কান্তিনগরে

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

বেশ বেলা উঠেছে। ভোম্বল জোরে হাঁটছে। এক একবার পিছন ফিরে দেখছে, পদ্মদিদির বর ধাওয়া করেছেন কিনা! -না, কেউ নেই।

কিছুদূর গিয়ে আবার পিছন ফিরে দেখলে। ঐ যে দূরে একখানা বাইসাইকল আসছে না? পদ্মদিদির বরেরও তো বাইসাইকেল, দেখেছে। তিনি আসছেন কী?

ভোম্বলের বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো। কিন্তু লুকোবে কোথায়? দু'ধারে ক্ষেত। তার ধানগুলো কাটা হয়ে গেছে। পাটও নেই। কেবল ক্ষেতের ওপর ধান ও পাটের কাটা গোড়াগুলো একটু একটু বেরিয়ে আছে। খান কয়েক অক্ষত দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু ক্ষেতগুলো তার কাছ থেকে এত দূরে যে, সেখানে পৌঁছতে না-পৌঁছতেই বাইসাইকেল, এসে পড়বে।

পথের ধারে একটা খেজুর গাছ রয়েছে। তার গোড়ার চারধারে ভাঁট, কালকাসুন্দি, চারা শেওড়া ও ঘন কচুর ঝোপ। ভোম্বল তাড়াতাড়ি ঝোপে ঢুকে পড়লো। ঝোপটা তার গায়ের ধাক্কায় দুলছে। ভোম্বল দু'চারটে গাছকে দু'হাতে চেপে ধরে থামিয়ে দিলে। তবু তারা অবাধ্যের মতো মাথা দোলাতে লাগলো।

তারপর বোধহয়, মাত্র মিনিট তিনেক কাটলো। কিন্তু ভোম্বলের মনে হলো সময়টা অনেকক্ষণ। তবুও বাইসাইকেল, আসে না। এদিকে গা বেয়ে কাঠ-পিঁপড়ে উঠছে, কাঁধে একটা শুঁয়োপোকা পড়লো, একটা বুনো মাকড়শা তার সামনে তাড়াতাড়ি জালবোনা শুরু করে দিলে। পিঠে মশা কামড়াচ্ছে, পায়ের নিচে কেঁচো শুড়শুড়ি দিচ্ছে, আর তো বসা যায় না!

হঠাৎ খটাং সোঁ সোঁ শব্দ কানে এলো। তারপরই একখানা বাইসাইকেল সাঁ করে চলে গেল। যে চালাচ্ছিল ভোম্বল তাঁকে দেখতে পেল না, চিনতেও পারলো না। তবু সে কষ্ট সয়ে ঝোপে লুকিয়ে রইলো! মিনিট কতক কেটে গেলে বেরিয়ে এলো। সাইকেল, যেদিকে যাচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ে চেনবার চেষ্টা করলো, লোকটা কে? পথটা গেছে বাঁ দিকে বেঁকে। দুধারে বড় বড় গাছ। মোটা মোটা গুঁড়ির আড়ালে চলন্ত গাড়ির ওপর মানুষটিকে চেনা সহজ নয়। পদ্মদিদির বর কী? ভোম্বল আস্তে আস্তে এগোতে লাগলো।

সামনে গাঁ। গাঁ'য়ে পৌঁছতে পৌঁছতেই বেলা গেল। এই গাঁ'য়ের নামই বোধহয় কান্তিনগর! মাঝে মাঝে ঢাকের আওয়াজ কানে আসছে। তাহলে এ গাঁ'য়েও পূজো হয়? বাড়ির জন্যে তার মন কেমন করে উঠলো। সে যদি এ সময়ে বাড়িতে থাকতো! তার ওপর সারাদিন পথ চলেছে; ক্ষিদের আগুনে পেট জ্বালা করছে। তবু সয়ে গেল। না—না, আর বাড়ি নয়। যত দূরেই হোক, একেবারে সেই টাটানগর।

গাঁয়ে ঢুকে দেখে, ছেলে-মেয়েরা নানা রঙের নতুন পোশাক পরে বোধ হয় ঠাকুর দেখতে চলেছে। ঐদিকে বোধহয় পুজোমণ্ডপ। ভোম্বল তাদের পিছন পিছন চললো।

ছেলে-মেয়েগুলোর সাজের কী বাহার! এদিকে গায়ের রঙ মিশ কালো, মাথার তেল কপাল ও রগ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তার ওপরই সিঁথে কাটা হয়েছে! দু'একজনের চুল আবার সজারুর কাঁটার মতো খাড়া। ছেলেগুলোর গায়ে লাল, হলদে, বেগুনি রঙের সাটিনের কোট বা ছিটের কামিজ। কোট আর কামিজের হাতাগুলো বড়, ধুতির কোঁচা পেটের ওপর পোঁটলার মতো ঠেলে উঠেছে। সকলেরই পায়ে বাদামী রঙের গোড়-তোলা ফিতে বাঁধা জুতো। কারুর জুতো পায়ের চেয়ে বড়। খুলে যাবার ভয়ে সে পা ঘষটাতে ঘষটাতে চলেছে। কারুর জুতো ছোট। সে গোড়ালিতে কাগজ গুঁজে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। মাঝে মাঝে যন্ত্রণায় মুখ বেঁকিয়ে হাসছে; সঙ্গীদের দেখাচ্ছে, জুতো জোড়া ঠিকই হয়েছে—পায়ে লাগছে না। কেউ আবার উল্টো করে জুতো পরেছে।

মেয়েগুলোর নাকে নোলক, কানে মাকড়ি, গায়ে লাল, নীল, হলদে ঘাগরা; খালি পা। তারা তেল-জবজবে চুলগুলোয় অ্যালবারট্ কেটে, কেউ বেশী ঝুলিয়েছে, কেউ খোঁপা বেঁধেছে। কোন কোন মেয়ের পরনে রাঙা ডুরে—চারধারে ঘাঘরার মতো ফুল আছে। সকলের মুখেই হাসি।

ভোম্বলেরও নতুন জামা-কাপড় পরতে ইচ্ছা হলো। বাড়ি থাকলে সেও আজ সাজগোছ করে ঠাকুর দেখতে যেতো!

সামনেই একখানা আম-কাঁঠালের বাগান। গাছগুলোর গুঁড়ির ফাঁক দিয়ে একটা মস্ত চণ্ডীমণ্ডপ যেন দেখা যাচ্ছে। তার সামনে লোকজন চলা-ফেরা করছে। বাগানের বাইরে দিয়ে পথ। তবুও বাগানের ভেতর দিয়ে কয়েকটা ছেলে-মেয়ে চললো চণ্ডীমণ্ডপের দিকে। ভোম্বল চললো পথ দিয়ে। যেতে যেতে দেখলে, একখানা বাড়ির বাইরের দিকে একটি তিন-চার বছরের পেট মোটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। তার মাথায় ঝাঁকড়া চুল, বগলে একখানা ডুরে। মেয়েটা কী যেন হাতের মুঠো থেকে চেটে চেটে খাচ্ছে। মনে হচ্ছে বাতাসা। ঐ যে কবজি থেকে রস গড়াচ্ছে। মেয়েটার সামনে হাত দুই তফাতে একটা সাদা-কালো রঙের কুকুর তার মুখের দিকে হ্যাংলার মতো তাকিয়ে জিভ বার করে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে মুখ চাটছে আর লেজ নাড়ছে।

ভোম্বল কুকুরটাকে তাড়া দিলে। তাতে কুকুরটা লেজ নামালো মাত্র। কিন্তু মেয়েটা বাড়ির ভেতর দিলে ছুট্। ছুটতে ছুটতে তার বগলের ডুরেখানার একটা আঁচল খুলে গিয়ে ধুলোয় লুটোতে লাগলো। ভোম্বলের ভারি মজা বোধ হলো।

ভোম্বল চণ্ডীমণ্ডপের সামনে গিয়ে দেখলে, অনেক লোক জড় হয়েছে। প্রতিমা সিংহাসনে উঠেছে। সে মনে মনে ঠিক করলে রাতখানা সেখানে কাটাবে। কিন্তু এখন যা ক্ষিদে। সে ঢাকীদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। সেই সময় কর্মকর্তার ভুলে আর তার বরাতগুণে এক কোঁচড় মুড়ি-নারকোল জুটে গেল। সেই সঙ্গে পেয়ে গেল খান আষ্টেক বাতাসা। কর্তা বোধহয় ভাবলেন, ভোম্বল বুঝি বাজনদারদের লোক—কাঁসি বাজায়। তাদের মুড়ি-নারকোল দিতে দিতে ভোম্বলকেও বললেন,—“কোঁচড় পাত ছোঁড়া।”

ভোম্বলও কোঁচড় পাততেই তিনি তাতে মুড়মুড় করে মুড়ি-নারকোল ঢেলে দিলেন।

মুড়িগুলে আউশের, বেশ টাটকা। দেখতে বেঁটে বেঁটে, গায়ে লাল ছিলে, খেতে মিষ্টি ও মুচমুচে। ভোম্বল চণ্ডীমণ্ডপের একধারে দাঁড়িয়ে মুড়ি-নারকোল চিবুতে লাগলো!

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%