চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

সেই গাঁয়েই তার রাতখানা কেটে গেল।

শরতের সকাল। সোনালি রোদে চণ্ডীমণ্ডপের সারা আঙিনা মাখিয়ে গেছে। তার এককোণে শিশির ভেজা শিউলীতলার পাশে চেনা স্থরে সানাই বাজছিল—‘গা ভোল, গা তোল, বাঁধো মা কুন্তল—’

ছেলেরা নতুন পোশাক পরে বাজনাদারদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে। ভোম্বলও তাদের মাঝে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। জায়গাটি ছেঁড়ে তার কোথাও যেতে মন চাইছে না।

সে মনে মনে ঠিক করলে, পুজো শেষ হয়ে গেলে আবার টাটানগরের পথ ধরবে। এই তো রাস্তা। এ কটা দিন এখানেই কাটাবে।

দুপুরে সে একমুঠো ভাত খেতে পেলো। আঁচিয়ে কাপড়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে চণ্ডীমণ্ডপের ধারে এসে দেখে, ওধারে পদ্মদিদির বর দাঁড়িয়ে। তাঁর পিছনে তকমা আঁটা এক পিয়াদা। তিনি কর্মকর্তার সঙ্গে কী বিষয়ে যেন কথা কইছেন। ভোম্বলের মনে হলো তারই কথা। সে চট করে চণ্ডীমণ্ডপের পিছনে সরে গেল।

তারপর এক গৃহস্থবাড়ির কলাবাগানের বেড়া ডিঙিয়ে বাগানের মধ্যে প'ড়ে—এক ছুটে বাগান পার হয়ে গেল। সামনে গোয়াল। তারপর একখানা খড়ের চালা। তার পিছনে ধানের গোলা। ভোম্বল এসবও পার হলো। ঐ যে রাস্তা, রাস্তায় উঠে সে দিলে ছুট।

ছুটতে ছুটতে গাঁয়ের বাইরে গিয়ে পিছন ফিরে দেখলে, কেউ আসছে কিন।। যারা আসছিল, তার সব অচেনা। ভোম্বলকে ছুটতে দেখে অবাক।

এদিককার পথটা ভাল নয় —কাঁচা-পাকা। গরুরগাড়ি চলাচলে দু'পাশে খাল, মাঝে উঁচু হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে জুলি—এক্ষেতে ওক্ষেতে জল যাবার জন্যে চাষীরা বোধহয় কেটেছে। এখন সব শুকনো। কেবল রাস্তার নিচে দু'পাশে মাটিকাটা খালে জল। তাতে কলমী-হিঞ্চের বন, দু-চারটি শালুকও আছে। কুলবরাবর শাতি-শুষনি ও থানকুনী বিছিয়ে আছে। এখানে ওখানে বক বসে। জলে পানকৌড়ি ডুব-সাঁতার কাটছে। খালের পাড়ে একটা বেলগাছের মাথায় একটা নীলকণ্ঠ পাখি উড়ে এসে বসলো। ভোম্বল হাতজোড় করে পাখিটাকে নমস্কার করতে করতে মনে মনে বললে, —“যেন ধরা না পড়ি।” পাখিটা কিন্তু হঠাৎ ক্যারর করে ডেকে উঠেই উড়ে গেল।

তা’তে ভোম্বলের ভয় হলো সে পিছন ফিরে দেখলে, পদ্মদিদির বর আসছেন কিনা। তাকেই ধরবার জন্যে তিনি বোধহয় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর ভোম্বলকে ধরেছেন! তার খোঁজ পাবেন সেই টাটানগরের লোহার কারখানায়।

এর পরই তো রেললাইন। কিন্তু সামনে একখানা গাঁ দেখা যাচ্ছে না? হাওড় কোথায়? চারধারে তাকিয়ে দেখলে। হাওড় তো দূরের কথা একটা পুকুরও দেখা যাচ্ছে না? কেবল ক্ষেতগুলো ছড়িয়ে আছে। ওগুলোর শেষে ঐ গাঁ। বোধহয় ঐ গাঁয়েরই ওধারে হাওড়; তারপর রেললাইন।

এদিকে বেলা পড়ে এলো। পশ্চিম দিকটায় আকাশকোলে সোনা ছড়িয়ে যাচ্ছে! ক্ষেতের মধ্য দিয়ে একপাল গরু লেজ নাড়তে নাড়তে গাঁয়ের দিকে চলেছে। পালের পিছনে চলেছে কয়েকটা রাখাল। পাখিরা বাসার দিকে উড়ে চলেছে। একটু পরেই নামবে সন্ধ্যা। পথে দু'চারজনের সঙ্গে দেখা হলো। কিন্তু ভোম্বল তাদের কারুকে আর রেল-লাইন বা সামনের গাঁয়ের নাম জিজ্ঞেস করলে না।

সে খুব তাড়াতাড়ি হাঁটছিল। তবু সন্ধ্যার আগে গাঁয়ে পৌঁছতে পারলে না। পথেই সাঁঝের তারাটি ফুটলো, চাঁদ উঠলো। সপ্তমীর চাঁদ; অল্প জ্যোৎস্না—খালের বুকে পড়ে চিক্ চিক্ করছে। পথের ওপর গাছের লম্বা ও ছেঁড়া ছেঁড়া ছায়া। সামনে ছায়ের আলো দেখা যাচ্ছে। যেন ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে না! তাই। তো এ গাঁয়েও তবে পুজো হয়?

ভোম্বল এবার ছুটলো। নিশ্চয় আরতি হচ্ছে। আওয়াজটা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে একসঙ্গে অনেকগুলো ঢাক বাজছে। হাঁ, ঐ তো বাজছে,–‘লাক চড়াচচড়, লাক চড়াচচড় গিদ। গিদা—'

আর বেশি দূর নয়—পথ ফুরিয়ে এলো। ভোম্বল গাঁয়ে ঢুকলো। বাঁ দিক থেকে ঢাকের আওয়াজ আসছে—আলোর ছটা দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি বউ, গোটা কয়েক ছেলে-মেয়ে কলরব করতে করতে ঐদিকেই যাচ্ছে। ভোম্বল তাদের পিছন পিছন চললো।

সে ঠিকই চলেছে। ঐ তো মণ্ডপ। আলোর আলো-গ্যাসের আলো জ্বলছে; জ্বলছে ঝুলন্ত আলো। বাঃ। মস্ত প্রতিমা। আরতি আরম্ভ হয়ে গেছে। পুরুত দু'হাতে দুটো বড় বড় ধুনুচি নিয়ে আরতি করছে। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় সব ধোঁয়া—প্রতিমা ঢাকা পড়েছে। ভোম্বল ছুটতে ছুটতে ভিড় ঠেলে প্রতিমার একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ইচ্ছে ছিল আরও কাছে যায়। কিন্তু সামনেটা মোটা বাঁশ দিয়ে আটকানো। ঐ যে ঐদিকটা ফাঁকা। সেখান থেকে সরে এসে চত্বর ঘুরে, সে যেই সেদিকে যেতে যাবে অমনি সামনে থেকে কে যেন খপ করে তার হাত দুটো চেপে ধরলে, ধরেই বললে,—“ভোমলা—ভোম্বল!” ভোম্বল চমকে উঠে লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে—তার কাকা!

তার কাকা এবার তাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরলেন। আর তার পালাবার উপায় নেই। সে টাটানগর যেতে যেতে চরামাদারিপুরের কাছারি বাড়িতে এসে পড়েছে!

খবরটা সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে গেল- নায়েবমশাইয়ের ভাই-পোকে পাওয়া গেছে।

পিয়াদারা ঢাকীদের বললে,—“জোরে বাজা, পাবি খাজা, হবে মজা।”

ঢাকীরা অমনি মহানন্দে তাঁদের দু'জনের চারধারে ঘুরে ঘুরে, হলে দুলে বাজাতে শুরু করে দিলে—'চাট্টা ঢানা চট্টো ঢাট্টা চানা ঢটে ঢাক—’

ডোম্বোলের দু'চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। সে শুনতে লাগলো ঢাকগুলো যেন বলছে, — 'টট্টা নগর ফস্কে গেল—টাট্টা নগর ফস্কে গেল— আর কাঁসিটা তাদের পিছন পিছন খ্যানখেনে গলায় বলছে,—টম্বোল দাদা, টম্বোল টম্বোল দাদা—'

তারপর?

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%