বাবুপুরের বাজারে। তারপর আরও দূরে সেই বসন্তখালির গঞ্জে, যেখানে ছিল রাজা সোনা রায়ের গড়। গড়ের এখন আর কিছু নেই। ইট-কাঠ-সব নিয়ে গেছে গাঁয়ের মানুষেরা। শোনা যায়, দু-এক ঘড়া মোহর, দু একটা বিষ্ণুমূর্তিও নাকি কেউ কেউ পেয়েছিল, আর গড়ের চারধারের মাটি চষবার সময় উঠেছিল অনেক মাথার খুলি। শাজাহাঁ বাদশার মনসবদার সবের খাঁ না রসিদ খাঁর সঙ্গে লড়াইয়ে সোনা রায় উতখাত হয়ে যায়। ওই সব মড়ার মাথার খুলি দু-পক্ষের ফৌজের। ওই বটতলায় সাধারণ লোকের বেশে বসে থাকত একদল ডাকাত! এ অনেক পরের কথা। তারা পথিকদের সব কেড়ে-কুড়ে নিয়ে মেরে বিলের হোগলারবনে পুঁতে রাখত। ওদের শায়েস্তা করে সদরের পুলিশ সাহেব।”

ভোম্বল মামুর এই সব কাহিনি ভাবতে ভাবতে আখ চিবতে চিবতে লাইনের ওপর দিয়ে হাঁটছে। আর সিকি মাইলের কিছু কম গেলে স্টেশন। কিন্তু তার আগে ওই পোলটা। সে পোলে উঠে প্রায় অর্ধেক পার হয়েছে। পিছনে যে একখানা মাল গাড়ি সিটি দিতে দিতে মাটি কাঁপিয়ে ছুটে আসছে তার খেয়াল নেই। লাইনের তারের বেড়ার ধারে কয়েকটা লোক মাঠে কাজ কয়েছিল। তারা ভোম্বলকে ওই অবস্থায় দেখে চিৎকার করতে লাগল। একজন ইঞ্জিনের বিপরীত দিকে দু হাত তুলে, পা ফাঁক করে দাঁড়াল।

হঠাৎ ভোম্বলের হুঁশ হল, বিপদ! সে ফিরে দ্যাখে ইঞ্জিনখানা ছুটে আসছে —রয়েছে পোল থেকে মাত্র হাত কুড়ি তফাতে। তারও সামনে পার হতে আর খান চারেক স্লিপার। জীবন ও মৃত্যু যেন ভোম্বলকে নিয়ে টানাটানি করতে লাগল। ইঞ্জিন চলার বেগ কমালেও ঝোঁক কমল না। এদিক-ওদিক থেকে লোকে চিৎকার করতে লাগল - ‘ছ্যামড়াটা গেল-গেল।’ ‘
হায় আল্লা!'

ভোম্বলও এক লাফে শেষ স্লিপারে উঠে, আর এক লাফে লাইন টপকে বাঁ ধারে পড়তেই ইঞ্জিনখানা তাকে ছাড়িয়ে চার-পাঁচ হাত তফাতে গিয়ে দাঁড়িয়ে যেন ভোঁস করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললে।

ভোম্বল এমন বেয়াকুফ জীবনে কখন হয়নি। তার বুক ঢিপঢিপ করছে, গা-হাত-পা কাঁপছে। সে লাইনের বাইরে গিয়ে স্টেশনের দিকে চলতে লাগল। ইঞ্জিন ড্রাইভার তাকে বিশ্রী ভাষায় গাল দিয়ে আবার ইঞ্জিন চালিয়ে দিলে। তার পাশ দিয়ে হুড়মুড় করে গাড়িখানা স্টেশনের দিকে চলল। স্টেশনে পৌঁছেও থামল না, চলে গেল।

খোলসাপুরের পর একটা ফ্ল্যাগ স্টেশন। তারপর কি, ভোম্বল জানে না, তারিণী ও জব্বর আলি হয়তো জানে। ও তাদের কাছ থেকে পরের গাঁয়ের পথ জেনে নিয়ে সেই পথে এগোতে থাকবে।

