সাতগেছে জোড়াবটতোলে

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

ভোম্বল উঠে বসে দেখলে, একজন দাঁড়ি ডাঙায় নেমে নৌকোর গলুই ধরে আছে, মালতী পাড় দিয়ে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে যাচ্ছে, মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী নৌকো থেকে ঘাটে নামচেন। ভোম্বল অবাক হয়ে গেল। তার বেশ মনে পড়ছে, সে শোয় নি, ঘুমোয়ও নি। এমন কি করে হল?

যাহোক, সে তাড়াতাড়ি নৌকো থেকে নেমে মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রীর আগে পাড়ে উঠে গেল। সামনে একটি চওড়া রাস্তা সোজা চলে গেছে গ্রামের একেবারে শেষে। তারপরে বাঁ দিকে ঘুরেছে। রাস্তা দিয়ে তাড়াতাড়ি চলেছে মালতী আর তার পাশে পাশে চলেছে একটি লাল রঙের কুকুর। তার লেজটি সাদা। কুকুরটা চলতে চলতে এক একবার হুঁ করে, এক একবার জিভ বার করে মালতীর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। রাস্তাটির দু'পাশে খড় ও টিনের ঘর-বাড়ি, আম-কাঁঠালের গাছ, কলার ঝাড় ও বাঁশের ঝাড়, মাঝে মাঝে ছোট ছোট ক্ষেত। রাস্তার ওপর বাড়ি-ঘর ও গাছের ছায়া আড় হয়ে পড়েছে। বেলা পড়ে এসেছে।

মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী পিছন থেকে বলে উঠলেন, “চল—চল। ঐ যে বাঁ ধারে জোড়া নারকোলগাছ আর ধানের ছোট গোলা দেখা যাচ্ছে ঐ আমাদের বাড়ি। ঐ যে লতী ঢুকল—”

মালতী বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে একবার পিছন ফিরে তাকাল। ততক্ষণে বাড়ি থেকে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এসে পথের প্রায় মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল একটি লোক তার পরনে ছোট ধুতি, কাঁধে গামছা, গলায় কণ্ঠী। লোকটি নদীর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ভোম্বল বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতেই মুহুরিমশাই ও তাঁর স্ত্রী এসে পড়লেন।

বৃদ্ধা সবাইকে দেখে ভারী খুশি; বললেন, “এই ভাবছি, বেলা গেল— এখনও কেন দেখা নেই!”

ভোম্বল সকলের দেখাদেখি তাঁর পায়ের ধুলো নিতেই তিনি তার থুৎনি ছুয়ে চুমো খেয়ে বললেন, “বেঁচে থাক, দাদু। রোদে মুখখানা রাঙা হয়ে গেছে। ছেলেটি বেশ। চল চল।” তারপর ভেতরে গিয়ে বললেন, “হরে কোথায় গেল? ওকে একটা ডাব কেটে দিক। ও বৌমা, পাটিখানা দাওয়ায় পেতে দাও।” বলতে বলতে নিজেই সামনের খড়ের ঘরখানিতে ঢুকে একখানি শীতলপাটি এনে দাওয়ায় বিছিয়ে দিয়ে বললেন, “বসো—বসো। আশ্বিনে রোদে সব ভাজা ভাজা হয়ে গেছে। হাঁ গাঁ, আজ সারা দিনমানটা তোমাদের মুখে কিছু পড়ে নি? ও লতী, কোথা গেলি?”

মুহুরিমশাই বললেন, “পথে আমাদের কোন কষ্ট হয় নি, পিসীমা। কেষ্টপুরে নেমে রান্না-বান্না করে খেয়েছি। ওখানে একজন দুধ, নাড়ু, কলা দিয়েছিলেন। আপনি স্থির হয়ে বসুন। —বুঝলে ভোম্বল, আমার যখন পাঁচ বছর বয়স তখন মা মারা যান। আমরা দু'ভাইবোন ছিলাম। বাবা আর বিয়ে করেন নি; ঐ পিসীমাই আমাদের মানুষ করেছিলেন। উনি আমার বাবারও বড়। পিসীমা, এই ছেলেটির কথায় লিখেছিলাম—”

বৃদ্ধা বললেন, “সে আমি দেখেই বুঝেছি। ও হরি, হরি কোথা গেলি? একটু জল তুলে দে—”

মুহুরিমশাই বললেন, “হরি গেছে নৌকো থেকে মাল-পত্তর আনতে এল বলে। ততক্ষণ ও একটু জিরিয়ে নিক।”

“তা নিক—” বলে বৃদ্ধা ঘরের ভেতরে উঠে গেলেন।

ভোম্বল মুহুরিমশাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারলে, পিসীমা বারো বছর বয়সে বিধবা হয়ে তাঁদের বাড়িতে ফিরে আসেন। সেই থেকে একটি দিনের জন্যেও কোথাও যান নি। এখন বয়স আটাত্তর বছর। ভোম্বল লক্ষ্য করতে লাগল বৃদ্ধার মাথার বেশির ভাগ চুলই কাঁচা, দাঁতগুলো ঠিক আছে, চোখও খারাপ নয়, কোমরও দিব্যি সোজা, কেবল চোখের কোলে, গালে ও কপালে কতকগুলো রেখা পড়েছে, গায়ের রঙ ফর্সা, গলায় কণ্ঠী।

বাড়িখানি দিব্যি নিকানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। উঠোনের এক দিকে একটি মাটির বেদির ওপর একটি কালো তুলসীগাছ আর একদিকে কুয়ো। কুয়োর ধারে বেড়ার গায়ে উঠেচে একটি পুইগাছ ও পাশে একটি যুঁইঝাড়। বেড়ার বাইরে আছে একটি লাউ-মাচা। তার তলায় বেগুন ও লঙ্কার চারা। খানিক দূরে কলার ঝাড়। ঝাড়ে কাঁদি পড়েছে। কিছুদূরে ছিল একটি লেবুগাছ। তার ডালে টুনটুনি পাখির বাসা দেখা যাচ্ছে। গাছটির তলায় একটি বিড়াল ওৎ পেতে বসে গাছের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গ্রামখানি ভারী নিঝুম ঠেকছে।

কুয়োতলা থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে ভোম্বল আবার বারান্দায় বসল, কিন্তু চুপচাপ বসে থাকতে তার ভালো লাগল না।

মুহুরিমশাইয়ের পিসীমা বললেন, “ও বৌমা, এদের খেতে দাও। বোস লতী—ওর এই পাশেই বোস।”

লতী আস্তে আস্তে এসে শীতলপাটির একধারে বসল। মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী দুজনকে খেতে দিলেন, দুটি ছোট ধামীতে করে মুচমুচে মুড়ি, নারকোলনাড়ু ও ক্ষীরতক্তি। দুজনে খেতে লাগল। তাদের সামনে বসে রইলেন মুহুরিমশাইয়ের পিসীমা। তিনি দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলে উঠলেন, “দুটিতে বেশ মানাবে।”

কথা কয়টি শুনেই ভোম্বলের গলায় মুড়ি-নাড়ু আটকে গেল। আবার তার মাথায় চাপল নেশা! সে তাড়াতাড়ি থেয়ে বারান্দা থেকে নেমে সোজা চলে এল রাস্তায়।

মুহুরিমশাই বাইরে দাঁড়িয়ে তামাক খেতে খেতে পাড়ার একজনের সঙ্গে গল্প করছিলেন। ভোম্বলকে দেখে বললেন, “এই সন্ধ্যায় কোথায় যাচ্ছ?”

“এ—ই খানে।” বলে ভোম্বল নদীর দিকে এগোতেই তিনি বললেন, “ওদিকে এখন যাবার দরকার নেই। একটু পরে জোড়াবটতলার মন্দিরে গিয়ে কথকতা শুনে এস। নরহরিদা, যাবে নাকি?”

“হুঁ—যাব। গোবিন্দ ঠাকুরের কথকতা! অমন মিঠে গলা, বলবার অমন ঢঙ এ-তল্লাটে কারো নেই। গাঁয়ে আর সে কীর্তনও হয় না, যাত্রাগানও উঠে গেছে। গোবিন্দ ঠাকুর মরে গেলে, কথকতার পালাও বন্ধ হবে।”

“তা যা বলেছ। নাও — ধর।” বলে মুহুরিমশাই নরহরিদার হাতে হুঁকোটি দিলেন।

কথকতা শুনতে ভোম্বলেরও বড় ভালো লাগে। গল্পগুলো কি সুন্দর। রামায়ণ-মহাভারতের গল্পগুলোর সময়ে কি সে ছিল না?

তাদের দুর্গাপুরে সেবারকার কথকতায় কথকঠাকুরের সুর তার এখনও মনে আছে। সে মনে মনে সুরটা আউড়ে নিলে, “ত—খন ওর্জুন বলি— লে–এ–এন— ওহে স—খা — অ—”

মুহুরিমশাই নরহরিদার হাত থেকে হুঁকোটি নিয়ে ভোম্বলকে বললেন “ভেতরে চল।”

বাড়ির ভেতরে যেতে কিন্তু ভোম্বলের ইচ্ছা হচ্ছিল না।

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%