বন্ধুর বাড়ি

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

দুপুরে হরনাথদের সঙ্গে রান্নাঘরের দাওয়ায় পাশাপাশি খেতে বসে ভোম্বল এক নতুন কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। হরনাথের মায়ের তখন জ্বর নেই। শোবার ঘর থেকে আস্তে আস্তে এসে দাওয়ায় উঠে শেষ দিকে বসে ভোম্বলকে বললেন, ‘তোর মা আর আমি এক বয়সী। পাশাপাশি বাড়িতে, যেটা চক্কোত্তিরা কিনেছে, সেটায় থাকতাম। তখন সবে আমরা দুজনে শ্বশুরঘরে এসেছি। তাই খুব ভাব হয়ে গেল৷ দুজনে দুজনের নাম ধরে ডাকতাম। এক সাথে ঘাটে যেতাম। এ সব তুই জানবি কি করে? দুজনে কত গল্প করেছি। তোর মামার বাড়ি ঐ ভাজনায়। আমার বাপের বাড়ি ছিল, ছগগোপুরের ওধারে আলমপুর। তখন আমাদের কতই বা বয়েস? ঐ লিচুর চেয়ে বছর তিনেকের বড় হবো। বাপের বাড়ির জন্যে মন কেমন করতো। না, বাবা, তুই খা। ভাত কোলে নিয়ে বসে রইলি! খা খা, পেট ভরে খা। তুই আমার সই মেনীর ছেলে। তোকে দেখে আমার সে সব কথা মনে পড়ছে। পুরনো কথা বলতে ভাল লাগে। তারপর,'—বলে তিনি নিঃশ্বাস ফেললেন।

ভোম্বল বা হরনাথ কেউই এসব কথা জানতো না। শুনে দুজনে যেন আর একটা সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধা পড়লো।

দুপুরে হরনাথের মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর মামার বাড়িতে মামা, মামী, আজীমা, আজামশাই? গিয়েছিলি? কে কে আছে? দেখেছিস তাদের!’

ভোম্বল বললে, 'কাল রাতে জটা গাঁ থেকে স্টেশনে আসবার পথে ভাজনা, না, ভাজনালের বাজারে এক দোকানদারের সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি নাকি আমার মামা। আমি আমার কথা বলিনি।’

—‘কেন বললি না?’

—‘আমার ভাল লাগলো না।’

—‘মামার ছেলে-মেয়ে কটা?’

—‘শুনেছি, একটাও না।’

—‘তবে মামার কাছে গিয়ে থাক। তার ছেলে তো এখন তুই।

—‘চিনি না জানি না, তার কাছে থাকবো?’

—‘ওমা! মামা যে!’

ভোম্বল জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে বললে, ‘কে কার খোঁজ রাখে? হরা! আমি মাকালের ওধারে গাঁ খানা দেখে আসি।’

—‘ফিরবি, না, চম্পট?’

—‘ঐ যে বেড়ার গায়ে কাপড় মেলা রইলো।’ বলতে বলতে ভোম্বল দপ দপ করে বেরিয়ে গেল।

হরনাথের মা ম্লান কণ্ঠে বললেন, ‘বাপ-মা মরা ছেলে। ঘরে আর কিসের টান?’

মাকালের ধারের গাঁয়ের নাম নাকি পাতখালি। মাকালে, পাতখালিভারি মজার নাম। মাকালেতে বোধহয় কেবল মাকাল— দেখতে খুব সুন্দর, রাঙা টুকটুকে কিন্তু ভাঙলেই যা বেরোয়, ফেলতে পারলে লোকে বাঁচে। আর পাতখালিতে সবাই উপোসী - পাতা কোলে বসে বসে খাবারের অপেক্ষায় হা পিত্যেস করছে।

ভোম্বল চললো, গাঁ দুখানা দেখতে। যে পথ ধরে সে সকালে গিয়েছিল সাতঘোরী, এ পথটা সে পথের উলটো দিকে। এটাও খানিক দূর অবধি গেছে রেললাইন বরাবর। তারপর বাঁ হাতি বাঁক নিয়ে দূরে গ্রামে গিয়ে সেঁধিয়েছে— তবে খুব বেশি দূর নয়।

এরপর আরও কত গ্রাম পার হয়ে কোন নদী কিনারে খেয়াঘাটে শেষ হয়েছে কে জানে। কি কোন শহরেই বা সেঁধিয়েছে। এগোতে এগোতে সে ডান ধারে তাকিয়ে দেখলে। ঐ দেখা যায় রেললাইনের ওধারে রাস্তা চলে গেছে সেই জটাগাঁয়ের দিকে। আর ঐ ভাজনালের বাজারের ঘর। এখন গাঁ খানাও দেখা যাচ্ছে। গাছে গাছে যেন জড়াজড়ি। তার মধ্যে এখানে সেখানে খড় ও টিনের ঘর। ঐখানে তার মামার বাড়ি, ঐখানে সে মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল।

বাঁ দিকে আলে ঘেরা ছোট-বড় আয়ত-চৌকো ক্ষেত। কতকগুলোতে তখন ও ধান রয়েছে। কতকগুলোর কাটা ধান মাঠেই পড়ে আছে গোছা গোছা, কতকগুলো শূন্য। চড়াইয়ের ঝাঁক উড়ছে, বসছে, আবার উড়ছে। শীতের রোদ, শীতের বাতাস, শীতের আকাশ, দুপুরে বেশ মিঠে লাগছে। কোথাও তাড়া নেই, সাড়া-শব্দ নেই, মানুষ-জন আছে, তাও যেন বোঝা যায় না৷

ঐ যেন ধুলো উড়িয়ে একটা সাদা বড় গরু ছুটতে ছুটতে আসছে। ওর পাশে একটা ও পিছনে একটা লোক। লোক দুটোর পরনে লুঙ্গি, মাথায় কাপড়ের টুপি—তারা লকড়ি হাতে ছুটছে। গরুটার পিছনের একখানা পায়ের খুরে ও শিং জোড়াতে দড়ি বাঁধা। লোক দুটো গরুটাকে টেনে রাখতে পারছে না। গরুটা এক একবার মাথা নুইয়ে শিংয়ের দড়ি খোলবার চেষ্টা করছে। সামনের লোকটা ভোম্বলকে হুঁশিয়ার করে দিলে—‘পাশ যাও, পাশ যাও।’

ভোম্বল তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘ও মিয়া, গোরুটা অমন করে ক্যান?’

লোক দুটোর একজনও জবাব না দিয়ে গরুটাকে টানাটানি করতে করতে ছুটে চলে গেল। গরুটার দু'চোখে যেন ভয়, নিঃশ্বাস পড়ছে জোরে, গা যেন কাঁপছে। ভোম্বল মনে মনে বললে, ‘ওরা কি গরুটাকে চুরি করে না জোর করে কেড়ে আনছে?’

সে একবার পিছন ফিরে দেখে সোজা এগোতে লাগল। যেতে যেতে দেখলে সামনের দিক থেকে আসছিল চার-পাঁচটি লোক। তাদের প্রত্যেকের মাথায় এক বোঝা করে কাটা ধান। তারা আসতে আসতে গল্প করছে আর হাসছে।

মাকালের গাছপালা, তার মধ্যে বাড়ি ঘর ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মাথার ওপর সূর্যও যেন গড়িয়ে নেমে পড়েছে, রংও হয়েছে একটু লালচে। ছায়া হয়েছে লম্বা। ভোম্বলের কানে আসছে মেঠো সুর। ওই যেন একটা লোক ধানখেতের মধ্যে বসে কি একটা করতে করতে গান গাইছে৷ গানের দু-একটা কথা সে বুঝতে পারছে। সুরটা শুনে তারযসব কেমন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে। সে গাঁয়ের কোলে পৌঁছে দেখলে কতকগুলো ছেলে একখানা ছোটো মাঠে মালসাট এঁটে চু-কপাটি খেলছে। তা ছাড়া আর কি বা খেলবে? এটা তো শহর নয় যে ত্রি-কাঠি বা ফুটবল খেলবে। তবে গাঁয়ে আরও দুটো খেলা আছে, আমছুট ও সি সি খেলা। ভোম্বল তিনটেই জানে কিন্তু প্রথমটা যে হিম্মত দরকার তা তার নেই৷

তখন তিন-চারটে রোগা ছেলে একটা বেশ মোটা ছেলের কোমর জাপটে ধরে, তাদের কোটের ভেতর দিকে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। মোটা ছেলেটা ঝটকানি দিয়েও নিজেকে ছাড়াতে পারছে না। টানাটানিতে সে হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল এবং সেই আবস্থাতেই নিজের কোটের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে। যারা কোমর ধরে ছিল তারাও নাছোড়বান্দা। এবার তার পা ধরে কোটের ভেতরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল। সে ‘মোর’ হয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে কোটের বাইরে গিয়ে বসল।

ভোম্বলের দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখতে দেখে তারা যেন কৌতূহলী হল। ভোম্বল আর কিন্তু দাঁড়াল না, গ্রামের ভেতর থেকে যে পথটা এসে বড়ো সড়কে পড়েছিল সেটা ধরে গ্রামখানায় ঢুকে গেল। এরই নাম মাকালে।

মুখেই একটি লোক একখানি কাঁচাবাড়ির সামনে বসে ধারাল কাটারি দিয়ে কাঁচাবাঁশের বাতা চাঁচছিল। পাশে পড়েছিল গোটা কয়েক কান্তা কাটা কাঁচাবাঁশের খুঁটি ও বাতা। এপাশে ওপাশে কয়েকটা মুরগি, একটা মস্ত মোরগ ও কয়েকটা ছানা চরছিল। মোরগটা হঠাৎ গলা ফুলিয়ে ঝুঁটি খাড়া করে মাথা তুলে বার দুই ডেকেই, পায়ের নখ দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা কয়েকটা শুকনো পাতা সরিয়ে একটা কি ঠোঁটে তুলেই গিলে চোখদুটো একটু বন্ধ করলে। বোধ হয় কোনও বড়ো পোকা গিলবার সময় আটকে গেল। লোকটার কাছ থেকে কিছু তফাতে মস্ত একটি চন্দনছিটের গাছ। তার পাতাগুলো চকচকে সবুজ। পাতায় পাতায় শ্বেতচন্দন রঙের ছিটে ও ছাপ। গ্রামখানা বাঁশঝাড়, আম, কাঁঠাল, জামরুল গাছের ছায়ায় আধা অন্ধকার। পাতার ফাঁকে ফাঁকে পড়ন্ত বেলার রোদ উঁকি দিচ্ছে, কিন্তু মাটিতে পড়ছে না। ভোম্বল যেতে যেতে দেখছে, পথের এদিকে ওদিকে শুকনো, আধশুকনো ডোবা, দু-একটা পুকুর।

পুকুর পারে কলার ঝাড় ও তাল-নারকোলের গাছ, কয়েকটা তালগাছের গায়ে বট-অশ্বত্থের চারা জড়িয়ে মাথায় ওঠবার জন্যে যেন হাত বাড়াচ্ছে। একখানা বাড়ির ভেতর থেকে একটি বউ কোলে একটি ছেলে নিয়ে নাচাতে নাচাতে বেরিয়ে এল। ছেলেটার গলায় মাদুলি, মাথায় পুঁটে কোমরে ঘুনসি, গায়ে ছোট্ট পিরান। তার পিছনে পিছন এল একটা চারপাঁচ বছরের রোগা মেয়ে। ছেলেটার দিকে দু'হাত বাড়িয়ে সে আসছে আর বলছে, ‘আয় আয় মণি, খেতে দেবো ননী।’
ছেলেটা ফোগলা মুখে হেসেই কুটি-পার্টি। রোগা মেয়েটা বোধ হয় ছেলেটার দিদি ওর অনেকদিন পরে বোধ হয় ভাইটি মায়ের কোলে এসেছে। তাই এত আদর। তারা প্রায় ছুটতে ছুটতে গাছপালার আড়ালে একখানা বাড়ির দিকে অদৃশ্য হলো৷

কে একজন দূর থেকে বলে উঠলো, ‘খোকা নাকি রে? এই খোকা - আ।’

ভোম্বল মনে করলে, বলে, ‘খোকা নই৷’ কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, ‘বোবার শত্রু নেই।’
তাই নীরবে এগিয়ে চলল। লোকটাও আর তাকে উত্যক্ত করলে না। কার সঙ্গে যেন তর্কাতর্কি করতে লাগল।

ভোম্বলের মনে হল, গাঁয়ের পথে শুধু শুধু ঘুরে লাভ কি? এদিকে সূর্য ডুবতে আর কতই বা দেরি! নিঝুমহগাঁ যেন আরও নিঝুম হয়ে এসেছে। শীতে সব জড়োসড়ো। এরপর পাতাখালি। সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতেই সন্ধ্যা। তারচেয়ে ফিরে যাওয়াই ভালো। সে বড়ো সড়কে ফিরে এসেই দ্যাখে, গায়ে নীল পিরাণ, কাঁধে লাল চাদর, হাতে লাঠি কাঁধে পিতলের নম্বর ও তকমা আঁটা একটা মড়াখেকো চৌকিদার তার পাশ দিয়ে গ্রামে ঢুকল। সেই লোকটা তখন বাতাগুলো এক জায়গায় গুছিয়ে রাখছিল।

চৌকিদার তাকে জিজ্ঞেস করলে, ‘অনিল মণ্ডলের বাড়িটি কোন মুড়োয়?’

বাতা চাঁচা লোকটা জবাব দিলে, ‘সিধে গিয়ে বাঁ হাতি জোড়া নিমের কোলে। কি সম্বাদ?’

‘থানার ডাক পড়েছে।’ বলেই চৌকিদার দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে এগিয়ে চলল।

লোকটা নিজের মনেই বললে, ‘কি ফ্যাসাদে না পড়েছে।’ বলেই ভোম্বলের দিকে এমন ভাবে তাকাল যেন মনে মনে বললে, ‘এ আবার কেডা যায়?’ এবং চাঁচাড়িগুলো কাটারির আগা দিয়ে জড়ো করতে করতে ডাক দিলে, ‘সামাদ রে-এ-এ-’

এক ডাকেই জবাব এল ‘এই যাই।’ তারপরই ভোম্বল দেখলে, তার বয়সি একটা আধ ফরসা মাঝারি গড়নের ছেলে ঝোপের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এল। তার পরনে আধময়লা, চেকদার সবুজ লুঙ্গি গায়ে আধময়লা শার্ট, মাথায় খোরা টুপি। সে এসেই বললে, ‘কি বোলেন?’

—‘ওই বাতার বোঝা নিয়ে গোয়ালের কোণে রাখগা’ বলে লোকটা কোমর সোজা করে দাঁড়াল।

ভোম্বল অবাক। মনে হচ্ছে ছেলেটি ইস্কুলে পড়ে। আর ওই চাষার মতো দেখতে বাতা চাঁচা লোকটা হয় ওর বাবা, নয় ওর গুরুজন। কিন্তু ছেলেটা কীরকম নম্রভাবে ওর সঙ্গে কথা কইলে।

লোকটা আবার বললে, ‘বাতাগুলো থুয়ে চাঁচাড়িগুলো নিয়ে যা।’

‘জে’ বলে ছেলেটা বাতার বোঝা টানতে টানতে নিয়ে চলল। ভোম্বলও আর দাঁড়াল না। বড়ো সড়কে এসে পিছনে ফিরে দেখলে, পশ্চিমে গাঁয়ের গাছ-গাছালির পিছনে রাঙা সূর্যের কেবল কপালখানি দেখা যাচ্ছে। যেন শেষবারের মতো সে পৃথিবীকে দেখে নিচ্ছে।

ভোম্বলের বিপরীত দিক থেকে ধুলো উড়িয়ে আসছে, একপাল গোরু। পিছনে ময়লা চাদর গায়ে, লকড়ি হাতে কয়েকটা রাখাল। তাদের খানিক পিছনে ধামা, ঝুড়ি, বস্তা মাথায় আসছে কয়েকটা লোক। আসছে এক সার গোরুর গাড়ি; কোনওটাতে হাঁড়ি কলসি, কোনওটাতে বাঁশের খাঁচায় বিচালির ওপর গুড়ের নাগরি, কোনওটাতে আখ, কোনওটাতে কীসের যেন ভরা বস্তা। ওরা হয়তো চলেছে এপারের হাটে, কি নৌকো বোঝাই করে জিনিসগুলো পাঠাবে আরও দূরে কোথাও। হয়তো তাই-ই হবে। কারণ হাট তো পরশু। এত আগে কি সওদাপত্র নিয়ে ফেলবে? এত যে গোরু-বাছুর, মানুষ-জন ও গাড়ি চলছে, আকাশপথে বাসার দিকে উড়ে চলেছে, কাক, বক, তবু চারধার নিঝুম। সব কেন এক আলস্যে জড়ানো। তাড়া নেই, হুড়োহুড়ি নেই, ঠেলাঠেলি নেই, সবেতেই ঘুম ঘুম ভাব। অথচ সবাই জিবন্ত মানুষ, গোরুবাছুর, পাখি, পোকামাকড়, গাছপালা পর্যন্ত।

সূর্য ডুবতে ডুবতেই হল অন্ধকার। ঝিঁঝির সুর হল চড়া। পথের পাশে বটগাছ, আমগাছে শুরু হল ছোটো ছোটো পাখিদের বাসার দখল নিয়ে বিষম কলহ কলকাকলি। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে বাদুর, আকাশে ঝিকমিকিয়ে ফুটছে তারার ঝাঁক।

ভোম্বল তাড়াতাড়ি হাঁটছে আর ভাবছে, ‘হরাটা হয়তো মনে করছে সে আর ফিরবে না।’ ভোম্বলের হরার দোকানে ফিরতে ফিরতেই সন্ধ্যা উত্তরে গেল। সে দূর থেকে দেখলে, দোকানের সামনে যেন জটলা, মনে করলে, খদ্দেরের ভিড়। সে আরও কাছে যেতেই তার কানে এলো গানের সুর। জটলাটা তাহলে খদ্দেরের নয়, শ্রোতার। ওরা সবাই গ্রামের মানুষ; কেউ কেউ স্টেশনেরও যাত্রী হতে পারে। সে দোকানে না ঢুকে ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে গান শুনতে লাগলো ৷ গায়ক বেহালা বাজিয়ে গাইছিল—

“ও আমি না দেখিলাম তারে,

আমার বাড়ির কাছে আরসি নগর

যে জন সেথায় বসত করে—”

গানটির ভাষা ভোম্বলের মনে ধরলো না, সুর ভাল লাগলো, এত ভাল লাগলো যে মনে হলো লোকটি যেন থামে না। এই সুরকে নাকি বলে বাউল—লোক-সঙ্গীত। বাউলরা ঐ সুর গায় বলেই কি সুরটার ঐ নাম? হতেও পারে। কিন্তু গায়কের গলার স্বর যেন ভার চেনা ঠেকছে। মনে হচ্ছে, তার চেনা প্রেমানন্দ গাইছে। কিন্তু সে কি এত দূরে আসবে? কেনই বা আসবে ? দুর্গাপুরে সে ওকে দেখেছে, বাজারে, স্টেশনে, হাটে, পাড়ায় পাড়ায়। সবাই ওর গান শুনতে চায়। তাই ওর ঝোলা ভরে ওঠে চালে, থলে ভরে পয়সায়। কিন্তু একা মানুষ থাকে শহরের শেষে নদীর পাড়ে বেলকুচি গাঁয়ে একটা কদমগাছতলায় ছোট একখানি খড়ের ওর ভিক্ষের ঘরে। সামনে খানিকটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন উঠোন। চাল- পয়সা ও গরীবদের বিলিয়ে দেয়। কিন্তু যারা ভিক্ষে করে তারাই গরীব। ভিক্ষুকের চেয়েও গরীব কেউ আছে কি?

তো সে ভিড় ঠেলে দোকানে ঢুকে দেখে, সত্যিই তার চেনা প্রেমানন্দ, বেঞ্চিতে বসে তার পুরনো বেহালাটির ওপর ঘাড় কাৎ করে ছড় টানছে আর গাইছে। সেই মাথার চুল চূড়া বাঁধা, মুখে কালো দাড়ি, গলায় মালা, আলখাল্লা পরা ফরসা, লম্বা । আজ আলখাল্লার ওপর মোটা আলোয়ান, বেঞ্চির পাশে রয়েছে ঝুলি। ভোম্বল দোকানের ভেতর গিয়ে বেঞ্চিতে বসে শুনতে লাগলো।

হরনাথের চোখ তার ওপর পড়তেই মুখে স্বস্তির ভাব ও হাসি ফুটলো৷ প্রেমানন্দ থামতেই শ্রোতারা বলে উঠলো, ‘থেমো না, থেমো না। আর এক খেন –আর এক খেন—’

প্রেমানন্দ, বেহালাটার কানে একটু মোচড় দিয়ে আবার ধরলে –

‘ও খাঁচার ভিতর অচিন পাখি

কমনে আসে যায়?

ধরতে পেলে মনো-বেড়ি

দিতেম তাহার পায়’

গানখানি ভোম্বল ওর মুখে কয়েকবার শুনেছে। ও গায় আর নূপুর পায়ে নাচে। এখন বোধ হয় নূপুর জোড়া নেই, কি ঝুলির ভেতর আছে। তবু সে গাইতে গাইতে মাথা দোলাতে লাগলো। আর শ্রোতাদের মধ্যে কে একজন হাতে তাল দিতে থাকলো।

অবশেষে গান থামলো। শ্রোতারা সকলেই দু-একপয়সা দিয়ে যে যার মতো সওদা নিয়ে চলে গেল। দোকান ফাঁকা। শীতের রাত।

গতকাল এমনি সময়ে ভোম্বল ছিল বিদেশী পাখিওয়ালার সঙ্গে ফাঁকা স্টেশনে বসে।

হরনাথ জিজ্ঞেস করলে ‘ভূপে, বাবাজীকে চিনিস? দেখিস নি?’

ভোম্বল বললে, ‘খুব চিনি। গানও শুনেছি অনেকবার। সবাই চেনে।’

প্রেমানন্দ তার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তোমায় যেন দুর্গাপুরে দেখেছি। বাড়ি কোথায়?’

—‘দুর্গাপুরে।’

—‘এখানে যে? হরু তোমার কে?’

–‘ক্লাস ফ্রেণ্ড।’

—‘মানে কি?’

-‘একসঙ্গে ইস্কুলে পড়তাম। ক্লাসের বন্ধু।’

—‘এখানে কি কর?’

হরনাথ বললে, ‘সে অনেক কথা। আপনি তো শ্রীক্ষেত্রে যাচ্ছেন। ওকে সঙ্গে নিয়ে যান।’

–‘শ্রীক্ষেত্রে? কেন? ও সেখানে গিয়ে কি করবে? আমি বৈরাগী। কতক পায়ে হেঁটে, কতক রেলে চেপে যাব। পথে গান গাইব, ভিক্ষে করবো। জগন্নাথ দর্শনে গিয়ে আর ফিরি, কি, না ফিরি।’ বলে বাবাজী নিঃশ্বাস ফেললে। তারপর আবার বললে, ‘ও কেন যাবে ? ওর ঘরে মা-বাপ নেই?’

