দুই যোদ্ধা

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

ভোম্বল যখন খেয়ে নায়েবমশাইয়ের সঙ্গে বারোয়ারিতলায় আবার ফিরে এল তখন পালা শুরু হয়ে গেছে।

মানুষের পাঁচিলের পিছন থেকে তার চোখে পড়ল সামিয়ানার তলায় ঝুলছে আলো, রঙ্গমঞ্ছে নড়া-চড়া করছে দু’টো মেয়ে পুতুল। সব নিস্তব্ধ ও স্থির। বাঁশি বাজচে—পুঁ-পুঁ-পুঁ― অমনি করে পুতুল কথা কইছে। নায়েবমশাই যেতেই সেই মানুষের পাঁচিল ফাঁক হয়ে গেল, চেয়ারও খালি হল৷

নায়েবমশাই বসতেই ভোম্বল বসল তাঁর পাশের চেয়ারে। তার সামনে সবাই মাটিতে বসে আছে। মঞ্চের সামনে একখানি মোটা কাপড় আড়াআড়ি করে টাঙানো। কাপড়খানির আসল রঙ তেল, ধোঁয়া ও ধুলোয় চাপা পড়েছে। পুতুলগুলোকে যারা নাচাচ্ছে তারা রয়েছে কাপড়খানির আড়ালে। কেবল দেখা যাচ্ছে দড়ি আর পুতুল। কুঁজী তখন কৈকেয়ীকে হাত নেড়ে, মাথা দুলিয়ে কুমন্ত্রণা দিচ্ছিল। আর বাঁশি বাজছিল, “পু পুঁ—পু পুঁ’ পুঃ—” যেন কুঁজী কথা কইছে।

ভোম্বলের ভারী মজা লাগল। কিন্তু ছেলে-মেয়েদের হট্টগোল আর থামে না। তারা নানা টিপ্পনী কাটে, হাসে, ঠেলাঠেলি ও মারামারি করে। দু’টো ছেলে তো মারামারি করতে করতে উঠে দাঁড়াল। বয়স্কেরা ছেলে-মেয়েদের ধমক দেয়। তবুও তারা থামে না। বয়স্কদের মধ্যেও হট্টগোল।

পর্দার আড়ালে যারা পুতুল নাচাচ্ছিল, ভোম্বল একবার দাঁড়িয়ে তাদের দেখতে চেষ্টা করলে, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না। কেবল দেখলে কয়েকখানি কালো পায়ের পাতা চলা-ফেরা করছে।

ক্রমে রামের বনগমনের সময় হল। দশরথ কাঁদে, কৌশল্যা কাঁদে, অযোধ্যাবাসীরা সবাই কাঁদে। তবুও ভোম্বলের দুঃখ হল না, কিন্তু সব ছেড়ে রাম যখন বনে চললেন, আর তাঁর পিছন পিছন চললেন সীতা ও লক্ষ্মণ—সেই দৃশ্যটি তার চোখে জল এনে দিলে। ছেলে-মেয়েরাও সবাই চুপ করল, বয়স্কদের মধ্যে কেউ কেউ চোখ মুছতে লাগল। মেয়েরা ছিল একধারে চিকের আড়ালে। ওরা তো একটুতেই কাঁদে। ভোম্বল রামায়ণ পড়েছিল। কিন্তু এই জায়গাটি যে এত মিষ্টি তা আজ তাকে বুঝিয়ে দিলে ঈশ্বর।

সে-ও বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরের পথে বেরিয়েছে। সেখানে তার জন্যে কাঁদবার, তাকে ছেড়ে সেই দুঃখে প্রাণত্যাগ করবার কেউ না থাকলেও বাড়ি কত মিষ্টি, কত আপনার, কত দিনের চেনা! বাড়ির জন্যে ভোম্বলের মন হু-হু করে উঠল।

তার মনে পড়ল বাড়ির ছবি। সেই ঘরের সামনে পরিষ্কার মস্ত আঙ্গিনা। তার পশ্চিম দিকে একটি ঝাঁকড়া কুলগাছ। কার্তিক-অঘ্রাণে গাছটি ফুলে ফুলে সাদা হয়ে যায়, কুল ধরে। মাঘমাসে কুলগুলো পুষ্ট হয়ে পেকে ও হলদে হয়ে অম্ল-মধুর রসে-শাঁসে ভরে ওঠে। কুলগাছটির পর কুয়োতলা। তার চারধারের শান দু-এক জায়গায় কেটে গেছে। ওধারে তারই পোতা কাগজিলেবুর গাছটি দিনে দিনে মস্ত হয়ে উঠেছে। তারপর একটি ডোবা। ডোবার পর বাঁশঝাড়। সন্ধ্যায় সেখানে শেয়াল ডেকে ওঠে, বর্ষায় ডোবাটা জলে ভরে যায়। তখন ব্যাঙের হাঁক-ডাকের বিরাম থাকে না।