খোলসাপুরে অনেকদিন আগে একবার এলেও ভোম্বল গাঁখানা একরকম ভুলে গেছে। গাঁখানা বেশ ছিমছাম মনে হচ্ছে —পথগুলো যেন একটু চওড়া। বাড়িঘরগুলোর সামনে একটু করে জায়গা। কয়েকখানা বাড়ির সামনে বিচালির পালা, ধানের গোলা। এদিকে-ওদিকে খেজুর গাছগুলোর কোনও কোনওটার গলায় কলসি বাঁধা, কোনও কোনওটার চাঁছা গলা খালি। সেখানে রয়েছে রস পড়বার নল। দেখে মনে হছে যেন জিভ বার করে দাঁড়িয়ে আছে। ভোম্বল ঠিক করতে পারছে না, কোন দিকে তারিণী বা জব্বরের বাড়ি। তারিণীর বাবা ছুতোরের কাজ করেন। জব্বরের বাবা নাকি মশনে গাঁয়ে জোতদারের পেয়াদা।

ভোম্বলের মাথায় এক বুদ্ধি খেলে গেল। ছুতোরদের বার বাড়িতে কাঠ-কুটো র্যাদা পড়ে থাকা সম্ভব। ও তাই দেখে তারিণীর বাড়ি বার করবে। গাঁয়ে ঢুকে সে এদিকে ওদিকে তাকাতে তাকাতে চলল। আর মুসলমানের বাড়িতে তো মুরগি চরে। ভোম্বল চলেছে। নিঝুম গ্রাম চারধারে লতা-পাতা যেন জড়াজড়ি করে আছে। পথটাও এক জায়গায় ঘুরপাক দিয়ে তিন দিকে চলে গেছে। ওই যে কে যেন এক বোঝা কাঠ মাথায় এদিকে আসছে। জঙ্গলের আওতায় লোকটার কোমর অবধি দেখা যাচ্ছে। লোকটা এক-একবার গাছপালায় ঢাকা পড়ছে। ভোম্বল তাড়াতাড়ি তার দিকে এগিয়েই জিজ্ঞেস করলে, —“জব্বর আলি কোথায় থাকে?

লোকটা বললে, “কোন জব্বর –ঢ্যাঙা না খোঁচা?”

ভোম্বল ফাঁপরে পড়ল। সে বললে, “মানে ইসকুলে পড়ে?”

লোকটা বললে, “দুডোই ছাত্র।”

ভোম্বল বললে, “বড়ো ইসকুলে, মানে দুর্গাপুরে।”

—“ও! রফিক মিয়ার ছাওয়াল? এই পথে সোজা গিয়ে ডাইনে বাঁক নেয়ে পুষ্করিণীর পাড়ে” - বলে লোকটা চলে গেল।

কিন্তু পুকুর পাড় অবধি যাবার আগেই বাঁকের মুখে দেখা তারিণীর সঙ্গে। দুজনেই দুজনকে দেখে অবাক ও খুশি। তারিণী বললে, “কী রে ভূপে, তুই এখানে?”

ভোম্বল বললে, “কলকাতা যাচ্ছি।”

—“হেটে?”

—“হুঁ।”

তারিণী বললে, “ইয়ার্কি রাখ। আমাদের গাঁয়ে তোর কে আছে?”

ভোম্বল বললে, “আমার দুই ক্লাস ফ্রেন্ড - তারিণী আর জব্বর।”

—“বুঝলাম, বেড়াতে এয়েছিস। চ, আমাদের বাড়ি। পাঁচটার গাড়িতে ফিরে যাস।”

—“জব্বর আলি নেই।”

—“সে গেছে তার ফুফুর বাড়ি হাটপুরে। তোর সব বই কেনা হয়েছে?”

ভোম্বল ঘাড় নাড়ল।

— “কবে কিনবি?”

ভোম্বল উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলে — “এখান থেকে হেঁটে কলকাতায় যাওয়া যায়?”

—“কাউকে তো যেতে শুনিনি। ওঃ! আবার এবার বুঝলাম সেবারের মতো বাড়ি থেকে পালিয়েছিস। কেন পালিয়েছিস? মার খেয়েছিস?”

ভোম্বল ঘাড় নাড়ল।

—“তবে?”

ভোম্বলের ঘনিষ্ঠ সাথী বা বন্ধু কেউ নেই। বাড়ি থেকে চলে আসার কারণটা তার কাছে বলতে প্রথমটা কেমন বাধল।

তারিণী বললে, “চ, আমাদের বাড়ি। আমার বাবা গেছে গোয়ারী, দাদা গেছে হুগলী। বাড়িতে কেবল আমার ছোটো বোন, ছোটো ভাই, মা আর আমি। কাল তো ইস্কুল খুলবে। জব্বরও আসবে। আমরা তিনজনে এখান থেকে পৌনে দশটার গাড়িতে যাব। আজ আমাদের বাড়িতে থাক্—”

ভোম্বল যেতে যেতে বললে, “আমি আর বাড়ি ফিরে যাব না। যাচ্ছি টাটানগর। তোর জিতেনকে মনে পড়ে?”

—“হ্যাঁ – হ্যাঁ।”

—“সে আছে সেখানে৷”

—“সেখানে কী করবি?”

—“কারখানায় কাজ শিখব!”

তারিণী পড়াশুনোয় ভালো নয়, কোনো রকমে প্রমোশন পায়, কিন্তু ছেলেটার হাতের কাজে খুব উৎসাহ। বললে, —“আমারও যেতে ইচ্ছে করে! কিন্তু সাহস হয় না।”

কথা কইতে কইতে দুজনে তারিণীদের বাড়ি এল। কাঁচা বাড়ি। মাত্র দুখানি ঘড়। আশ-পাশে সব বাড়িই প্রায় একরকম। গ্রামখানিতে গাছপালা ও কিছু কম। রেলরাস্তার ধারের গ্রামগুলোই এই রকম। ছোটো ছোটো বাঁশঝাড়, কলার ঝাড়, আম-কাঁঠাল-জামরুল-লিচুর গাছ এদিকে-ওদিকে ছড়ানো। তার মধ্যে কলকে, করবী, টগর, শিউলির ঝাড়। কোথাও নিম, বেল, সজনে সদর্পে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। যে দুএকখানা কোঠা দেখা যাচ্ছে সেগুলো পুরোনো-ছাদের কোণে, আলসেয় বট অশ্বত্থের চারা, কার্নিসের তলায় বন-পায়রার বাসা। কোথা থেকে যেন খোল ও গানের আওয়াজ আসছিল। তারিণী বললে, “রাম মুখুজ্জের বাড়িতে অষ্টপ্রহর হচ্ছে -ওই যে পুকুরের ওপারে একতলা কোঠা, এধারে মানের ঝাড়, পেঁপে গাছ, লাউমাচা, ওই বাড়ি। লোকটার অনেক পয়সা।”

কিন্তু কারো ধন-দৌলতের কথা শুনলে ভোম্বলের একটু আগ্রহ নেই। সে কান পেতে শুনছে, পদকীর্তনের অল্প অল্প ভেসে আসা মিঠে সুর। দুএকটা কথাও কানে ঢুকছে।

‘নিকটে চরায়ো ধেনু, বাজায়ো মোহন বেণু

আমি যেন ঘরে বসে শুনি -’

আর খোল বাজছে - টঙাটঙ ঘুম ঘুম -

এসব গানের সুর তার মনে গিয়ে অবিরাম বেজে চলে। দু-দিন তিন দিন এমনি ভাবে থাকে।

তারিণী বললে, “ও বাড়িতে গ্রামের অনেক লোক খিচুড়ি খাবে—”

ভোম্বল বললে, “তোমাদেরও নেমন্তন্ন?”

তারিণী বললে, “আমরা কী কাঙালি? বাবা বলে, গতরে খেটে পয়সা আনি। বড়ো মানুষের খোশামোদ করবো কেন? আমরা ঘোঁটও পাকাই না, শয়তানদের সাথে স্যাঙাতিও করি না।”

কিন্তু ভোম্বলের এসব কথা শুনতে ভালো লাগছিল না। সে হঠাৎ বললে, “তোমাদের গাঁয়ে খাবারের দোকান নেই?”