হরনাথ বললে, ‘না। বল না রে ভূপে, বাবাজীকে তোর সব কথা। বাবাজী পথ-ঘাট সব জানেন।’

প্রেমানন্দ ভোম্বলের মুখের দিকে তাকালো।

ভোম্বল আস্তে আস্তে সব কথা বলে গেল। শুনে বাবাজী বললে, ‘সে তো অন্য পথে—খড়্গপুর দিয়ে ডাইনের পথ। আমার সঙ্গে তুমি কোথায় যাবে? আমি ধরবো বাঁয়ের পথ, পথের কষ্ট, অনাহার, অনিদ্রায় তোমার দেহ পাত হবে যে! সেখানে যেতে হয়, রেলে চেপে যাও। তোমার কে আছে? কেউ নেই? এমনতরো কথা তো ভাল ঠেকে না।’

হরনাথ জিজ্ঞেস করলে ‘আপনার গাঁয়ের আখড়া কে দেখছে?’

—“আমার আখড়া নেই বাবা। আমি একা।একখেন ঘর ছিল-কুলুপ এঁটে পাশের বাড়ির বিপিনকে চাবিটা দিয়ে বলে এসেছি, ‘দেখাশুনা করিস, রাতে শুস।’ লোকটা মুনিষ খাটে; অনেক কটা বাচ্চা-কাচ্চা। বলেছি, ‘আর যদি নাই ফিরি, ঘরের দখল ছাড়িস নে। কপালে কি হবে কি করে বলি? সবই শ্রীহরির মর্জি।”
বলেই বাবাজী ঝুলি থেকে বিড়ি বার করে ধরালো।

হরনাথ বললে, ‘ভূপে তো আর বাড়ি ফিরে যেতে চায় না। এখানকার একজন কলকেতায় গস্ত করতে যায়। কাল সকালে ভূপে তার সঙ্গ ধরবে, এই ঠিক আছে। কিন্তু সে শ্যালদা তক ওকে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেবে। তারপর ও কার সঙ্গ ধরবে? খড়্গপুর তো কলকেতা-হাওড়া ছাড়িয়ে?’

—‘হুঁ’

—‘আপনার সঙ্গ ধরলে ওর সুবিধে হতো। তাই বলছিলাম—।’

—‘কিন্তু বাবা, আমি এদিককার গাঁ-গঞ্জ ঘুরে কিছু পাথেয় সংগ্রহ করে তবে এগোবো।

-‘যাবেন তো এ পথে?’

—‘নাও যেতে পারি। উদিকে রেল পেলে তাতেই চাপবো।’

ভোম্বল কিন্তু মনে মনে খুশী হলো। সেই সঙ্গে তার আফশোস হতে লাগলো, সে কেন গান গাইতে পারে না! তাহলে তো বাবাজীর জুড়ি হয়ে যাহোক কিছু রোজগার করে, রেল ভাড়াটাও যোগাড় করতে পারতো।

তারপর আর কথা হলো না।

শীতের অন্ধকার রাত। পথ জনশূন্য হয়ে গেল। কিন্তু স্টেশনটা যাত্রী-গাড়ি ও মালগাড়ি চলাচলের দরুন মাঝে মাঝে সরগরম হয়ে উঠতে লাগলো। দূরে মাঠের ধার থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে এলো। দোকানের কোণে যে সাদা রঙের কুকুরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়েছিল, সে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে অন্ধকার রাস্তায় কাকে যেন তেড়ে গেল – বোধ হয় শিয়ালকে৷ তারপর নাক ঝাড়তে ঝাড়তে ফিরে এলো।

সে রাতে হরনাথই সযত্নে বাবাজী ও ভোম্বলকে খাওয়ালে তপ্ত খিচুড়ি ভুজাভুজি। বাবাজী এসে শুয়ে পড়লো দোকানে। তার সঙ্গে শীতবস্ত্র ছিল সামান্যই। হরনাথ দিলে একখানা নকল কম্বল। ভোম্বলের শোবার ব্যবস্থা হলো হরনাথের সঙ্গে। ইচ্ছে না থাকলেও ভোম্বলকে সেই ব্যবস্থাই মানতে হলো।

কিন্তু ভোম্বলের ঘুম একটানা ও গাঢ় না। প্রহরে প্রহরে

দূরে যেন কোথা থেকে শিয়ালের ডাক তার কানে আসতে লাগলো৷ তাতে তার মন কেমন করতে লাগলো। কার জন্যে, কিসের জন্যে তা সে বুঝতে পারলে না। অবশেষে এক সময় শিয়ালের পাল শেষবারের মতো ডেকে জানিয়ে দিলে, রাত পোহালো। ভোর হলো। ঘরের চালে কাক ডাকতে লাগলো। মাঠের ধারে টেলিগ্রাফের তারে বসে, দোয়েলও মিঠে শিসে বলতে লাগলো জাগ,—জাগ, জাগো—ও-ও।

তারপর যখন রোদ ওঠে ওঠে, স্টেশনে পশ্চিমে যাবার গাড়ির ঘণ্টা পড়লো, যগা বারুইয়ের ছেলে এসে হরনাথকে খবর দিলে, বাবার ভোর রাত থেকে কম্প দিয়ে জ্বর; যাওয়া হবে না। খবরটা শুনে ভোম্বল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললে।

এদিকে বাবাজী ও ভোম্বলও যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল। একটু রোদ উঠতেই দুজনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

হরনাথের মা পোটলা বেঁধে চিড়ে পাটালী ও কদমা দিয়ে ভোম্বলকে বললেন, ‘পথে খাস। আবার আসিস, তুই আমার সইয়ের ছেলে।’
বলতে বলতে আঁচলে চোখ মুছলেন।

ভোম্বল পায়ের ধুলো নিতেই থুতনি ধরে চুমো খেয়ে বললেন, ‘বেঁচে থাক। ঠাকুর তোর মনস্কামনা পূর্ণ করুন।’

হরনাথ পাঁচটা টাকা দিয়ে বললে, ‘পথে খরচ করিস। কাজকর্ম শিখে আবার আসিস। চিঠি দিস—গ্রাম - আড়ানি, ডাকঘর-ভাজনা, জেলা নদীয়া। মনে থাকবে তো।’

ভোম্বল ঘাড় নেড়ে বললে, ‘হু’ এবং ঠিকানাটা পুনরাবৃত্তি করল।

বাবাজী কাঁধের বড় ঝুলিটা থেকে একটা খালি ঝুলি বার করে ভোম্বলকে বললে, ‘ধরো। টাকা কটি পেটকাপড়ে বাঁধো। তোমার বাড়তি বস্ত্র, খাবারগুলো এই ঝোলায় পুরে কাঁধে ঝোলাও। হাঁ, এবার যাত্রা। চললাম গো মা, চললাম গো বাবাজী। জগন্নাথ তোমাদের মঙ্গল করুন। চলো।’

দুজনে চললে৷ সাতঘোরীর পথে। যেতে যেতে বাবাজী বললে, ‘সামনে ওই বাবলা গাছটার কোল দিয়ে আলে নেমে ক্ষেতখানা পার হয়ে লাইনে উঠে ওপারের গাঁয়ে ঢুকবো। এবং খানিক পরেই দুজনে লাইন পার হয়ে তারের বেড়া গলিয়ে মটর ক্ষেতে নেমে আলে আলে পার হয়ে গাঁয়ে গিয়ে ঢুকলো। ভোম্বল যেতে যেতে পিছন ফিরে দেখলে। না, আড়ানির ঘরবাড়ি গুলো দেখা যায় না, দেখা যাচ্ছে কেবল স্টেশনটা আর সিগন্যাল গুলো।

সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%