আঙিনার উত্তরে রান্নাঘর। তার খড়ের চালে উঠেচে লাউয়ের লকলকে ডগা। ঘরখানির পিছনে একজোড়া নটকানা কলের গাছ। কাঁটালো সবজে ফলগুলো ফেটে সোনালী গুঁড়ো ঝরে পড়ে। গাছ দুটির পর উঁচু চাটাইয়ের বেড়া তার ওধারে পালেদের বাড়ি। বেড়ার ঠিক কোলেই মস্ত সজনে গাছ। যখন সজনে ফুল ফোটে তখন বাতাস তার গন্ধে ভরে ওঠে। বা’র দিকে সামনেও উঠোন। উঠোনে তিনটি আমগাছ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। তিনটি গাছই বুড়ো হয়ে গেছে, তবুও ফল দেয়, তাদের ডালে শালিকেরা বাসা বাঁধে, ভোরে দোয়েল বসে শিস দেয়। একটিতে আছে পরগাছা। দক্ষিণের বেড়া ঘেঁষে আছে একটি জাম ও একটি আমড়া গাছ। আর তাদেরই মাঝখানে দাড়িয়ে আছে বুড়ো চাপাগাছটি। ঐ দিকেই বেড়ার কোলে সে পুঁতেছিল একটি কলকে ফুলের গাছ। গাছটি হয়ে উঠেছে মস্ত। কলকে ফুলের মধু খেতে টুনটুনি আসে। দুপুরে যখন সব নিঝুম হয়ে যায় তখন আমগাছের ডালে বসে ঘুঘু ডাকে, “কেষ্টগোপাল, ওঠ – ওঠ-ওঠ—”। আর ঐ আমতলায় দাঁড়ালেই বাঁ দিকে দেখা যায়, নদী। তার ওধারে ধুধু বালুচর ও বুনোঝাউয়ের সবুজ বন। তারপর আকাশের কোলে ধোঁয়াটে নীল গ্রাম। বর্ষায় চরখানা রাঙা জলের বিশাল স্রোতে ডুবে যায়। তখন সারা দিনরাত পাড় ভাঙে ‘ঝপ-ঝপ'। গভীর রাতে জলের ডাক শুনে বুক কাঁপে।

এক এক সময় মনে হয়, নদী-তীরে কে যেন শাঁখ-ঘণ্টা বাজিয়ে পুজো করছে, আর বলছে, “ব্যোম্ ব্যোম্‌”। এই রাঙা জলে ভেসে আসে কত দেশ-বিদেশী নৌকো।

রামের বনগমনের সঙ্গে সঙ্গে পুতুল-নাচও শেষ হল। লোকজন চলে যেতে লাগল। ভোম্বলও স্বরূপের সঙ্গে বাড়ি এল।

ভোরে তার ঘুম ভাঙবার সঙ্গে সঙ্গে বারোয়ারিতলার পুতুলগুলো আবার যেন চোখের সামনে নাচতে লাগল।

সে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে উঠোনে নামতেই দেখতে পেল, কুয়োর ধারে শিউলীতলায় ডুরে শাড়ি পরা একটি মেয়ে ফুল কুড়োচ্ছে! আর, মাঝে মাঝে মাথা তুলে গাছটির দিকে তাকাচ্ছে।

ভোম্বলের সাড়া পেয়ে সে পিছন ফিরে তার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। ভোম্বলের মনে হল, সে মেয়েটিকে ফুল কুড়োতে বারণ করে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলে, ফুলে তার কি বা দরকার? মেয়েটা বোধ হয়, ফুলের বোঁটা শুকিয়ে গুঁড়ো করে তাতে কাপড় ছোপাবে। সে জিজ্ঞেস করলে, “ফুল কি করবে?”

মেয়েটি কোন উত্তর দিলে না, আর ফুলও কুড়ল না। কোঁচড়ের ফুলগুলোর দিকে এমনভাবে তাকাতে লাগল যেন তার মধ্যে বিশেষ দরকারী কিছু হারিয়ে গেছে, সেটিকে তার তখনই পাওয়া চাই।

ভোম্বল আবার জিজ্ঞেস করলে, “তুমি কে?”

মেয়েটি সপ্রতিভভাবে জবাব দিলে, “আমি মুহুরীবাবুর মেয়ে মালতী—”

ভোম্বল পিছন ফিরে দেখে, 'ঠাকুরমশাই' গামছা পরে তার পিছনে তামাকের গুল দিয়ে দাঁত মাজছে। মেয়েটিকে দেখে ভোম্বলের মনে পড়ল তাদের দুর্গাপুরের বুলবুলিকে। সেও ঐ রকম কালো, তাকেও অনেকটা ঐ রকম দেখতে। তার নাকটিও ঐ রকম লম্বা, টানা চোথ, জোড়া ভ্রূ, মাথায় কোঁকড়া চুল, মুখখানা ডিমের মতো, থুৎনিতে একটু টোল। তবে সে রোগা ও মাথায় একটু লম্বা।

“কেউ কিছু বলবে না। তুমি ফুল কুড়িয়ে নিয়ে যাও” বলে ভোম্বল তার দিকে একটু এগিয়ে গেল।

কিন্তু মালতী আর ফুল কুড়ল না, শিউলী গাছটির দিকে একবার তাকিয়ে দেখে, মুখের ওপরের কোঁকড়া চুলগুলো বাঁ হাতে সরিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেল। ভোম্বল নিজের মনেই বললে, “কী ভীতু!”

ঠাকুর কুয়োতলা থেকে খক-খক করে হেসে উঠল। হাসি শুনে ভোম্বলের বিরক্তিবোধ হল। কুয়োতলায় গিয়ে রুক্ষ স্বরে ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করলে, “হাসছ কেন? এতে হাসবার কি আছে?”

ঠাকুর বললে, “আমি 'হসী' নি। কাশুচি–”

ভোম্বল অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা কি মিথ্যাবাদী। কিন্তু সে আর কিছু বললে না, মুখ ধুয়ে ঘরে গেল।

নায়েবমশাই তখনও শুয়ে শুয়ে স্তোত্র আওড়াচ্ছেন। ভোম্বলকে জামা-কাপড় পরতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছ?”

ভোম্বল বললে, বেড়াতে এবং তাঁর দ্বিতীয় কথাটি শোনবার অপেক্ষা না করেই বেরিয়ে গেল।

তখন সবে রোদ উঠেছে। বারোয়ারিতলা থেকে সানাইয়ের স্তর ভেসে আসছে। মাথার ওপর দিয়ে কয়েকটি গাঙচিল ‘কেরে কেরে ডাকতে ডাকতে পূর্বদিকে উড়ে গেল।

সে বারোয়ারিতলা বাঁয়ে রেখে বরাবর সিধে খানিক দূর যেতেই বগার সঙ্গে দেখা হল। বগা তাকে কি জিজ্ঞেস করবার আগেই সে বগাকে জিজ্ঞেস করলে, “দরগাটা কোন দিকে বলতে পার?”

বগা স্বচ্ছন্দে হাত দিয়ে বললে, “বরাবর সিধে। জোলাপাড়া ছাড়ালেই দরগার গম্বুজ নজরে পড়বে। যান—যান—দেখে আসুন।”

বগার কথায় ভোম্বলের সাহস হল। সেই সঙ্গে তার মনে হল, দরগাটা দেখবার মতো, সেখানে ভয়ের কিছু নেই। স্বরূপ মিথ্যে তাকে ভয় দেখিয়েছে। সে হন-হন করে হাঁটতে লাগল। কিন্তু খানিকটা যেতেই ডানধারের একখানা বাড়ি থেকে একটি বারো-তেরো বছরের ছেলে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে এল। তার খালি গা, বুকের ছাতি চওড়া।

রাস্তার মাঝথানে দাড়িয়ে সে বেশ গলা ছেড়ে গাইতে লাগল—

“আমাদের—অ-রাজা যিই নি

বিলাত-এ আছেন—অতি—ই নি—”

ভোম্বল পাঠ্যপুস্তকে পড়েছে এই পদ্যটা। এটা সপ্তম এডোয়ার্ডের উদ্দেশ্যে লেখা। ভোম্বলদের দুর্গাপুরের বাজারে, গোপীনাথ বাড়ির চত্বরে, ঠাকুর-বাবুদের আড়তের মাঠে কয়েকটা স্বদেশী সভা হয়েছে। সব সভাতেই ভোম্বল ছিল 'ভলান্টিয়ারদের ক্যাপ্টেন'। সে ষষ্ঠী রায়ের মতো মাথায় রেশমের পাগড়ি বেঁধে, কোমরে তলোয়ার ঝুলিয়ে, ঘোড়ায় চড়ে সর্দারি করতে পারে নি কিন্তু তার ছুটোছুটি দেখে সবাই বলেছিল, “এই তো চাই।” সেই থেকে সাহেবদের ওপর সে মারমুখো। সপ্তম এডোয়ার্ডকে সে ভারতের রাজা বলে স্বীকারই করে না। যুদ্ধ বাধলে সে আগে যাবে লড়াইয়ে। গায়কের সামনে গিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে সে ধমক দিলে, “এই, চুপ!”

ছেলেটাও ধমক দিয়ে উঠল, “তুই চোপ।” ভোম্বল কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা এবার মাথা দুলিয়ে আঙুলে তুড়ি দিয়ে গেয়ে উঠল— “আমাদের— অ রাজ—আ যি—ই—নি বিলা—তে—”

ভোম্বল ঠাস করে তার গালে দিলে একটা চড়। চড় খেয়ে “দাঁড়া শুওর, তোকে আজ কেটে ফেলব” বলেই ছেলেটা ছুটে বাড়ির ভেতর চলে গেল এবং পরক্ষণেই একখানি কাটারি হাতে করে ছুটে বেরিয়ে এসে “চলে আয় তুই ভদ্দরলোকের ছেলে—” বলতে বলতে ভোম্বলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

তার মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠেচে, চোখ দু'টো লাল হয়ে গেছে, নাকটা উঠেচে ফুলে। সে যেমনভাবে এগিয়ে আসছিল তাতে ভোম্বলের ধারণা হল, ছেলেটা একটা কোপ দেবেই। সেও মরীয়া হয়ে উঠল। পথের ধারে পড়েছিল আধলা ইট; সে ছুটে সেটা তুলে নিয়ে বললে, “আর এক পা এগিয়েছিস্ কি তোর মাথার ঘিলু বার করে দেব। ইংরেজের কুত্তা—”

—“দেখ কার ঘিলু কে বার করে” বলেই ছেলেটা কাটারিখানা ছুঁড়ে তাকে মারলে। সোঁ করে সেটা এসে লাগল ভোম্বলের হাতে। তাতে কতটা কাটল বা আদৌ কাটল কি না তা বুঝবার অবসর ভোম্বলের হল না। সে ছুটে গিয়ে বাঘের মতো তার ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে মাটিতে ফেলে বুকের ওপর বসে দু'হাতে গলা চেপে ধরবার সঙ্গে সঙ্গে কে যেন পিছন থেকে সবলে তার হাত দু'খানা টানতে টানতে বললে, “ভদ্দরলোকের ছেলের এই কাজ?”

ততক্ষণে সেই বাড়ির জনকয়েক মেয়ে-পুরুষ ও কয়েকজন পথিক সেখানে জড় হয়েছে।

মেয়ে-পুরুষগুলো এক সুরে চিৎকার করে উঠল, “শুয়োরটাকে মেরে জঙ্গলে পুতে ফেল—মারে৷ মারো—এত বড় আসপদ্দা—!” একজন তৎক্ষণাৎ ভোম্বলকে একটা লাথি মারলো

যে লোকটা ভোম্বলের হাত ধরে টানছিল সে ভোম্বলকে তুলে দাঁড় করিয়ে বললে, “মারব পরে। আগে শুনি কি হয়েছে। বাছাধন তো আমার মুঠোয়। এই বল, কেন এমন কাজ করছিলি? ও তো খুন হতো। ভদ্দরলোক বলে তোকে রেহাই দেব না।”

ভোম্বল লোকটিকে চিনতে পারলে। সে ঈশ্বর, তার মুখ ও গা থেকে তখনও মদের গন্ধ বার হচ্ছে। এবার ভোম্বল অনুভব করলে তার হাতখানা কন-কন করছে। সে হাতখানার দিকে তাকিয়েই রুক্ষ দৃষ্টিতে ঈশ্বর ও যে ছেলেটি তাকে লাথি মেরেছিল তার মুখ দেখে নিয়ে ঝাঁঝালো সুরে বললে, “কি হয়েছে তা আমার কাকা নায়েবমশাইকে বলব”

