শুধু পথ আর পথ

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

যখন ভোম্বলের ঘুম ভাঙল, কাক ডাকছে, বাইরে লোকে কথা কইছে, বাবাজির বিছানা খালি। তবু তার আরও খানিকক্ষণ শুয়ে থাকতে ইচ্ছা হল। কিন্তু সেই সঙ্গে মনে পড়ল, তাকে যেতে হবে অনেক দূরে। সে অমনি উঠে পড়ল এবং বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলে চারধার ফর্সা, সূর্য ওঠে ওঠে, বাবাজি পুকুরের ধার থেকে আসছে। দু-একটা লোক চলাফেরা করছে। পাখি ডাকছে, উড়ছে, বসছে। চারধারে গ্রাম। গাছগাছালির মাঝে দালান-কোঠা, টিন ও খড়ের ঘর। আর দূরে দেখা যাচ্ছে মস্ত একটা কোঠাবাড়ির খানিকটা। ভোম্বল আন্দাজ করলে, ওইটেই ‘সিঙ্গিবাবুদের’ বাড়ি। সে নিজের মনেই নিজেকে জিজ্ঞেস করলে, ‘সিংহ না সিঙ্গা থেকে সিঙ্গি?' কিন্তু জবাবটা ঠিকমতো পেল না।

বাবাজি এসেই বললে, ‘তৈরি হয়ে এসো। সঙ্গের সঞ্চয়টুকু শেষ করে চলো বেরিয়ে পড়ি। আমি লোকের দরজায় দরজায় ঘুরব। তুমিও ওদিক-সেদিক বেড়াও। তারপর স্নান, প্রাসাদ, পলায়ন।’ বলেই একটু হাসলেন।

ভোম্বল বারান্দা থেকে চত্বরে নেমে মন্দিরের পাশ দিয়ে পুকুরের ঘাটের ওপর দাঁড়াল। মস্ত পুকুর কিন্তু ঠিক চৌকো নয় - চার পারে চার বাঁধানো ঘাট। - চারধারে রাস্তা। রাস্তার ধারে ধারে নারকোল গাছ; পুকুরে কাচ-পারা জল, ফুলশূন্য পদ্মবন। পুকুরটার পশ্চিমে উঁচু ভিতের ওপর মন্দির। তার চারদিকে চওড়া চাতাল। ভোম্বল তখন মন্দিরের কাছে গেল না।...

সে যখন অতিথিশালায় ফিরে গেল তখন বাবাজি বেরিয়ে যাবার জন্যে তৈরি। ভোম্বলও জলযোগ সেরে নিলে।

যে লোকটা রাতে কম্বল এনেছিল, সে এল এবং কম্বল চারখানা গুছিয়ে নিতে নিতে বললে, ‘বেলা ঠিক বারোটায় ভোগ। একটায় পেসাদ।’ দুজনে দুদিকে বেরিয়ে পড়ল।

ভোম্বল চললে, যেদিকে দুচোখ যায়। যেতে যেতে দেখছে, খানিকটা জায়গা একটু শহুরে, তার বাইরে ঝোপঝাড়, লতা-গুলঞ্চ, গাছ-গাছালি, ঘরবাড়ি, গোয়াল-গোলা, বিচালির পালা, কাঠের গাদা, নারকোল-খেজুর গাছ, বাঁশঝাড় বেত-ঝোপ। সব কোথাও এলোমেলো, কোথাও ঠাসাঠাসি, কোথাও মাঠ ঘিরে। কোথাও শুকনো ডোবা, কোথাও রয়েছে মজা বা কুচিপানা ভাসা পুকুর।

সে খুঁজতে লাগল, গত রাতে যে পথে এসেছিল, সেই পথটা। পথে লোকজন দেখছে, ছেলেমেয়ে গায়ে মাথায় চাদর- র‍্যাপার জড়ানো, কারো খালি পা, কারো-পায়ে জুতো, চটি বা খড়ম। কিন্তু এমন একটা পথও তার চোখে পড়ছে না, যেটাকে মনে হয় গত হয় গত রাতের পথ। তার পিছন দিক থেকে দুটি লোককে আসতে আসতে সে বলতে শুনলে, ‘আজকাল বাজারটা যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা। না পাওয়া যায় তরিতরকারি, না পাওয়া যায় মাছ।’ একজন বললে, “জেলেরা চালাক হয়েছে। গাঁয়ের হাট বাজারে আর কটা খদ্দের? সব পাঠাচ্ছে, আশে-পাশের শহরে - রানাঘাট, নৈহাটী। কেউ কেউ ‘শেলদায়ও’ যায়৷”

—‘তা বটে। খাল-বিল-পুকুরও মজে যাচ্ছে, ভরাট করে বসত বা আবাদ হচ্ছে। মাছই বা পাওয়া যাবে কোথায়? চূর্ণী, মাথাভাঙা, ইচ্ছামতী - সেও তো দুর -’

বলতে বলতে তারা থলে হাতে তাড়াতাড়ি ভোম্বলের ডান দিকের পথ ধরে চলে গেল। ভোম্বল একবার ভাবলে, তাদের পিছু পিছু যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল, কি হবে গিয়ে? সে সমানে চলতে লাগল।

যেতে যেতে দেখলে, পথের বাঁদিকে একখানা কাঁচা-পাকা বাড়ির মস্ত বার-উঠোনের একপাশে ধানের মরাই। উঠোনের অনেকটা জায়গা জুড়ে ধান শুকচ্ছে আর ধান সিদ্ধ করার গাঢ় গোবরের গন্ধ নাকে লাগছে। গন্ধটা ভোম্বলের বিশ্রী বোধ হতে লাগল। ও ভাবলে ‘এই চালের ভাত ওরা খাবে কি করে?’ সে তাড়াতাড়ি জায়গাটা পার হয়ে যেতে লাগল।

জায়গাটায় গাছপালা ও বাঁশঝাড় এমন ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেতে যেতে তার কোথাও বেশ ঠাণ্ডা, কোথাও লাগে কম ঠাণ্ডা মানে কিছু গরম। সে ভেবে পায় না, কেন এমন হয়। তাদের ইস্কুলের বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই হয়তো এর কারণ বলে দিতে পারেন। গাঁয়ের পথে এক জায়গায় তাপ কেন অন্য জায়গার চেয়ে কম বা বেশি বোধ হয়। এই যেমন এখন তার বোধ হচ্ছে।

হঠাৎ তার কানে এল, অনেকগুলো ছেলেমেয়ের চিৎকার। মনে হল তারা যেন ছুটোছুটি করছে। ভোম্বল তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়েই দ্যাখে পথটার শেষে সামনেই একখানা মস্ত টিনের ঘরের ছেঁচ থেকে সাইনবোর্ড ঝুলছে। তাতে লেখা ‘সর্বমঙ্গলা দেবী অবৈতনিক প্রাথমিক পাঠশালা।’

ঘরখানায় চারদিকে বারান্দা। বেড়া জাফরি-কাটা চাটাইয়ের, কিন্তু তার গায়ে জায়গায় ছোটো বড়ো গর্ত ভাঙা। একপাল ছেলেমেয়ে বারান্দায় ও সামনের মাঝারি গোছের মাঠখানাতে। ছেলেরা মালকোঁচা ও মেয়েরা গাছ-কোমর বেঁধে মার্বেল খেলছে, বা ছুটছে। একটা মস্ত নারকোল কুলের গাছে এড়ো ছুড়ছে, গলা ধরাধরি করে গল্প করতে করতে হি হি করে হাসছে। একটা মেয়ে আর-একটা মেয়ের পিছনে ছুটতে ছুটতে ডাকছে, এই বিদ্যুৎলতা। এই বিদ্যুৎলতা! এই বিদ্যুৎ!' বিদ্যুতলতা তখন মাঠ দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। ভোম্বল দেখলে, মেয়েটা মেঘের মতো নীলচে-কালো; রোগা, কিন্তু নাক-মুখ চোখ বেশ, চুলও মাথাভরা। ভোম্বল ভেবে পায় না, চেহারার সঙ্গে কেন নামের মিল হয় না? ওর নাম কালিন্দী রাখলে কি এমন বেমানান হত? পাঠশালাটার তিনদিকের মাঠ পারে ঘন গাছপালা ও ঝোপ ঝাড়। এখন শীতে পাতলা। তার মাঝ দিয়ে ওধারে একটা পাড়া দেখা যাচ্ছে, দু-একটা লোককে চলাফেরা করতে, একটি স্ত্রীলোককে কুয়ো থেকে জল তুলতে, ওই একটা লোক কাটারি হাতে বাঁশঝাড়ে ঢুকে গেল।

হঠাৎ ঠং ঠং করে ঘণ্টা বাজাল। অমনি ছেলেমেয়েগুলো হুড়হুড় করে পাঠশালায় ঢুকতে লাগল। এখন ওদের ‘টিফিন’ ছিল। ভোম্বলের মনে পড়ল, সেও পাঠশালায় পড়ত। তাদের সঙ্গেও পড়ত কয়েকটা ঝুঁটিবাঁধা মেয়ে। এমনি ফরসা। তারা নাকি ‘হাকিম-বাবুদের' মেয়ে। পণ্ডিতমশায় তাদের খুব খাতির করতেন। তারা কি খেতো তাও জিজ্ঞেস করতেন। তাদের পাঠশালাটা কিন্তু এ রকম বা সেই কাছিমদহ হাটের পথের পাঠশালার মতো নয়।

এদিকে বেলা বেশ চড়েছে। গাঁয়ের মানুষের ঘড়ি লাগে না, আকাশের সূর্য, মাটিতে ছায়া সময়ের কথা জানায়। ভোম্বলকে আরও একটা ব্যাপার সময়ের কথা জানিয়ে দেয় - ক্ষুধা। তখন কিন্তু মাথার ওপর সূর্যের তাপ, পেতে জ্বলে ওঠা খিদের আগুন জানিয়ে দিলে, বেলা অনেক। সে পথ চলতি একজনকে জিজ্ঞেস করে অতিথিশালার পথটা জেনে নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখে বাবাজি পুকুরে স্নান করতে চলেছে। ভোম্বলকে দেখেই বললে, ‘আর বিলম্ব নয়, স্নান সেরে নাও। বেলাবেলি রওনা দিতে হয়।’

তারপর স্নান ও পেটভরে তপ্ত প্রসাদ ভক্ষণ করে তারা দুজনে যখন রেলবাজারের বাঁধা সড়ক ধরলে, তখন দুপুর গড়িয়েছে। যাবার সময় বাবাজি বললে, “এখানে যা পেয়েছি তার একভাগ তুমি নাও। পরে লাগবে। ভিক্ষের চালের সবটা গত রাতের সেই লোকটিকে দিয়েছি। সে তার দরুন, একটি টাকা দিয়েছে। পথে চাল কি করব। এরপর আর পায়ে চলা পথ ধরব না -রেলে যাব। কলকাতা থেকে গঙ্গা পেরিয়ে হাওড়ার ইস্টিশান। ওখান থেকে ‘ছিক্ষেত্তের’ গাড়ি। তোমাকেও তোমার গাড়িতে বসিয়ে দেব। তারপর ‘মালেকের' যা ইচ্ছে।”

ভোম্বলের বুক দুরুদুরু করতে লাগল, তার মনে হতে লাগল, সে যেন তার লক্ষ্যের একেবারে সামনে এসে পড়েছে।

মন্দির তখন বন্ধ। দুজনেই ওঠবার পৈঠায় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে চলল - পুকুরের ধারে বাঁধানো রাস্তা দিয়ে। তারপর ‘রুইমারি ডাকঘর' বাঁয়ে রেখে ‘কাত্যায়নী দেবী দাতব্য চিকিৎসালয়ের' সামনে দিয়ে, এসে পড়ল ‘কাছারিবাড়ির’ ধারে। সেখান থেকে বাঁয়ে ঘুরেই ‘সিঙ্গিবাড়ির’ ‘সিংহ দরজা।’ মস্ত মস্ত দুটো মহল। ওই দেখা যায় এক জোড়া হাতি, পায়ে শেকল বাঁধা, একবার এগোচ্ছে, একবার পেছচ্ছে, শুঁড়ের আগা অবিরাম নড়ছে। আরে! ওটা কি - ঘোড়ার গাড়ি? ভোম্বল জীবনে সেই প্রথম ঘোড়ার গাড়ি দেখলে শহরে নয়, রুইমারি গাঁয়ে! ছবিতে যেমন দেখেছে ঠিক তেমনটাই। গাড়িখানা সেই মস্ত মস্ত বাড়ি দুখানার মাঝ থেকে বেরিয়ে বাঁধা সড়কটা ধরে এগিয়ে যেতে লাগল। বোধহয় যাচ্ছে রেলবাজার। সেখান থেকে যতটা দেখা যায়, ভোম্বল দেখলে, গাড়িখানা টানছে একজোড়া সাদা টাট্টু। তাদের লেজ চামরের মতো ফোলা। গোড়ালি ...... ঝোলা। ঘাড়ের সাদা কেশরও লম্বা ঝকঝকে। কোচোয়ান ও সহিসরা উর্দিপরা। গাড়িখানা চকচকে, কিন্তু ভেতরে কে বা কারা আছে দরজাবন্ধ থাকায় দেখা গেল না। ধুলো উড়িয়ে গাড়িখানা চলে যেতে যেতে পথের বাঁকে অদৃশ্য হল।

ভোম্বলের মনে ভারি আনন্দ। মেঘশূন্য নীল আকাশে সূর্য ঝকঝক করছে। পথের দুপাশে মস্ত মস্ত চিনা-অচিনা গাছে। তারপর জলশূন্য খাল। তার কোলে গ্রাম - গ্রামের বাড়িঘর, এক-এক জায়গায় গায়ে লাগা। এক-এক জায়গায় ফাঁকা ফাঁকা। কোনও কোনও বাড়িতে লাউ-কুমড়ো মাচাতে ঝুলছে। কোনো কোনো বাড়ির চালে লাউ জালি, ফুল মুখে জায়গায় জায়গায় দেখা যাচ্ছে, খেত-খোলা, খাড়া করা কাটা কাটা ধানের আঁটি। পথ দিয়ে এধারে-ওধারে চলেছে একা দোকা বা এক সঙ্গে কয়েকজন পথিক, চলেছে গোরুর গাড়ি। ওই দেখা যায় পায়ে-চলা আঁকাবাঁকা মেঠোপথ চলে গেছে দূরে গাঁয়ের দিকে। অনেক উঁচুতে ঘুরপাক দিচ্ছে চিল শকুন। চারধার নিস্তব্ধ, থেকে থেকে শোনা যাচ্ছে শালিক - চড়ইয়ের কিচিমিচি, দোয়েলের - শিস, বুলবুলের ঝাঁঝালো ঝংকার। কাকেরা কা কা করছে। হঠাৎ পাশেই ঘেউ ঘেউ শব্দ শুনে ভোম্বল চমকে উঠে ফিরে দ্যাখে একটা সাদা কালো রঙের কেঁদো কুকুরকে শিং নুইয়ে চুঁ মারতে যাচ্ছে একটা মোটা-সোটা কালোর ভাব সাদা ছিটে পেট মোটা ছাগল। দুজনের মাঝের ব্যবধান তিন-চার আঙুলের বেশি হবে না। কুকুরটার চোখ-মুখের ভাব বিস্ময় ও রাগ-মেশানো। ছাগলটা এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন মনে মনে বলছে, ‘যদি ছাগলের মান থাকে তোকে ঢুঁ মারবোই।’ অথচ ওদের মাঝে কোনও খাবারও নেই। ছাগলটার সঙ্গে ছানাও নেই। আছে কেবল পথের ধারে আধমরা ঘাস। কুকুরটা বোধহয় ছাগলটার সঙ্গে খুনসুটি করতে গিয়েছিল। কিন্তু ছাগলও যে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জীব, মর্যাদা বজায় রাখতে জানে, তা সমঝে দিলে। ভোম্বল মনে মনে হাসলে। এবার থেকে কুকুরটা ছাগল দেখলেই হয়তো লেজ গোটাবে অর্থাৎ সেলাম করবে।

পথের ধারে ধারে মস্ত মস্ত গাছ সেগুন, নাগকেশর, শিরীষ, তেঁতুল বাবলা, মেহগিনি, তেঁতুল, আম আর বট অশথ। এসব ছাড়াও আছে, শিমুল, অচিন, রয়না। ভোম্বল যেতে যেতে দেখলে, এক জায়গায় বটের মূলে রয়েছে কয়েকখানা গোরুর গাড়ি।

গোরুগুলোর কোনোটা বিচালি চিবোচ্ছে, কোনওটা শুয়ে জাবর কাটছে, কোনওটা দাঁড়িয়ে কান ঝাড়া দিচ্ছে। আর গাড়োয়ানরা ময়লা চাদর মুড়ি দিয়ে দাবান করা খালি গাড়িগুলোর ওপর যেন দিব্যি আরামে ঘুমোচ্ছে। বটের ডালের ফাঁক দিয়ে তাদের গায়ে এসে পড়েছে দুপুরের মিঠে রোদ। বয়ে যাচ্ছে খোলা মাঠ ও খেত-খামারের পাকা ধানের মিষ্টি মিষ্টি গন্ধভরা শুকনো বাতাস। খানিক তফাতেই রয়েছে খেতের মাঝে রোদে শুকনো কাটাধানের গোছা আর চার-পাঁচটি লোক, বোধ হয় চাষি। ওরা ওই গাড়িগুলোতে ধান বোঝাই দিয়ে দূরের কোনও গাঁয়ে নিয়ে যাবে। ধানশূন্য খেতের মধ্যে এক ঝাঁক বুনো পায়রা ও চড়ুই পড়ে থাকা ও ঝরে পড়া ধানগুলো খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। ভোম্বলের মনে পড়ে গেল, ‘উঞ্ছবৃত্তি ব্রাহ্মণে’র গল্প। গল্পের সেই বামুনও খেতে পড়ে থাকা ধান খুঁটে নিত। তা থেকে আবার ভিক্ষাও দিত ও অতিথি সেবাও করত।

বাবাজি চলছে আপন মনে। মাঝে মাঝে খালি গলায় গুনগুন করে গান গাইছে কখনো-কখনো পিছন ফিরে দেখছে, হয়তো ভোম্বলকেই। পথিকেরাও কেউ কেউ তাদের দিকে কৌতূহলী হয়ে তাকাচ্ছে।

এদিকে বেলা পড়ে আসছে; পথে ও মাঠে গাছের, ও পথচলতি মানুষের ছায়া আড় হয়ে পড়ে ক্রমেই লম্বা হচ্ছে। পথও যেন আর ফুরোয় না। ওই যে দেখা যায় গাঁয়ের বউ-ঝি কলসি কাঁখে ওই দিকে কোথায়, পুকুর বা দিঘিতে জল আনতে চলেছে। চারধারের নিঝুমতা যেন আরও জমাট বাঁধছে। ওই কোণ থেকে কে কাকে ডেকে উঠল। আওয়াজটা মনে হল ফাঁপা। শুনেছি রুইমারি থেকে রেলবাজার নাকি আড়াই ক্রোশ। কিন্তু ভোম্বলের মনে হচ্ছে আড়াই ক্রোশ কখন পার হয়ে তিন ক্রোশের মাথাও বুঝি ছাড়ায়। অনেক দূরে ওই দেখা যাচ্ছে গাঁয়ের গাছপালার কোলে পথটা যেন শেষ হয়েছে। সূর্যও গাছগুলোর মাথা ছোঁয় ছোঁয়, রংও মনে হচ্ছে লালচে। বাতাস হঠাৎ পড়ে এল। গাঁয়ের সবজে কালো রং যেন ধোঁয়াটে দেখাচ্ছে। বাবাজি কিন্তু চলেছে আপন মনে।

সামনে পোয়াটাক পথ যাবার পর দেখলে, ডানদিকে মাঠের ওপর একটা পায়ে চলা পথ ধরে লোক চলাচল করছে। তাদের কাছে আসতেই বাবাজি তাকে জিজ্ঞেস করলে, ‘রেলবাজার আর কদ্দুর?’

—‘এই সড়ক ধরে পৌঁছতে এখনও আধ কোশটেকের ওপর। ওই মাঠ ভেঙে গেলে কাটাখালের সাঁকো পেরোলেই বাজারের পিছন। বাজার পেরোলেই ইস্টিশন।’

‘লোকে কি বছরভরই এ পথ ধরে?’

লোকটা বললে, ‘এই পোষ থেকে জ্যষ্ঠি তক। এখনও মাঝে মাঝে কাদামাটি। আসলে জায়গাটা আবাদ। কিছু কিছু চোতেলির ফসল এখানে-সেখানে এখনও আছে। কোথাও যাওয়া হবে?’

‘গঙ্গাপার। এসো গো ভোমু বাবাজি।’ বলেই বাবাজি সড়ক থেকে মাঠে নামল এবং মেঠোপথে এগোতে লাগল।

সামনে প্রায় দীপ্তিহীন সূর্য। ওই যেন দেখা যায় বাঁশের সাঁকোর লম্বা খোঁটা। ওই দুটো লোকে সাঁকো পার হচ্ছে। সামনের দিক থেকে আঁকাবাঁকা মেঠোপথটা ধরে আসছে কয়েকজন লোক, মাথায় বোঝা, তাড়িয়ে আনছে একজোড়া কালো ছাগল। পথের ডাইনে-বাঁয়ে চৈতালির ছোটো ছোটো খেত। আধশুকনো কাদার ওপর ছোটো-বড়ো পাখির পায়ের ছোটো-বড়ো চার আঙুলের ছাপ কোথাও ঘুরে-ফিরে, কোথাও সিধে চলে গেছে। যখন জল ছিল, জলে মাছ বা ওদের খাবার মতো কিছু ছিল, তখনই পাখিগুলো এসে বসত। বসত বক, বসত কাদাখোঁচা, বসত খঞ্জনা, তৃষ্ণা পেলে কাক চিল ও কিনারে বসে জলে ঠোঁট ডুবিয়েই আকাশপানে গলা তুলে জল গিলত। ওই তো শুকনো কাদায় জমে আছে গোরু ছাগলের খুরের, শিয়াল কুকুরের পায়ের ছাপ। একটা দাঁড়কাক তখন এক জায়গায় নরম কাদায় বসে ঠোঁট দিয়ে খুঁড়ে বোধহয় কেঁচো বা চিতি কাঁকড়া বার করছে। খানিক তফাতে চরছে এক জোড়া ঘুঘু। ঘুঘু দুটো হঠাৎ উড়ে গিয়ে খানিক তফাতে বসল।

দুজনে এগোতে এগোতে এসে পড়ল সাঁকোর ধারে। নীচে ঝিরঝিরে জল খাল, এক জায়গায় খান দুই ডিঙি কাত হয়ে আছে। খালের ওপার বরাবর খড় ও টিনের বাড়ি-ঘর। পাড়ের গায়ে কালকাসুন্দি, ভাঁট, শিয়ালকাঁটা, আকন্দ ছোটো ছোটো গাছ। তার মাঝে গোটা কয়েক তাল-খেজুর গাছ। সাঁকো। দুজনেই বাঁশের ওপর দিয়ে আগু-পিছু হয়ে, বাঁশের পাড় ধরে সাঁকো পার হয়ে ঘর-বাড়িগুলোর মাঝের শুঁড়ি পথ দিয়ে দ্যাখে বাজার। কিন্তু শেষ বেলায় এমন জায়গায় এত বড়ো বাজার। এত লোক, এত রকমারি সওদা-পত্র, এত লোকের সমাগম। রাস্তা বলতে কিছু নেই - সব কেবল মানুষ, সওদা-পত্র, হইচই, বচসা, দরাদরি, ভিখারি বোষ্টমের গান। বাজারের ওধারে দেখা যাচ্ছে স্টেশন ও সিগন্যাল, টেলিগ্রাফের তার।

সেদিন শুক্রবার। ভোম্বল আন্দাজ করলে, সেদিন হাটবার। সে মনে মনে ছড়া তৈরি করলে - ‘হাট বসেছে শুক্রবারে - খাল পেরিয়ে রেলবাজারে।’ এবং মনে মনে বললে, ‘বাবাজি যদি বেহালা বাজিয়ে গান ধরে তো বেশ হয়।’ কিন্তু বাবাজির সেদিকে মনই নেই। মানুষ-জনের মাঝ দিয়ে স্টেশনের দিকে চলেছে। অগত্যা ভোম্বলকেও তার পিছু নিতে হয়েছে।

হাটের বাইরে খালি খানকয়েক গোরুর গাড়ি। তার পাশে জোব্বা পরা, চোখে চশমা, মাথায় টুপি একটি লোক, চিৎকার করে চোখের ব্যামোর শিশিভরা ওষুধ বেচছে, খানিক তফাতে দোকান সাজিয়ে একজন বিক্রি করছে দাদের মলম, ম্যালেরিয়ার পাঁচন, হজমিগুলি – টকটক ঝাল ঝাল স্বাদ। আর এক - জায়গায় কাঁধে ঝোলা, হাতে একগোছা পাতলা বই নিয়ে একটি লোক সুর করে বিক্রি করছে ‘লক্ষ্মীর পাঁচালি, মানিক পিরের গান, সত্যপিরের ছড়া।’

সন্ধ্যা হয় হয়, ভাঙে ভাঙে। হাটের এধারে-সেধারে জ্বলে উঠেছে লন্ঠন, ডিবরি। ভোম্বলরা স্টেশনে পৌঁছতে পৌঁছতেই একখানা যাত্রী গাড়ি হুস হুস করতে করতে স্টেশন ছেড়ে কলকাতার দিকে চলে গেল।

বাবাজি বললে, ‘আজকের রাতখানা এই ইস্টিশানে কাটিয়ে কাল প্রথমেই যে গাড়ি পাবো তাতেই রওনা, বুঝলে বাবাজি।’

ভোম্বল বললে, ‘হু।’

—‘কিন্তু আমি মনে করি, তুমি ঘরে ফিরে গেলেই ভালো হত।’ - ভোম্বল জবাব দিলে না।

দুজনে স্টেশনে প্ল্যাটফরমে এসে কাঁধের ঝোলা নামিয়ে একখানা বেঞ্চিতে বসল। ভোম্বলের পা দুখানা ব্যথা করছিল। একটু আরাম বোধ হতে লাগল৷

সামনে আঁধার কালো গ্রাম। আকাশে সাঁঝের তারা। প্ল্যাটফর্ম প্রায় জনশূন্য। বাবাজি একটা বিড়ি ধরিয়ে টানতে টানতে বললে, “কলকাতায় পৌঁছে কোথাও থামা নয়, সিধে হাওড়ার পোল। পোলের ধারের ঘাটে নেমে গঙ্গায় ডুব। তারপর কাছাকাছি কোনও হোটেলে মহাপ্রাণীকে ঠাণ্ডা করে, পোল পেরিয়ে একেবারে হাওড়ার ইস্টিশান। ইস্টিশানে খোঁজ নিতে হবে, ‘ছিক্ষেত্তের’ ‘টেনের’ টাইম কখন, আর তোমার টাটা নগরের ‘টেন' কখন ছারবে। আগে ছাড়লেই ভালো হয়। তোমায় বসিয়ে দিতে পারব।”

ভোম্বল বললে, ‘আমি নিজেই গাড়ি খুঁজে নিয়ে বসতে পারব।’

এই স্টেশনেও আড়ানির মতো রাত বেশি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রী-গাড়ি, মালগাড়ি যাতায়াত করতে লাগল। স্টেশনের পাশেই বাজার। ভোম্বলদের খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধা হল না। সে কয়েকবার বাজার ঘুরে এল। বাবাজি এক সময়ে বেহালা বাজিয়ে গান ধরতেই একে একে অনেক শ্রোতা জড়ো হয়ে গেল। তারা কেউ বাজারের, কেউ হাটের, তাদের কেউ পাশের গাঁয়ের মানুষ। তাদের মধ্যে একজন ছিল বাউল। লোকটি বুড়ো, তার মুখে পাকা দাড়ি, মাথায় পাকা চূড়া, গায়ে গেরুয়া আলখাল্লা, কাঁধে ভোট কম্বল ও ঝুলি, হাতে একতারা। দুই বাবাজিতে কথায় কথায় আলাপ হল। সে যাচ্ছে কেঁদুলি না ওই দিকে কোথায়। ভোম্বল সেদিককার কোনও খবরই রাখে না। দেশের মধ্যেই তার জানা জগৎ যে কত ছোটো। কেউ তাকে বলেও না যে, আগে দেশকে দেশের মানুষকে জানো। তারপর দৃষ্টি দিয়ো বাইরে দূর-দূরান্তরে।

হঠাৎ যেন কি হল, দুই বাবাজিতে বেহালা ও একতারা বাজিয়ে একসঙ্গে গান ধরে দিলে এবং শ্রোতাদের মধ্যে একজন হাতে তালি বাজিয়ে তাল দিতে লাগল। একতারা-বেহালা বাজে কোঁ কোঁ বং বং বং কোঁ-কোঁ বং বং, তালি চট চট চট চট আর বাবাজিদের পায়ে নূপুর বাজে রুনুঝুনু। স্টেশনের বাবুরা, এমনকি পুলিশও ছুটে এসে সেই আনন্দমজলিশে জমায়েত হল। এদিকে যে টেলিফোন বাজছে ক্রিং-ক্রিং-ক্রিং - সেদিকে বাবুদের কারোর - কান নেই। সবাই একমনে শুনছে - ‘ও আমি একদিনো, না দেখিলাম তারে।’ ভোম্বলের মন যেন কেমন হয়ে গেল।

খানিক পরে নাচ-গান থামল। এক ফোঁটা মধুর চারদিকে যেমন পিঁপড়ে জমায়েত হয় এবং তার ওপর এক ফোঁটা জল পড়লে যেমন পিঁপড়েগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে যেদিকে সেদিকে ছড়িয়ে পড়ে, নাচ-গান-বাজনা থামতেই শ্রোতারাও তেমনি ছড়িয়ে পড়ল। দু-চারজন মাত্র একটি করে পয়সা দিলে।

তারপর স্টেশনটা আধো-অন্ধকার ও নিঝুম হয়ে গেল। সামনেও অন্ধকার। দু-চারটে জোনাকি যেন আঁধার স্রোতে ভেসে চলে গেল। কোথা থেকে ভেসে একটা উড়ে এসে ভোম্বলের কাঁধে বসে পিটপিট করতে করতে উড়ে গেল। দূরে দেখা যাচ্ছে, গ্রামের দু-একটি আলো। ভেসে এল শিয়ালের ডাক যেন তেপান্তরের মাঠ থেকে -তারপর ভোম্বলের রাত কেটে গেল প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে শুয়ে।

ভোরের আলো ফুটতে ফুটতেই তাদের যাবার গাড়ি আসবার ঘণ্টা। তারপর টিকিট কেটে যাবার জন্যে প্ল্যাটফর্মে আসতেই বুড়ো বাবাজি বললে, ‘চলেন আগে -মাঝে পিছে ভিড় হয়।’

তিনজনে প্ল্যাটফর্মের আগে গিয়ে দাঁড়াতেই হুস করে স্টিম ছাড়তে ছাড়তে স্টেশন কাঁপিয়ে গাড়ি এসে থামল। বরাত জোরে তিনজনে একটি প্রায় খালি তৃতীয় শ্রেণির কামরা পেয়ে গেল। তাতে মাত্র কয়েকটি যাত্রী শুয়েছিল। একজনের মাথার ওপর শার্সিবন্ধ জানলার কোলে ছিল হাতখানেক খালি জায়গা। ভোম্বল সেখানে গিয়ে বসতেই ইঞ্জিন গলা-ভাঙা-সিটি দিয়ে একটা হ্যাঁচকা টান মেরে আস্তে আস্তে চলতে শুরু করলে।

ভোম্বলের মন আনন্দ ও ভয়ে ভরপুর। সে জানলার শার্সি - নামাবার উদ্যোগ করতেই বাবাজি বললে, ‘এখন খুলো না। ঠাণ্ডা বাতাস আসবে। রোদ উঠলে খুলো।’

ভোম্বল অগত্যা ঠাণ্ডা শার্সিতে কপাল ঠেকিয়ে আধো-অন্ধকার সচল পল্লিদৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইল।

গাড়ি চলতে লাগল, ঘটর ঘটর ঘটর—

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%