তারিণী বললে, “এ কী শহর? কেন, তোর খিদে লেগেছে? আমার মা মুড়ি ভাজে, চিঁড়ে কোটে। গাছে কাঁচা লংকা, ঘরে আড়া-পেঁয়াজও আছে। তুই বোস্”- বলে বারান্দায় পাতা বড়ো জলচৌকিখানা দেখিয়ে ভেতরে চলে গেল।

ভোম্বলের কিন্তু ভালো লাগল না। সে বুঝতে পারলে, তারিণী গেল মুড়ি আনতে। তারিণী আসবার আগেই এল তার ভাইবোন আধময়লা জামা-কাপড় পরে চোখে কৌতুহল, ভয় ও সংকোচ নিয়ে দুজনে উঠোন থেকে ভোম্বলকে উঁকি দিয়ে দেখেই বাড়ির ভেতরে সরে গেল, এল ছোটো ধামিতে আউশে মুড়ি, আদা কুচি ও বাতাসা নিয়ে তারিণী। বললে, —“ধর, জল আনছি।”

ভোম্বল খুশিমনে ধামিটা নিয়ে সাগ্রহে মুড়ি চিবতে লাগল। সেই বুড়ির বাড়ির মুড়ির মতোই মিষ্টি ও মশমশে।

তারিণী এক ফেরো জল এনে বললে, “আমাদের চাষের আদা। মা মুড়কিও তৈরি করে। এ বার খুব অসুখ করেছিল বলে পারেনি।”

ভোম্বল বললে, “এখান থেকে রেলে কলকাতার ভাড়া কত জানিস?”

তারিণী বললে, “খেয়ে নে। স্টেশনে গিয়ে জেনে আসব।”

খানিক পরে দুজনে স্টেশনে গেল। ছোটো স্টেশনে। মেল বা মালগাড়ি দাঁড়ায় না দাঁড়ায় প্যাসেঞ্জার ও মিক্সড। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তখন কোনো গাড়িই আসবার কথা নয়। এই সব স্টেশনে গাড়ি আসবার আগে আলো জ্বালার ব্যবস্থা, গাড়ি চলে গেলে আলো নিবিয়ে দেওয়া হয়। তখন যে অন্ধকার সেই অন্ধকার। স্টেশনের পয়েণ্টসম্যান ও পোর্টাররা প্ল্যাটফরমের ওধারে রেল কোয়ার্টাসের সামনে ইঞ্জিন থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা কয়লা পোড়াচ্ছিল। তাতে আগুন পোহানো ও কোক কয়লা তৈরি করা, দুটি কাজই হচ্ছে। যাত্রী বসার শেড ফাঁকা, টিকিট দেওয়ার ঘুলঘুলিও বন্ধ। একটা ভিখারি শেডের তলায় মেঝেয় ছেঁড়া চট বিছিয়ে ছেঁড়া কাঁথা গায়ে জড়িয়ে বসে বিড়ি টানছে আর কাশছে। একজন পয়েন্টম্যান, গায়ে কম্বলের লম্বা জামা, মাথায় ও কানে কমফরটারের মতো করে ময়লা কাপড় জড়িয়ে হাতে গার্ডবাতি নিয়ে প্ল্যাটফরমের ইট বাঁধানো কিনারা দিয়ে জুতো খট-খট কড়তে করতে লাইনের পয়েন্টের ও সিগন্যালের মাথায় জ্বালতে যেতে যেতে একটু গলা ছেড়েই গাইছে, ‘রামা হো-’” স্টেশন-ঘরে মস্ত টেবিলের ধারে জ্বলছে মস্ত কাচের শেডে কেরোসিনের ল্যাম্প। সন্ধ্যা থেকে স্টেশনের কর্তা হয়েছেন সহকারী স্টেশন-মাস্টারমশাই। বনাতের কালো কোট-প্যান্টালুনস পরে ঝাঁপের মতো মস্ত খাতা খুলে চেয়ারে বসে কী যেন লিখছেন। টেবিলের এক ধারে গায়ে মাথায় আলোয়ান জড়িয়ে একজন চেয়ারে বসে তাঁকে কী সব বলছে। আর সহ-মাস্টারমশাই খাতা থেকে চোখ না তুলেই বলছেন, ‘হুঁ। হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ।’

স্টেশনের চারধারের মশা, দু-চারটে জোনাকিও ঘরে ঢুকছে; আর, কোণে গর্তে, খাঁজে খাঁজে ঘুরঘুরে, উইচিংড়ি, ঝিঁঝি তো আছেই। সকলেই নিজ নিজ কর্তব্য পালন করছে। একটানা শব্দ হচ্ছে চাঁ-ই-ই-ই।

তারিণী মাস্টারমশাইয়ের কাছে সোজা গিয়ে জিজ্ঞেস করলে, “স্যার, কলকাতার ভাড়া কত?”

ভোম্বল সাহসী ও সপ্রতিভ হলেও তারিণীর সাহসে নিজেকে ছোটো মনে করলে। মাস্টারমশাই আলো-আঁধারি কাটিয়ে তারিণীর মুখের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে বললেন, “তোর সঙ্গে কে?”

—“আমার ক্লাস ফ্রেন্ড।”

এবার ভোম্বল বুঝলে তারিণীর সাহসের মূলে আগের চেনা-জানা।

মাস্টারমশাই বললেন, “ওকে তো আগে দেখিনি। কোথায় থাকে?”

—“ওই আগের স্টেশনে।”

—“ভর সন্ধেয় বাড়ি ছেড়ে এখানে যে? পালিয়েছে নাকি?”

সেই লোকটি এবার বললে, “আজকালকার ছেলেরা ওই রকমের হয়েছে। আমার এক শালা পালিয়ে গিয়েছিল একেবারে সেই কাশী। তার এক মেসো সে সময়ে তীর্থ করতে গিয়েছিলেন ওখানে। তিনি দশাশ্বমেধ ঘাটে নাইতে গিয়ে দেখেন, শ্রীমান ঘাটের ধারে বসে রাম-পেসাদী গাইছেন! লোকে শুনছেও, পয়সাও দিচ্ছে! তিনি ওকে কিছু না বলে বাড়িতে টেলিগ্রাম করে লোক নিয়ে গিয়ে ধরে আনেন। শ্রীমান না কী সন্ন্যাসী হতে গিয়েছিলেন। আমরাও তো মশাই ছোটো ছিলাম। এসব বিদকুটে ফন্দিফরাজ মাথায় আসত না। আরে বাবা! লেখাপড়া শিখে রোজগারপাতি করে সংসার কর। তা না। যত সব কুবুদ্ধি। আজকাল আবার হয়েছে - স্বদেশি। ওতে কী হচ্ছে? এখন মন্দটাই বা কী আছিস? যত সব! বলে তিনি নড়ে-চড়ে বসলেন।”

মাস্টারমশাই হাঁকলেন, “এই বুলাকি-বুলাকি-এই-”

দূর থেকে উত্তর এল, ‘আওতানি, হুজুর-।’


ভোম্বল তারিণীর কানে কানে বললে, ‘কী মতলবে ডাকছে রে?’


তৎক্ষণাৎ দুজনে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। যেতে যেতে শুনতে পেল মাস্টারমশাই বলছেন, ‘ওই মহিম মিস্ত্রীর ছেলে।’

তারিণী বললে, “আবার অন্ধকারে ঢিল চালাব।”

ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, “কেন?”

তারিণী বললে, “জব্বর, পচা, সুরেশ, আমি টিকিট না কেটে রেলে যাওয়া-আসা করতাম। একদিন উনি আমাদের ধরেন। আমরা বলি, ‘পাড়ার ছেলে। টিকিট কাটব কেন?’


উনি বললে, ‘রেলগাড়ির চলার পথের দুধারে পাড়া। পাড়ার লোকেই রেলে চলে। সব পাড়াপড়শিই যদি তোমাদের মতো পাড়া সম্পর্কে রেলের ভাড়া গ্যাঁড়া দেয় তাহলে গাড়ি চলবে কী করে?’


আমরা বলি, ‘আমরা ইস্কুলের ছাত্র।’


উনি বললে, ‘ইস্কুলের ছাত্ররা কী মাইনে দেয় না? তাদের খাওয়া-পরার সামগ্রী বাজারে বিনে পয়সায় পায়?’


এই রকম সব আজে-বাজে কথা বলে আমাদের পুলিশের হাতে দেয় আর কি! আমরাও কয়েকদিন আঁধারি চালিয়েছিলাম। আবার কোনদিন কী হয়।”

ভোম্বল সে রাতে তারিণীদের বাড়িতে কোনো রকমে কাটিয়ে একটু বেলা উঠলে তারিণীর মাকে প্রণাম করে রেলপথ ধরেই চলতে লাগল পশ্চিমে।

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%