উদ্যতফণা সাপের সামনে সাপুড়ে যেন ওষুধের শিকড়টি তুলে ধরল। মেয়েরা ঘোমটা টেনে ভেতরে চলে গেল, যারা দাঁড়িয়ে দেখছিল, তারাও চঞ্চল হয়ে উঠল। যে লাথি মেরেছিল তার ভাবভঙ্গীতে মনে হল, তার পায়ে বিষম লেগেছে। ঈশ্বর যেন কেমন হয়ে পড়ল। কেবল ভোম্বলের প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বিকার।

ঈশ্বর বললে, “তুমি নায়েবমশাইয়ের ভাজতে কি না তা এখনই বার করছি। যার গলা টিপে মারছিলে সে আমার শালার ছেলে—”

ভোম্বল চট করে বাঁ হাতের আস্তিন তুলে বললে, “এই দেখ, তোমার শালার ছেলে কাটারি ছুড়ে মেরে আমার কি করেছে।”

সবাই দেখলে, ভোম্বলের হাতে কালশিরে পড়ে ফুলে উঠেছে। তারা সবাই চাষী। তাদের একজন বললে, “এঃ! ভারী বেঁচেছেন। কুয়োর পানি তুলে হাতখানা ডুবিয়ে রাখেন—”

আর একজন বললে, “চাষার কাণ্ড! চাষার মার দেশের বার! এখন ঠেলা বোঝ। ঐ রুপোপেয়াদা ছুটতে ছুটতে আসচে—”

ভোম্বল দেখলে স্বরূপ ছুটতে ছুটতে তাদের দিকে আসছে। সে এসেই ভোম্বলের হাতের দিকে তাকিয়ে বললে, “করেছিস কি? এবার মাথা বাঁচা! ভাগ্যে রহমতের মুখে খবর পেয়ে ছুটে এলাম। না হলে তো মেরেই ফেলতিস। কি দিয়ে মেরেছিস?”

ভোম্বল আস্তে আস্তে বললে, “কাটারি ছুঁড়ে।”

—“অ্যাঃ! কৈ সে কাটারি?” বলে স্বরূপ এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। ভোম্বলও তাকাতে লাগল, কিন্তু দেখতে পেল না।

—“চলুন দা'বাবু—” স্বরূপ বললে, “কাটারি লুকিয়ে বাঁচবি?”

ভোম্বলের হাতে এখন অসহ্য যন্ত্রণা! ভাগ্যে কাটারির উল্টো দিকটা লেগেছিল, না হলে হাতখানা কেটে দু'খানা হয়ে যেত। সে পথে স্বরূপকে সকল ঘটনা বলতে বলতে রাগে ফুলে উঠতে লাগল। তার কেবলই মনে হতে লাগল, সে মার খেল কিন্তু ওদের কিছুই করতে পারলে না!

পথে নায়েবমশাইয়ের সঙ্গে দেখা। তিনি আগেই খবর পেয়েছিলেন। ভোম্বলের হাতখানা দেখে বলে উঠলেন, “শিগগির ওকে ডাক্তারখানায় নিয়ে যা; চল, আমিও যাচ্ছি। এই বগা, সেই ডাকাতগুলোকে এখনই ধরে আন।”

বগা ছুটল ঈশ্বরদের ধরতে। ভোম্বলরা ডাক্তারখানায় থাকতে থাকতেই বগা ফিরে এসে বললে, “তারা কেউ বাড়ি নেই।”

নায়েবমশাই গাঢ়স্বরে বললেন, “বাড়ি নেই?”

স্বরূপ দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে বললে, “ফিরতি হবি না? এবার হাড়মাংস আলাদা করব। বড় বাড়—।”

নায়েবমশাই বাঘের মতো একবার তার দিকে তাকালেন।

ডাক্তারবাবু হাতখানা পরীক্ষা করে ওষুধ দিয়ে বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “বিশেষ কিছু হয়নি। লড়তে গেলে ওরকম জখম হয়ই।” বলেই হি-হি করে হাসলেন।

ভোম্বলেরও মুখে হাসি ফুটল। কিন্তু পরাজয়ের বেদনায় তার মন হাতের চেয়ে বেশী টন টন করতে লাগল।

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%