খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ছোট স্টেশন।
প্ল্যাটফর্মের প্রায় মাঝামাঝি একখানা ছোট খড়ের ঘর, তার বেড়া চাটাইয়ের। গায়ে ছোট একটি জানলা। তার তলার দিকে কাঠের ঘুল-ঘুলির ভেতর দিয়ে হাত গলিয়ে যাত্রীরা টিকিট কেনে। বেড়ার গায়ে আলকাতরা দিয়ে ও প্ল্যাটফরমের দুই মাথায় বোর্ডে ইংরেজী ও বাঙলায় বড় বড় কালো হরফে লেখা-শালুকডাঙ্গা।
ততক্ষণে রোদের তেজ বেশ বেড়েছে!
ভোম্বল চারধারে তাকিয়ে দেখলো শালুকফুল তো দূরের কথা, কোথাও একটা পুকুরও নেই। কেবল দিকে দিকে জলে ভরা আমনের ক্ষেত, ধানের কচি শিষ ও পাতাগুলো বাতাসে খেলা করছে। মধ্যখানে একটি উঁচু জায়গায় একখানা গাঁ; জল থেকে পা গুটিয়ে যেন জড়সড় হয়ে বসে রয়েছে। ষ্টেশন থেকে একটা কাঁচাপাকা রাস্তা সাপের মতো একেবেঁকে গাঁয়ের মাঝে দিয়ে চলে গেছে সেই পুবে— অনেক দূরে। রাস্তাটার দু'পাশে বড় বড় ঝাঁকড়া গাছ, ঠিক যেন এক একটা ছাতা বসানো।
ষ্টেশন থেকে ছইয়ে ঢাকা একখানা গরুর গাড়ি যাচ্ছিল গাঁয়ের দিকে। ছইয়ের পিছন দিকটা একখানা ডোরাকাটা আধময়লা চাদরে ঢাকা—মাঝে মাঝে একটু ফাঁক হচ্ছে। বোধহয়, ভেতরে কোন বউ আছে।
হঠাৎ একখানা বাইসিকল গাঁয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। যে বাইসিকল চালাচ্ছে, তার মাথায় সাদা পাগড়ি, গায়ে কালো কোট। সে গরুর গাড়িখানার সামনে এসেই ঘণ্টা বাজালো—টিঙ -টিঙ, টিঙ-টিঙ।

গরু দুটো বাইসিকল দেখে হঠাৎ ভড়কে গিয়ে বড় বড় চোখ বার করে রাস্তা থেকে ধানক্ষেতের মধ্যে নেমে দিলে দৌড়। ভোম্বল হাসি আর চাপতে পারে না। গরু দুটো লেজ তুলে ছুটতে ছুটতে এক একবার মাথা নিচু করে জোয়াল খোলার চেষ্টা করে; কিন্তু লম্বা শিঙ জোড়ায় আটকে যায়—পারে না। শেষে অনেক চেষ্টা ও কষ্টের পর গরু দুটো বাগে এলো; গাড়িখানা ক্ষেতের জলকাদার মধ্য দিয়ে কিছুদূর গিয়ে আবার রাস্তায় উঠে চলতে লাগলো।
ষ্টেশনের ও-ধারে প্রকাণ্ড এক অশ্বত্থ গাছ। তার তলায় একখান ময়রার দোকান।
ভোম্বল রেল-লাইন পার হয়ে দোকানের সামনে গিয়ে দেখে ময়রার পো মাথা নিচু করে মেঝেয় পাতা চাটাইয়ে বাতাসা কাটছে। ভোম্বলের দিকে ফিরেও তাকালো না। ভোম্বলের পেট তখন ক্ষিদের জ্বলছে। গরম গুড়ের গন্ধে তার জিভে জল এলো; কিন্তু রাস্তার দিকে তাকিয়েই তার আক্কেল গুড়ুম! বাইসিকল আরোহী ততক্ষণে তার কাছে এসে পড়েছে। আরে! এ যে চক্রবর্তী-মশায়ের ছোট ভাই—ষষ্ঠি খুড়ো। ষষ্ঠি খুড়ো ঠিকাদারি করে বেড়ান। খুড়ো নিশ্চয় তাকে দেখেছেন। তবু সে ছুটে দোকানের পিছন দিকে পালালো। ভয়ে তার বুক টিপ, টিপ, করছে।
