গোরুর গাড়িতে

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

সকাল থেকেই ভোম্বলের বুক দুড়দুড় করছে। বাড়ির বাইরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে একখানি ছই-ওলা গোরুর গাড়ি। ঐ গাড়িতে তাকে যেতে হবে নদীর ঘাটে। সে কয়েকবার ঘর-বার করল।

নায়েবমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার হাত কেমন আছে?”

ভোম্বল হাতখানা টিপে ও দুলিয়ে বললে, “অর্ধেকের বেশী সেরে গেছে।” বলেই হাতখানা টান করে ঝুলিয়ে দিলে। অমনি হাতখানা টনটন করে উঠল। সে আবার হাত গুটিয়ে নিলে।

নায়েমশাই বললেন, “বাঁধা থাক। বাড়ি গিয়ে খুলো।”

কিন্তু বাঁধা হাত নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে ভোম্বলের লজ্জা করতে লাগল।

রান্নাঘরের মধ্য থেকে আসছিল, পিতলের হাঁড়িতে হাতা নাড়ার ঠুং ঠাং শব্দ ও ভাতের মিষ্ট গন্ধ। ভোম্বলের আর দেরি সয় না। নিজের যাবার ইচ্ছা হলে সে না খেয়েই কোন সকালে বেরিয়ে পড়ত।

স্বরূপ জিনিসপত্র বাঁধা-ছাঁদা করতে করতে বললে, “সে মেড়োটা এখনও এল না?” তার কথা শেষ হতেই মাথায় প্রকাণ্ড বোঁচকা, বগলে একখানি পাকা বাঁশের লাঠি নিয়ে ঢুকল সুচি। লাঠিখানির গাঁটে গাঁটে পেতল লাগানো।

ভোম্বল দেখলে, তার গায়ে মেরজাই, গলায় চাদর, পায়ে হাওলদারী নাগরাই, মাথার চুল ও কপাল তেলে চক্‌চক্‌ করছে। সে বোঁচকাটা উঠোনে নামিয়ে লাঠিখানি তার গায়ে ঠেসান দিয়ে রাখল। ভোম্বলের ইচ্ছা হতে লাগল, লাঠিখানা হাতে তুলে দেখে। কিন্তু নায়েবমশাইয়ের জন্যে সে সুযোগ হল না।

খানিক আগেই সে স্নান করেছিল। ঠাকুর খেতে দিলে ভাত, ডাল, আলুভাজা, ঘি। সবই গরম। গালে দিলে মুখ পুড়ে যায়, পেটে গেলে গা দিয়ে ঘাম ঝরে। কিন্তু যাবার সময় এ-সব তুচ্ছ, এবং পরে মজার গল্পের বিষয় হয়ে উঠবে।

নায়েমশাই বললেন, “ব্যস্ত হয়ো না। রেল-স্টিমারের পথ নয়। আস্তে খাও”

ভোম্বল খেয়ে উঠে আঁচিয়ে এমনভাবে দাঁড়াল যেন তার আর তর সয় না।

গাড়িতে গিয়ে নায়েবমশাই বললেন, “তা হলে আর দেরি কেন? ওঠ। ওরে স্বরূপ, সব উঠেচে?”

“আজ্ঞে” বলে স্বরূপ উঠোনে এসে দাঁড়াল।

নায়েবমশাই বললেন, “আমি আর সঙ্গে যাব না।”

ভোম্বলের বারান্দা থেকে নামতে গিয়েই মনে পড়ল, কাকাকে প্রণাম করা হয় নি। সে অমনি নিচু হয়ে নায়েবমশাইয়ের পায়ের ধুলো নিতেই তিনি তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “দীর্ঘজীবী হও। ভগবান তোমায় সুবুদ্ধি দিন।”

শেষের কথাগুলোতে ভোম্বল ব্যথিত ও উত্যক্ত হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারে না, কেউ তাকে বোঝাতেও পারে না, তার বুদ্ধি কোনখানে কু। কিন্তু এখন তার মন যাবার আনন্দে ভরপুর। তাই কু-কথাগুলো তৎক্ষণাৎ মনে তলিয়ে গেল।

সে বাইরে গাড়ির সামনে গিয়ে দেখে, ভেতরে পুরু ওপর একখানি-আধ-ময়লা ছোট শতরঞ্জি পাতা। প্রায় শেষ দিকে কয়েকটি ছোট বোঁচকা, সরা-ঢাকা গলায় দড়ি-বাঁধা একটি ছোট নতুন হাঁড়ি ও বড় মানকচু। আর, এ সবের শেষে সুচির বোঁচকাটি। জিনিসপত্রেই ভেতরের জায়গার প্রায় সবটা জুড়ে আছে। ভোম্বল হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আলিমদ্দি গাড়োয়ান গাড়ির মুখ একটি তুলে বলদ দু’টো জুড়ে, নিজে উঠে বসল।

গাড়িও অমনি চলতে লাগল। সেই সঙ্গে পিছন থেকে কে বলে উঠল, “দুর্গা! দুর্গা!”

ভোম্বল ফিরে দেখে নায়েবমশাই। তাঁর এক হাতে হুঁকো। তিনি তাকে উদ্দেশ করে একটু চেঁচিয়ে বললেন, “পৌঁছে চিঠি দিও। সুচি, সাবধানে যাস।”

—“জী! হুজুর!”

সুচি ও স্বরূপ চলল গাড়ির পাশে পাশে। গাড়ির দোলায় ভোম্বলের মন দুলে উঠল। মনে হল, জায়গাটি বেশ।

গাড়ি চলল, কাছারিবাড়ি ছাড়িয়ে, পুকুরের ধার দিয়ে, বারোয়ারিতলার পথে। তারপর বারোয়ারিতলা বাঁয়ে রেখে, বাঁশতলার ছায়ায় ছায়ায় গিয়ে পড়ল পাগলাপাড়ায়। সেখান থেকে ডাইনে ঘুরতেই চোখে পড়ল দূরে গাছপালার ফাঁকে একটি পুরোনো মসজিদের বালিখাসা গম্বুজ। গম্বুজের মাথায় বসেছিল, এক জোড়া কালো পায়রা। ভোম্বলের ধারণা হল, এটে বোধ হয় সেই দরগা। সে মুখ বাড়িয়ে স্বরূপকে জিজ্ঞেস করলে, “ঐ দরগা দেখা যায় না?”

স্বরূপ বললে, “কৈ? ও—হাঁ—হাঁ”, ভোম্বল একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল। এখান থেকে রাতের বেলা চার প্রহরে চারবার কান্না শোনা যায়।

গাড়ি পাগলাপাড়া ছাড়াতেই গম্বুজটা আর দেখা গেল না।

কাঁচা-পাকা রাস্তা। তার কোথাও গর্ত, কোথাও ছোট জুলি, কোথাও ইটের সারি বেরিয়ে, কোথাও বা কাদা শুকিয়ে শক্ত হয়ে পায়ে পায়ে ধুলো হয়ে যাচ্ছে। গাড়ি দুলচে, নাচছে, লাফাচ্ছে। ভোম্বলকেও সেই সঙ্গে দুলতে হচ্ছে , ছইয়ের গায়ে মাঝে-মাঝে মাথা ঠুকে যাচ্ছে।

পাশ দিয়ে একখানি বাইসিকল ছড়ছড়, ঠং ঠং করতে করতে চলে গেল। গাড়ির বলদ দু’টো তাতে ভড়কে গিয়ে পথের ধারে খানায় নামে আর কি! আলিমদ্দি বহু কষ্টে তাদের সামলে নিয়ে পথের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল, বলদ দু'টোকে গাল ও মার দিতে দিতে বললে, “ছাইকেল কখন দেখ নি? ক্যামুন?”

বাঁ-ধারে একখানি বাড়ির পিছনে একটি কলার ঝাড়। কয়েকটা পাতা মাথা নুইয়ে বাতাসে এদিক-ওদিক নড়চে যেন কলাবউ মাথা নাড়তে নাড়তে বলছে, না, না, না। বাঁশগাছেরও আগায় কয়েকটি পাতা বাতাসে খুব তাড়াতাড়ি ঘুরচে যেন হাত ঘোরাচ্ছে। তার একটু দূরে বসেছিল একটি ফিঙে। ফিঙেটির মাথার ওপর দিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিকে উড়ে গেল একটা দাঁড়কাক। ফিঙেটি মাথা তুলে তার দিকে একবার তাকিয়েই সেই দিকেই দুলকি চালে উড়ে গেল। সামনের দিক থেকে ঘোড়ায় চড়ে ছাতা মাথায় আসছিল একটি লোক। তার গায়ে চৌখুপ্পী ছিটের গলাবন্ধ কোট, চাদরখানি পাকিয়ে পৈতের মতো করে বাঁধা। ঘোড়াটি ছোট। লোকটির পা দু'খানি মাটিতে বোধ হয় ঠেকে যায়, তাই, ছু'পাশে ফাঁক হয়ে আছে। ভোম্বল প্রথমে মনে করেছিল ডাক্তারবাবু। কিন্তু কাছে আসতেই দেখলে, ডাক্তারবাবুর মতো দেখতে বটে, তবে তিনি নন। এর ঘোড়াটাও অন্য রকমের। দেখে মনে হয় কোনকালে ছোটে না, অমনি খুটুখুট করে চলে। এ রকম ঘোড়ার পিঠে কে না চড়তে পারে? লোকটা গাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে গাড়ির দিকে একবার আড়চোখে তাকাল।

পথের ডানধারে একটি বড় পুকুর, যেন একটা দীঘি। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়েছিল কয়েকজন স্ত্রীলোক, পুরুষ ও কয়েকটি ছেলেমেয়ে। একটি বিধবা স্ত্রীলোক কাঁদছিল। আর, পুকুরে জন দুই লোক ডুব দিচ্ছিল আর ভেসে উঠছিল।

স্বরূপ পুকুরধারের একজনকে করে চেঁচিয়ে উঠল, “কি হল বিশ্বেসের পো?”

উত্তর এল “ছাওয়াল ডুবেছে।”

তাই শুনে ভোম্বলের কৌতূহল বেড়েই গেল। সে তাড়াতাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে গাড়ির পিছন দিকে যেতেই গাড়োয়ান চেঁচিয়ে উঠল, “গাড়ি ওলা হল। মাঝে সরে আসুন—” কিন্তু ভোম্বলের মন তখন গেছে পুকুরের তলায়—সেই ডোবা ছেলেটির দিকে।

সে দুর্গাপুরে একবার একটি ছোট মেয়েকে পুকুরের তলা থেকে তুলেছিল। ভোম্বল তখন পুকুর ধারে নাগেদের লিচুগাছে উঠে লিচু চুরির মতলবে ছিল। সে না তুললে মেয়েটি মরেই যেত। ভোম্বল গাড়োয়ানের কথায় কান না দিয়ে এক লাফে রাস্তায় নেমে ছুটে পুকুরধারে যাবার আগেই সুচি তার পথ আগলে বললে, “কুথা যান?”

ভোম্বল বললে, “পুকুরধারে—”

স্বরূপ বললে, “ওখানে গিয়ে কি দেখবেন? যে ডোববার সে তো গেছেই। যার গেল তার বুক ফাটছে। এই যে মেয়েলোকটা কাঁদছে ওরই ছাওয়াল। উঠুন—গাড়িতে উঠুন—”

ভোম্বল বললে, “আমি চেষ্টা করে দেখতাম, ছেলেটাকে— তুলতে পারি কি না—”

আলিমদ্দি গাড়ি থামিয়েছিল। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে, “আল্লাহ!” তারপর বললে, “তাকে তোলা কি আপনার ক্ষ্যামতা? পুকুরটাতে এক বাঁশ পানি। ঐ তো ছ'জন নেমেছে। ওরাই পারছে না। পুকুরটাতে প্রত্যেক বছর একটা করে ডোবে। ওর তলায় জিন আছে—”

ভোম্বল নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে সামনে দিয়ে গাড়িতে উঠে এল। কিন্তু শেষ দেখবার আগেই গাড়ি এগিয়ে গেল, পুকুর ও লোকগুলো গাছপালার আড়ালে ঢাকা পড়ল। কিন্তু স্ত্রীলোকটির কান্না শোনা যেতে লাগল।

পথের দু'টি পাশে ঘন ঝোপ-জঙ্গল। তার মাঝে মাঝে আশ-শেওড়া, বুনো কুল, খেজুর, আম-কাঁঠালের গাছ। পথের ওপর তাদের ছায়া। জায়গায় জায়গায় ঝোপের মাথায়, আশ-শেওড়ার ডালে ডালে জড়িয়ে আছে আলোকলতা। কোথাও বা ঝুমকোলতা, বনকলমী ও বুনো কাঁকরোল ঝোপের মাথায় লতিয়ে উঠেছে। ঝোপের তলায় পোকা খুঁটে খাচ্ছে কয়েকটা চড়ুই ও একজোড়া বুলবুল। কোন একটি গাছের ডালে পাতার আডালে বসে ডাকছিল একটা বসন্ত-বউরি—“টঙ্‌-টঙ-টক, টঙ-টাঙ্‌-টঙ“

খানিক যেতেই পথের দু'পাশের গাছপালা ও ঝোপ-ঝাড় পাতলাহয়ে এল। সামনে পড়ল ধানের ক্ষেত–ক্ষেতের পর ক্ষেত। বাতাসে দুলছে, ঝুমুর ঝুমুর আওয়াজ উঠছে, যেন লক্ষ্মীর পায়ে নূপুর বাজছে। তারই মাঝে এখানে-সেখানে দু'-একখানি আখের ক্ষেত—যেন হাজার সৈন্য সঙিন উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। ক্ষেতের কোলে মাথাল মাথায় কয়েকটি চাষী কি যেন করছিল। ঐ আখ ক্ষেতের ধারেই এক জায়গায় চাষীরা চালা বেঁধে খোলা বসাবে। গোরুতে আখমাড়াই কল ঘোরাবে। কল থেকে নল দিয়ে মাটির জালায় পড়বে তাজা আখের রসের ধারা। সেই রস বড় বড় খোলায় জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে গুড়। তার রঙ সোনার মতো, গন্ধ মিঠে, দানা মিছরির মতো। গুড়ের গন্ধে আসে বড় বড় নীল মাছি, মৌমাছি পিপঁড়ে ও বোলতা। খোলার উনুন জ্বলে আখের শুকনো ছিবড়ের গনগনে আগুনে। আখপোড়া গন্ধও লাগে ভারী মিঠে। দূর থেকে দেখা যায় আকাশের কোলে খোলার কালো ধোঁয়া। ভোম্বল তার সঙ্গীদের নিয়ে শীতকালে খোলায় যায় আখ খেতে। চাষীদের কাছে চেয়ে এবং না চেয়ে চুরি করে খায় অনেক আখ। এত খায় যে, চলতে গেলে পেটের মধ্যে আখে রস ঢক ঢক করে। আখের কত নাম! সবচেয়ে ভালো লাগে, ধলী!

হঠাৎ সে সামনে দেখতে পেল, নৌকোর মাস্তুল। নৌকো দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার গেরুয়া রঙের পাল দেখা যাচ্ছে, আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছে।

ভোম্বল আলিমদ্দিকে জিজ্ঞেস করলে, “এ জায়গার নাম কি?”

“নদীর পাড়”, বলে আলিমদ্দি বাঁ-ধারের বলদটার পিঠে এক ঘা লকড়ি কষে দিয়ে বললে, “পা চলে না, ক্যামুন? আজ ঘাটেই থাকবা? বাড়ি আর ফিরতি হবি নে?”

ভোম্বল বললে, “নদীর পাড়ে আর একখানা গাড়ি রয়েছে।”

“হেঁ। এ তো ভারী জ্বালায় পলাম রে! বেটা কুড়ের বাদশা। তুইও মরে চলেছিস—?” বলে আলিমদ্দি ডানধারের বলদটার তলপেটে খোঁচা দিলে। গাড়ি এবার বেশ জোরেই চলতে লাগল। কিন্তু পথে বালির ভাগ-বেশী। তার ওপর চাকার টানা দাগ রেখে গাড়ি চলেছে; খস-খস হচ্ছে
হচ্ছে।

ঘাটের ওপর একখানি ছইওয়ালা গোরুর গাড়ি লেজ তুলে দাঁড়িয়েছিল। গাড়ির একদিকের চাকায় দুটো বলদ বাঁধা। গাড়োয়ান গাড়ির ভেতর থেকে একটি কালো পোরটম্যানটো টেনে বার করে মাথায় নিয়ে নিচে নেমে গেল। ভোম্বলরাও গিয়ে পড়ল গাড়িখানির কাছে। আলিমদ্দি এক লাফে নিচে নেমে বলদ দু'টোকে জোয়াল থেকে খুলতে লাগল । স্বরূপ এগিয়ে এসে বললে, “নামুন দা'বাবু। এই ছুচি, লইকোয় মাল নিয়ে যা—”

ভোম্বল গাড়ি থেকে নেমে পাড়ে দেখে, ঘাটে একখানি পানসী বাঁধা। তার সামনের পাটাতনে দাঁড়িয়ে সেই ভদ্রলোকটি, সে যাকে সেদিন সন্ধ্যায় নায়েবমশাইয়ের সঙ্গে গল্প করতে দেখেছিল।

স্বরূপ বলে উঠল, “মুহুরিমশাই আগেই পৌচে গেছেন। যান দা'বাবু উঠুন—”

এবার মুহুরিমশাই তার দিকে ফিরে তাকিয়ে সহাস্যে বললেন, “এস ভোম্বল। সাবধানে নেমে এস–”

ভাঙা পাড়। একটি পথ এঁকে-বেঁকে নেমে গেছে জল অবধি। জলের কাছ বরাবর কালো আঠালো মাটি দেখা যাচ্ছে। তার ওপর রয়েচে পায়ের ছাপ। নদীর নাম চিত্রা। মন্দ চওড়া নয়। রোদে জল চিক্‌চক্‌ করছে। একটি জায়গা আয়নার মতো মসৃণ ও ঝক্কঝকে। ছোট ছোট ঢেউ এসে ছলাৎ ছলাৎ করে কূলে লাগছে না। এপারের ঘাট নির্জন, ওপারে কয়েকটি মেয়ে-পুরুষ স্নান করছে। একখানি বড় নৌকো ফিকে সবুজ রঙের পাল তুলে উজানে চলেছে। তার ভেতর থেকে জল ছেঁচে ফেলা হচ্ছে । দু'খানি জেলেডিঙি দাঁড় টেনে পাশাপাশি খুব তাড়াতাড়ি ভাটিতে চলেছে যেন 'বাচ' দিচ্ছে

ভোম্বল নিচে নেমে একেবারে নৌকোর সামনে গিয়ে ভেতর দিকে তাকিয়ে দেখে, একখানি তোশকের ওপর শতরঞ্জি পাতা। তার ওপর মাথায় কপাল অবধি ঘোমটা দিয়ে একটি স্ত্রীলোক বসে। তাঁকে দেখতে কতকটা তার কাকিমার মতো কিন্তু বয়স তাঁর চেয়ে কিছু কম, আর তাঁরই পাশে একখানি ডুরে পরে বসে আছে সেই মালতী। ভোম্বল এতক্ষণে বুঝলে মালতী এই মুহুরিমশাইয়ের মেয়ে।

সে একটু আড়ষ্টের মতো উঠে দাঁড়াতেই মুহুরিমশাই বললেন, “জুতে| খুলে ভেতরে গিয়ে বসো। আমিও তো তোমার কাকা। খুঁজলেই কায়েতের সম্পর্ক বেরোয়—”

ভেতর থেকে সেই স্ত্রীলোকটি চাপাগলায় বললেন, “এস বাবা, লজ্জা কি? আমিও তোমার কাকিমা হই। এখানে এসে বসো—”

ভোম্বল বললে, “বাইরেটা আমার ভালো লাগে।”

স্বরূপ বললে, “বাইরে লোদে মাথা ফেটে যাবে। বেলা পড়লে বাইরে বসবেন। এখন ভেতরে গিয়ে মাঠা’নের কাছে বসেনগা।”

ভোম্বল জুতো খুলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আস্তে আস্তে ভেতরে গিয়ে বসল। মুহুরিমশাইয়ের স্ত্রী বললেন, “দেখি লতী, তুই সরে বোস্ ওকে বসতে দে—?”

ভোম্বল বসল পান্‌সীর ছোট জানালাটার ধারে।

নৌকো একটু একটু দুলছে। মালপত্র তুলে মাঝির সাহায্যে ভেতরে গুছিয়ে রেখে, মুহুরিমশাই সামনে ছইয়ের মুখে বসলেন। সুচি গামছা মাথায় দিয়ে লাঠিখানা পাশে রেখে বসল সামনে পাটাতনে। তিন দেঁড়ে পান্‌সী। দাঁড়িদের একজন লগি তুলে ঠেলা দিয়ে নৌকোর মুখ একটু বার দিকে ফেরালো।

স্বরূপ ঘাটে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বললে, “মুহুরিমশাই, দা’বাবু নমস্কার। ভালোয় ভালোয় পৌঁছোন—”

গাড়োয়ান দু'জন বললে, “সালাম।”

ভোম্বল জানলা দিয়ে দেখলে ডাঙা সরে যাচ্ছে, পাশ দিয়ে খড়কুটো নিয়ে জল ছুটে চলেছে বিপরীত দিকে। গোটা কয়েক জল-মাকড়শা ও কতকগুলো কালো কড়ি পোকা জলের ওপর দিয়ে ডাঙার দিকে তীরবেগে ছুটে গেল। ভোম্বল সামনের দিকে ভালো করে দেখতে পেল না। কেবল তার চোখে পড়ল, রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ ও খান কয়েক সাদা মেঘ। বাতাস ছিল। একটু গিয়েই মাঝিরা পাল তুলে দিলে। ভোম্বল ডাঙাটা একবার দেখবার চেষ্টা করলে। কিন্তু চরমাদারীপুরের ভাঙা ঘাট ততক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%