পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

স্টেজ বাঁধা প্রায় সারা হয়ে এসেছিল। সামনে চিতোর দুর্গের দৃশ্যপট। ঐ যে দু'পাশে ছোট ছোট পাহাড়। তার মাঝ দিয়ে চলে গেছে নির্জন পার্বত্যপথ। একটি পাহাড়ের মাথায় রয়েছে একটি দুর্গ। তার শিরে উড়ছে নিশান। দৃশ্যটি ভোম্বলকে নিয়ে গেল, কয়েক শো বছরের ওপারে সেই সেকালের চিতোরে। সবাই দৃশ্যটির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। মনে মনে কী ভাবচে কে জানে!

ভোম্বল চিতোর থেকে ফিরে এল স্টেজের সামনে। স্টেজের ওপর যারা ঘোরা-ফেরা করছিল, তারা সবাই ব্যস্ত, সবাই কর্তা, সবায়েরই মুখে ও চালে ভারিক্কী ভাব।

একজন স্টেজ থেকে তড়াক করে লাফ দিয়ে সামনে নেমে স্টেজের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “সিনথানা হেলে রয়েছে। কোথায় আটকাচ্ছে দেখ। যত সব আনাড়ী নিয়ে কাজ! সব সিন ফেল—” বলতে বলতে সে দু'হাতে ভর দিয়ে এক লাফে স্টেজে উঠে গেল।

ঠিক তখনই উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে দড়ি গোটাতে গোটাতে একজন বলে উঠল “ফুটলাইট আছে। হুঁশ নেই?”

—“সে খেয়াল আছে—” বলে লোকটি তাড়াতাড়ি চিতোর দুর্গের দড়ি ধরে টানতে লাগল। তাতে দুর্গের একটি পাশ গুটিয়ে যেতে লাগল। অমনি ওপাশ থেকে একজন বলে উঠল, “করছো কি? সিনখানা ছিঁড়েবে যে! সব তাতেই সর্দারি।”

—“হোলড ইওর টং। মুখ সামলে কথা বল—” বলে লোকটি তাকে ধমক দিলে।

তৎক্ষণাৎ উত্তর হল, “বি কেয়ারফুল! আই অ্যাম নট ইওর সারভ্যান্ট।”

কিন্তু লড়াই জমে উঠবার আগেই নায়েবমশাই ডাক্তারবাবুর সঙ্গে সেখানে এসে দাঁড়ালেন; স্টেজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যে বাঁধা শেষ। ওহে অমৃত, কখন প্লে শুরু হবে?”

দু’জন যোদ্ধাই তাড়াতাড়ি স্টেজের সামনে এগিয়ে এসে নায়েবমশাইকে সবিনয়ে নমস্কার করলে এবং দু'জনেই একসঙ্গে বলে উঠল, “আজ্ঞে, আরতির পরে।”

—“হাঁ। ঠিক পরেই আরম্ভ কর। সন্ধিপুজোর আগেই শেষ করা চাই। পারবে তো?” বলে নায়েবমশাই প্রতিমার দিকে তাকালেন।

তারা দু'জনেই একসঙ্গে উত্তর দিলে, “আজ্ঞে হাঁ। সন্ধিপুজো তো রাত দু'টোয়। তার আগেই—”

তাদের উত্তর শেষ হবার আগেই নায়েবমশাই ডাক্তারবাবুকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন। সেই যোদ্ধা দু'জনও উইংসের আড়ালে অদৃশ্য হল। ভোম্বল দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, এরা দু'জনই কি ‘অ্যাক্টর'? যখন স্টেজে আসবে তখন আর ওদের চেনাই যাবে না, যেন শুঁয়াপোকা প্রজাপতি হয়ে গেছে। আচ্ছা, ওদের একজন যদি প্রতাপসিংহ ও অপরজন যদি শক্তসিংহ সাজে, স্টেজের ওপরেই লেগে যাবে সত্যিকারের লড়াই!

ভোম্বল সেখান থেকে একটু ফাঁকার দিকে গেল। তারপর এল ঢাকীদের কাছে। সেখানে সকালের সেই ছেলেটা আরও কয়েকটি ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে কিসের যেন প্রতীক্ষা করছিল। ভোম্বল কিন্তু তাদের দেখেও দেখলে না। সে চলল সামনের পথটি ধরে।

বেলা ডুবে গেছে। পথের পাশে বাঁশতলার ছায়া হয়ে এসেছে কালো। চারধার থেকে উঠচে স্যাঁৎসেঁতে গরম ভাপ। বাতাস স্থির। চলতে চলতে ভোম্বলের কোথাও লাগছে না ঠাণ্ডা, কোথায়ও একটু গরম। পথ দিয়ে কত পুরুষ, কত স্ত্রীলোক, কত ছেলে-মেয়ে আসছে ঠাকুর দেখতে। কেউ কেউ বলছে, “ঠিয়েটর হবে। ঠিয়েটর দেখেছিস্ কোন দিন? পরী সেজে লাচবে।”

ভোম্বল মনে মনে হেসে বললে, “এরা একদম গেঁয়ো ভূত—”

চলতে চলতে বারোয়ারিতলা থেকে সে এত দূরে গিয়ে পড়ল যে, সেখানকার গোলমাল আর শুনতে পেল না। পথে পথিকও কেউ নেই। চারধারে ঝি ঝি ও ঘুরঘুরে পোকার চিৎকার। অষ্টমীর সদ্য ওঠা জ্যোৎস্নায় পথের দু'পাশে বড় বড় গাছের ছেঁড়া ছায়ায় সব আলো-আঁধারী। গাছপালার গায়ে, পাতায় জোনাকি পিট-পিট করছে। হঠাৎ একটা পেঁচা মাথার ওপর ডানা ঝটপট করে ডেকে উঠল। একটা বাদুড় উড়ে এসে একটা গাছের ডালে বসল আর একটা শেয়াল পথের এপার থেকে ওপারে ছুটে গেল।

ডানধারে শোনা গেল শাঁখের আওয়াজ। ভোম্বল সেদিকে তাকিয়ে দেখে, গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটি মিটমিটে আলো চলেছে। হাত কয়েক গিয়েই পরিষ্কার দেখলে, একটি বউ তুলসীতলায় সেই আলোটি রাখল। ভোম্বল বুঝতে পারলে, সেটি প্রদীপ। বউটির মুখে লেগেছে প্রদীপের আভা। প্রদীপটি রেখে গলায় আঁচল দিয়ে সে তুলসীতলায় গড় হয়ে প্রণাম করল।

ভোম্বল আরও খানিক যেতেই হঠাৎ তার বাঁ-ধারে কে মোটা গলায় হেঁকে উঠল, “কে যায়?”

ভোম্বল উত্তর দিলে না, তেমনি চলতে লাগল।

লোকটি আবার বললে, “কথা কও না যে? কে যায়?”

ভোম্বল এবারও উত্তর দিলে না। পথ দিয়ে যার খুশি সে চলবে। ওর তাতে কি? ওর কাছে নাম বলে চলতে হবে না কি?

লোকটি আবার বললে, “তুমি বোবা না ঠসা? কথা কও না ক্যান?”

ভোম্বল রাগে ফেটে পড়তে পড়তে সামলে নিয়ে একটু চেঁচিয়ে বললে, “তোমার তাতে কি?”

—“আমার তাতে কি? এ কি মগের মুলুক? একরত্তি ছোঁড়াও চোখ গরম করবে? জানো, কার জায়গা দিয়ে হাঁটছ?” বলতে বলতে একটা লোক লাঠি হাতে ভোম্বলের সামনে এসে দাঁড়াল।

জায়গাটা জ্যোৎস্নায় আলো হয়ে আছে। ভোম্বল দেখলে, লোকটা যে লম্বা-চওড়া তা নয়, তবে তার শরীর বেশ মজবুত। তার খালি গা, খালি পা, মাথায় লম্বা চুল, মুখে অল্প গোঁফ-দাড়ি, গায়ের রঙ কালো।

সে মাটিতে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে আবার বললে, “আর এক পাও এগোতি পারবা না।” এবং লাঠিখানির দু’মুড়ো দু'হাতে ধরে পা ফাঁক করে পথ আগলে দাঁড়িয়ে রইল।

ভোম্বল এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললে, “কেন? এ কি তোমার জায়গা? সরকারী রাস্তা। পথ না ছাড়লে নায়েবমশাইকে বলে তোমার দফারফা করব। আমি তাঁর ভাইপো—”

লোকটাকে কথাগুলো বলেই ভোম্বলের মনে হল, তার হার হয়েছে। পরাস্ত করতে সে তার কাকার দোহাই দিলে?

ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে আলো হাতে আসছিল একটা লোক। সে কাছে আসবার আগেই ঐ লোকটি বললে, “ফিরে যাও। যাও ফিরে—”

কথাগুলো সে বললে থিয়েটারী ঢঙে। ইতিমধ্যে আলো হাতে লোকটি ভোম্বলদের একেবারে সামনে এসে বললে, “কি রে পাগলা? কার পথ আগলাচ্ছিস? আরে! এ যে দা'বাবু। আপনি পাগলাপাড়ায় কেন? চলেন—চলেন—”

যে লোকটা পথ আগলে ছিল, সে হঠাৎ হা হা করে হেসে উঠল। তারপরেই লোকটা তর্জনী নাচিয়ে, চোখ পাকিয়ে, মাথা ঝাঁকিয়ে বললে “আজ ছেড়ে দিলাম। আবার যদি কখনও দেখি—”

কিন্তু কথাগুলো শেষ না করেই আবার হা— হা করে হাসতে লাগল।

যে আলো হাতে এসে দাঁড়িয়েছিল, সে স্বরূপ। সে ভোম্বলের হাত ধরে তাকে একরকম টানতে টানতে নিয়ে যেতে যেতে বললে, “দা’বাবু, বারোয়ারিতলা ছেঁড়ে এদিকে এই রাতের বেলা ক্যান আলেন? বাবু শুনলে ভারী রাগ করবেন। রাতবিরেতে একা এ রকম ঘুরবেন না। আপনাদের দুর্গাপুর শহর নয়। এই পাগলাপাড়া আর ওদিকে উত্তরে দরগাবাড়ি জাগাটা খারাপ।”

ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, “ও কি সত্যি পাগল?”

—“ও তিনপুরুষে পাগল। ওই শুনুন—” একটা কান্নার মতো শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বলে স্বরূপ থমকে দাঁড়াল।

ভোম্বল বললে, “ও তো শেয়ালের কান্না।”

—“শেয়ালের কান্না নয় – শেয়ালের কান্না নয়, দা'বাবু। ও শব্দ উঠে আসছে দরগাবাড়ির মাটির তলা থেকে। রাতের বেলা চার প্রহরে চারবার শোনা যায়—”

—“রোজ রাতে?”

—“হুঁ।”

—“কৈ, কাল তো শুনি নি?”

—“এদিকে এসেছিলেন নাকি?”

—“না। কে কাঁদে স্বরূপ?”

—“সে কেউ জানে না। নানা লোকে নানা কথা বলে। রাতের বেলা সে গল্প থাক। যদি ইচ্ছে হয়, কারো সঙ্গে কাল দিনের বেলা এসে দরগাটা দেখে আসবেন"

—“না, তুমি বল। তোমাকে বলতেই হবে। কে কাঁদে—?”

—“আমার বাড়ি পুবের গাঁয়ে। এখান থেকে চার কোশ। আমার পিসীর কাছে ছোটবেলায় ঐ দরগার গল্প শুনেছিলাম। ঐ দরগাটা কবে তৈরি হয়েছিল, কেউ জানে না। জ্ঞান হওয়া ইস্তক সবাই দেখেচে, দরগাটার ঐ অবস্থা। ভাঙা-চোরা, চারধারে কয়েকটা বুড়ো গাছ -নিম, বট, বেল। মাঝখানে একটা পুষ্করিণী। পুষ্করিণীর জল লাল, পৈঠাগুলো ফেটে, ভেঙে বসে গেছে। উত্তরপাড়ে পাঁচ-ছটা কবর, পুবের পাড়ে মসজিদ, পশ্চিম ও আর দক্ষিণ পাড়ে জঙ্গল। দুপুরে ওর গাছের ছায়ায় কখনও কখনও দু’-একটা গরু-ছাগল ঘুমোয়। রাতের বেলা কেউ ওদিকে যায় না, দুপুরেও একা যেতে গা ছম্‌ছম্ করে। দরগার ঐ দক্ষিণ পাড়ে জঙ্গলে একটা ভাঙা বাড়ির— কিন্তু এসব শুনে কী হবে?”

ভোম্বল বললে, “তোমাকে বলতেই হবে—না হলে আমি যাব না—”

স্বরূপ বললে, “আমি দরগাটা দু’দিন দেখেছি। ঐ পাগলার ঠাকুরদা ছিল মির্জা সাহেবের বরকন্দাজ। তখন এই গাঁয়ে এসে ঐ পাগলাপাড়ার উত্তরের দীঘির ধারে বসত করেছে। আগে সে থাকত মধুগঞ্জে। ভারী জোয়ান মরদ লোক ছিল। একদিন পথ দিয়ে আসতে আসতে দরগার কান্না শুনে তখনই ব্যাপারটা দেখতে যায়। রাত নিশুতি। চাঁদের আলোয় সব ফুটফুট করছে। গিয়ে দেখে, পুষ্করিণীর ভাঙা পৈঠায় বসে এক বিবি কাঁদছে আর বুক চাপড়াচ্ছে। তার মাথায় ঝলমলে ওড়না, পায়ে জরির জুতো, পাঁচ আঙুলে হীরের আংটি, গলায় মুক্তোর মালা, পরনে রেশমী শালোয়ার, গায়ে সলমাচুমকি বসানো রাঙা পিরেন। পৈঠায় শুয়ে একটি ফুটফুটে ছেলে। ছেলেটার গলা কাটা। রক্তের স্রোত পৈঠা বেয়ে টপ টপ করে পড়ছে পুষ্করিণীর জলে। তাই দেখে, লোকটা সাহস করে বিবিকে জিজ্ঞেস করে, সে কেন কাঁদচে। ঐ ছেলেটা তার কে? কে তাকে খুন করেছে? কিন্তু এক লহমায় সব মিলিয়ে যায়। ঐ দরগায় তখন থাকত এক বুড়ো ফকির। সে কারো সঙ্গে কথা কইত না। সে পাগলার ঠাকুরদার হাত ধরে তাকে বাড়ি রেখে যায়। লোকটা তখন পাগল হয়ে গেছে। সে কেবল বলে, ‘কি দেখলাম – কি দেখলাম! হায় আল্লা—।’ সে যতকাল বেঁচেছিল, সন্ধ্যা হলে কেবল ঐ কথা বলত। এই আমরা বারোয়ারিতলায় এসে পড়লাম।”

ভোম্বল গল্পটি শুনতে শুনতে প্রথমে কেমন অভিভূত হয়ে পড়েছিল। বারোয়ারিতলার আলো ও লোকজন তাকে সচেতন ও নির্ভর করে দিলে। সে বললে, “আচ্ছা স্বরূপ, পাগলার ঠাকুরদা যদি দেখেই পাগল হয়ে গিয়ে থাকে, তা হলে সে যা দেখেছিল তা গুছিয়ে লোকের কাছে বললে কি করে?”

স্বরূপ বললে, “পাগল কি এক রকমের হয়? ঐ যে বাবু। ওনার কাছে বলবেন না যেন, ওদিকে গিয়েছিলেন।”

ভোম্বল চুপ করে রইল, কিন্তু তার মাথায় ঘুরতে লাগল দরগার কাহিনী। দরগাটা সে দেখবেই।

এদিকে আরতি শেষ হয়ে গেল। তখন বারোয়ারিতলা লোকে লোকারণ্য। রঙ্গমঞ্চের সামনে সতরঞ্জি, পাটি ও চাটাই পড়েছে, তার পিছনে কয়েকখানি বেঞ্চি ও চেয়ার। আরতি শেষ হতে না হতে সব ঠেলাঠেলি, হুড়োহুড়ি করতে করতে যে যেখানে পারছে বসে পড়ছে। সবাই যেতে চায় সামনে। চেয়ার-বেঞ্চিগুলো দখল করলে ছেলের দল। ভোম্বল কোথাও বসল না; সে জানে, সে বসবে নায়েবমশাইয়ের পাশে চেয়ারে। তাকে ঠেলা দিয়ে কয়েকটা ছেলে বসবার জন্যে ছুটে-গেল। সে একধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে সেই সিনখানির দিকে তাকিয়ে রইল।

তার পাশে দাঁড়িয়ে দু'টি যুবক সিগারেট টানতে টানতে নিজেদের মধ্যে খাটো গলায় কি যেন আলোচনা করছিল। ভোম্বল তাদের চিনতে পারলে। তারা দু'জনে সেই তখন রিহার্সালের ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল।

একজন বললে, “সবাই বসে তো গেল। এখন প্লে হবে কিনা তার ঠিক নেই। তুই ঠিক বলছিস সুরেশ?”

অপরজন বললে, “এতে ভুল হবার কি আছে? ভবানীটা দাঁড়াতেই পারবে না তো স্টেজে অ্যাকটিং করবে কি করে? শেষে একটা কেলেঙ্কারী করে বসল?”

—“এখন রাণা প্রতাপের পার্ট করবে কে? মাতাল হবার আর সময় পেল না? নায়েবমশাই শুনেছেন?”

—“বোধ হয়।”

—“তবে মজাটা জমবে ভালো।”

—“তার আগে পিঠ বাঁচে কিনা দেখ। আমি তো এখনই কান্তিনগরে পগার পার হচ্ছি—”

—“ইয়ার্কি নাকি? ঠ্যাঙানিটা কেবল আমাদের ওপর দিয়েই যাবে? সে হবে না। ঐ যে নায়েবমশাই। যতীশরা ওঁকে বোধহয় সব বলছে। চল—চল্‌–”

ভোম্বলও তাদের সঙ্গে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। নায়েমশাইয়ের চারধারে লোক জমে উঠচে।

নায়েবমশাই বলছিলেন, “চরমাদারীপুরের নাম ডোবালে তোমরা? এই যে সব লোক থিয়েটার দেখবে বলে বসে আছে, এদের মধ্যে কেউ কেউ চার-পাঁচ ক্রোশ ভেঙে এসেছে, এরাই বা কি বলবে?”

যতীশ বললে, “আমাদের কি দোষ? ভবানীর এই রকম স্বভাব বলে আমরা সারাদিন ওকে আগলে রেখেছিলাম। সন্ধ্যেবেলা ‘বাড়ি থেকে আসচি' বলে সে এই কাণ্ড করে বসেছে। এখন একেবারে বে-হুঁশ! গ্রীনরুমে উপুড় হয়ে পড়ে আছে—”

নায়েবমশাই বললেন “আর কেউ রাণা প্রতাপের পার্ট প্লে করতে পারে না?”

সুরেশ বললে, “এদিকে ও রকম আর কেউ নেই। এক পারেন চিটেঝুড়ি গাঁয়ের মোহনবাবু। তিনি এখানে তাঁর বোনের বাড়ি এসেছিলেন, কিন্তু বিকেলেই চলে গেছেন।”

নায়েবমশাই বললেন, “ও! সেই মোহন? আমাদের দুর্গাপুরের চক্রবর্তী মশাইয়ের মেয়ে পদ্মর বর? তাকে তো এখন আনা যাবে না। যেতে-আসতে যার নাম সেই রাত দু'টো—তাকে আমিও বিকেলে সাইকেলে যেতে দেখেছি। এখন কি করা যায়? রাতও হচ্ছে ; ওরে মহেশ, একবার ঈশ্বরকে ডেকে আনতে পারিস?”

মহেশ বললে, “ঈশ্বরদা এখানেই আছে হুজুর। ঐ যে। ঈশ্বরদা—”

ভোম্বল দেখলে, একটি আধবুড়ো, রোগা, কালো, বেঁটে লোক ডাক শুনে ফিরে দাঁড়াল। মহেশ তাকে হাতছানি দিয়ে বলল, “এদিকে এস। বাবু ডাকছেন।”

লোকটি তাড়াতাড়ি তাদের দিকে আসতে লাগল। তার গায়ে বোতাম-আঁটা সাদা নতুন গেঞ্জি, কাঁধে লাল গামছা, পায়ে ময়লা সাদা ক্যামবিসের জুতো, মুখে একমুখ কাঁচা-পাকা গোঁফ, মাথায় টেরি। সে নায়েমশাইয়ের সামনে এসে হাতজোড় করে মাথা নুইয়ে নমস্কার করে একটু ভাঙা ও ধরা গলায় বললে, “হুজুর, ডাকছেন?”

নায়েবমশাই বললেন, “ঈশ্বর, ছোকরাবাবুরা তো চরমাদারীপুরের নাম ডোবাতে বসেছে—”

ঈশ্বর বললে, “হুজুর, আমি টের পেয়েচি। আগেই তা আঁচ করেছিলাম। গুরু শিখিয়েছিলেন, 'যে রসেই ডোব বাবা, বুদ্ধিটাকে এককাঠি ওপরে রেখো।’ কিন্তুক,—এখন আমি কি করতে পারি?”

ভোম্বল ঈশ্বরের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তার নাকে কেমন একটা বিশ্রী গন্ধ লাগল।

নায়েমশাই বললেন, “তোমার কথায় তা বুঝতে পারছি। এখন তোমায় একটি কাজ করতে হবে। তোমার জন্যেই চরমাদারীপুরের এত নাম। দশ-বিশখানা গাঁয়ের লোক তোমার সুখ্যাতি করে। তোমায় এখনই পুতুল-নাচ লাগাতে হবে।”

ঈশ্বরের লাল চোখ দু'টো যেন আরও লাল এবং আরও বড় হয়ে উঠল। বললে, “হুজুর এখন কোথায় কাকে পাই? পালা বাঁধবার মতো পুতুলও তো নেই। সব গেছে সেই ছিরিগঞ্জে দত্তবাবুদের বাড়ি। তিন রাত পালা হবে। আমিও যেতাম। যাই নি কেবল বাবুদের তামাশা একটু দেখবার ইচ্ছে।”

নায়েবমশাই এবার একটু কড়া সুরে বললেন, “সবই বুঝলাম। এখন পুতুল নিয়ে এসো। জুড়িদের ডাকো। এই মহেশ সবাইকে বলে দে—পুতুল নাচ হবে। কেউ যেন না যায়। যাও হে ঈশ্বর। ভালো কথা, পালা কি?”

ঈশ্বর মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললে, “বড় পালা তো জুড়বার উপায় নেই। পালা লাগাতেই যার নাম রাত দশটা। আপনার হুকুম যেমন করে পারি তামিল করবই। তবে হুজুর, গরীব আমি। যেন মারা না যাই। কাল যাব সেই ছিরিগঞ্জ। বুড়ো হয়ে গেছি। এত-কি আর পারি? দু'টো টাকা পেলে যারা আছে তাদের চারধার থেকে ডেকে-ডুকে জড় করি। ওরে লটবর তুই ঝপ করে ট্যাঙরা আর নোশোকে ডেকে নিয়ে আয়। আমি বাজারটা একবার ঘুরে এলাম বলে—” বলে ঈশ্বর হাত পাতল।

নায়েবমশাই দু’টি টাকা দিয়ে বললেন, “তুমিও যেন রসে তলিয়ে যেও না।”

“না হুজুর! গুরু বল—” বলতে বলতে ঈশ্বর কয়েক পা এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে বললে “পালাটা হবে ‘বনগমন'। আমরা এলাম বলে।”

ভোম্বল ভাবতে লাগল, কার বনগমন? পঞ্চপাণ্ডবের না রামের? রামেরই হবে। পঞ্চপাণ্ডবের বনগমনের জন্যে কেউ তো দুঃখ করে না। রামের—রামেরই বনগমন।

নায়েমশাই বললেন, “ভোম্বল, চল খেয়ে-দেয়ে আসবি। পালা জুড়তে রাত হবে।”

ভোম্বল বললে, “এখন ক্ষিদে পায় নি।”

নায়েবমশাই বললেন, “বাড়ি যেতে যেতেই ক্ষিদে পাবে। এখানে থাক। আমার সঙ্গে যাবি—” বলে তিনি তাড়াতাড়ি আর একদিকে চলে গেলেন।

ভোম্বলের মাথায় আবার এল সেই দরগার কথা। দরগাটা যেন তাকে টানতে লাগল। যদি কোন সঙ্গী পেত তা হলে, সে এখনই একবার জায়গাটা দেখে আসত।

একটু পরেই এল লাঠি ও লণ্ঠন হাতে সেই হিন্দুস্থানী চাকরটা। নায়েবমশাইও এলেন তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এবং তৎক্ষণাৎ বাড়ি চললেন। ভোম্বল যেতে যেতে কান খাড়া করে রইল, যদি দরগার কান্না শোনা যায়। কিন্তু খানিক দূর যেতেই বাঁশঝাড়ের তলা থেকে ডেকে উঠল এক পাল শিয়াল; আর তাদের ভেঙচি কাটতে লাগল, কয়েকটা কুকুর।

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%