দোকানের পিছনে ঘন ভাঁটজঙ্গল ও কচুবন। তার মধ্যে গোটা কয়েক জলবিছুটির গাছও ছিল। একটার পাতা ভোম্বলের পায়ে লেগে গেল। ইঃ! পা-খানা বেজায় কুট কুট করছে। সে জায়গাটা চুলকোতে চুলকোতে দোকানের বেড়া ঘেঁষে দাঁড়ালো।
পিছনে জলে ভরা আমনের ক্ষেত— দোকানের সামনে দিয়ে রাস্তা ফাঁকা৷ পালাবারও উপায় নেই। তবুও সে একবার ভাবলো ক্ষেতের মধ্যে নেমে যায়। কিন্তু জ্বলে মযে-জোঁকও থাকতে পারে। একটা যদি পায়ে লাগে তো রক্ষা নেই। তার চেয়ে সেখানে দাঁড়িয়েই দেখা যাক, খুড়ো কী করেন!
সে আঙুল দিয়ে চাটাইয়ের বেড়া একটু ফাঁক করে সেই ফাঁকে একটা চোখ রেখে দেখলো—খুড়ো বাইসিলখানা দোকানের সামনে ঝাঁপের তলায় পাতা বেঞ্চির গায়ে হেলান দিয়ে রাখলেন।
দোকানি এবার মাথা তুলে দেখলো; দেখেই বললে,–“পেন্নাম হই, দা’ ঠাকুর।”
ষষ্ঠী খুড়ো বেঞ্চির একধারে বসে বললেন,—“মাখোন, এক ছিলিম তামুক খাওয়া তো—”
দোকানি অমনি হাঁক দিলে—“ওরে! মাদোব-মাদো—ও—ও—ব! ছোঁড়াটা থাকে থাকে, আর পালায়। কেবল ইষ্টিশনে গিয়ে বসে থাকে—”
খুড়ো বললেন,—“আরে! এই তো এখানে দাঁড়িয়েছিল দেখলাম।”
ভোম্বল খিল খিল করে হাসলো। খুড়ো তাকে মাধব ঠাওরেছেন। মাখন বললে,—“আমিও যেন দেখলাম। আচ্ছা, আমিই হাত ধুয়ে দিচ্ছি।”
খুড়ো 'আচ্ছা' বলে কোটের পকেট থেকে একখানা কালো ডাইরি আর তার পুটে আটকানো মাথায় নিকেলের টুপি-পরা একটি কপিং পেনসিল টেনে নিয়ে ডাইরির পাতা ওলটাতে লাগলেন।
তাঁর মুখ অন্যদিকে। ভোম্বল দেখলো, এই সুযোগ। সে ঘরের পিছন থেকে সরে গিয়ে রাস্তায় উঠেই গাঁয়ের দিকে দিলে ছুট।
ছুট ছুট। ভোম্বল ছোটে আর পিছন ফিরে তাকায়। দেখে, ষষ্ঠীখুড়ো কী করছেন। খুড়ো তখনও তেমনি ভাবে বসে আছেন। কিন্তু যদি হঠাৎ ঘাড় তুলে, মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকান! একবার ঐ পথের বাঁকে বড় ঝোপটার আড়ালে গিয়ে পড়তে পারলে হয়। কিন্তু বাঁকটাও কাছে নয়। ছুটতে ছুটতে তার দম বন্ধ হবার মতো হলো। আর কয়েক
কদম।
ব্যাস! সে এসে পড়েছে।
ঝোপটার হাত কতক তফাতে একটা কাঁঠাল গাছ। ভোম্বল তার তলায় বসে হাঁফাতে লাগলো। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ। একটু জল পেলে ভাল হোত। কিন্তু কোথায় খাবার জল? দুপাশে ধান-ক্ষেতে যে রয়েছে তা খেলে নিশ্চয় অসুখ করবে। গাঁখানা সেখান থেকে তখনও আধ-মাইলটাক তফাতে। তবে তার এধারে যেন পথের পাশে একখানা ঘর দেখা যায়। ঘরখানার খড়ের চাল দিয়ে অল্প অল্প ধোঁয়া উঠছে।
ততক্ষণে রোদ বেশ খরখরে হয়ে উঠেছে। শরতের রোদ গায়ে বেঁধে, মাথা পোড়ায়, আবার তাতে মনও কেমন করে। ভোম্বল ওপর পানে তাকিয়ে দেখলো, আকাশে সাদা-কালো মেঘ, যেন পাল পাল রাঁজহাস ডানা ছড়িয়ে দূরে কোথায় উড়ে চলেছে। গাঁয়ের ওপর দিয়ে, ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে পথে তার গায়ে-মাথায়ও তাদের কোমল সচল ছায়া আরাম বুলিয়ে যাচ্ছে।
সে ষষ্ঠীখুড়োর ভয়ে ঝোপের কোলে কোলে সেই ঘরখানার দিকে এগোতে লাগলো।
সেখানে পৌঁছে দেখে, সেটা একটা কামারশালা। হঠর, ভর ভর -হঠর ভরর ভরর, করে হাপর চলছে; আর, চুল্লীর আগুন সাপের মতো চার-পাঁচটা লকলকে লাল ফণা তুলে শব্দ করছে—সোঁ, সোঁ। কর্মকার লাঙলের ফলা, কাস্তে ও হেঁসে গড়ছে। তার কাছাকাছি দু-তিনটি চাষী উবু হয়ে বসে দেখছে। ভোম্বলের অনেক দিনের ইচ্ছে, সে একখানা বেশ বড় ছুরি তৈরি করে। ছুরিখানা এমন ধারালো হবে যে, আঙুল ঠেকালেই কুচ করে কেটে যাবে। কিন্তু সে কর্মকারকে ছুরির কথা না বলে, বললে,—“একটু জল খাওয়াবে গো?”

লোকটার মাথায় একখানা ময়লা, তেলচিটে ন্যাড়া টুপির মতো জড়িয়ে পিছনে ছোট খোঁপার মতো পুটলি পাকানো। পরণের কাপড়খানা ময়লা, কালো ঝুল, গায়ের রঙও পোড়া লোহার মতো—কিন্তু শরীর বেশ বলিষ্ঠ। লোকটা একখানা কাস্তে সাঁড়াশি দিয়ে ধরে আগুনে পোড়াতে পোড়াতে চোখ তুলে দেখলো। সে ভোম্বলকে কোনদিনও দেখেনি। তার খুব আশ্চর্য বোধ হলো; জিজ্ঞেস করলে, –“তোমার বাড়ি কোথায়?”
ভোম্বল বললে,—“দুর্গাপুর।”
— “দুগগোপুর? সে আবার কোথায়?”
ভোম্বল পিছন দিকে আঙুল তুলে বললে,—“ওই দিকে। বড় তেষ্টা পেয়েছে। আগে একটু জল দাও।”
“জল?” বলে কর্মকার বার দুই এদিক-ওদিক তাকালো। তারপর কাস্তেখানা আগুনের ওপর রেখে চাষীদের একজনকে বললে,—“হাপর টানো৷ তিষ্টার জল দিতেই হয়।” এবং ঘরের কোণে ওঠে গিয়ে, একটা মেটে কলসী থেকে ছোট ঘটিতে জল গড়াতে লাগলো। কলসী, ঘটি আর তার মালিকের চেহারা দেখলে, সে জল খেতে আর ইচ্ছে হয় না। কিন্তু তৃষ্ণার সময়ে সেই জলেই বরফ দেওয়া জলের মতো তার প্রাণ জুড়িয়ে গেল। জল খেয়ে ভোম্বল আর দাঁড়ালো না, গাঁয়ের দিকে চলতে লাগলো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন