খগেন্দ্রনাথ মিত্র
সেই অনেক দিন আগের কথার বাকিটুকু আবার অনেক দিন পরে বলছি।
ভোম্বল না জেনে এসে পড়েছে চরমাদারীপুরের কাছারি বাড়ির বারোয়ারিতলায়। আবার, যাঁর ভয়ে সে দেশছাড়া, ধরা পড়েছে ঠিক তাঁরই হাতে। কিন্তু তিনি তাকে মারলেন না, বকলেন না, কেন সে ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে শেষে চরমাদারীপুরে এসে পড়েছে, তাও জানতে চাইলেন না, কেবল তার হাত ধরে ভিড়ের ভেতর দিয়ে তাকে একরকম টেনে নিয়ে চললেন।
বারোয়ারিতলা থেকে বেরিয়ে তাঁরা পড়লেন গ্রামের সরু কাঁচা অন্ধকার পথে। ভোম্বলদের আগে আগে লন্ঠন হাতে, মাটিতে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে চলেছে এক পিয়াদা। পথটির দুপাশে কাঁটানটে, কালকাসুন্দি, কচু ও ভাঁটঝোপ। তার তলায় সাপ-খোপ থাকতে পারে। লাঠির শব্দে সে না-কি সরে যাবে, তাই পিয়াদাটি লাঠি ঠুকছে। কিন্তু একটা ব্যাং হঠাৎ ডানপাশের ঝোপের তোলা থেকে এক লাফে বেরিয়ে এসে ভোম্বলের আগে আগে লাফিয়ে চলল এবং এক জায়গায় গিয়ে চুপচাপ বসে রইল। ভোম্বল লন্ঠনের আলোয় দেখতে পেল তার গলার দু পাশ ঘন ঘন ফুলছে, চোখ দুটো একবার চকচক করে উঠল। ভোম্বলরা তার কাছে গিয়ে পড়তেই সে বাঁ-পাশের ঝোপের দিকে লাফ দিলে এবং ভোম্বলের খালি পায়ের ওপর এসে পড়ল। ভোম্বল ঘৃণায় পা ছুড়ে তাকে ফেলে দেবার আগেই সে এক লাফে বাঁ দিকের ঝোপে ঢুকে গেল। কিন্তু ভিজে গাঁয়ের স্পর্শে ভোম্বলের গা ঘিনঘিন করতে লাগল।
নায়েবমশাই তার কাঁধে একটি ছোট ঠেলা দিয়ে বললেন, “ভাল করে দেখে চল।”
কিন্তু ভোম্বল তো দেখেই চলচে! ব্যাঙটা তার পায়ের ওপর এসে পড়ল তো সে কি করবে? তার মন দুঃখে ভার হয়ে আছে।
নায়েবমশাই মানে তার কাকা থাকেন সরকারী বাড়িতে। বারোয়ারিতলা থেকে বাড়িখানি বেশ কিছু তফাতে। ভোম্বল চলতে চলতে এদিকওদিক তাকাতে লাগল। কিন্তু সপ্তমীর চাঁদের আলো ও রাতের অন্ধকার মিলে-মিশে সব ঢেকে রেখেচে। সে পরিষ্কার কিছুই দেখতে পেল না। ঝাঁক ঝাঁক জোনাকি-বসানো অন্ধকারভরা গাছগুলো স্থির হয়ে আছে কেবল এইটুকুমাত্র দেখতে পেল। বারোয়ারিতলা থেকে ঢাক-কাঁসির আওয়াজ আসছিল। কাঁসি যেন এবার তাকে বিদ্রূপ করছে –“ভোম্বল দাদা-লম্বা ঠ্যাঙা।" আর ঢাকগুলো একসঙ্গে বলছে, “ধর্ ধর ধর ধর্।
কিন্তু ভোম্বলের চোখের জল শুকিয়ে গেছে।
বাড়ি পৌঁছে পিয়াদা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। নায়েবমশাই তাকে নিয়ে ঢুকলেন তার পিছন পিছন।
উঠোনে পা রাখতেই ভোম্বলের নাকে এল শিউলির ভিজে গন্ধ। ডান ধারে একখানি ছোট ঘরে দেখা যাচ্ছিল আলো; তার খানিক ঘরখানির বারান্দায় এসে পড়েছিল। ভিতরে একবার কাঁসির শব্দ হল। কিন্তু তার মধ্যে কি হচ্ছে, জানবার আগেই সে নায়েবমশাইয়ের সঙ্গে উঠল বাঁ-ধারে বড় খড়ের ঘরখানির দাওয়ায়। ঘরখানিতে তালা দেওয়া ছিল। নায়েবমশাই এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে চাবির গোছা বার করে তালা খুললেন। শিকলটা কপাটের গায়ে ঝন্ করে আছড়ে পড়ল৷
নায়েবমশাইয়ের পিছন পিছন ঘরে ঢুকে ভোম্বল দেখলে, বাঁশের আড়া থেকে একগাছি তারে ঝুলছে একটি পুরনো হারিকেন। হারিকেনটি উস্কে দিতে দিতে নায়েবমশাই পিয়াদাটিকে বললেন, “স্বরূপ, কুয়ো থেকে জল তুলে দে।”
স্বরূপ হারিকেন হাতে চলে গেল।
তিনি ভোম্বলকে বললেন, “ভোম্বল, কুয়োতলা থেকে হাত-পা ধুয়ে এস। ঐ যে বাঁশের আলনায় গামছা ঝুলছে; আর, ঐ মাচার তলায় রয়েছে খড়ম। নিয়ে যাও—”
ভোম্বল গামছা ও খড়ম নিয়ে কুয়োতলায় গিয়ে দাঁড়াল। বাঁধানো কুয়ো। একধারে একটি মোটা গুঁড়ির ওপর হারিকেনটি রেখে স্বরূপ বালতি করে জল তুলছিল। হারিকেনটি ছিল একটু কাত হয়ে। তাই পলতের এক্কার থেকে সরু কালো জিভের মতো একটি শিখা উঠে বিপরীত দিকে চিমনির গা মেন চেটে কালো করে ফেলচে। ভোম্বল হারিকেনটা তুলে ঠিক করে গুঁড়ির ওপর বসালো। কিন্তু গোল গুড়ি; হারিকেনটি বসল না, গুঁড়ি থেকে উল্টে জল-কাদায় পড়ে দপ্ করে জ্বলে উঠে, নিবে গেল।
হারিকেন পড়ার শব্দে নায়েবমশাই ঘর থেকে হাঁক দিলেন, “বেটা, ওটাকেও ভাঙলি? গাঁজা টেনে সব একাকার দেখচ?”
স্বরূপ ভোম্বলকে বললে, “দেখুন তো কি লটখটি বাধালেন! এখন কি ‘কৈফেৎ’ দি?”
ভোম্বল বললে, “ঠিক করে বসাতে গিয়ে পড়ে গেল তো কি করব?”
উত্তরে স্বরূপ বিড়বিড় করে কি যেন বললে, ভোম্বল বুঝতে পারলে না।
ফিকে জ্যোৎস্নামাখা চারধারের দৃশ্য তার বড় ভাল পাগল। হাত-মুখ ধুয়ে খড়ম পায়ে ঘরে ঢুকে দেখে নায়েবমশাই তক্তাপোশে হুঁকো টানচেন। তাঁর পাশে একখানি ধোপার বাড়ির কালাপেড়ে ধুতি ও একখানি ভাঁজ করা সিল্কের চাদর।
ভোম্বল যেতেই তিনি বললেন, “পরনের ময়লা কাপড়খানা ছেড়ে আমার এই কাপড়খানা পরে চাদরখানা উপস্থিত গায়ে জড়াও। কাল সকালে বাজারে গিয়ে যা-হয় ব্যবস্থা করা যাবে। কৈ রে হারাণে—”
—“আজ্ঞে এই যে!” বলে একটি কালো, রোগা, ঢ্যাঙা লোক ধরে ঢুকল। তার মাথার চুলগুলো কুঁচির মতো খাড়া, মুখে খোঁচা খোঁচা গোঁফ-দাড়ি, গায়ে গেঞ্জি, পরনে কোরা ধুতি, হাতে একটি কলাপাতার মোড়ক।
সে মোড়কটি ভোম্বলের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললে, “নেন দা’বাবু। জল আনচি।”
ভোম্বল কাপড়খানি কোন রকমে গুছিয়ে পরে, চাদরখানি গায়ে জড়িয়ে মোড়কটি হাতে নিয়েই দেখে, ভারী ও নরম। খুলে দেখে খানিকটা গরম কাঁচাগোল্লা ও দু'খানি রাঘবসাই। সে দু’টিও সবে পাক থেকে নেমেচে। গরম ছানা, রস ও কচি কলপাতার মিশ্র সুবাসে ভোম্বল আর ক্ষিধে সামলাতে পারলে না। তার জিভে জল এল।
বেড়ার ধারে হাতলভাঙা তেলচিটে চেয়ারখানি দেখিয়ে নায়েবমশাই বললেন, “কাপড়ে-চোপড়ে রস ফেল না, ঐ চেয়ারে বসে খাও।”
ভোম্বল চেয়ারে বসতে বসতে এক খাবলা কাঁচাগোল্লা মুখে পুরে চিবোতে লাগল। গরম কাঁচাগোল্লা চিবোতে ভারী আরাম! দাঁতে দাঁতে ঘষে খস্ খস্ মজার শব্দ হয়।
হারাণ ততক্ষণে একটি কাঁসার গেলাসে জল নিয়ে এল। ভোম্বলেরও খেতে দেরি হল না। কিন্তু পাতাখানির ওপর তার মায়া হতে লাগল।
নায়েমশাই বললেন, “পাতাখানা জানালা গলিয়ে ফেলে দাও।”
ভোম্বলের এতক্ষণে হুশ হল, তার মাথার ওপর একটি জাফরিকাটা জানালা আছে। বাইরের দিকে তোলা রয়েছে তার চাটাইয়ের ছোট ঝাঁপ খানি! সে জানলা গলিয়ে পাতা ফেলে দিয়ে হারাণের হাত থেকে গেলাসটি নিয়ে বাইরে হাত ধুতে গেল। হাত-মুখ ধুয়ে এক ঢোক জল খেয়ে গেলাসটি আবার হারাণের হাতে দিয়ে কোঁচার খুঁটে হাত-মুখ মুছতে গিয়েই মনে পড়ল কাপড়খানি তার কাকার।
চেয়ারের পিঠে সে ভিজে গামছাখানি রেখেছিল। তাতে হাত-মুখ মুছে আলনায় তুলে রেখে চেয়ারখানিতে আবার বসতেই নায়েবমশাই গলা খাঁকারি দিলেন। অমনি ভোম্বলের বুক কেঁপে উঠল। তামাকের গন্ধটা বোধ হতে লাগল বড় উগ্র। তিনি ভোম্বলকে গুরুতর কিছু বলবার অর্থাৎ তার দোষ-ত্রুটি বিচার করবার আগে এই রকম গলা খাঁকারি দিয়ে নেন। এমন ব্যাপার বহুবার ঘটেছে। তার দোষ ছাড়া আর কিছু তাঁদের কারো চোখে পড়ে নি। ভোম্বল প্রতীক্ষায় রইল।
ততক্ষণে ঢাক-কাঁসির আওয়াজ থেমে গেছে সব নিঝুম। কিন্তু চালের বাতায়, ঘরের কোণে, ঝোপে-ঝাড়ে অবিরাম ঝিঝি ডাকছে। বাঁশের মাচায় কালো পোরটম্যানটোর ওপর টাইমর্পিসটা করছে টক্-টক্ টক্-টক্ যেন সময়-নদীতে দাঁড় টেনে চলেছে। কাছে কোথাও বোধ হয় পুকুর আছে। না-হলে এমন পাল্লা দিয়ে ব্যাঙগুলো ডাকবে কেন? কুয়োর ধার থেকে পাঁকের, বাড়ির বাইরে থেকে গাছপালার বুনো ও কোথা থেকে যেন শিউলির ভিজে গন্ধ এসে নাকে লাগছে না। ভোম্বল চেয়ারে তেমনি কাঠ হয়ে বসে আছে। কিন্তু নায়েবমশাই আবার একমনে হুঁকো টানতে লাগলেন। তবে এবার বেশীক্ষণ টানলেন না, হারাণকে ডেকে হুঁকোটা তার হাতে দিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে ভোম্বলকে বললেন, “খেতে রাত হবে। ততক্ষণ একটু ঘুমিয়ে নাও। আমি ওদিকটা একবার দেখে আসি।”
নায়েবমশাই চটি চট্ চট্ করতে করতে বারান্দা থেকে নামলেন। উঠোনে নেমে বললেন, “হারাণে, এখানে থাক। এই স্বরূপ, আলোটা ভেঙেচিস ? এটা কোনটা?”
স্বরূপ গলার স্বর নামিয়ে উত্তর দিলে, “সেইটেই। গুঁড়ির ওপর কাৎ হয়ে গিয়েছিল। নোকসান হয় নি। খারাপ তেল। তাই ‘চিপনিতে’ কালি পড়েছে। ঐ বসন্তর দোকানের তেল। বেটা রোজ ঠকায়। বললে শোনে না।
নায়েবমশাই বললেন, “বটে! আচ্ছা।”
তারপর আর তাঁদের গলা শোনা গেল না। হাই তোলার শব্দে ভোম্বল পিছন ফিরে দেখে হারাণে দরজার বাইরে একখানি চাটাই পাতচে। ভোম্বলও উঠে দাঁড়িয়ে পিছনের সেই জানালাটি দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলে। অন্ধকার। জ্যোৎস্না সরে গেছে। জোনাকির ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটি আলো দুলতে দুলতে চলে গেল। কাছেই কোথায় কুকুর ডেকে উঠল।
হারাণে বললে, “দা’বাবু, শুয়ে পড়েন। আমি বাইরে আছি। ভয় নেই।” বলে সে বাইরে থেকে দরজাটি ভেজিয়ে দিলে এবং একটু পরেই খাটোগলায় গান ধরলে—
“বল রসনা হরে,
বহুদিন তোমারে
করেচি যতন—”
ভোম্বল দুর্গাপুরে থাকতে, বিশেষ করে গরমকালে নিশীথে অনেকবার গানটি শুনেছে। গানটির কথাগুলো তার ভালো লাগে না। কিন্তু সুরটি তার মন স্পর্শ করে। শুনলেই মনে হয়, গায়ক অতি দুঃখে কাঁদছে। হারাণের গলা বেশ মিঠে। ও বোধহয় যাত্রার দলে ছিল। না-হলে এমনভাবে গায়? কাল ওকে জিজ্ঞেস করবে, ও যাত্রার দলে ছিল কি না। কিন্তু পরের দিনটির জন্যে অপেক্ষা করার মতো ধৈর্ষ তার হল না।
সে উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে, “হারাণে, তুমি কি যাত্রা করতে?”
হারাণে শুয়েছিল, উঠে বসল; বলল, “আপনার মতো কচি বয়সে দলে ছেলাম।”
—“কি সাজতে?”
—“কেষ্ট।”
—“তুমি লেখাপড়া জান?”
—“না।”
—“তবে কি করে ‘পার্ট’ মুখস্থ করতে?”
—“শুনে শুনে।”
—“দল ছাড়লে কেন?”
—“ভারী কষ্ট দা'বাবু। ভালো খাওয়া-দাওয়া ছিল না। ঠিকমতো মাইনে দিত না। কত গাঁ যে ঘুরেচি! বড় বড় জমিদারবাড়িতে গেছি। আমার গান শুনে বাবুরা সাতখানা ‘মেটেল’ দিয়েছিল। আমার মামা বেহালা বাজাতো। শেষ একবার এক গাঁয়ে গিয়ে মামার আর আমাদের চারজনের কলেরা হল। মামা মারা গেল। আর একটা ছোকরাও মরল। আমরা দু'জনে উঠলাম বেঁচে। তারপর বাড়ি এসে আর গেলাম না!”
—“তোমার সেই মেডেলগুলো আছে?”
—“গরীবের ঘরে সে কি থাকে দা'বাবু? সব রুপোর দরে বেচে খেয়েচি। আপনি যান, শোন্ গা—”
ভোম্বল বসে বসে ভাবতে লাগল। আর কারো বা আর কিছুর কথা নয়, তার নিজের কথা। কিন্তু যা মশা! একদণ্ড স্থির হয়ে বসা যায় না। সে মশারি ফেলে দিয়ে তার ভেতর বসে রইল। তার মনে হল, এত আদর-যত্ন তো সে তার কাকার কাছ থেকে কোনদিন পায় নি। সে দোষ করে শাস্তির ভয়ে পালিয়ে এসে শাস্তির বদলে আদর পাচ্ছে তার মানে কি? সে টাটানগর যাচ্ছিল কারিগরের কাজ শিখে চাকরি করতে। কিন্তু তা কি ফস্কে গেল?। বাড়িতে সে কার জন্যে ফিরে যাবে। তার বাবা, মা, নিজের ভাই-বোন কেউ নেই! কথাটি মনে হতেই তার মনে ভেসে উঠল কাকিমা ও খুড়তুতো বোন রানীদিদির স্নেহমাখা মুখ দুখানি আর ছোট্ট ভাগ্নেটি। তারা আছে! বাড়ি থেকে এ পর্যন্ত যতটা পথ সে পার হয়ে এল তার সমস্তটাই, সব ঘটনাগুলোকে নিয়ে তার চোখের সামনে এসে দাঁড়াল। তার মধ্যে শালুকভাঙার সেই বুড়ী ও চিটেঝুড়ি গাঁয়ে শ্বশুর-বাড়িতে রানীদিদির বন্ধু পদ্মদিদি ছাড়া আর কেউ তাকে ধরে রাখবার চেষ্টা করে নি। পথে কাছিমদহ-কাছারির নায়েব ব্রজেনবাবু, তার কাকার বন্ধু, তাকে পিয়াদা দিয়ে ধরবার চেষ্টা করেছিলেন সত্য কিন্তু তাঁর জন্যে তার মনে কোন বেদনা নেই।
সে এখান থেকেও চলে যাবে; কেউ তাকে ধরে রাখতে পারবে না। কিন্তু বাইরে তার কাকার গলা খাঁকারি শোনা গেল। তিনি চট্ চট্ করতে করতে দাওয়ায় উঠে ডাকলেন, “এই হারাণে—হারাণে! বেটা মরে আছে—”
হারাণে ধড়মড় করে উঠে বসে বললে, “আজ্ঞে?”
নায়েবমশাই ঘরে ঢোকবার আগেই ভোম্বল চোখ বুজে শুয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থায় থাকতে থাকতেই সে ঘুমিয়ে পড়ল। তারপর অনেক রাতে ডাকাডাকিতে খাবার জন্যে উঠল। ঘুমচোখেই খেয়ে আঁচিয়ে এসে সেই যে শুল সারারাতের মধ্যে তার ঘুম একটি বারের জন্যেও ভাঙল না। বাড়ি ছাড়বার পর এমন বিছানা, এত আরাম, এরকম নিশ্চিন্ততা এই তার প্রথম।
যখন তার ঘুম ভাঙল তখন জানালা ও বেড়ার ফাঁক দিয়ে সোনার পাতের মতো রোদ এসে মেঝেয় চৌকো ও গোল হয়ে লেগে আছে। আর সেই আলোর ধারায় সূক্ষ্ম ধূলিকণা উড়ছে যেন কোটি কোটি জীবাণু নড়াচড়া করছে।
নায়েবমশাই কখন উঠে গেছেন।
বারোয়ারিতলায় একবার চটাং চট চট শব্দে ঢাক বেজে উঠল। ভোম্বল বুঝলে, এ কোন দুষ্ট ছেলের কাজ। সে বেতের চটা দিয়ে ঢাকে আওয়াজ করছে।
সে তাড়াতাড়ি উঠে বসল। মশারির ভেতর একবার তাকিয়ে দেখলে, কোণে কয়েকটা মশা। তারা রক্ত শুষে রাঙচিতে ফুলের মতো ফুলে উঠেচে। ভোম্বল মশারি নাড়া দিতেই তারা উড়ল, কিন্তু ভারী শরীর নিয়ে বেশী দূর যেতে পারলে না ভোম্বলেরও তাদের মেরে হাত কালি করতে ইচ্ছা হল না। সে মশারির ভেতর থেকে বেরিয়ে দাওয়ায় এসে দেখে কুয়োতলায় একটি লোক উবু হয়ে বসে একখানি ময়লা কাপড়ে খস্ খস্ শব্দে সাবান ঘষচে। ছোট রান্নাঘরটির মটকার কোণ দিয়ে ধোয়া বেরিয়ে বেড়ার ওধারে বেলগাছটির ডাল-পাতার ভেতর গিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। ঘরখানির পাশে বেড়ার ধারে একটি মস্ত ও বুড়ো শিউলি গাছ। কিন্তু তার তলায় একটি ফুলও নেই। কয়েকটা ফুল বোঁটা থেকে খসে নিচে পড়তে পড়তে পাতাতেই উপুড় বা কাৎ হয়ে আটকে আছে। সাদা মোমের ছোট ছোট গুটির মতো কুঁড়িতে গাছটি ভরা।
ভোম্বল কুয়োতলায় যেতেই যে লোকটি কাপড়ে সাবান দিচ্ছিল সে তার দিকে তাকিয়েই তাড়াতাড়ি বালতির জল ফেলে আবার এক বালতি জল তুলে দিয়ে একটু হেসে বললে, “নেন।”
মনে হল সে ভোম্বলকে খুশি করতে পারলে যেন কৃতার্থ হয়। ভোম্বল হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ফিরে যাবার আগেই নায়েবমশাই কাসতে কাসতে বাড়ি ঢুকে দরজা থেকেই হাঁক দিলেন, “ঠাকুরমশাই। চা হল?”
লোহার কেটুলিতে গরম জল নিয়ে “ঠাকুরমশাই' বেরিয়ে এলেন— সতের আঠারো বছরের এক উড়ে ছোকরা। তার গলায় মাজা মোটা পৈতা, গালে পান, মাথায় তেলচুকচুকে লম্বা চুল, শরীরটি বেশ নবীন, পরনে আটহাতী আধময়লা লালপাড় মোটা ধুতি। সকালে উঠেই ঠাকুরমশাইয়ের স্নানাহ্নিক সারা হয়েছে, না-হলে নাকে তিলক, কপালে চন্দনের ফোঁটা থাকে? ভোম্বল তার চেহারা দেখে মনে মনে হাসল।
নায়েমশাই বললেন, “ভোম্বল, তোমার হাত-মুখ ধোয়া, দাঁত মাজা হয়েচে?”
ভোম্বল বললে, “হাত-মুখ ধুয়েচি; দাঁত মাজি নাইবার আগে।”
নায়েবমশাই কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই বললেন, “তা হলে চা খেয়ে নাও, বেরোতে হবে। আমার অনেক কাজ। কৈ রে হারাণে?”
“আজ্ঞে—” বলতে বলতে হারাণে একটি কলাপাতার ঠোঙা হাতে বাড়ির ভেতর ঢুকল ।
—“চল–চল” বলতে বলতে নায়েমশাই রান্নাঘরের বারান্দায় গিয়ে উঠলেন।
হারাণে দু'খানি পিঁড়ে পেতে দিলে। ভোম্বল বসল নায়েব-মশাইয়ের পাশে। হারাণে একখানি থালায় হাতের কলাপাতার ঠোঙা রেখে এনে দিলে নায়েমশাইয়ের সামনে। ভোম্বল দেখলে, থালায় কলাপাতার ওপর রয়েছে খান আষ্টেক নিমকি ও দু’টি বড় বড় কাঁচাগোল্লা। ঠাকুরমশাই দু'টি এনামেলের চটাওঠা পেয়ালায় তাঁদের চা দিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন।
বাড়িতেও ভোম্বল চা খায়। কিন্তু তার সঙ্গে কোনদিন থাকে মুড়ি, কোনদিন মুড়ির মোয়া, কোন কোন দিন জিলিপি। তবে চায়ের রঙ হয় এই রকমই কালো। নিমকি টাটকাই ছিল। একখানিতে একটি কামড় দিয়েই তার মনে একটা কঠিন প্রশ্ন জাগল, “হারাণে, স্বরূপ, বারোয়া রতলার ঐ ঢুলীরা, কুয়োতলার লোকটা, ওরাও কি সকালে চা-নিমকি খায়? সে যতদূর জানে, খায় না। অনেকে সকালে কিছুই খায় কেন খায় না? ওদের কি ক্ষিদে পায় না?” ওদের কাউকে জিজ্ঞেস করে প্রশ্নটির উত্তর সংগ্রহ করতে সে মনস্থ করল। তবে কাকার সামনে নয়। উনি বাজে প্রশ্ন পছন্দ করেন না। এমনিতেই তাকে এখন পর্যন্ত কিছুই বলেন নি। সুযোগ পেলে আর ছাড়বেন না। রাগী মানুষ। হয়তো পিয়াদাদের কাউকে দিয়ে ঠ্যাঙাবেন কিংবা জমিদার-কাছারির যে গুম-ঘরের গল্প সে শুনেছে তাতেই বন্ধ করে রেখে দেবেন।
এখানকার গুম-ঘর দেখতে ভোম্বলের খুব কৌতূহল হল। চা-নিমকি খাওয়ার প্রশ্নটির চেয়েও এই ব্যাপারটি তার কাছে জরুরী হয়ে উঠল যেমন করেই হোক ঘরখানি অন্ততঃ বাইরে থেকেও সে দেখবে। সে শুনেছে, খাজনা আদায়ের জন্যে কাছারি বাড়ির সামনে খোলা মাঠে রোদে প্রজাদের বসিয়ে রাখে, বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে মারে, ঘর জ্বালিয়ে দেয়, ঘরের চাল কেটে ফেলে, হাতী নিয়ে গোটা বাড়ি ভেঙে সেখানে রাতারাতি তারা সব কলার গাছ বসিয়ে দেয়। কাছারিতে বড় বড় লেঠেল থাকে । এক-একটা ডাকাত। তারা লাঠিতে ভর দিয়ে, রণপা চড়ে দশ ক্রোশ পথ দু ঘণ্টায় পার হয়ে যায়। সে যখন এখানে এসেই পড়েছে তখন সব কিছু দেখেশুনে যাবে। কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না। জিজ্ঞেস করলে সে গিয়ে তার কাকাকে বলে দেবে। তিনিও ধমক দেবেন, “তোমার এ সবে দরকার কি? পড়াশুনোর কথা ভাবো।”
পড়াশুনো! পড়াশুনো! পড়াশুনো! এ যে ছাই কি? তাদের দুর্গাপুরের বাজারে বড় বড় দোকানদার আছে। রেল স্টেশনের ধারে বড় বড় পাটের আড়ৎ আছে। আড়তদারেরাও ঐ সব দোকানদারদের মতো লেখাপড়া জানে না। তাদের বাড়ি বাড়ি ছেলেরা তার সঙ্গে ইস্কুলে পড়ে; কিন্তু একদিনও পড়া পারে না! ওরা কি এ জন্যে বাড়িতেও ধমক খায়?
নায়েমশাই ধমক দিলেন, “চা পড়ছে কেন? সাবধানে খাও।”
ভোম্বল চমকে উঠল। অমনি রান্নাঘরের দরজার পাশে ফোঁস করে শব্দ হল। ভোম্বলের ধারণা হল, সে ধমক খেয়েচে বলে ঠাকুরমশাইটি হেসে উঠল। ভোম্বল সেদিকে একবার আড়চোখে তাকাল। কিন্তু ঠাকুর তখন নিজের জন্যে কাঁসার গেলাসে চা ঢালছিল। তবুও ভোম্বলের সন্দেহ দূর হল না।
চা খাবার পর শোবার ঘরে গিয়ে নায়েবমশাই বললেন, “পেটের কাছটা অমন ফুলে আছে কেন? চাদরখানা বেশ করে গায়ে জড়িয়ে নাও। বাজারে যেতে হবে। যে বেশে রয়েছো, তাতে—” বলেই তিনি হারাণের হাত থেকে হুঁকো-টি নিয়ে চেয়ারে বসে একমনে টানতে লাগলেন।
কিন্তু চাদরখানাকে ভোম্বল কিছুতেই জুত করতে পারলে না। সিল্কের চাদর গা থেকে পিছলে খসে পড়ে। নায়েবমশাইয়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। শেষে একরকম করে জড়িয়ে নিয়ে
আজ সে স্বরূপকে দেখতে পেল না, তাদের সঙ্গে লাঠি হাতে চলল আর একজন। তার চোখ দুটো যেমন বড়, তেমনি লাল, মাথার কালো লম্বা চুলগুলে ফোলানো, গায়ে কোরা গেঞ্জি, পরনে কোরা ধুতি মালকোঁচা দিয়ে পরা।
শরতের কড়া রোদ। আকাশে মেঘ আছে। কিন্তু তারা সব অলসের মতো গা ভাসিয়ে চলেছে সূর্যকে আড়াল বার কষ্টটুকুও যেন করতে চায় না। নায়েবমশাই রেলির বাড়ির স্প্রিংয়ের ছাতাটি ঝপ করে খুলে মাথায় দিতেই লোকটি তাঁর হাত থেকে সেটি নিয়ে তাঁর মাথায় ধরে লাঠি বগলে তাঁর পাশে পাশে চলল।

ভোম্বল মনে মনে বললে, “রাজামশাই চলেছেন!”
নায়েবমশাই লোকটিকে বললেন, “বগা, আজ একবার কমরদ্দিকে খবর দিস।”
লোকটির নাম তা হলে বগা। বগা ভাঙা গলায় উত্তর দিলে, “এখনই যেতাম, হুজুর। কিন্তু গেলে হুজুরের কষ্ট হবে। পালকিতে বাজারে গেলেন না কেন, হুজুর? যা রোদ—”
এতবার একজনকে 'হুজুর' বলতে ভোম্বল কোনদিনও শোনে নি। দুর্গাপুরে তার কাকাকে কেউ তো হুজুর বলে না, বলে ‘হারাণবাবু’ বা ‘চাকীমশাই’। কিন্তু এখানে এই ঝোপ-জঙলে বাঁশবনের ধারে—!
বগা হঠাৎ একবার তাকেও বললে “ওদিকে পায়ে কাঁটা ফুটবে, এদিকে সরে আসেন, হুজুর।"
তাকে ‘হুজুর' বলতে শুনে ভোম্বল কেমন যেন হয়ে গেল। বগা তাকে ঠাট্টা করেনি তো? সে গোপনে বগার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলে। কিন্তু সে শুকনো মুখে ঠাট্টার চিহ্নও নেই। ও যেন ঠাট্টা পছন্দই করে না। খালি পা, রুক্ষ চুল, একখানি দশহাতী ধুতি এলোমেলো করে পরা, গায়ে একখানি সিল্কের চাদর যাহোক করে জড়ানো চৌদ্দ বছরের একটা ঢ্যাঙা ছেলে ‘হুজুর' ? ভোম্বল জীবনে এই প্রথম সম্মান পেল এবং তখন থেকে একটু ভারিক্বী হয়ে হুজুরী চাল বজায় রাখবার চেষ্টা করতে লাগল।
সরকারী বাড়ি থেকে কাছারি বাড়ি খানিকটা তফাতে। এ দু'য়ের মাঝে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। তার ওপর দিয়ে পথ। পথের ধারে শিয়ালকাঁটা, আকন্দ, ভেরাণ্ডা, কচু ও দাঁতছোলার জঙ্গল। তারই মাঝে একটি আম, গোটা দুই খেজুর ও একটি তালগাছ দাঁড়িয়ে আছে। পথটি গেছে কাছারি বাড়ির প্রকাণ্ড চত্বরের ওপর দিয়ে। ভোম্বল চত্বরটি পার হতে হতে দেখলে ডানধারে পাশাপাশি রয়েছে ধানের দুটি বড় বড় গোলা। একটি গোলার তলায় ওৎ পেতে বসেছিল হলদে-সাদায় মিশানো একটা হুলো বেরাল। সে এক একবার ওপর দিকে তাকাচ্ছিল। গোলা থেকে খানিক তফাতে একটি প্রকাণ্ড নিমগাছতলায় একখানি টিনের চালায় ছিল দু'খানি কালো রঙের পালকি।
ভোম্বল চলতে চলতে গুম-ঘরখানার খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। কিন্তু এমন একখানি ঘরও তার চোখে পড়ল না যেখানি দেখে মনে হতে পারে তার মধ্যে অমন সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে! সে দেখলে, লম্বা কাছারি-ঘরের সব দরজা-জানলা বন্ধ। কেবল একদিকের একটি খোপের দরজা আধখোলা। বারান্দায় কেউ নেই; কিন্তু খোপের মধ্যে বসে কারা যেন কি করছে। আর, এধারে একটি কালো রঙের কুকুর বসে গা চাটচে। ভোম্বল বেশ ভাল করে লক্ষ্য করতে লাগল। ঘরের পাকা বারান্দার সিমেন্ট মাঝে মাঝে চটে গেছে। ঘরে শালের খুঁটি, চাটাইয়ের বেড়া, টিনের চাল। বারান্দার খুঁটিগুলো ও বেড়ার মাঝে মাঝে খানিকটা কালো হয়ে আছে। ভোম্বল বুঝতে পারলে, ও দাগ মাথার, হাতের ও পিঠের তেল ও ঘামের। তারই ওপর দু-এক জায়গায় চুনের দাগও রয়েছে। কে যেন পান খেয়ে আঙুলের চুন মুছেচে। বারান্দায় ওঠবার পৈঠাগুলোর তলার দিকের দু’টির সিমেন্ট উঠে ইট বেরিয়ে পড়েছে। ভোম্বল ভাবে, এই কাছারি বাড়ির কোথায় গুম-ঘর আর এই প্রকাণ্ড উঠোনটিতে কোথায় অবাধ্য প্রজাদের রোদে বসিয়ে রাখা হয়?
সামনের দিক থেকে খালি বস্তা ও ধামা হাতে দু'টি লোক আসছিল। তারা পথ ছেড়ে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে নায়েবমশাইকে সালাম দিলে। ভোম্বল তাদের দিকে তাকাতেই তারা তাকেও সালাম দিলে। ভোম্বল সালাম ফিরিয়ে না দিয়ে বললে, “হু"। সালামও তার জীবনে এই প্রথম পাওয়া। তার মনে হল, টাটানগরের কারখানায় হাতুড়ি পেটার চেয়ে নায়েবী অনেক উঁচু কাজ। কারিগর-মিস্ত্রীকে কে কবে সালাম করে, কে কবে হুজুর বলে ডাকে। কিন্তু গায়ে জোর থাকলেই তো আর নায়েব হওয়া যায় না। তার কাকা তো রোগা! তবে হাঁ, লম্বা বটে রঙও ফর্সা; চোখ দু'টি আর গোঁফ জোড়া খাতির করবার মতো।
পথটি ঘুরে বারোয়ায়িতলায় এসেছে। তারা বারোয়ারিতলায় এসে পড়ল। কিন্তু বেলা বেশী হওয়ায় নায়েমশাই সেখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ালেন না।
তাঁকে দেখে সেখানকার ভদ্র-অভদ্র, ছেলে-বুড়ো সকলে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। তিনি দু-একজনের সঙ্গে দু-একটি কথা বললেন; একবার প্রতিমার দিকে এমনভাবে এগিয়ে গেলেন যেন ঠাকরুণকেও কিছু বলবার আছে অথবা ঠাকরুণের মুখ থেকে দু'একটি কথা শুনবেন। ঢাকীদের দিকেও একবার তাকালেন। ভোম্বলের ইচ্ছা সেখানে খানিকক্ষণ থাকে।
তার কাছ থেকে খানিক দূরে সামিয়ানার শেষদিকে কতকগুলো ছেলে যেন কি করছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যেটি সে ভোম্বলের দিকে তাকিয়ে ফিক্ করে হেসে ফেললে এবং পাশের ছেলেটিকে একটু উঁচু গলায় বললে “দ্যাখ দ্যাথ ঐ ছোঁড়াটার পেটে একটা বালিশ বাঁধা।”
কাপড়খানি বড় বলে ভোম্বল কোঁচার প্রায় সবটুকু পেটের ওপর গুঁজেছিল। সে জানতো সেজন্যে তাকে ভালো দেখাচ্ছে না, পেটের সমুখভাগ ফুলে আছে। কিন্তু ছেলেটির মন্তব্যে তার ভেতরের লড়াইয়ের ছেলেটি জেগে উঠল। তার কাকা না থাকলে সে ওর সঙ্গে এক হাত লড়ত। তাই তার দিকে কেবল কটমট করে তাকাল এবং তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল, “তোমার তাতে কি?”
ভোম্বল শুনতে পেল, ছেলেটার এক সঙ্গী তাকে বলল, “নায়েবমশাইয়ের ভাজতে।”
ছেলেটি উত্তরে বললে, “তবে ভয়ে মরে গেলাম।” এবং ভোম্বলের দিকে তাকিয়ে আবার ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল।
ভোম্বল মনে মনে বললে, “আচ্ছা রসো।”
নায়েমশাই তখন বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছেন। বগা পিছন ফিরে ভোম্বলকে ডাকলে, “আসেন, হুজুর!”
নায়েবমশাইও ফিরে দেখলেন।
ভোম্বলের মনে পড়ল, সেখানে আসবার পথে সেই মানিকপুরের বাঁশতলায় সেখানকার ছেলেগুলোর সঙ্গে যুদ্ধের কথা। সেই অচেনা জায়গায় সে ছিল একা এবং পথের ধার থেকে বাঁশের আগা কুড়িয়ে নিয়ে তাদের তাড়া করেছিল। তার ভয়ে ছেলেগুলো সব হয়ে গিয়েছিল এক ঝাঁক চড়ুইয়ের মতো হাওয়া। আর এখানে সে তো 'হুজুর', সালাম পাচ্ছে, নায়েবমশাইয়ের ভাইপো। ইচ্ছে করলে সে নিজের হাতে বা পিয়াদা দিয়ে ওদের চিট্ করে দিতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল, পিয়াদার সাহায্য নেওয়ার বা তার কাকার কাছে নালিশে তার পৌরুষ ক্ষুণ্ন হবে। শাস্তিটা সে দেবে একা গায়ের জোরে, নিজের হাতে। তাই সে ঘুষি উচিয়ে দেখাল। সেই ছেলেটি তাতেও দমল না; সে-ও একখানি পা তুলল। ভোম্বল তাতে বিষম ক্রুদ্ধ হল। কিন্তু তখন প্রতিশোধের সময় ও সুযোগ নেই। তাই আত্মসংযম বলে যে মনের একটি অবস্থা আছে, ভোম্বল সেদিন তা প্রথম অনুভব করলে। প্রতিশোধের ইচ্ছাকে সে ক্রুদ্ধ, উত্তেজিত ডালকুত্তার মতো মনের এক কোণে মোটা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখলে। সময় ও সুযোগ এলেই তাকে শত্রুর টু'টি লক্ষ্য করে দেবে লেলিয়ে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন