খগেন্দ্রনাথ মিত্র
পুবদিক ফর্সা হল—
ভোম্বল মাথার কাছে জানলাটি খুলে দিতেই চোখে পড়ল শিশির ভেজা শিউলী গাছটি। ঐ যে কয়েকটা ফুল খসে পড়ল; একটা পড়তে পড়তে পাতায় রইল আটকে। সকালের ভিজে, ঠাণ্ডা বাতাসে, আলোমাখা আকাশ দেখে ভোম্বলের মনে পড়ল, সদ্য ছেড়ে আসা মাত্র চারটি দিনের চেনা চরমাদারীপুরের কাছারি বাড়ির উঠোনে সকালবেলাকার ছবিখানি। তার একধারে সেই ছোট বাংলা ঘরখানি। তার খড়ের চাল দিয়ে উঠছে ধোঁয়া। শিউলীতলায় রাঙা ডুরে শাড়ি পরা, ঝাঁকড়া চুল, একটি ছোটমেয়ে কোঁচড় ভরে ফুল কুড়োচ্ছে। আর, বারোয়ারীতলা থেকে ভেসে আসছে ঢাকের আওয়াজ — চটাং চটাং চটাং চটাং।
ভোম্বলের কাকিমা ঘরের বারান্দা থেকে উঠোনে নামতে নামতে বললেন, “ও ভোমু উঠে পড়। আটটায় পেয়াদাটার গাড়ি। মনে আছে?”
খোকন চৌকাঠ পার হতে হতে বললে, “মামা, ওঠ।”
ভোম্বল একলাফে বিছানা থেকে নেমে খোকনকে ধরতেই দে ‘আঁ-অ’ করে কেঁদে উঠল।
“দ্যুৎ! জংলী!” বলে ভোম্বল তাকে ছেড়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। ওদিকে নোনা গাছটার তলায় একটা সাহেব বুলবুল পোকা খুঁজতে খুঁজতে ঝংকার দিচ্ছে। বাড়ির পিছনে ডোবার ওপারে বাঁশঝাড়ে একটা বাঁশের আগায় বসে একটা ফিঙে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে আর মাঝে মাঝে ডাকচে—চিঁউ। দূরে কোথায় কোন গাছের গুঁড়িতে লম্বালম্বি বসে একটা বসন্ত অবিরাম মাথা কুটতে কুটতে ডাকছে—টঙ্ টঙ্-চক। ওদের ডাক শুনলেই মনে হয়, সব ফাঁকা, সব শূন্য, কোথাও কিছু নেই। কাঠঠোকরাদের মতো ওরাও গাছের গুঁড়িতে গর্ত করে। কিন্তু চেহারা কাঠঠোকুরার মতো সুন্দর নয়, বড়ও নয়। শীত-বসন্ত-গ্রীষ্ম সব কালেই ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি ওদের ডাক শোনা যায়! তবু নাম, বসন্ত বউরী!
খানিক পরে সুচিকে নিয়ে ভোম্বল চলল স্টেশনে।
সে রাতে যে ভাবে, যে বেশে স্টেশনে গিয়েছিল, আজ চলল তার উল্টো বেশ পরে—গায়ে নতুন শার্ট, পরনে নতুন কাপড়, পায়ে নতুন জুতো, মাথায় সিঁথে, মুখে বেপরোয়া ভাব, পিছনে নিজস্ব বোঁচকা ঘাড়ে, বগলে পাকা বাঁশের লাঠি, ষণ্ডামার্কা হিন্দুস্তানী পেয়াদা!
নিধু চক্রবর্তীমশায় বারান্দায় চৌকিতে বলে হুঁকো টানছিলেন। পাশে টগরার বাবা কি একটা পড়ে শোনাচ্ছিলেন। দুজনেই চোখ তুলে ভোম্বলের দিকে তাকালেন। কিন্তু কিছু বললেন না।
ভোম্বল নির্ভয়ে চলল।
সঙ্গে দেখা বোদের সঙ্গে। বোদে বললে, “আরে বাপ্! ফুলবাবু! কোথায় গিয়েছিলি? কবে ফিরলি? দাঁড়া—দাঁড়া—”
ভোঙ্গোল বললে, “এখন সময় নেই! আটটার গাড়িতে কাকার এই পিয়াদাটাকে তুলে দিতে হবে। ও যাবে দেশে—দ্বারভাঙা না ঘরভাঙ্গা কোথায়!” এবং তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতে যেতে খানিক দূর থেকে চেঁচিয়ে বলল, “দুপুরে আমতলার ঘাটে যাস। ওদেরও ডাকিস।”
তারপর হনহন করে চলল। বাজারের কাছাকাছি যেতেই কালা সাহেব তপেন—ছেলেরা বলে, টাপেন স্যানডাল' -'শাণ্ডেলের সঙ্গে দেখা। লোকটি খুব ইংরেজী বুলি আওড়ান—কেউ ওঁর ভুল ধরতে পারে না। উনি যেন কোন দেশী রাজার 'পা' মানে পি.এ বলেন, 'প্রাইম মিনিস্টার'। ভোম্বলেরা লোকটির মর্যাদা বুঝতে পারে না, তিনিও তাদের নগণ্য মনে করেন। পুজোর ছুটিতে বাড়ি এসেছেন, লক্ষ্মীপুজোর পরেই চলে যাবেন। ভোম্বলকে দেখে ঠোঁটে ধরা সিগারেটটা নাচাতে নাচাতে অস্পষ্ট ভাবে বললেন, “নটি বয়। হয়ার ডিড ইউ গো? ইওর আংকেল ওয়াজ ক্রাইং?”
শেষের কথাগুলিতে ভোম্বলের বুকে ধক করে একটা ঘা লাগল। সে কারে কান্না সইতে পারে না। সে তো চরমাদারীপুরে চোখের জল দেখেই এসেছে।
সে মাথা নিচু করে এগিয়ে গেল।
তারপর সুচিকে নিয়ে বাজারের ভেতর দিয়ে ভিড় ঠেলে চলল। পথের দুপাশে তরিতরকারি ভরা ঝাঁকা-ঝুড়ি-ধামা। কেউ বা ময়লা কাপড়ের উপর কয়েকটা বেগুন সাজিয়ে রেখেছে। কেউ বা মাটিতেই গোটা দুই কুমড়ো রেখে উবু হয়ে বসে আছে। ঐধারে মাছের বাজার—আঁশটে গন্ধে বাতাস ভারী ও বিশ্রী। বাজার ছাড়িয়েই কাঠগোলা, পাটের আড়ৎ। ঐ যে ঘাটে গায়ে গায়ে ছোট-বড় নৌকো বাঁধা। গোলায় ও আড়তে হাঁটুর উপর ধুতি পরা মজুরেরা কাজ করছে। ঐ ওপারে চলেছে যাত্রীবোঝাই খেয়া। আর, এপারে খেয়াঘাটের ধারে বাবলা বন, হলদে ফুলে ভরা শিয়ালকাঁটার জঙ্গল, আকন্দ ও চোরকাঁটার রাজ্য। তার পাশে অপেক্ষমান যাত্রীরা বসে। ঘাটের ওপর পাটনীর খোড়ো কুঁড়ে। পাটনীর নাম শিবু। ভোম্বল লোকটাকে চেনে। ওর সঙ্গে পারানি নিয়ে ভোম্বলদের একবার খুব ঝগড়া হয়।
ভোম্বল সুচিকে নিয়ে স্টেশনে ঢুকল। গিয়ে শুনলে, গাড়ি দেরীতে আসছে। পথের এক জায়গায় কি যেন হয়েছে। গাড়িখানা যাবে কলকাতায়, সব স্টেশনে থামতে থামতে। ‘মিক্সড্ ট্রেন’ কিনা—খানকয়েক ওয়াগন মাল-পত্রের, খান কয়েক বগি যাত্রীর। এ রকম গাড়িতে চড়তে ভোম্বলের ভালো লাগে না।
টিকিট-ঘরের ঘুলঘুলি তখন বন্ধ। সে সুচিকে নিয়ে ডাক রাখার সেই উঁচু বাক্সটার ওপর বসতে যেতেই নীল জামা গায়ে, মাথায় পাগড়ি একজন হিন্দুস্থানী বললে, “খোঁকা বাকস্মে চড়বে না।”
ভোম্বল বললে, “চড়লে কি হয়?”
—“ভিতরে ডাঁক আছে। পুলিস পাকড়াবে।”
ভোম্বল অবাক হল। সে রাতে তো কেউ তাকে বারণ করেনি। সে এদিক-উদিক তাকিয়ে দেখলে, কোথাও একটা পুলিসও নেই, আবার একখানা বেঞ্চিও খালি নেই। এক জায়গায় একখানা মাল-বওয়া খালি ট্রলি পড়ে ছিল। সে গিয়ে বসল তার উপর। সুচি বসল নিচে।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের সামনে রেললাইন। তার ওপরে ঢাকা বারান্দা। বারান্দার বাইরেও রেললাইন। এক জায়গায় দুখানা খালি ওয়াগন দাঁড়িয়ে ছিল। আর একটা লাইনে খান চারেক ওয়াগনে ছিল কুলিরা। লাইনের ধারে তোলা উনুনে তাদের কেউ কেউ রান্না চাপিয়েছিল। লাইনের ওপারে নদীর পাড়। তারপর জলস্রোত—নদী। ওপারে প্রায় সদ্য জেগে ওঠা একটুখানি চর—চরে মুথাঘাস, আগুন-জ্বলা ও দু'চারটি কাশফুল। পরপারে গ্রাম—সবুজ-কালো রেখা পুবে-পশ্চিমে মিলিয়ে গেছে।
স্টেশনের পিছন দিকে রেল-বাবুদের ইট বার করা ‘কোয়ার্টারস্’ ও প্ল্যাটফর্মের ধারে লোহার বেড়ার মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে একজোড়া মস্ত শিশুগাছের ছায়ায় বেশ একটু ভিড় হয়েছে। সেখান থেকে অল্প অল্প গানের আওয়াজ আসছে। প্ল্যাটফর্মের দু'দিকে ক্রোটন, কামিনী, টগর ও কাঠমল্লিকা গাছ।
ভোম্বল সুচিকে বললে, “গাড়ির দেরী আছে। তুমি বসো। টিকিটের ঘণ্টা পড়লেই আমি আসব।” বলতে বলতে সে উঠে চলে গেল। এবং এল যেখানে গান হচ্ছিল সেখানে। ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখে অন্ধ সাবের ফকির গান গাইছে—
“একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।”
ও গাইছে আর দু'চোখ দিয়ে জলের ধারা ওর বসন্তের চিহ্নভরা কালো গাল দু'খানা বেয়ে পড়ছে। ভোম্বল ওকে চেনে; থাকে বাঁকা খালের ওপারে দাশুড়ে গ্রামে। ও ভোম্বলদের পাড়ায়ও যায় —হাতে লাঠি, কাঁধে ঝোলা, পরনে ছেঁড়া ময়লা কাপড়। ও কেন কাঁদে? ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়েছে এই দুঃখে না, নিজে অন্ধ —মরে নতুন জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এসে সব চোখে দেখতে চায়? লোকটির বয়স অল্পই। ঐ গানটিই ওগায় সব জায়গায়। লোকে ওকে ভিক্ষেও দেয়।
ভোম্বল দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল। কিন্তু পরের কলি— ‘ওমা, হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে জগৎবাসী’— শেষ না হতেই টিকিটের ঘণ্টা পড়ল—ঠং ঠং ঠং।
ভোম্বল ছুটল প্ল্যাটফর্মে, এসে সুচিকে নিয়ে গেল টিকিট কাটতে। টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্মে ফিরে এসে দাঁড়াতেই ফুঁসতে ফুঁসতে গাড়ি এসে পড়ল।
তারপর হাঁকাহাঁকি, ছুটোছুটি, দরজা খোলা ও বন্ধ করার, মাল-পত্র নামানে৷-ওঠানোর শব্দে স্টেশন গমগম করতে লাগল। সুচি একখানা কামরায় উঠে গেল। ভোম্বল তবুও গেল না, গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। ভাবতে লাগল, এই গাড়ি যাচ্ছে কলকাতায়। কলকাতা সে দেখেনি। শুনেছে, শহরটার পশ্চিমে গঙ্গা, মিশেছে সাগরে সেই যেখানে লোকে তীর্থে যায়। পোল দিয়ে গঙ্গা পার হলেই হাওড়ার মস্ত স্টেশন। ঐ স্টেশন থেকেই ছাড়ে টাটানগরের গাড়ি। কিন্তু সব ফসকে গেল!
হঠাৎ গাড়ি ছাড়ার ঘণ্টার শব্দে তার চমক ভাঙল। দেখলে, সুচি জানলায় দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বলছে, “পরনাম।”
ইঞ্জিন সিটি দিয়ে একটা হ্যাঁচকা টান মারলে। গাড়িগুলো হুড়মুড় শঙ্গে এগিয়ে গেল। তারপর ভোম্বলের চোখের সামনে দিয়ে বায়স্কোপের ছবির মতো পরে যেতে যেতে স্টেশন ছেড়ে চলে গেল। ঐ দেখা যায়, ব্রেকভ্যানের পিছনটা, তারপর সব ফাঁকা! সব নিস্তব্ধ!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন