ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, অলৌকিক শক্তির অধিকারী হলে অনেক লাভ হয় বলে অনেকের ধারণা; কিন্তু অলৌকিক শক্তি অর্জন করার ফলে অনেক সময় ক্ষতিও হয়। আমার বক্তব্য যে সঠিক তার প্রমাণ স্বরূপ আমি তোমাকে বজ্রগিরির রাজা অমরদীপের কাহিনি শোনাচ্ছি। এই কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
বজ্রগিরির রাজার ইচ্ছা ছিল সুষ্ঠুভাবে দেশ শাসন করা। রাজা হিসেবে তার নাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক— এটাই ছিল তার সুপ্ত বাসনা। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও দেশ শাসন করার মতো যোগ্যতা এবং সামর্থ তার ছিল না। সে যেকোনো সাধু সন্ন্যাসীর দেখা পেলে তাকে মনের কথা বলত, কিন্তু সাধু সন্ন্যাসী, অথবা যোগী তার তেমন কোনো উপায় বলে দিতে পারল না।
এইভাবে অনেককাল পরে একটা সাধু রাজা অমরদীপের কাছে এসে তার কথা শুনে, তার ইচ্ছা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে জানিয়ে একটি আরশি তার হাতে দিয়ে বলল, 'মহারাজ, এই আরশির অলৌকিক ক্ষমতা আছে। আপনার অধীনে যারা কাজ করে তাদের উপর এই আরশি নজর রাখবে। আপনি যখন যাকে ইচ্ছা তখন তাকেই এই আরশিতে দেখতে পাবেন। শুধু আপনি তাকে স্মরণ করবেন এবং আরশির দিকে তাকাবেন তাহলেই তাকে দেখতে পাবেন। যাকে যে দায়িত্ব দিলেন সে ঠিকমতো সেই কাজ করছে কিনা তা আপনি পরিষ্কার দেখতে পাবেন। শুধু তাই নয়, আপনি ইচ্ছা করলে সে কী ভাবছে তাও আরশিতে তার মুখ দেখে বুঝতে পারবেন।'
রাজা অমরদীপ ভেবেছিল ওই আরশির সাহায্যে সারাদেশ সুষ্ঠুভাবে শাসন করতে পারবে। গোপন জায়গায় ওই আরশিটা রেখে শাসন কাজ চালাতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যে সম্পূর্ণ নির্ভরতা এসে গেল ওই আরশির ওপর। রাজা একটুও ভাবত না, এমনকী মন্ত্রীদের সঙ্গে কোনো বিষয় পরামর্শ করাও বন্ধ করে দিল। কারও কথা বিশ্বাস করার তার প্রয়োজন হত না। আরশিতে দেখে রাজা যা বুঝত তাই করত।

রাজার এই নতুন ধরনের আচরণ মন্ত্রী সেনাপতি-সহ প্রত্যেকে লক্ষ করল, কিন্তু কারণটা যে কী তা কেউ বুঝতে পারল না। রাজা নিজেই যা ভাবত তা মন্ত্রী এবং অন্যান্যদের করতে বলত। অন্যদের মতামত কী তা আরশি দেখে রাজা নিজেই বুঝতে পারত। রাজার পরিকল্পনা যার পছন্দ হত না তার প্রতি কী করা উচিত তা রাজা ঠিক করে ফেলত।
রাজা অমরদীপের প্রধানমন্ত্রীর নাম ছিল বিক্রমসেন। একদিন আরশিতে রাজা দেখতে পেল বিক্রমসেন তার প্রতি অশ্রদ্ধার ভাব পোষণ করছে। রাজার কোনো কাজ তার পছন্দ হচ্ছে না। রাজা তৎক্ষণাৎ বিক্রমসেনকে কারাগারে নিক্ষেপ করল। এই ঘটনার পর দেখা গেল বহু লোক রাজাকে মনে মনে পছন্দ করছে না। রাজার কাজকর্ম বহু প্রজার ভালো লাগছে না। দেখতে দেখতে, কিছুদিনের মধ্যেই বহু গণ্যমান্য লোককে রাজা কারাগারে নিক্ষেপ করল।
বহুলোক কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়ায় সারাদেশ জুড়ে অশান্তি দেখা দিল। সারা দেশে শান্তি স্থাপনের জন্য রাজা সেনাপতির উপর ভার দেওয়ার কথা ভাবল। ভাবতে ভাবতে সে এই মুহূর্তে সেনাপতি কী ভাবছে, কী করছে, তা জানার জন্য আরশির দিকে তাকাল। রাজা জানতে পারল, সেনাপতি ভাবছে কীভাবে রাজাকে বিব্রত করে, তাকে সিংহাসন থেকে ফেলে দেওয়া যায়।
সেনাপতি এই ধরনের চিন্তা করছে জেনে রাজা তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করল। প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপতি-সহ সারা দেশ জুড়ে এতগুলো লোক কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ফলে প্রজারা ভাবল রাজার মতিভ্রম ঘটেছে। ওই রাজাকে দিয়ে আর যে দেশ শাসন করা সম্ভব নয়, সে ব্যাপারে কারও সন্দেহ রইল না।
এই অবস্থায় অমরদীপ ভাবল, ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করার আগে ছেলে তার সম্পর্কে কী ভাবছে তা জানার। সেই আরশিতে রাজা দেখল, তার ছেলে ভাবছে অন্য কাউকে দিয়ে তার বাবাকে হত্যা করাবে অথবা বাপকে কারাগারে নিক্ষেপ করে নিজেই রাজা হবে।
আরশির মাধ্যমে এই ব্যাপারটা জানতে পেরে রাজা ভাবল, 'আমার ছেলেই যখন পছন্দ করছে না তখন আমি গোটা দেশ শাসন করব কী করে?' রাজা তৎক্ষণাৎ ছেলেকে ডেকে বলল, 'বাবা কান্তিদীপ, আমার আর এক মুহূর্ত সিংহাসনে বসার ইচ্ছা নেই। আগামী কাল থেকে তুমিই হবে এই দেশের রাজা। আমি বনে তপস্যা করতে চলে যাব।' বলে ছেলেকে সিংহাসনে বসানোর সমস্ত উদ্যোগ আয়োজন সেরে ফেলে রাজা অমরদীপ ওই আরশিটা ভেঙে ফেলল।
পরেরদিন রাজা কান্তিদীপ সিংহাসনে বসল আর অমরদীপ গেরুয়া পোশাক পরে তপস্যা করতে বনে চলে গেল। এই পরিবর্তনের ফলে সমস্ত বন্দি মুক্তি পেল। সারা দেশের প্রজারা খুশি হল। রাজা যে বনে চলে গেল সে ব্যাপারে একজনেরও দুঃখ হল না।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, অমন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন আরশি পেয়েও রাজা অমরদীপ কেন দেশ শাসনের কাজে ব্যর্থ হল? দোষ কি আরশির না রাজার? রাজা বনে গেল। না-হয় ভালোই করল, কিন্তু আরশিটা তো ছেলেকে দিয়ে যেতে পারত? ছেলে ওই আরশিটা কীভাবে ব্যবহার করে তা জানার কৌতূহল কি ছিল না অমরদীপের? —এই প্রশ্নগুলোর জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না-দাও, তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'ওই আরশিটা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও দেশ শাসনের পক্ষে উপযুক্ত আদর্শ বস্তু সেটা নয়। প্রজারা নানারকম চিন্তা করতে পারে। যে যখন রাজার বিরুদ্ধে চিন্তা করল তাকে তখনই কারাগারে নিক্ষেপ করা আদর্শ রাজার কাজ নয়। প্রত্যেকের চিন্তাধারা ভিন্ন ধরনের থাকতে পারে। সবাই বেশিরভাগ সময় নিজের কথাই ভাবে আর সব রাজাকেই প্রধানমন্ত্রী সেনাপতি-সহ বহু রাজকর্মচারীর উপর নির্ভর করতে হয়। একজন রাজার বিরুদ্ধে ভাবলেই সে তেমন কিছু করতে পারে না। চিন্তাভাবনা এবং কাজের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। কেউ কিছুক্ষণের জন্য বিরুদ্ধে ভাবতে পারে। তাই বলে তাকে চিরশত্রু ভেবে কারাগারে নিক্ষেপ করা উচিত নয়। আরশির জন্য রাজার সব থেকে বড়ো ভুল হল এটাই। আর ছোটো ভুল হল আরশির উপর রাজার নির্ভরতা। এই নির্ভরতার ফলে রাজা একটুও ভাবতেন না। মন্ত্রী সেনাপতি অথবা কারও সঙ্গে পরামর্শ করতেন না। প্রাচীন কালে রাজাদের একটা মহৎ গুণ ছিল, ছদ্মবেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে নিজের চোখে দেখে আসা। প্রধানমন্ত্রী, গুপ্তচর, দূত এদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খবর সংগ্রহ করা সত্ত্বেও রাজা বেরিয়ে পড়তেন ছদ্মবেশে, কিন্তু এই রাজা ওই পদ্ধতি গ্রহণ করলেন না। সম্পূর্ণরূপে আরশির উপর নির্ভর করে খেয়ালখুশিমতো যাকে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। পরিশেষে যখন বুঝলেন তখন তিনি আরশি ছেলেকে না-দিয়ে, যাওয়ার আগে নিজের হাতে ভেঙে ফেললেন।'
রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন