স্টেশনে দুই আলাপি

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

ভোম্বল কাছে গিয়ে দ্যাখে সেই টকটকে লাল আলোটা গুমটিরই বটে। হুস হুস করতে করতে একখানা ইঞ্জিন তার সামনে দিয়ে বাঁ দিক থেকে ডানদিকে চলে গেল। ইঞ্জিনে তখন কয়লা দিচ্ছে। রেলপথের পাশে ইঞ্জিনের উনুনের আগুনের আভা ইঞ্জিনের সঙ্গে ছুটছে। মাথাকাটা চিমনি দিয়ে ধোঁয়ার সঙ্গে জোরে বার হচ্ছে ফুলকি। চলতে চলতে ইঞ্জিনখানা হঠাৎ জোর দিয়ে ঘনঘন হুস হুস করতে করতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

ওই দেখা যায় খানিক তফাতে স্টেশন। ডাইনে-বাঁয়ে দুটি প্ল্যাটফরমের শেডের তলায় দুটিমাত্র আলো জ্বলছে। দূরে-কাছে দেখা যাচ্ছে সিগন্যালে লাল-সাদা আলো।

কিন্তু পাখিওয়ালা কই? দুটি প্ল্যাটফর্ই যে ফাঁকা। ওই যেন ডাইনের প্ল্যাটফর্মের আফিস ঘরের সামনে দিয়ে বাঁক কাঁধে ওভারব্রিজের দিকে কে আসছে, পাখিওয়ালা কী? হাঁ, পাখিওয়ালা বটে।

ভোম্বল এ প্ল্যাটফরমের কিনারে দাঁড়িয়ে ডাকলে, ‘উস্তাদজি-ই-ই।’

পাখিওয়ালা থমকে দাঁড়াল; তার দিকে তাকাল এবং প্ল্যাটফর্ম থেকে লাইনে নেমে লাইন পার হয়ে এ প্ল্যাটফর্মের ধারে এসে খাঁচাসুদ্ধ বাঁকটা ও নলগুলো তার ওপর রেখে এক লাফে প্ল্যাটফর্মে উঠে এল। তারপর বললে, — হামি তো মন করলাম তুমাকে আটকাল বা। যেত্তা ঝুট-ঝামেলা। উ লোককা কেয়া?’

ভোম্বল বললে, ‘এখন গাড়ি আছে? চলো, ওই বেনচিতে বসি। যা ঠাণ্ডা।’

হাঁ। ভারী জাড়া - বলে পাখিওয়ালা নলগুলো বাঁকে বাধতে লাগল।

তারপর দুজনে এসে গায়ে-মাথায় বেশ করে আলোয়ান জড়িয়ে বেঞ্চিতে সুস্থির হয়ে বসল৷

সামনে-পিছনে অন্ধকার, নিঝুম গ্রাম। জনহীন স্টেশন। অফিসঘরের খড়খড়ি দেওয়া দরজা-জানালা বন্ধ। ভোম্বলের মুখের সামনে মশার ঝাঁক। নাকে লাগছে বন-জঙ্গল ও পাঁকের গন্ধ। শেডের তলায় বুনো পায়রার বাসা। বোধ হয় শীতে কয়েকটা পায়রা হুম হুম করে কাতরে উঠল।

ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, ‘উস্তাদজি, তোমার খাঁচায় কী কী পাখি? ওদের শীত করছে না?’

পাখিওয়ালা বললে, “হামি ‘উস্তাদ’ নেহি। হামার নাম শিউনন্দন –”

ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, ‘তবে রসিক যে তখন ‘উস্তাদজি' বলে ডাকছিল?’

—‘উ লোক লাক তামাশা করে। দু'বচ্ছর কা উপর উ লোককা সাথে হামার জান-পছন্দ। আচ্ছা আদমি—মেহনতী আদমি। গাঁও মে উর ঘর হাম দেখা। বেচারা হামার মাফিক গরিব। কি করবে? ভাগওয়ানকা মরজি। নসিব!’ - বলে পাখিওয়ালা একটু চুপ করে রইল। তারপর বললে, ‘হামার খাঁচায় ইধার বুলবুলি, উধার দোয়েল। আখুন রোঁ ফুলায় গুলি মাফিক হুয়া। ডানার ফাঁকে মাথা ঘুষিয়ে ঘুমাচ্ছে। বাংলা মুলুককা জাড় ভারী না আছে। চিড়িয়া মরে না। পশ্চিম কা জাড় ভারী, আদমি মর যাতা। তুমহার ঘর কিধার? ইস্কুল মে পড়তা?’

ভোম্বল বললে, ‘যাবো টাটা।’

শিউনন্দন চমকে উঠল। বললে, ‘টাটা! কই আছে হুঁয়া?’

- “না, কারখানায় কাজ শিখতে যাব।”

শিউনন্দন যেন আরও অবাক হল। জিজ্ঞেস করলে, ‘ঘর মে তুমহার কে আছে? পিতাজি-মাতাজি?’

ভোম্বল বললে, ‘না। চাচাজি আছে।’

শিউনন্দন জিজ্ঞেস করলে, ‘ইস্কুল মে লিখা-পড়া শিখো না?’

—‘শিখি৷’

—‘তবে কেনো যাবে? এবং একটু চুপ করে থেকে আবার বললে, ‘হামার গাঁও কাছে এক হাট আছে। ইস্কুলে হামি পুরা এক বরষ লিখা-পড়া শিক্ষা।’

ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, ‘ছাড়লে কেন? তোমাদের দেশের অনেকে তো কারখানায় কাজ করে। তুমি কেন করো না? পাখি ধরে বেড়াও কেন?’

উত্তরে শিউনন্দন তার জগাখিচুড়ি ভাষায় যা বললে, ভোম্বল তা থেকে বুঝলে, “ওর এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে পড়তে, শ্লেটে লিখতে ভালো লাগত না; মাস্টার মারত। ওদের গ্রামের একটা লোক ছিল সে পাহাড় জঙ্গলে পাখি ধরে বেড়াত, চার-পাঁচ রকমের পাখির ডাক জানত। তার নাম ছিল বিহারি। ও তার সঙ্গে মাঝে মাঝে ভিড়ে গাঁ থেকে দূরে পাহাড়-জঙ্গলে যেত। তার কাছে পাখি ধরা ও পাখির ডাক ডাকতে শিখেছিল। ওর বাবা-কাকা পরের ভুঁই চাষ করত, মুনিষ খাটাত। কিন্তু ওকে লেখাপড়া শিখাতে চেয়েছিল চাকরি করার জন্যে। কিন্তু তা হল না। পরের ভুঁই চষতেও ওর ভালো লাগত না। বাবা গাল-মন্দ করত, বলত ‘বসে বসে খাবি। আমি আর কতদিন তোকে খাওয়াব? বুড়ো হয়ে পড়েছি।’ তখন ওর ভাই খুব ছোটো। গাঁওমে একবার মড়ক লাগল। গাঁয়ের দশ-পনেরো জন মারা গেল। বাবা-মাও মরে গেল। গাঁ থেকে পাঁচ ক্রোশ তফাতে থাকে ওর মামা। সে লেখাপড়া জানে, জমিদারের মুহুরি। খবর পেয়ে এসে ওর ছোটোভাইকে নিয়ে গেল। আর ওকে বললে, ‘অকর্মার ধাড়ি ছেলেকে আমি বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারব না; কাজ খুঁজে নাও।’ ও ভুঁই চষা, মুনিষ খাটা তো শেখেনি, পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে যা শিখেছে তাই সম্বল করে বেরিয়ে পড়ে। একদিন শুনতে পায় গাঁয়ের লোকের মুখে, মামা এসে ওদের বাড়ি আর কয়েক কাঠা ‘জমিন’ যা আছে সব চাচাকে বন্দোবস্ত করে দিয়েছে।

তারপর ও ‘পাখি’, আর পাখির খদ্দেরের খোঁজে কত গাঁ, শহর ঘুরেছে। পায়ে হেঁটে বহু জায়গায় গেছে, কত লোকের সঙ্গে ‘জানপছন্দ' হয়েছে। কলকাতার চেয়ে এধারে পাখির বড়ো বাজার আর নেই।

কলকাতার ‘টিটি’ বাজার আর ‘হাঁথি’ বাগান চিড়িয়ার মস্ত আড়ত। কলকাতায় গেলে ওখানে তার গাঁয়ের লোকের বস্তিতে কিছুদিন থাকে। তারপর আবার বেরিয়ে পড়ে। চিড়িয়া মিলে ফাগুন মাহিনায়। এখন চিড়িয়ার সময় না আছে। তবু ঘুরি। তুমি কলকাত্তা দেখেছো?”

ভোম্বল বললে, ‘না।’

কলকাত্তা ভারী শহর—বহুত আদমি, গাড়ি-ঘোড়া -টিরাম, হাওয়াগাড়ি। আরে বাপস্! শির ঘুর যাতা। গঙ্গাজিমে ভারী ভারী জাহাজ – গঙ্গাজিকা পানি আচ্ছা।

ভোম্বল বললে, ‘হাওয়া গাড়ি? ও বুঝেছি মোটরগাড়ি। ছবিতে দেখেছি। খুব জোরে চলে, হুস হুস আওয়াজ দেয়। না?’

শিউনন্দন বললে, ‘হাঁ।’

ভোম্বল তার হিন্দি-বাংলা মিশানো কথাগুলো একমনে

শুনতে লাগল।

পাখিওয়ালা আবার বললে, ‘হামার ঘর মে কই নেহি৷ তব ভি গাঁও কা ওয়াস্তে মন কাঁদে।’

এদিকে রাত ক্রমে বেশি হচ্ছে, ঠাণ্ডা বাড়ছে, গাড়িরও দেখা নেই। নির্জন, নিঝুম স্টেশন। আধা অন্ধকারে পথের আলাপি এক ঘড়ছাড়া বাঙালি কিশোর ও এক হিন্দুস্তানি তরুণ পাখিওয়ালা পাশাপাশি বসে কথা কইছে। যাই ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, ‘তুমি এখন কোথায় যাবে?’

কলকাত্তা। সামনে মাঘ মাহিনা। হুঁইসে পায়দলে চিড়িয়া খোঁজে গাঁও গাঁও ঘুরব।

—‘কীসে কলকাতা যাবে?’

-‘টিরেন মে।’

-‘আমারও যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমার কাছে রেলের মাশুল নেই। আচ্ছা, এই লাইন ধরে যাওয়া যায় না৷’

পাখিওয়ালা বললে, ‘ভারী মেহনত হোবে। কেতনা পিসেনজার মাশুল না দেয়, গাড়ি চাপে।’

ভোম্বল বললে, ‘ওটা তো চুরি করা। এখন কোন দিকে যাবার গাড়ি আসবে? পুবের না পশ্চিমের? কলকাতা তো পশ্চিমে?”

-‘হ্যাঁ।’

সেই সময় তারা যে প্ল্যাটফর্মে বসেছিল, সেই প্ল্যাটফর্মে ও বিপরীত দিকে স্টেশন ঘরের দিকে

দুটি একটি করে যাত্রী আসতে লাগল, স্টেশন ঘরের দরজা ও তার পাশে ওয়েটিং শেডের ফটক ও টিকিট দেবার ঘুলঘুলির কাঠের ঢাকনা যেন খুলে গেল; ঠঙাঠঙা শব্দে ঘণ্টা বেজে উঠল। গাড়ি আসছে। তারা দুজনে যে প্ল্যাটফর্মে বসেছিল তার ওপর দিয়ে গায়ে কম্বলের অলস্টার-জামা, মাথায় ময়লা-পাগড়ি, কাঁধে ছোটো মই, হাতে গার্ড বাতি, একটি লোক পায়ের নাগরাই খটখট শব্দ করতে করতে প্ল্যাটফর্মের এধার থেকে ওধার যেতে লাগল আলো জ্বালতে জ্বালতে।

এদিককার মতো ওভারব্রিজ দিয়েও পোঁটলা-পুঁটলি হাতে টিনের বাক্স ঝুলিয়ে আসতে লাগল, আধ ময়লা কাপড় চোপড় পরা, গায়ে আধ ময়লা চাদর- র‍্যাপার জড়ানো মেয়ে-পুরুষ। এল জাল ঘাড়ে, বাঁক কাঁধে খালি হাঁড়ি ও শোলার গোছা ঝুলিয়া জনকয়েক জেলে। আসতে লাগল ঝুড়ি কোদাল কাঁধে সার বেঁধে মাটি-কাটা মজুর। এবং আরও কত সাধারণ মলিন-বেশপরা গ্রামের মেয়ে-পুরুষ এসে জড়ো হতে লাগল। কোনও বিশেষ কাজে বা রুজির সন্ধানে সেই শীতের রাতে চলেছে সবাই ঘর ছেড়ে। চারধারের অন্ধকার গ্রামগুলো থেকেই এল তারা। সবাই থার্ড ক্লাসের যাত্রী। তাদের মুখে ভয় ও উদ্বেগের ছাপ। সেই জনতার মধ্যে ফরসা কাপড়-পিরান পরা, গায়ে পশমি আলোয়ান জড়ানো, গলায় কমফরটার, পায়ে গোড়-তোলা জুতো-মোজা, হাতে চামড়ার বড়ো ব্যাগ বা মুটের মাথায় বাক্স-বিছানা চাপিয়ে এলেন দু-চারটি ভদ্রলোক। তাঁরাও গ্রামের এবং ইন্টার ক্লাসের মানে দেড়াভাড়ার যাত্রী, সেই জনতার দলে একদম বেমানান, যেন মুড়ি-মিছরি। দেখতে দেখতে স্টেশনটা কথাবার্তায়, হাঁকাহাঁকিতে, চলায়, মোটঘাট ফেলার রাখার শব্দে গমগম করতে লাগল। ও প্ল্যাটফর্ম থেকে আসতে লাগল টিকিটে ছাপ দেওয়ার ঘটাং ঘটাং আওয়াজ তারই মধ্যে শোনা গেল, দূর ও কাছের সিগন্যাল ফেলার শব্দ ঘ্যাঁচ-ঘটাং। সেই সঙ্গে সিগন্যাল দুটোর আলোর লাল রং চকিতে হয়ে গেল সবুজ। ভোম্বল মনে মনে খুঁজছিল খাবারের দোকানের সেই লোকটিকে যে পাখিওয়ালাকে পুলিশের হাতে দেবে বলে শাসিয়েছিল। সেই ভিড়ে সে উর্দিপরা লাঠি হাতে তকমাআঁটা পুলিশকে ঘুরতে দেখছে, কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছে না কোথাও তারই মধ্যে সেই খাবার দোকানের খাবারের কাচের বাক্স কাঁধে ঘুরছে সেই ঢ্যাঙা ছোকরাটা; ঘুরছে পান-সিগারেটওয়ালা। ওরা হাঁকছে, “খাবার-গরম খাবার; ‘পান-চুরে এট -।’

তারপর আবার শব্দ হল - ঠঙা ঠঙা ঠঙা। গাড়ি আসছে -গাড়ি আসছে। ওই একবার ইঞ্জিনের সিটি শোনা গেল। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। তারপরই স্টেশন কাঁপিয়ে এল স্টিম ছাড়তে ছাড়তে কালো চকচকে ইঞ্জিন। যেন সেই শীতের রাতেও ছুটতে ছুটতে ঘেমে নেয়ে গেছে এবং তার পিছনের যাত্রী-বোঝাই গাড়ির সারি। তার কামরাগুলোর জানালার কাঠের পাল্লা বা কাচের শার্সি বন্ধ মাঝে মাঝে দুটো-একটা খোলা। তারপরই দরজা খোলার, জানালা পড়ার শব্দ, ঠেলাঠেলি, ওঠানামা, ধমক-অনুনয়-ডাকাডাকির আওয়াজ। মজুররা সকলেই চায় এক কামরায় উঠতে। সুতরাং কামরার দরজায় ভিড় ও ঠেলাঠেলি। জানালা ও দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভিতরের একটু অংশ - অল্প আলো ও ভিড়ের একটুখানি। গাড়ি - স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। অবশেষে সকলেই এক রকম করে উঠল। তারপর কালো-পোশাক পরা, মুখে গার্ড-বাঁশি, হাতে গার্ড-লন্ঠন গার্ড সাহেব মাথার ওপর লন্ঠন তুলে নাড়তে নাড়তে বাঁশি বাজালেন ফুরররর; ওদিকে ঘণ্টা পড়ল ঠং ঠং ঠং। গাড়ি চলা শুরু করল প্রথমে আস্তে। ভোম্বল চলন্ত গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ির সারি ক্রমে স্টেশন ছেড়ে বাইরের অন্ধকারে যেন মিলিয়ে যেতে লাগল। শেষে ব্রেকভ্যানের পিঠে আঁটা লাল আলোটিও গেল মিলিয়ে। ও গাড়ি চলেছে দুর্গাপুরের পথে - তারপর – না, না, ভোম্বল আর কখনো সেখানে ফিরে যাবে না।

ক্রমে স্টেশন নির্জন হয়ে আধা অন্ধকারে ডুবে যেন ঘুমোতে লাগল। আবার সব নিঝুম, নিথর। ঝিঁঝি ডাকছে। পেঁচা ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। সেই কাঠের বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসে তারা দুটিতে আলাপি।

উর্দিপরা, গার্ড-লণ্ঠন হাতে একজন পয়েন্টসম্যান সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। শিউনন্দন তাকে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলে, ‘কলকাতা যাবার গাড়ি কখন আসবে?’

সে বললে, ‘দেরি আছে।’

-‘কত দেরি?’

-‘দু ঘণ্টা বাদ আসবে ডাঁকগাড়ি। উসকো একঘণ্টা বাদ পিসেনজার।’

ভোম্বল জিজ্ঞেস করলে, ‘এখন রাত কত?’

লোকটা কোনো জবাব না দিয়ে কাশতে কাশতে চলে গেল।

শিউনন্দন পকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরিয়ে খুব জোরে একটান দিয়ে কাশতে কাশতে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললে, ‘ডাঁকগাড়ি ইস্টেশনে ধরে না। হামি বলি কি তুম ঘর চলা যাও। জুটমুট কাহে ঘুমতা?’

শিউনন্দনকে ওই দোকানের লোকে বলেছে, ব্যাধ; কেউ বলেছে, আড়কাঠি কিন্তু ভোম্বল দেখছে লোকটির মন স্নেহ-মমতায় ভরা। বললে, ‘না। আমি আর ফিরব না।’
ফিরে যাওয়ার উপদেশ শুনতে বা কথাটা ভাবতেই তার মন বিদ্রোহ করছে। এত বড়ো পরাজয় সে কিছুতেই স্বীকার করবে না। সে আবার বললে,’ তোমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আমি যদি পাখি ধরে বাজারে বেচে বেড়াই?’

শিউনন্দন বললে, ‘আরে! ই কোন বাত? তোম যাবে টাটা-কারখানা মে কাম শিখবে। আমার সাথ চিড়িয়া ধরবে?’

-‘আমি বলছি, পাখি ধরে বিক্রি করে পয়সা জমিয়ে খাওয়া, থাকা, রেলের মাশুল জোগাড় করবার কথা।’

-‘হাঁ হাঁ, ও হাম সমঝিয়েছি। ইস মে কেতনা মেহেনত, তখলিফ জানো?’

ভোম্বল হতাশ হল। একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলে, ‘তোমার হাতিবাগান যাওয়া সহজ, না টিটি বাজারে যাওয়া সহজ? এখান থেকে কলকাতা কতদূর? তুমি রেলে চেপে কোন স্টেশনে নামবে শিয়ালদা?’

শিউনন্দন হাসলেন; বললে, ‘তোম না জানে শিয়ালদা, না জানে কোলকাত্তা – টাটা যাবে?’

ভোম্বল অপ্রস্তত্ত হয়ে ভাবতে লাগল। সে দেখছে, তার ভূগোলের যেটুকু জ্ঞান হয়েছে তা যৎসামান্য; এই নিরক্ষর পাখিওয়ালা দেশের সম্বন্ধে যা শিখেছে তার জানার তুলনায় অনেক।

সে বসে ভাবতে লাগল। এদিকে শীতের নিঝুম রাত গড়িয়ে চলল; শিউনন্দন গুনগুন করে ভজন ধরে দিলে।
একবার ভাবলে, সে বিনা টিকিতেই রেলে চাপবে। আবার ভাবলে, শিউনন্দনের হাতিবাগানের বাসার ঠিকানা জেনে নিয়ে আড়ানি থেকে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পৌঁছবে সেখানে। সে একখানা বইয়ে পড়েছে জার্মানি না কোন দেশে ছাত্রেরা গাঁয়ের পথে দু-দশদিন ঘোরে, চলার পথে চাষিদের, খেত-খামারের কাজে সাহায্য করতে করতে চলে। সেজন্যে চাষিরা তাদের খাবার বা পারিশ্রমিক দেয়। তারা কেউ কেউ চলে সাইকেলে, কেউ কেউ চলে পায়ে হেঁটে। সঙ্গে থাকে বই; এতে নাকি তাদের শিক্ষা হয়। পথে আসতে আসতে সেও তো খেত-খামারে চাষিদের কাজ করতে দেখেছে। তাদের সাহায্য করলে কি তারা তাকে ছাত্র বলে রাতের আশ্রয়, খাবার বা পয়সা দেবে না? শিউনন্দন চলে যাচ্ছে যাক। ভোম্বল তো রাতের আশ্রয় পেয়েছে। কাল চারধারে গ্রামের খেত-খামারের কাজে যোগ দিয়ে সে খাবার বা পয়সা রোজগার করবে। এইভাবে সে পথ চলবে। কিন্তু এই আশ্রয়টুকুতে সে না পাচ্ছে আরাম, না পাচ্ছে ভরসা। শিউনন্দন চলে গেলে সে হবে একেবারে একা। এই নির্জন প্ল্যাটফর্মে, ঠাণ্ডায়, কাঠের বেঞ্চিতে সে ঘুমোবে কি করে। হয়তো পুলিশ এসে ভবঘুরে বা চোর অথবা স্বদেশি ছোকরা বলে এসে কে তাকে ধরে নিয়ে যাবে? এদিকে তার চোখ দুটো মাঝে মাঝে ঘুমে জড়িয়ে আসছে। শিউনন্দনের কণ্ঠে আর গান নেই। সে বসে বসে ঢুলছে। হঠাৎ খাঁচার পাখিগুলো কিচির-মিচির করে উঠল। ভোম্বল দেখলে মস্ত একটা ছুঁচো খাঁচার কাছ থেকে ছুটে পালাচ্ছে। শিউনন্দনেরও তন্দ্রা ছুটে গেল। সে ঝুকে খাঁচার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘চুহা।’

এমন সময় ঠঙা ঠঙা ঠঙা শব্দে বেজে উঠল, ঘণ্টা, ঘ্যাঁচ-ঘটাং শব্দে পুবের সিগন্যাল ফেলার শব্দ হল, কিন্তু প্ল্যাটফর্মের আলো জ্বালল না, যাত্রীও দেখা গেল না, কেবল স্টেশন ঘরের মস্ত দরজাটা খুলে গেল - অফিস ঘর থেকে গার্ড-লণ্ঠন হাতে, কালো মস্ত উর্দিপরা স্টেশন-মাস্টার প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ালেন। পয়েন্টসম্যান গেল সামনের দিকে লাইন ক্লিয়ার দিতে। ডাকগাড়ি আসছে। ভোম্বল পুব দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখলে, গাঢ় অন্ধকারে - তিনটে লাল, সাদা, সবুজ আলো ঝিকিমিকি করতে করতে এগিয়ে আসছে এবং মিনিট খানেকের মধ্যেই আলোগুলো সমেত একখানা ইঞ্জিন ছুটে এসে স্টেশন কাঁপিয়ে ধুলো উড়িয়ে একসার বগি নিয়ে ঘটঘট শব্দে ঝড়ের বেগে তার সামনে বিপরীত প্ল্যাটফর্মের পাশ দিয়ে পশ্চিম দিকে ছুটে চলে গেল। ওই দেখা যায় তার ব্রেকভ্যানের পিঠের লাল আলোটা ক্রমে ছোটো ও চাকার ঘটাঘট শব্দ ক্ষীণ হতে হতে মিলিয়ে গেল। আবার সব অন্ধকার ও নিঝুম। ভোম্বলের মন কেমন করে উঠল।

এর পর ‘পিসেঞ্জার।’ সে এসে দাঁড়াবে ওই বিপরীত প্ল্যাটফর্মে। তার পথের আলাপি শিউনন্দন তাতে চেপে চলে যাবে। হয়তো ওর সঙ্গে আর কোনও দিন দেখাই হবে না। লোকটি কত ভালো।

রাত ঝাঁ ঝাঁ করছে; প্রহরে প্রহরে দূরে কোথাও শিয়াল ডেকে উঠছে। তারা দুটিতে বেঞ্চিতে বসে ঢুলছে। এবার বোধহয় পশ্চিম দিক থেকে গাড়ি আসছে। ওই যে সিগন্যালের আলোর রং বদলে গেল, সিগন্যাল ফেলার শব্দও হল, ঘ্যাচাং ঘট। কিন্তু যাত্রী তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না, বোধহয় মালগাড়ি আসছে।

শিউনন্দন সজাগ হয়ে বললে, ‘হামি উ প্লাটফর্ম যাতা। টিকস্ কাটে গা।’ এবং বাঁকটা তুলে নিলে। ভোম্বল বললে, ‘আমিও ওই প্ল্যাটফর্মে অফিসঘরের পাশে ওই বেঞ্চিতে বসব। এখানে একা থাকতে হবে।’

দুজনে প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে, লাইন পার হয়ে বিপরীত প্ল্যাটফর্মে উঠে খালি বেঞ্চিখানাতে বসল। তার একটু পরেই ছুটে এল একখানা মালগাড়ি এবং না থেমেই স্টেশন কাঁপিয়ে হুস হুস শব্দে ছুটে যেতে লাগল। তার স্টেশনটা ছাড়তে লাগল বহু সময় - ওয়াগন যেন শেষই হয় না। তাদের পাশেই টিকিট কালেকটারের ঘর, ওজন যন্ত্র, দেওয়ালের গায়ে কয়েকটা গ্যাসের পিচকিরি। সেগুলোর গায়ে লেখা - ‘ফায়ার।’


তারপরই তারে ঝুলছে ঘণ্টা, মানে হাত আড়াই লম্বা রেললাইন, তার ছেঁদায় গলানো - রয়েছে বাজাবার একটা বল্টু।

দুজনের কারো মুখেই কথা নেই। বন্ধ ঘরের মধ্যে টেলিফোনের আওয়াজ হল - ঠং ঠং ঠং। তারপরই গলার আওয়াজ পাওয়া গেল - “থার্টি টু-ডান ঠিক সময়ে ‘রান’ করছে? টি আই-ম্যাক সাহেব আসছে? হ্যাঁ হ্যাঁ - সব ঠিক আছে। হ্যাঁ-হ্যাঁ।” এবং দরজা খুলে এ এস এম বেরিয়ে এসে হাঁকলেন, ‘এ তেওয়ারিই -ই- তেওয়ারি -ই-ই-’। দূরে থেকে জবাব এল - ‘সব ঠিক আছে।’


তার একটু পরেই স্টেশনটা মানুষ জনে সরগরম হয়ে উঠল, তবে আগের মতো নয়। রাত তখন অনেক। শিউনন্দন উঠে গিয়ে ‘টিকস’ কেটে আনল।

খানিক পরে এসে থামল ‘পিসেঞ্জার’। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ছুটতে ছুটতে এল পাঁচ-ছটা পুলিশ। তারা হুট হুট করে গাড়িগুলোর প্রত্যেকটি কামরার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গিয়ে কি যেন খুঁজল এবং নেমে এল। যারা উঠছিল, যারা ভেতরে ছিল সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত।

কেউ বুঝতে পারে না, ব্যাপার কি? এই অবস্থায় শিউনন্দন কোন ফাঁকে কোন কামরায় যে উঠল, ভোম্বল জানতে পারলে না। যাবার সময়ে সে বলেও গেল না। গাড়ি ছাড়তে দেরি হচ্ছে। দুজন যাত্রী ভোম্বলের সামনে দিয়ে যেতে-যেতে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, ‘পুলিশ দুজন স্বদেশি ছোকরাকে খুঁজছে। তারা নাকি এই গাড়িতে পালাচ্ছে।’

তারা ভোম্বলের দিকেও তাকাল। তাদের একজনার কথায় অস্পষ্ট শব্দ ভোম্বলের কানে এল, ‘বয়স নাকি ষোলো-সতেরো বছর।’

ভোম্বল বুঝতে পারলে না, ও দুটো লোক কি সাদা! পোশাকের পুলিশ না সবজান্তা প্যাসেঞ্জার? ততক্ষণে ট্রেনখানার আগা-পাছতলার তল্লাশি শেষ। ঘণ্টা পড়ল, গার্ড সাহেব বাঁশি বাজালেন - ফুররর, এবং হাতের লন্ঠন মাথার ওপর তুলে নাড়তে লাগল। তবু গাড়ি নড়ে না। অবশেষে সিটি দিয়ে একটু পিছেয়ে এসে, সামনের দিকে এগিয়ে চলল যেন জোরে ও রাগের সঙ্গে।

কয়েকজন পুলিশ ভোম্বলের সামনে দিয়ে সদর্পে যেতে যেতে তার দিকে ফিরে তাকাল। তাতে ভোম্বলের মন একটু চঞ্চল হল। সে ফিরে দ্যাখে তার পাশে এসে বসেছে একটি লোক। তার সামনে মেঝেয় মস্ত বোঁচকা। সে ভোম্বলকে জিজ্ঞেস করলে, ‘এই ট্রেন থেকে নামলে, গাঁয়ে যাবে? আমি যাব সেই পাতখালি, এই আড়ানির পাশে মাকালের দেড় ক্রোশ দক্ষিণে। আঁধার রাত পথটা ভালো নয়, সঙ্গে মাল। ভোরের ‘অপিক্ষায়' থাকি।’

ভোম্বল কোনও জবাব দিলে না। লোকটা আবার জিজ্ঞেস করলে, ‘আসছো কোথা থেকে? যাবে কোথায়?’

ভোম্বল ফাঁপরে পড়ল; তার প্রথম প্রশ্নের জবাব দিলে, ‘আসছি গোয়ালন্দর দিক থেকে।’

-‘ইস্টিশনের নাম কী?’

ভোম্বল বিরক্তির সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিলে। লোকটার এত কৌতূহল কেন এবং একটু বিরক্তির সঙ্গে বললে, ‘সব স্টেশন চেনো?’

উদিকে যাতায়াত আছে কি না। দেখি চিনতে পারি।

কোনও জবাব না দিয়ে ভোম্বল কাঠ হয়ে বসে ভাবতে লাগল, কখন যে ভোর হবে?

লোকটাও আর কিছু জিজ্ঞেস না করে পকেট থেকে কৌটা বার করে তা থেকে একটা বিড়ি তুলে নিয়ে ধরিয়ে টানতে লাগল।

এই সময়ে আবার ঠঙা-ঠং শব্দে ঘণ্টা পড়ল। এবার গাড়ি আসছে পশ্চিম দিক থেকে। যাবে পুবে। এবারও আসছে ‘পিসেঞ্জার।’

গাড়ি এসে স্টেশনে থামার আগে সেই একই ঘটনা। একই দৃশ্য। এবার স্টেশনে যাত্রী-সংখ্যা খুবই কম-কম উঠল, কম নামল। এই গাড়িখানাই দুর্গাপুর পৌঁছয় প্রায় ভোরে। এই গাড়িতেই ভোম্বল সেই প্রথম ভুল করে শালুকডাঙায় নেমে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পড়েছিল, চরমাদারিপুরে। এমন ভুল সে আর করবে না। গাড়ি চলে যেতে স্টেশন ফাঁকা হয়ে গেল।

ভোম্বলের বিরক্তিবোধ হতে লাগল। শীতের রাত কী লম্বা। যেন শেষই হতে চায় না, ঠাণ্ডায় আড়ষ্ট হয়ে ধীরে এগোয়। কখন যে রোদের ছোঁয়া পাবে।

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%